ধর্মের বিরুদ্ধে, ধর্মের অন্ধকারাচ্ছন্নতা – বর্বরতা নিয়ে যে কয়েকজন ব্লগার সাম্প্রতিক সময়ে নিরলস ভাবে লিখে যাচ্ছেন, সুষুপ্ত পাঠক তাঁদের একজন। সেইজন্যে তিনি আমাদের ধন্যবাদ পাবার দাবী রাখেন। জরুরী কাজটি তিনি করছেন ক্লান্তিহীন ভাবেই। সুষুপ্ত পাঠক ধর্মের বিভিন্ন প্রামান্য গ্রন্থ থেকে যথাযথ রেফারেন্স সহ তুলে ধরছেন ধর্মের ভয়াবহ প্রভাব আর ধর্মের অযৌক্তিকতাকে। কোনও সন্দেহ নেই, এই সময়ে, তিনি বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলে আমাদের নাস্তিকতাবাদী আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট প্রদায়ক।

আমাদের কালে, বাংলাদেশের নাস্তিকতাবাদী আন্দোলনের প্রধান প্রেরণা হচ্ছে পশ্চিমের নিউ এথিস্টরা বা নিউ এথিজম ধারা (প্রখ্যাত লেখক অভিজিৎ রায় তার অবিশ্বাসের দর্শন পুস্তকে নিউ এথিজমের বাংলা হিসাবে লিখেছিলেন “নব্য নাস্তিকতা”) । যে সকল পাঠক আন্তর্জাতিক নাস্তিকতাবাদী আন্দোলনের খোঁজ খবর রাখেন, তাঁরা জানেন নিউ এথিজম এখন এক ধরনের “ব্র্যান্ড’, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিউ এথিজমেরই তো জয় জয়কার। আমি ভুলও হতে পারি তবে সুষুপ্ত পাঠকের অনেক গুলো লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে, জনাব শুষুপ্ত পাঠক নাস্তিকতার এই নতুন পশ্চিমা ধারা “নিউ এথিজম” এর একজন বাঙ্গালী প্রতিনিধি। এই ধারার দুটি প্রধান বৈশিষ্ঠ্য, এরা দুটি বিষয়কে দুনিয়ার সবচাইতে বড় সমস্যা বলে মনে করেন, এগুলো হলো –

১) ইসলাম এবং ইসলামই বর্তমান দুনিয়ার যাবতীয় দুর্দশার জন্যে দায়ী। এরা খ্রিস্টিয়ানিটি কিম্বা হিন্দুত্ব নিয়েও মাঝে মাঝে লেখেন বটে, কিন্তু এঁদের লেখার মূলধারাটি হচ্ছে ইসলাম বিষয়ক, দুনিয়ার সাম্প্রতিক সন্ত্রাসবাদের সাথে ধর্ম হিসাবে ইসলামের ঐতিহাসিক ভুমিকা নিয়ে।

২) আর এঁদের চোখে দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে বামপন্থা বা কমিউনিজম। বামপন্থীরা বা কমিউনিস্টদের এরা মনে করেন বিরোধী শিবিরের মানুষ। এরা মনে করেন, বামপন্থীরা নানান ধরনের “হাবিজাবি” যুক্তি সামনে এনে আসলে ইসলামী জঙ্গিবাদেরই পরোক্ষ সমর্থক হিসাবে কাজ করেন।

(নিউ এথিস্টদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আরো বিস্তারিত জানার জন্যে, আগ্রহী পাঠকেরা ইউটিউবে স্যাম হ্যারিস কিম্বা ডেভ রুবিন এর ভিডিও, পোডকাস্ট গুলো শুনে দেখতে পারেন।)

