প্রথম আলো’র সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ একটি লেখা লিখেছেন নিউজিল্যান্ডের সাম্প্রতিক ভয়ংকর সাদা আভিজাত্যবাদী হামলার প্রতিক্রিয়া হিসাবে। লেখাটিতে অনেকগুলো প্রসঙ্গে তিনি আলোচনা করেছেন । সেখানে তিনি শুরু করেছেন পশ্চিমা সাদা খুনী আর খুনী যদি মুসলিম হয় তাহলে তাদের প্রতি যে সামাজিক, আইনী আচরনের প্রভেদ হয় সেটা দিয়ে। সেখান থেকে তিনি নরওয়ের সাদা আভিজাত্যবাদী খুনী ব্রেইভিক এর প্রসঙ্গ এনেছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর ভু-রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিযোগিতাকে  এনেছেন, অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কথা এনেছেন, কেনো ইউরোপ ও পশ্চিমাদের দায় আরও বেশী করে শরণার্থী নেওয়া সেই প্রসঙ্গও এনেছে। ফারুক যে চিন্তা’র উল্লেখ করেছেন সেটা দারুন মানবিক কিন্তু একেবারেই ইউনিক নয়। তার মতো হাজার হাজার পশ্চিমা মানুষও এভাবেই ভাবেন। এমন কি অসংখ্য পশ্চিমা লেখক, গবেষক বহু বছরের পরিশ্রম দিয়ে এই “আমরা আর তারা” রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করেছেন, এর অমানবিক দিকগুলোকে তুলে ধরেছেন। হাল আমলের কথিত সন্ত্রাসবাদ আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের নৈতিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে যে সকল গবেষণা রয়েছে তার বেশীরভাগই আসলে পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক এলাকা থেকেই এসেছে। এই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বহু বিতর্ক আছে এবং এই প্রসঙ্গে আমার অবস্থান বলাটা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে ফারুক ওয়াসিফের লেখার কিছু আগ্রহউদ্দীপক সরলীকরন ও তথ্যগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা। এই সকল তথ্যগত ভুল ফারুকের অনিচ্ছাকৃত হতে পারে আবার স্বেচ্ছা প্রনোদিতও হতে পারে। আমি শুধু এই ভুল গুলোর দিকে ফারুক ওয়াসিফের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি  কেননা এই ধরনের সরলীকরন ও তথ্যগত সীমাবদ্ধতা লেখারটির গ্রহনযোগ্যতাকে প্রশ্ন করেছে, ফলে এই লেখাটি ঘৃণা নিরপেক্ষকরনের বদলে ঘৃণার উদ্রেক ঘটাতে পারে।  লেখাকে যথেষ্ট মাত্রায় পপুলার করার জন্যে কখনও কখনও এই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে বটে, তবে আমার ধারণা এটা ফারুক ওয়াসিফের মতো সৃজনশীল মানুষের জন্যে তার নিজের লেখাকে নিয়ে ভাবনার সুযোগ করে দেবে।  মোট চারটি বিষয় উল্লেখ করবো।

ফারুক ওয়াসিফের প্রথম প্রস্তাবনা হচ্ছে – কোনও সন্ত্রাসবাদী যদি পশ্চিমা বা সাদা জনগোষ্ঠীর অন্তরভুক্ত হয়, তাহলে তাকে বলা হয় “মানসিক ভাবে অসুস্থ” আর যদি আক্রমনকারী   মুসলিম জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে  তাদের বলা হয় “জঙ্গী”, “সন্ত্রাসবাদী” ।   ফারুক ওয়াসিফের লেখা থেকে সরাসরি তুলে দিচ্ছি এই অংশ টুকু –

 

“বন্দুক হাতে লোকটি ঢুকল স্কুলে, চালাল নির্বিচার গুলি। শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিষ্টান এই লোকটিকে তখন বলা হবে মানসিক ভারসাম্যহীন। সমাধান: ওকে আটকে রেখে চিকিৎসা করো।

 

বন্দুক হাতের লোকটি মুসলমান? তাহলে এটা নির্ঘাৎ এক ‘জেহাদি’ সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র। সমাধান: মুসলমান খেদাও।

 

বন্দুক হাতে লোকটি যদি ইসরায়েলি অথবা মার্কিন সেনা হয়, তাহলে তার পরিচয় হবে সভ্যতার প্রহরী। তাদের বীরের খেতাব দাও”।

 

এটা কি এতোটাই সাধারন? যে একজন খুনী “সাদা” বলেই তিনি “মানসিক অসুস্থ” হিসাবে সুরক্ষা পান আর খুনী যদি মুসলিম সম্প্রদায়ের হয়ে থাকেন তাহলে তিনি তা পান না, যদি সত্যিই তিনি মানসিক ভাবে অসুস্থও হয়ে থাকেন? মোটা দাগে এই প্রস্তাবনাটি হয়তো সত্য বলে মনে হবে। অন্তত আমেরিকা ও প্রধান পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রতি যে ঘৃণার চর্চা শুরু হয়েছে তাতে এই বিষয়ে হয়তো কেউই দ্বিমত করবেন না।  অন্তত যদি আমরা সংবাদপত্রের তাৎক্ষনিক রিপোর্ট গুলোকে অনুসরন করি। কিন্তু চুড়ান্ত বিচারে কিম্বা আইনী প্রক্রিয়ায় আসলেই কি এই সকল অপরাধীকে “মানসিক রোগী” সাব্যস্ত করে তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়, কেবল তারা সাদা বা পশ্চিমা বা অমুসলিম বলেই? অর্থাৎ তাদেরকে শাস্তি দেবার বদলে এক ধরনের পুনর্বাসনে পাঠানো হয়? আর যদি তাইই হয়ে থাকে, তাহলে এই “মানসিক ভাবে অসুস্থ” হিসাবে গন্য হবার জন্যে কি কেবলই তাদের বর্ণ বা ধর্মগত পরিচয়টিই গননায় নেয়া হয়? ফারুক ওয়াসিফের উপরের লেখাটির প্রথম দুইটি পয়েন্টে অন্তত আমার তাইই মনে হয়েছে। অর্থাৎ খুনী যখন পশ্চিমা বা অমুসলিম কেউ হয়ে থাকেন তিনি এক ধরনের ইনডেমনিটি লাভ করেন “মানসিক ভাবে অসুস্থ” সুতরাং তাকে শাস্তি দেয়া যাবেনা, তার চিকিতসা করো আর এর বিপরীতে খুনী যদি মুসলমান হন, তাকে সোজা শাস্তিভোগ করতে পাঠিয়ে দাও। এই বিষয়টি তথ্যগত ভাবে সঠিক নয়।  কেনো নয় সেইটা ব্যাখ্যা করি।  ব্যাখ্যার আগে দুইটা বিখ্যাত কেইস এর উদাহরণ দেই।

কেইস – ১

২০১১ সালে নরওয়েতে যে ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদী ঘটনাটি ঘটেছিলো আন্দেরস ব্রেইভিক নামের একজন সাদা আভিজাত্যবাদীর দ্বারা (আমরা পরে আরও বিস্তারিত লিখবো), সেই ব্রেইভিক কে গ্রেফতারের পরে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপটিই ছিলো তাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে পাঠানো। এমনকি প্রাথমিক মূল্যায়নে ব্রেইভিক কে মানসিক ভাবে “অস্থিতিশীল” বলার পরে আদালত দ্বিতীয় একটি মূল্যায়নের জন্যে তাকে পাঠায় এবং আদালত রায় দেয় যে ব্রেইভিক মানসিক ভাবে সুস্থ। সে সজ্ঞানেই এক কাজটি করেছে। তারপরে তার বিচারিক কাজ শুরু হয়।

কেইস – ২

আরেকটি ঘটনা ২০১৭ সালে, এপ্রিল মাসের ৭ তারিখে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের প্রধান একটি সড়কে একটি শপিং মলের সামনের ফুটপাথে ট্রাক চালিয়ে দেয় উজবেকিস্তানের নাগরিক আখিলভ রাখমত। কট্টর সুন্নী ইসলামে বিশ্বাসী আখিলভ কে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং তিনি ঘটনার সাথে তার সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করেন। তার বেলাতেও বিচারিক কার্যক্রমের প্রথম ধাপটি ছিলো তার মানসিক সুস্থতা সংক্রান্ত প্রশ্নের সমাধান করা। সুইডেনের ডাক্তারদের একটি বোর্ড তাকে পরীক্ষা করেন ও তাঁর মানসিক সুস্থতার বিষয়ে নিশ্চিত করেন।

 

এই দুইটি উদাহরনের প্রথম ব্যক্তিটি অমুসলিম, ইউরোপীয় এবং দ্বিতীয় ব্যক্তিটি সুন্নী মুসলিম ও প্রথাগত অর্থে ইউরোপীয় নন, উজবেকিস্তানের । দুজনের ক্ষেত্রেই বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো তাদের মানসিক সুস্থতার প্রশ্নটি দিয়ে। এর মধ্যে কোনও গোপন পক্ষপাতিত্ব ছিলো কিনা তা জানার উপায় নেই। কিন্তু মোটা দাগে এটা সত্য যেকোনো অস্বাভাবিক সন্ত্রাসবাদী ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক ধাপ হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা, তিনি সাদা না কালো সেটা আসলে এখানে খুব গুরুত্ব পায়না। সুতরাং ফারুক ওয়াসিফ এর প্রথম দাবীটি সত্যিই সরলীকরনে আক্রান্ত।