আমার বোঝাপড়ায়, সুষুপ্ত পাঠক নব্য নাস্তিকতাবাদ বা নিউ এথিজমের একজন সার্থক প্রতিনিধি তিনি তার অসংখ্য লেখায় অনেক যুক্তি, রেফারেন্স সহ লিখেছেন, ইসলামের বর্বরতার দিক গুলো, ধর্মের অযৌক্তিকতা, নিষ্ঠুরতার কথা নিয়ে। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে ইস্টীশন ব্লগে একটি ব্লগপোস্ট করেছেন, ইসলামী জঙ্গীবাদ এবং বামপন্থিদের ভুমিকা নিয়ে। আগ্রহী পাঠকেরা সুষুপ্ত’র লেখাটি পড়ে নিতে পারেন এখানে

সুষুপ্ত’র লেখাটি প্রথমত তাঁর ব্যক্তিগত মতামত, কিন্তু তাঁর এই লেখাটি এক অর্থে আমাদের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের “নব্য নাস্তিকতাবাদী” বয়ান। এবার আসুন সুষুপ্ত পাঠকের লেখাটিকে ব্যবচ্ছেদ করা যাক। কোনও রকমের ভুমিকা – ব্যাখ্যা – বিশ্লেষণ ছাড়াই, সুষুপ্ত লিখছেন এভাবেঃ

“বাংলাদেশের বামপন্থিরাই কেবল নয়, নিকট অতিতের সব আন্তর্জাতিক বামপন্থি বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতা ইসলামী টেরোরিস্টদের প্রতি পরোক্ষ সহানুভূতি দেখিয়ে হাবিজাবি কারণ সামনে এনে তাদের আইডিওলজিকে আড়াল করতে আগ্রহী হতে দেখা গেছে”।

কোনও প্রমান আছে আপনার কাছে জনাব সুষুপ্ত পাঠক? যদি থেকে থাকে, তাহলে সেই প্রমান হাজির করলেন না কেনও এই লেখায়? নিদেন পক্ষে দুচারজনের লেখা থেকে কোটেশন? কোনও বামপন্থি আজ পর্যন্ত লিখেছেন তাঁরা ইসলামী জঙ্গীবাদ কে সমর্থন করেন? সুষুপ্ত পাঠক তার লেখায় খুব যত্ন করে কুরআন হাদিসের রেফারেন্স দেন, ইবনে কাথির থেকে দেয়া তার অসংখ্য রেফারেন্স আমরা দেখেছি, এই লেখাতেও আছে। রেফারেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ মানুষ সুষুপ্ত পাঠকের এই লেখটিতে তার প্রধান অভিযোগ বামপন্থিদের বিরুদ্ধে, অথচ তারই কোনও রেফারেন্স নেই, কোনও কোটেশন নেই, কোনও অডীও বা ভিডিও লিংক নেই। কেন? কোনও রকমের রেফারেন্স, প্রমান ছাড়া এই ধরনের অভিযোগ দায়ের করা কি সত্যনিষ্ঠার লক্ষন?

আমি জানি সুষুপ্ত পাঠক নিবেদিত প্রাণ লেখক, তিনি নিশ্চয়ই আমার লেখার বিপরীতে তার মতামত প্রকাশ করবেন, অন্তত আশা করছি। তাই তার প্রতি আমার তিনখানা প্রশ্নঃ

১। বাংলাদেশের কোন কোন “বামপন্থী” কিম্বা বামপন্থী দল ইস্লামিস্টদের প্রতি “পরোক্ষ” সহানুভূতি দেখিয়েছেন? (আপনি নিশ্চয় পিনাকী মার্কা বামপন্থিদের কথা লিখবেননা আশা করছি, কিংবা আমাদের বন্ধু ব্লগার পারভেজ আলমকে বলির পাঁঠা করবেন না)। যদি করেনও, তাহলে তাঁদের লেখা থেকে সরাসরি কোট – আনকোট করে ব্যাখ্যা করবেন প্লিজ। এবং দয়া করে কি একটু বলবেন, ব্যক্তি পর্যায়ের বাইরে, রাজনৈতিক ভাবে, কোন কোন বামপন্থী দল ইসলামী জঙ্গীদেরকে সমর্থন করেছেন?