এখন আসি আমেরিকার “গান ভায়োলেন্স” বা “ম্যাস শুটিং” এর প্রসঙ্গে। ফারুকের উদাহরণটি মূলত একটা তুলনামূলক বাইনারী তৈরী করেছে আমেরিকার “ম্যাস শুটিং” এর সাথে “ইসলামী জঙ্গী হামলা”র ঘটনার মাঝে।  আসেন একটু দেখি বিষয়টা –

আমেরিকায় গান ভায়োলেন্স একটা ভয়ংকর সমস্যা। বাস্তবত এটা ইসলামী জঙ্গী হামলার চাইতে কয়েকগুন বড় সমস্যা। এটা সাধারন আমেরিকানরা স্বীকার করেন। যার প্রমান হচ্ছে আমেরিকার বন্দুক আইন নিয়ে সকল শ্রেনীর নাগরিকেরা সোচ্চার হয়ে উঠছেন। এমন কি বন্দুক আইনের সংশোধন করার বিষয়টি একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও পরিনত হয়েছে। সুস্থ চিন্তার মানুষদের জন্যে প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে কোনও একজন মানুষ যদি বলা নেই কওয়া নেই হঠাত করে এক বা একাধিক বন্দুক নিয়ে সাধারন মানুষের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পরিচিত বা অপরিচিত মানুষদের খুন করে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে খুনীর “মানসিক সুস্থতা”র প্রশ্নটি কি একটা ভ্যালিড প্রশ্ন? এমন কি যারা ধর্মীয় বা বর্ণবাদী হামলা করেন, তাদের বেলাতেও হামলাকারীর “মানসিক সুস্থতা”র প্রশ্নটি কি একটা ভ্যালিড প্রশ্ন? অন্তত পশ্চিমা দেশগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই ধরনের “অস্বাভাবিক” হামলাকারীর মানসিক সুস্থতার প্রশ্নটি বিচারিক প্রক্রিয়ারই একটা অংশ। কিন্তু ফারুকের দেয়া তুলনামূলক উদাহরণটিতে মনে হতে পারে যে হামলাকারী যদি সাদা হন, তাহলে তার শাস্তির বদলে তাকে “মানসিক অসুস্থ” বানিয়ে মেন্টাল কেয়ার হোমে পাঠানো হয়। অর্থাৎ লোকটি কেবল সাদা হবার সুবাদে শাস্তিকে এড়াতে পারেন। এটা খুব ঝুকিপূর্ণ একটা দাবী। এই ধরনের দাবীর ক্ষেত্রে ফারুকের উচিত ছিলো খানিকটা পরিসংখ্যান হাজির করা। অর্থাৎ –

    • কতজন কিম্বা কি অনুপাতে “ম্যাস গান শুটিং” এর আসামী আসলে মানসিক ভাবে অসুস্থ হিসাবে পরিগনিত হয়ে থাকেন ?
    • কতজন বা কি অনুপাতে অভিযুক্ত এই মানসিক অসুস্থতার জন্যে তাদের বিচার বা শাস্তি এড়িয়ে হাসপাতালে যেতে পারেন?
    • মানসিক রোগি হয়ে শাস্তি এড়ানো এদের সংখ্যাই কি প্রধান? 

ফারুক ওয়াসিফ এই সকল পরিসংখ্যান এর ধার ধারেন নি, তাঁর সেটা দরকারও নেই, তিনি যেহেতু দেশের প্রখ্যাত পত্রিকার তারকা সাংবাদিক, সুতরাং তাঁর আসলে লিখলেই চলে, তিনি কেবল তাঁর বিচারের রায় দিয়েছেন।

আমি জানি এটা প্রধান প্রবনতা নয়। তবুও আমি আরেকবার পরীক্ষা করে দেখলাম। ওয়াশিংটনপোস্ট আমেরিকার বন্দুক ভায়োলেন্স এর উপরে একটি বিশেষ গবেষণা সংখ্যা করেছিলো। এই সংখ্যাটিতে তারা ১৯৬৬ সাল থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত আমেরিকার সবচাইতে ভয়ংকর ১৬৬ টি গান ভায়োলেন্স এর পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। এদের মাঝে মাত্র দুইজন মুসলিম গান শুটার ছিলেন, বাকি সবাই সাদা- কালো আমেরিকান।  এই ১৬৬ জন গান শুটার এর মাঝে ৯৩ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছিলেন, হয় পুলিশের হাতে নয়তো নিজেরাই নিজেদেরকে গুলি করে মেরেছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে আসলে ৫৭% গান শুটার বিচারের মুখোমুখিই হন না, তার আগেই নিহত হন। বাকী রইলো বেঁচে যাওয়া ৭৩ জন। এদের মাঝে ১১ বছরের কিশোর থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধ রয়েছেন। এদের বেশীরভাগেরই শাস্তি হয়েছে মৃত্যুদন্ড নয়তো ৫০ থেকে ৬০০ বছরের জেল। এবং সবচাইতে আগ্রহ উদ্দীপক হচ্ছে এদের মাঝে মাত্র ৪ জনকে শাস্তি দেয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদী সাইকিয়াট্রিক কেয়ার এর জন্যে পাঠানো হয়। অর্থাৎ শতকরা হিসাবে এটা দাঁড়ায় ৫% এর মতো। এমন কি এরকমের ঘটোনাও ঘটেছে মানসিক হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ম্যাস শুটিং ঘটিয়েছে কিন্তু তাকে আর মানসিক হাসপাতালে ফেরত পাঠানো হয়নি অতিরিক্ত ভীতিকর আসামী হিসাবে। আচ্ছা বলুন তো এই ৫% এর সূত্র ধরে এটাকে কি একটা সাধারন প্রবনতা হিসাবে উল্লেখ করা যায়? অর্থাৎ ৫% অপরাধীকে “মানসিক অসুস্থ” হিসাবে রায় দেয়াকে কি এভাবে বলা যায় যে বন্দুকধারী সাদা বা অমুসলিম হলেই তাকে “মানসিক অসুস্থ” বানিয়ে দেয়া হয়? যদি এটা ৫% থেকে বেড়ে ৭% বা ১০% ও হয় তাহলেও কি এটাকে সাধারন প্রবনতা হিসাবে উপসংহার টানা যায়?  এটা একটা বেয়াক্কেল কাজ। যেকোনো সুস্থ চিন্তার মানুষই বলবেন এটা একটা বেয়াক্কেল উপসংহার। এটা বেয়াক্কেল উপসংহার দুইটি কারণে – প্রথমত, এই উপসংহার টি তথ্যনিষ্ঠ নয়, বাস্তব পরিসংখ্যান এটাকে সমর্থন করেনা, দ্বিতীয়ত – এই ধরনের উপসংহার আসলে ঘৃণাবাদীদের হাতে আরেকটি ঘৃণা ছড়ানোর হাতিয়ার তুলে দেয়। দুটোর কোনোটাই দায়িত্বশীল কাজ নয়। ফারুক কেনো এই ধরনের দায়িত্বহীন কাজ করলেন? জনপ্রিয়তার জন্যে? হতে পারে।

এবার ফারুকের লেখার আরেকটি অংশ দেখি। সরাসরি তাঁর লেখা থেকেই তুলে দিচ্ছি।

 

 “ব্রেইভিকের দায় সব সুইডিশকে নিতে হয়নি। ২০১১ সালে অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নামের এক ব্যক্তি নরওয়েতে গুলি ও বোমা ফাটিয়ে এক ঘণ্টা ধরে মোট ৭৭ জনকে হত্যা করেন। এর আগে নিজের ব্লগে তিনি মুসলিমবিদ্বেষী কথাবার্তা লেখেন। নরওয়ের মতো নিউজিল্যান্ডও শান্তির দেশ বলে পরিচিত। কিন্তু এই শান্তি সাম্প্রদায়িক ঘাতক মানসিকতা তৈরি ঠেকাতে পারেনি। ব্রেইভিককে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী বলেননি সে দেশের আদালত।

 

এই অংশটুকুতে আমার আপত্তির যায়গা দুইটি । প্রথমটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেটা হচ্ছে তিনি বলছেন –

“ব্রেইভিকের দায় সব সুইডিশকে নিতে হয়নি”।

ব্রেইভিকের কাজের দায় কেনো “সব সুইডিশ” কে নিতে হবে? ব্রেইভিক কি সুইডিশ নাগরিক? কিম্বা ব্রেইভিক কি সুইডেনে হামলাটি করেছিলেন? কিম্বা ব্রেইভিক কে কি সুইডেনের কোনও এজেন্সি এই কাজটি করার জন্যে পাঠিয়েছিলো? বিষয়টি পরিষ্কার নয়। আমার ধারণা এটা একটা অসতর্ক বাক্য। হয়তো ফারুক ওয়াসিফ লিখতে চেয়েছিলেন যে – ‘ব্রেইভিকের দায় সব নরওয়েজিয়ান কে নিতে হয়নি’।  ফারুক যেভাবে চিন্তা করেন তাতে মনে হচ্ছে তিনি বলতে চাচ্ছেন যেভাবে কোনও একজন মুসলিম অপরাধীর দায় সারা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপরে চাপিয়ে দেয়া হয় পশ্চিমা মিডিয়াগুলোতে, ব্রেইভিকের খুনের দায়ে বলা হয়নি যে নরওয়েজিয়ান মাত্রই “খুনী” । এটা সত্য কথা, কিন্তু মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের দায় সমগ্র মসুলিম জনগোষ্ঠীর উপরে চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টা কতটা পশ্চিমা সমাজের বাস্তবতা আর কতটা পশ্চিমা মিডিয়ার কারসাজি? ফারুক কি এখানে মিডিয়ার ভুমিকা কে অস্বীকার করেন? কিম্বা পশ্চিমা মিডিয়া কি সত্যিই পশ্চিমা সমাজের সামাজিক মতামত কে প্রতিফলিত করে? নাকি এই যন্ত্রগুলো দিয়ে শাসকেরা তাদের স্বপক্ষে মতামত “উৎপাদন” করে? আমি নিশ্চিত ফারুক এসব জানেন, কিন্তু এতোটা “ডিটেইলস” এ গেলে আর পপুলার লেখা হয়না, সেই বিষয়টাও তিনি ভালো করে বোঝেন।