(অবশ্য আপনি যদি “বুশ ডকট্রিন” দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করা মানেই হচ্ছে সাদ্দাম হোসাইন কে সমর্থন করা, কিম্বা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করাই হচ্ছে ইসলামী জঙ্গীদের “পরোক্ষ” ভাবে সমর্থন করা, তাহলে আলাদা কথা। কিন্তু সেটা বললেও, প্লিজ একটু ঝেড়ে কাশবেন, তাতে অন্তত আপনার পাঠকদের আপনাকে বুঝতে আরো সুবিধা হবে।)

২। কোন কোন আন্তর্জাতিক বামপন্থী ইসলামী জঙ্গীদের “পরোক্ষ” ভাবে সহানুভুতি জানিয়েছেন? আপনি দাবী করেছেন, “সব আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবি” এই কাজটি করেছেন, আপনি কি এই রকমের দশজনের নাম বলতে পারবেন? আমি জানি, আপনি হয়তো নোয়াম চমস্কির নাম বলবেন, তাহলে বাকী নয়জনের নাম জানাবেন কি? সম্ভব হলে তাঁদের সংশ্লিষ্ট লেখা থেকে কোটেশন ও রেফারেন্স সহ?

৩। আপনি লিখেছেন – “হাবিজাবি কারণ” এর কথা। সেই হাবিজাবি কারণ গুলো কি কি একটু দয়া করে বলবেন? আর কেনইবা সেই সকল কারণ হাবিজাবি সেটা কি ব্যাখ্যা করবেন?

বামপন্থিদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের বাস্তব ভিত্তিটি হচ্ছে – বামপন্থিরা আমেরিকার বিদেশ নীতির ঘোর বিরোধী। আর আমাদের নাস্তিক বন্ধুদের “ভাশুর” হচ্ছেন আমেরিকা। ধর্ম মতে ভাশুরের নাম নেয়াটা অনুচিত। আমাদের নব্য নাস্তিক বন্ধুরা ধর্ম না মানলেও, ধর্মের সংস্কৃতিটা দারুন ভাবে মেনে চলেন। তাই “ভাশুর” আমেরিকার বিদেশনীতি নিয়ে কথা বলাটা তাঁদের কাছে “হাবিজাবি” মনে হয়। সারা দুনিয়াব্যাপী ইসলামী জঙ্গীবাদের উত্থানের পেছনের কারণ বিষয়ে তাই নব্য নাস্তিকরা আলোচনা করতে চান না। তারা মনে এই সকল আলোচনাকে বলেন “হাবিজাবি”।

অথচ এই নাস্তিকেরাই নিজেদেরকে দাবী করে “র‍্যাশনাল” মানুষ হিসাবে। “র‍্যাশনাল” মানুষেরা কি পৃথিবীকে কার্যকারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন নাকি উপরওয়ালার বয়ান দিয়ে ব্যাখ্যা করেন? র‍্যাশনাল মানুষ কি মধ্যপ্রাচ্যের অব্যাহত সন্ত্রাসবাদকে তার লক্ষন থেকেই ব্যাখ্যা করবেন? নাকি তার মূল কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন? সুষুপ্ত পাঠক নিশ্চয়ই নিজেকে র‍্যাশনাল মানুষ বলে দাবী করবেন, আফটার অল তিনি নাস্তিক এবং মুক্তচিন্তক। দেখুন সুষুপ্ত’র র‍্যাশনালিজমঃ

“কারণটা সবাই জানে এখন। ইসলামী টেরোরিস্ট বা জিহাদীদের একটা অংশ আমেরিকা-ইউরোপীয়ানদের বিরুদ্ধে জিহাদ করছে। বামদেরও কমন শত্রু আমেরিকা ও তার মিত্ররা। এই সূত্রে ইসলামের লাগানো আগুনে বামরা আলু পোড়া দিয়ে খেতে চাইছে”।