তবে এই অংশটির চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অংশ হচ্ছে এটা, ফারুক লিখছেন – “ব্রেইভিককে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী বলেননি সে দেশের আদালত”। মাত্র এক লাইনের এই বাক্যটিতে ফারুক ব্রেইভিক এর সম্পর্কে নরওয়েজিয়ান আদালতের ভুমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন যা দারুন ভাবে তথ্যগত ভুল। কেনো বলি –

আন্দেরস ব্রেইভিকের অপরাধকে একটা “সন্ত্রাসবাদী কাজ” বা ইংরাজিতে Terrorist act বলে উল্লেখ করেছে নরওয়েজিয়ান আদালত। তার বিচার হয়েছে টেরোরিস্ট আইনে। আইনের যে দুইটি ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে সেই দুইটি ধারাও “টেরোরিস্ট” আইনের ধারা।  তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উল্লেখ করা হয়েছে “চরমপন্থী” বা ইংরাজিতে “Extremist” হিসাবে। যদি আরও বিস্তারিত বলি তাহলে হয়তো হাস্যকর শোনাবে, তবুও বলি। ব্রেইভিকের মামলার চুড়ান্ত রায়ে ইংরাজী “Terrorist” শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ বারের মতো, “Terror” প্রায় চল্লিশ বারের মতো আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উল্লেখ করতে “Extremist”, “Extremism”, “Farright extremism” ইত্যাদী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় গোটা চল্লিশেক বার। এরপরেও ফারুক বলছেন যে নরওয়ের আদালত ব্রেইভিক কে সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গী বলেনি। ফারুক কি ব্রেইভিকের মামলার রায়টি পড়ে দেখেছেন? নাকি কেবল উইকিপেডিয়ার জ্ঞান দিয়েই দায়িত্ব সেরেছেন। আমি ব্রেইভিকের মামলার রায়ের মূল ইংরাজি কপি থেকে তুলে দিচ্ছি –

 

  • “Although the Court will discuss the objective and subjective conditions for punishability further on in the judgment, in relation to the relevant penal provisions, the deaths will henceforth be referred to as murders, the personal injuries as attempted murders and the explosion at the Government District and the shooting on Utøya as terrorist acts”.

 

  • “The defendant succeeded in keeping his extensive terrorism preparations hidden from the surrounding world. He carried out the terrorist attacks on 22 July 2011 in line with his plans”

 

  • “Against this background, the Court finds it has been proved beyond any reasonable doubt that the defendant had such terror intent as described in the Penal Code, section 147a first subsection paras. a) and b) when attacking the Government district, and as described in para. b) when attacking at Utøya”.

 

এই রকমের অসংখ্য প্যারাগ্রাফ রয়েছে রায়ের ডকুমেন্টটিতে যেখানে ব্রেইভিকের কাজ কে বলা হচ্ছে “টেরোরিস্ট” এক্ট বা সন্ত্রাসবাদী ঘটনা। তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কে বলা হয়েছে চরমপন্থী, ডানপন্থী চরমপন্থী ইত্যাদি। দেখুন –

 

  • “The defendant’s rightwing extremist ideology is also documented through his compendium”.

 

  • “During the trial, anti-Islamic and rightwing extremist ideas and rhetoric were thoroughly elucidated”

 

  • “The Court’s assessment thus far is that the defendant’s statement of being a participant in a civil war with expectations of a takeover of power in Europe can be understood in a political context that is significant in farright extremist subcultures”

 

বলুন তো, এই ধরনের গোটা তিরিশেক প্যারাগ্রাফ থাকার পরেও কি বলা যায় যে নরওয়ের আদালত ব্রেইভিক কে জঙ্গী বা সন্ত্রাসী বলেননি? ফারুক ওয়াসিফ কি বলতে চাচ্ছেন আদালতের রায়ে যতবার ব্রেইভিক এর নাম নেয়া হয়েছে প্রত্যেকবার “ডিফেন্ডেন্ট” এর বদলে “জঙ্গী – সন্ত্রাসী ব্রেইভিক” বলতে হবে? এটা পরিষ্কার নয়। কিন্তু পৃথিবীর কোনও আদালত কি এভাবে বলে? আদালতের ভাষায় যিনি বিবাদী তাকে কি এভাবে সম্বোধন করা হয়? আমি আগ্রহবশত বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এর একটি রায়ের কপি চেক করলাম। জামাত নেতা কাদের মোল্লার রায়ের কপি। প্রায় সাতশো পাতার এই ডকুমেন্ট টিতে কাদের মোল্লাকে উল্লেখ করা হয়েছে “Appellant” অথবা “Convicted Appellant”  হিসাবে। আদালত নিজে তাকে “রাজাকার” বলে সম্বোধন করেন নি। যতবার “কসাই কাদের” বা এই ধরনের শব্দ এসেছে সেসবই এসেছে অন্যের বয়ানে এবং উদ্ধৃতি আকারে।