প্রথমে সুষুপ্ত বর্ণিত “জিহাদ” প্রসঙ্গে লিখি। পরে না হয় বামপন্থিদের “আলুপোড়া” খাওয়া নিয়ে লিখবো।

“জিহাদ” এর নানান সংজ্ঞা আছে, মডারেট মুসলমানেরা জিহাদ বলতে যা বলতে চায়, আইসিস এর জিহাদ তার থেকে অনেক আলাদা। আমরা ইতিহাস থেকে জানি, প্রচলিত সাদামাটা অর্থে, জিহাদ মানে হচ্ছে কাফের – বিধর্মীদের বিরুদ্ধে ইসলামের সম্প্রসারনবাদী যুদ্ধ। মুহাম্মদের হাত ধরে যে জিহাদের শুরু হয়েছিলো, অন্তত নবম শতক পর্যন্ত চালু ছিলো সেই সকল রক্তক্ষয়ী জিহাদ। আর সুষুপ্ত পাঠক লিখছেন একবিংশ শতকের “জিহাদ” নিয়ে। তাই আমার সংশয়বাদী মনে প্রশ্ন জাগছে – সুষুপ্ত আপনি কি দয়া করে বলবেন ইসলামী টেরোরিস্ট বা জিহাদীরা আসলে কোথায় এবং কিভাবে আমেরিকা ও ইউরোপের বিরুদ্ধে “জিহাদ” করছে? কোথায় বলতে আমি জিজ্ঞাসা করছি ভৌগলিক ভাবে পৃথিবীর কোথায় ইসলামী জিহাদীরা আমেরিকা ও ইউরোপের বিরুদ্ধে জিহাদ করছে? বলবেন? বিগত দুই-তিনশো বছরে কবে কোথায় ইসলামের নামে দেশ দখল করেছে মুসলমান দেশগুলো? গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে অনেক দেশ দখল করতে দেখেছি আমরা, সেগুলো কারা করেছে তা আপনিও জানেন, আমরাও জানি, কিন্তু ইসলামী জিহাদ দিয়ে কয়টি দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলবেন? হয়তো আপনি মাদ্রিদ, লন্ডন, প্যারিস, বার্লিনে আর সাম্প্রতিক সময়ে স্টকহোম এ হামলার কথা উল্লেখ করবেন। কিন্তু এই সকল হামলা কি জিহাদ? এই হামলাগুলোর পেছনে কি ইসলামী সম্প্রসারনবাদ জড়িত? এই হামলাগুলো কেবলই কিছু মুসলমান নামের জঙ্গীর কাজ? নাকি এর সাথে চলমান বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কিত? আর এই সকল হামলা যদি জিহাদ হয়, তাহলে সারা দুনিয়া জুড়ে পশ্চিমা দেশগুলো যে যুদ্ধের দামামা চালু রেখেছে, তাদের কে আপনি কি বলবেন? ইসলামী “জিহাদ” এর তুলনায় পশ্চিমা বড়ভাইদের চালু করা – জারি রাখা যুদ্ধগুলোর আকৃতি – ধ্বংসযজ্ঞের কোনও তুলনামুলক ইতিহাস আপনার জানা আছে?

আপনি নিশ্চয়ই জানেন দুনিয়ার কতটি দেশে আমেরিকা আর তাঁর মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক ঘাটী আছে? আপনি কি আসলেই জানেন? আমার ধারণা আপনি জানেন, তবুও একটু মনে করিয়ে দেই, পৃথিবীর ৬৩ টি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাটি আছে। আপনি কি সামরিক ঘাটির মানে বোঝেন? তাহলে আরেকটু খোলাসা করে বলি – পৃথিবীতে নানান ভাবে মোট ১৫৬ টি দেশে আমেরিকার সৈনিক বসানো আছে। পৃথিবীতে দেশ কয়টি আছে জানেন? মোট ১৯৫ টি দেশ। এই ১৯৫ টি দেশের মধ্যে ১৫৬ টি দেশে মার্কিন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সেই সরকারগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে। সারা দুনিয়া জুড়ে আমেরিকার মোট ৭৭৩টি সামরিক স্থাপনা বা মিলিটারী বেইস আছে। বলুন তো, নিজের দেশের বাইরে সারা দুনিয়াতে এই বিপুল পরিমানে সামরিক ঘাটি আর সামরিক স্থাপনা আমেরিকার কি কাজে লাগে? এতো গেলো শুধু আমেরিকা। এর সাথে যদি ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড আর রাশিয়াকে জুড়ে দেয়া যায়, তাহলে পৃথিবীর এমন কোনও দেশ পাওয়া যাবেনা যেখানে এই ছয়টি পশ্চিমা দেশের কোনও না কোনও সামরিক ঘাঁটি আছে। মাত্র ছয়টি দেশ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের সরকারকে বাধ্য করেছে তাঁদের বশ্যতা স্বীকার করবার জন্যে। শুধুমাত্র ইরান সহ চার – পাচটি দেশ মার্কিন আর তাঁর মিত্রদের বিরুদ্ধে এখনও লড়ে যাচ্ছে রাজনীতির ময়দানে। আর একেই সুষুপ্ত পাঠকেরা বলছেন ইসলামী জিহাদ। আমেরিকার আর ইউরোপের শহরগুলোতে ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের বোমাবাজিকে যদি আপনি পশ্চিমের বিরুদ্ধে ইসলামিষ্টদের “জিহাদ” বলেন, তাহলে সারা দুনিয়ার প্রায় সকল সার্বভৌম জাতি ও দেশকে যারা নিজের সামরিক ঘাটিতে পরিনত করেছেন, তাদেরকে কি বলবেন? সুষুপ্ত পাঠক কিম্বা তাঁর মতো বন্ধুদের কাছে এই সকল আলোচনা হচ্ছে “হাবিজাবি”, কেননা এই সকল আলোচনা তাঁর এবং হয়তো আমাদের সকলের “ভাশুর” কে বিব্রত করে, ইসলামী জঙ্গীবাদের দায় তখন আর কেবল ইসলাম ও মুহাম্মদের উপরে চাপানো যায়না । (মার্কিন সামরিক বিস্তার সম্পর্কে আগ্রহীরারা এখানে দেখে নিতে পারেন এখানে)


(এটা হচ্ছে পৃথিবীর মানচিত্রে আমেরিকার সামরিক মহড়ার বাস্তব চিত্র, এই ছবিটি হাল নাগাদ করা হলে অন্তত ১১ টি নতুন দেশ এটাতে যুক্ত হবে। এটাকে অবশ্য খ্রিষ্টান জিহাদ বলা যাবেনা। এটা কে কোন ধরনের “জিহাদ” বলা যাবে?)

পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা মেশিনের তোতাপাখি না হয়ে, নিজের বুদ্ধি বিবেচনাবোধ খাটানোটা জরুরী। সন্দেহাতীত ভাবে, ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠী ছড়িয়ে পড়েছে সারা ইউরোপে, তারা এখানকার জনজীবনকে আতংকগ্রস্থ করে তুলছে। ইউরোপের জনগন এবং সরকারকে আতংকের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু একজন র‍্যাশনাল মানুষ কখনও শুধু রোগের লক্ষণটাই দেখেনা, তিনি রোগের কারণটি দেখেন। যেকোনো সমস্যাকে বোঝার মূল পদ্ধতি হচ্ছে সমস্যাটির কার্যকারণ বোঝার চেষ্টা করা, সমস্যা বা কোনও রোগের চিকিৎসার মূল পদ্ধতি হচ্ছে রোগের কারণটি দূর করা, শুধুমাত্র লক্ষন দূর করা নয়। এখানেই আমাদের সুষুপ্ত পাঠকের মতো নাস্তিক মুক্তমনাদের সমস্যার জায়গাটি। এরা রোগের কারণগুলোকে মনে করে “হাবিজাবি” কথা, আর লক্ষন গুলো নিয়ে দিনরাত হাহাকার করে চলেন। আপনি আমার বাড়ীর পাশে সামরিক ঘাঁটি বানাবেন এবং আমার কোনও প্রতিক্রিয়া হবেনা, এটা র‍্যাশনাল প্রত্যাশা নয়, বরং বাস্তবতা হচ্ছে, আমার বাড়ীর পাশে সামরিক ঘাঁটি বানালে আমি আতংকিত বোধ করি, যদি আমার ক্ষমতা থাকে তাহলে আমি তার প্রতিবাদ করি, যদি আমি অক্ষম হই প্রতিবাদে, সেই অক্ষমতা থেকে তৈরী হয় চাপা ঘৃণা, যা প্রতিদিন গুনোত্তর ধারায় বেড়ে চলে। সারা মধ্যপ্রাচ্যের জনগোষ্ঠীতে যে ঘৃণার জন্ম হয়েছে, তা কতটা ধর্মতাড়িত আর কতটা উপনিবেশিক বঞ্চনায় ফলাফল, সেই বিষয়টির সিরিয়াস অনুসন্ধান জরুরী। এই অনুসন্ধান ইসলামী মোল্লা বা মডারেটদের দিয়ে হয়নি, হচ্ছে না, আর দুঃখজনক হচ্ছে, এই অনুসন্ধানের কাজটি “মুক্তচিন্তক” বলে দাবীদার নাস্তিকদের দিয়েও হচ্ছেনা।

সারা দুনিয়া জুড়ে চলমান জঙ্গী সন্ত্রাসবাদের “র‍্যাশনাল ইনকোয়ারী” বা বাস্তবমুখী – যৌক্তিক অনুসন্ধান দরকার। এই অনুসন্ধানে, সৎ বিবেচনাবোধ খুব জরুরী, সত্যনিষ্ঠা খুব জরুরী, ইতিহাসনিষ্ঠা খুব জরূরী আর সবচাইতে জরুরী যেটা দরকার তা হলো খোলা মন। ইসলামী জঙ্গীবাদের পেছনে কুরআনের আক্রমণাত্মক বানীগুলোর প্রতি মুমিনদের যে একনিষ্ঠতা সেটা যেমন বলা দরকার ঠিক তেমনি, বিগত পঞ্চাশ বছরে মার্কিন আর তাঁর মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে যে সন্ত্রাসবাদের বীজ বপন করেছে, সার – পানি নিয়ে তার ফলন নিশ্চিত করেছে, সেটাও বলা দরকার। কুরআন আর মুহাম্মদের বানীগুলো যেমন মুমিন মুসলমানদের কাফের হত্যার প্ররোচনা দেয়, তেমনি চোখের সামনে নিজের শহর কিংবা দেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিনত হতে দেখলেও মানুষ “শত্রু” নিধনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। দুটি কারণই জরুরী, কোনটাই “হাবিজাবি” কারণ নয়।

আধুনিক বিজ্ঞানের দর্শন রচিত হয়েছে স্যার কার্ল পপার এর হাত ধরে। দেখুন জনাব কার্ল পপার “র‍্যাশনালিটি” বা যুক্তি সহবাদ সম্পর্কে কি বলছেন।

“র‍্যাশনালিজম হচ্ছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি যা ভিন্নমতগুলোকে শোনে এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখে এবং মেনে নিতে তৈরী থাকে যে – আমি হয়তো ভুল হতে পারি, আপনি হয়তো সঠিক হতে পারেন, আর এভাবেই আমাদের প্রচেস্টা দিয়েই আমরা হয়তো সত্যের কাছাকাছি যেতে পারি।”

সত্য কঠিন, কঠিনকেই তো ভালোবেসেছি আমরা তাই না?

(চলবে)।

আগ্রহী বন্ধুরা পরের পর্ব পড়তে পারেন এখানে

 

Spread the love