তাহলে, নরওয়ের আদালত সম্পর্কে ফারুকের এই যে দাবী, তার ভিত্তি কি? তিনি কি সচেতন ভাবেই এই তথ্য বিকৃতি ঘটিয়েছেন? আমি মনে করি হয়তো না। তবে এই এক লাইনের একটি বাক্য ঘৃণাবাদীদের হাতে একটা বিরাট অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। ফারুক কি ভেবে দেখবেন?

ফারুক আরও কিছু উপরভাসা মন্তব্য জুড়ে দিয়েছেন যা আসলে বাস্তবতার সাথে মেলেনা। একথা সত্য যে যেকোনো ইসলামী সন্ত্রাসবাদীর দ্বারা হওয়া কোনও হামলার প্রতিক্রিয়া অন্যান্য হামলার প্রতিক্রিয়ার চাইতে ভিন্ন রকমের হয়। বিশেষ করে আমেরিক, ইংল্যান্ড সহ বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশের ইসলামোফোবিয়ার চর্চার কারণে। কিন্তু সেটাকি আসলে ইউরোপের বা পশ্চিমের মূল ধারা? যেমন ফারুক বলছেন –

 

 “অথচ শিকড়ের দিকে না, লতাপাতায় জড়ায়ে যায় আমাদের মন ও মগজ। তাই ‘সন্ত্রাসী’ পরিচয় কেবল মুসলমানদের জন্যই বরাদ্দ। অথচ এফবিআই ডেটাবেইস থেকে বের হওয়া একটা প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ১৯৮০-২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঘটা মাত্র ৬ শতাংশ সন্ত্রাসী ঘটনায় মুসলিম সন্ত্রাসীরা জড়িত ছিল। যুদ্ধাক্রান্ত সিরিয়াকে বাদ দিলে ২০১৬-১৭ সালেও বিশ্বের মোট সন্ত্রাসী ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে অমুসলিমদের দ্বারা (গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০১৮)”।

 

ফারুকের দেয়া এই তথ্য অনুযায়ী, ৯৪% সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে “অমুসলিম” সন্ত্রাসীদের দ্বারা এবং এটা এফবিআই এর ড্যাটাবেইজ বলছে। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে এই ৯৪% কে এফবিআই ড্যাটাবেইজে কি “সন্ত্রাসী” হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে নাকি অন্য কিছু? এদের কে যদি সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করা হয় তাহলে কি “সন্ত্রাসী’ পরিচয় কেবল মুসলমানদের জন্যই বরাদ্দ” এই বাক্যটি কি সঠিক, তথ্যনিষ্ঠ? না, এটা বাস্তব সম্মত নয়। ফারুক হয়তো পশ্চিমা মিডিয়ার কথা বলতে চেয়েছেন। সেটা স্পস্ট করে বলা দরকার। ধরা যাক, সন্ত্রাসবাদের যে সবচাইতে বড় ড্যাটাবেইজ, ম্যারিল্যান্ড ইউনিভারসিটি তার দেখাশোনা করে, সেখানে কিন্তু একই সংজ্ঞায় সকল সন্ত্রাসবাদী ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে (সেই সংজ্ঞা নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে) এবং এই ডেটাবেইজের সকলেই “সন্ত্রাসী” হিসাবেই শ্রেনীবদ্ধ, কেবল মুসলিমরাই নয়। সেখানে আইরিশ বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও সন্ত্রাসী হিসাবে শ্রেনীবদ্ধ, স্পেনের কিছু অতি ডান ও অতিবাম গ্রুপের বিচ্ছিনতাবাদীরাও “সন্ত্রাসী” হিসাবেই চিহ্নিত ও শ্রেনীবদ্ধ। ফারুকের গন্ডগোলটা হচ্ছে তিনি পশ্চিম বলতে কেবল পশ্চিমা মিডিয়াকেই বোঝেন। অথচ এফবিআই কিম্বা ম্যারিল্যান্ড ইউনি’র ড্যাটাবেইজ গুলোতো পশ্চিমাই তাইনয় কি? সেখানে তো ৯৪% লিপিবদ্ধ সন্ত্রাসী ভিন্ন ধর্মের, তারা কি সেটাকে অস্বীকার করছেন? সুতরাং পশ্চিমা মিডিয়া যা বলে প্রায়শই পশ্চিম তা বলেনা। ফারুক তার সাধারনীকরন দিয়ে পশ্চিমা মিডিয়া আর পশ্চিমা সমাজ কে এক করে ফেলেছেন এবং তারপর নিজের ঘৃণা উগড়ে দিচ্ছেন, যেটা কোনও কাজের কথা নয়। দুটোকে আলাদা করে বলা দরকার, স্পস্ট করে বলা দরকার পশ্চিমা মিডিয়া আর পশ্চিমা সমাজের বাস্তবতাকে। মূল ধারাকে, মূল প্রবনতাকে।

সন্ত্রাসবাদের পরিসংখ্যান বিষয়ে আরেকটা কথা বলা দরকার। সন্ত্রাসী ঘটনার সংখ্যাগত অনুপাত বা পারসেন্টেজ উল্লেখ করেছেন ফারুক ওয়াসিফ, কিন্তু উল্লেখ করেননি তার ভয়াবহতার কথা। অর্থাৎ েই ঘটোনাগুলোর দ্বারা মানব প্রাণের ধ্বংস ও বস্তুগত ধ্বংসের পরিমানের কথা। ফারুক কি লিখবেন গত পঞ্চাশ বছরে আইরিশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে কতজন মানুষ নিহত হয়েছেন আর ইসলামী চরমপন্থিদের হাতে কতজন মানুষ নিহত হয়েছেন? শুধুমাত্র “ইন্সিডেন্স” বা ঘটনার সংখ্যা দিয়ে কি সন্ত্রাসী ঘটনার ভয়াবহতা বোঝা যায়? যায়না। কেননা সংখ্যার হিসাবে আইরিশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা সংগঠিত সন্ত্রাসবাদী ঘটনা হয়তো ইসলামী চরমপন্থিদের দ্বারা হওয়া ঘটনার চাইতে অনেক বেশী হবে, কিন্তু নিহত মানুষের সংখ্যা হিসাব করলে ইসলামী সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহতা কয়েক হাজার গুন বেশী হবে। যারা এই হিসাব টি পরীক্ষা করতে চান তারা সন্ত্রাসবাদের সবচাইতে বড় ড্যাটাবেইজে একটু গবেষণা করে দেখতে পারেন। এটা সম্পূর্ণ ফ্রি। ফারুক ওয়াসিফেরা এতোটা “ডিটেইল” এ কখনই যাবেন না। কেননা তাহলে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ কে আর অতটা “নিরীহ” চেহারায় দেখানো যাবেনা।

আসুন ফারুকের আরেকটি বক্তব্য দেখা যাক –

 

“ফ্রান্সের শার্লি হেবদোতে গুলি করে কয়েকজন হত্যার পর জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, দায়ী করা হয় মুসলমান জনগোষ্ঠীকে।“

 

ফারুক ওয়াসিফের এই বর্ণনা আমাকে বিস্মিত করেছে। দেখুন কত সহজ ভাবেই তিনি বলছেন “গুলি করে কয়েকজন হত্যার” কথা, অর্থাৎ ফারুক ওয়াসিফের কাছে ঘটনাটি কেবল “কয়েকজন” কে হত্যা কিন্তু ফরাসী জনগনের কাছে এটা ছিলো তাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচাইতে ভয়ংকর ঘটনা। শুধুমাত্র ছবি আঁকার কারণে, ক্যারিক্যাচার করার কারণে, স্বাধীন মতামত দেয়ার কারণে বারোজন শিল্পী – সাংবাদিক ও কার্টুনিস্টকে এক সাথে নির্মম ভাবে হত্যা করা ফারুক ওয়াসিফের কাছে “কয়েকজন”কে  হত্যা করা। ফারুক ওয়াসিফের কাছে “শারলি হেব্দো” হচ্ছে “কয়েকজন মানুষ” এর খুন হওয়া আর ফরাসীদের কাছে “শারলি হেব্দো” হচ্ছে ফরাসী স্পিরিটের প্রতিক, ফরাসী সমাজের চেতনা অর্থাৎ “স্বাধীনতা”, চিন্তার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা, লেখার কিম্বা ছবি আঁকার স্বাধীনতা। ফারুক ওয়াসিফ এর কাছে শারলি হেব্দো হচ্ছে “কয়েকজন” কে হত্যা করার ঘটনা।   এটা আগ্রহ উদ্দীপক। তিনি বলেন নি হত্যাকান্ডটি কারা ঘটিয়েছে, কেনো ঘটিয়েছে, কিন্তু অভিযোগ করছেন এই ঘটনায় মুসলিম জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়। কে দায়ী করেছিলো? যিনি জরুরী অবস্থা জারী করেছিলেন তিনি? অর্থাৎ ফরাসী রাস্ট্রপতি ফ্রাসোয়া ওলাদ কি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে দায়ী করেছিলেন? এখানে ফ্রাসোয়া ওলাদের প্রতিক্রিয়াটি যুক্ত করে দিলাম, দেখুন তো এখানে তিনি কাকে দায়ী করেছেন? তার সমগ্র প্রতিক্রিয়ায় “মুসলমান” বা “ইসলাম” বা এর ধারে কাছেও কোনও শব্দ নেই। এমন কি কাউকে দায়ী করার প্রসঙ্গও নেই। তাহলে কে মুসলমানদের দায়ী করলো? ফরাসী জনগন? যে পাঁচ লক্ষ ফরাসী নাগরিক বাস্তিল চত্বরে জড়ো হয়েছিলেন তারা? তাদের তো শ্লোগান ছিলো “আমরা ভীত নই”, তাদের শ্লোগান ছিলো “আমরাই শারলি হেব্দো”। কে বা কারা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে দায়ী করলো সেটা নির্দিষ্ট করে  বলার দায় ফারুক ওয়াসিফের নেই। বাস্তবিক অর্থে শারলি হেব্দোর ঘটনাকে ফরাসীরা নারকীয় ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করেছিলো। কিন্তু মূলধারার ফরাসী নাগরিকেরা এটাকে একটি সন্ত্রাসবাদী ঘটনা হিসাবেই চিহ্নিত করেছিলো এবং এর দায় নির্দিষ্ট সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের বলেই চিহ্নিত করেছিলো। এই ঘটনার জেরে,  কিছু উগ্র ডানপন্থী মুসলিমদের মসজিদে হামলা করেছিলো। কিছু মুসলিম নাগরিককে হেনস্থা হতে হয়েছিলো। কিন্তু সেটা কি ফরাসী নাগরিকদের প্রধান প্রতিক্রিয়া ছিলো? বরং তাদের প্রধান প্রতিক্রিয়া ছিলো মুসলিম সমাজের সাথে মিলেই এই ধরনের নারকীয় ঘটনার প্রতিরোধের শপথ নেয়ার মধ্যে দিয়ে। ফারুকের আলোচনায় প্রধান প্রবনতাগুলো কখনই আসবেনা, কেননা তাতে স্টোরী টা “পপুলার” হয়না।

লেখাটির মূল উপজীব্য “শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান” আর নিরীহ “মুসলিম”। এই বাইনারী দিয়ে সমগ্র লেখাটিতে ঘৃণার বাতাস ছড়িয়েও ফারুক শেষমেশ ভালোবাসার কথা শুনিয়েছেন। এটা আশার কথা। কিন্তু সেটা তার লেখায় ছড়ানো ঘৃণা আর সত্যনিষ্ঠার অভাবকে কমাতে পারেনি। বাস্তবত, ফারুক ওয়াসিফের মতন সৃজনশীল লেখকের কাছ থেকে আমরা যা দাবী করি সেটা হচ্ছে “দায়িত্বশীলতা”, “তথ্যনিষ্ঠা”, যদি এই জগতের এই সকল ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, তাহলে পশ্চিমা শয়তানিকে উল্লেখ করার পাশাপাশি শুভ চরিত্রের আন্দোলনগুলোকেও উল্লেখ করা দরকার। শুভ প্রবনতাকে উল্লেখ করা দরকার। নরওয়ের আদালত যে ব্রেইভিক কে “টেরোরিস্ট” বলেছেন সেটা গোপন করে কোনও লাভ নেই।  নইলে সেই একই বাইনারী – “আমরা আর ওরা” তৈরী হবে, যেমন টা ফারুক তৈরী করেছেন তার লেখায়।

পশ্চিমের দখলদারিত্ব ও রাস্ট্র স্পন্সরড সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতা করতেই হবে।  কিন্তু সেই সমালোচনা করতে গিয়ে যদি এই রকমের হরে-দরে পপুলার যুক্তি উৎপাদন করা হয়, তথ্য বিকৃত করা হয়, টুইস্টেড পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সেটা বরং পশ্চিমের এই সকল যথাযথ সমালোচনাগুলোকেই দুর্বল করে দেয়। এটা ফারুক ওয়াসিফ যদি বোঝেন তাহলেই মঙ্গল।

যারা ফারুকের এই লেখাটিকে দারুন “মহান” লেখা বলে উল্লেখ করছেন, তাদের জন্যে সেলিম রেজা নিউটনের একটা খুব ছোট্ট লেখা এখানে সংযুক্ত করলাম। পড়ে দেখুন আর যেকোনো ভাবেই হোক ঘৃণার বিপরীতে দাঁড়ান।

ঘৃণাকে পালটা ঘৃণা দিয়ে পরাস্ত করা যায়না। অংশ নয়,  সমগ্রটা দেখুন। সেটাই বাস্তবতা।

Spread the love