ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় নথী গায়েব হয়ে যাবার ঘটনায় দৈনিক পত্রিকা গারডিয়ানের শিরোনাম (২০১৭)। ছবিটিতে কেনিয়ার মাউ মাউ বিদ্রোহের সময়ে এভাবেই গ্রামবাসীদের ঘর থেকে বের করে এনে তল্লাশী চালাতো ব্রিটিশ সৈনিকেরা।

ব্রিটেনের সরকারী মহাফেজখানা থেকে এক হাজার নথী গায়েব হয়ে গেছে সাম্প্রতিক সময়ে। এই এক হাজার নথী গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি কেবল এবারেই প্রথম ঘটলো, তা নয়, বরং এই রকমের গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা ইদানিং প্রায়শই ঘটছে। ব্রিটেনের মতো একটি উন্নত দেশে, যারা নিজেদেরকে সভ্যতা, গনতন্ত্র ও জবাবদিহিতার ’রোল মডেল’ মনে করেন বিশ্বের মাঝে, সেখানে কিভাবে সরকারী দলিল এভাবে গায়েব হয়ে যেতে পারে? সবচাইতেই উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে – সরকারী মহাফেজখানা থেকে এই দলিল গুলোর বেশীরভাগই ছিলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশ সরকার ও ব্রিটেন রাষ্ট্রের যে ঔপনিবেশিক নিপীড়নের ইতিহাস তার প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড। এই দলিলগুলোতে ছিলো আরজেন্টিনার ফকল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধের নানান নথীপত্র, এর মাঝে ছিলো কিভাবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিদ্রোহীদের উপরে নমন নিপীড়নের সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করেছিলেন এই ধরণের নানান সব নথীপত্র, পোলিও ভ্যাক্সিন নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার নথীপত্র, প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ভুমিকা ইত্যাদি নানান ধরণের নথী। এই বিপুল পরিমানে রাষ্ট্রীয় নথী গায়েব হয়ে যাওয়া কে সরকার বলছে ”Misplaced” হওয়া অর্থাৎ ভুলে হয়তো কোনো যায়গায় রয়ে গেছে আর ফেরত আসেনি, কেননা এই সকল নথী মহাফেজখানা থেকে ধার নিয়েছিলো ব্রিটেন সরকারেরই নানান দফতর। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এটা কেবল ধার নিয়ে ফেরত না দেয়ার ঘটনা নয়, এটা হয়তো একটা পদ্ধতিগত উদ্যোগ, নথীগুলোকে চিরতরে গায়েব করে দেয়ার।

ব্রিটেনের জাতীয় মহাফেজখানায় মোট এক কোটি দশ লক্ষ’র মতো সরকারী নথী রয়েছে এবং ঐতিহাসিক ভাবেই এই সকল নথীর একটা বিরাট অংশ রাষ্ট্র হিসাবে ব্রিটেনের যে ভয়ংকর সব ভুমিকা রয়েছে সারা দুনিয়াতে সেই সকল ঘটনার দলিলপত্র। সাম্প্রতিক দুনিয়ার গণতান্ত্রিক পরিবেশে ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের গবেষক, ঐতিহাসিক ও সাংবাদিকেরা এই সকল নথী ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে থাকেন যা প্রায়শই রাষ্ট্র ও সরকারের জন্যে বড়োসড়ো অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। কিন্তু মানবতাবাদী মানুষের কাছে সরকার ও রাষ্ট্রের এই অস্বস্তির চাইতেও অনেক বেশী জরুরী কাজ হচ্ছে ইতিহাসের নিপীড়কদের স্বরূপ উন্মোচন করা যেনো একই ধরণের নিপীড়কের উত্থান আর না ঘটে পৃথিবীর ইতিহাসে। এই সকল গবেষক, ইতিহাসবিদ বা সাংবাদিকদের লেখালেখি সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উন্মোচিত করেছে কিভাবে পশ্চিম সারা পৃথিবীতে অব্যাহত সন্ত্রাসবাদ ও ষড়যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন দেশের উপরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেছে ও জারী রেখেছে। নোম চমস্কি, ইলান পেপে, ওয়েন জোন্স কিংবা মার্ক কারটিসের মতো নানান বয়সের নানান পেশার অসংখ্য গবেষক এই সকল সরকারী নথী থেকেই দেখিয়েছেন কি ভয়ংকর ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, নিপীড়ন ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সমূহ চালিয়ে গেছে এই সকল কথিত ”সভ্য” পশ্চিমা দেশগুলো। ব্রিটেনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ মার্ক কারটিস ব্রিটেনের এই সকল রাষ্ট্রীয় নথীপত্র থেকেই দেখিয়েছেন কিভাবে ব্রিটেন সারা দুনিয়াব্যাপী ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের সাথে নানান রকমের আঁতাত করেছে, ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের মদদ দিয়ে ব্রিটেনের অরথনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধাদি হাসিল করেছে, সময় ও সুযোগ মতো এই সকল সন্ত্রাসবাদী দলগুলোকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের সরকার পতনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। পশ্চিমা দেশের এই ধরণের ভুমিকা উন্মোচনের এই কাজটি আমেরিকার বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক নোম চমস্কি করে চলেছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। কিভাবে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে অ্যাংলো-মার্কিন জোট ও তাদের মিত্র পশ্চিমা দেশগুলো ভয়ংকর সব গণহত্যা চালিয়েছে শুধুমাত্র সেই সকল জনপদের সম্পদ দখলের জন্যে সেসকল ইতিহাস চমস্কি সহ আরও অনেক ইতিহাসবিদ প্রকাশ করে চলেছেন। কথিত এই সকল ’সভ্য’ ও ’উন্নত’ পশ্চিমা দেশগুলোর এই ইতিহাসগুলো বিষয়ে নোম চমস্কি তার একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন তাঁর লেখা ’পশ্চিমা সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে” বইটিতে। তিনি সেখানে উল্লেখ করেছেন, পশ্চিমা দেশগুলো খুব সফলতার সাথেই তাদের করা এই সকল ভয়ংকর সব ইতিহাস তাদের নিজেদের জনগনকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে, বিশেষত এই সকল দেশের তরুন প্রজন্ম কে। এই সকল দেশগুলোর তরুন প্রজন্ম জানেইনা তাদের রাষ্ট্র মাত্র কয়েক দশক আগেও সারা দুনিয়াতে কি ভয়ংকর নিপীড়ন, নির্যাতন চালিয়েছে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর উপরে। সেজন্যেই বেলিজিয়ামের জনগন জানেননা যে রাজা লিওপোল্ড-২ কঙ্গোতে যত মানুষ হত্যা করেছিলো তার সংখ্যা পুরো বেলজিয়ামের জনগসংখ্যার চাইতেও বেশী। ব্রিটেনের তরুনেরা জানেনা তাদের রাষ্ট্রটি মধ্যপ্রাচ্যে বা ভারতের ইতিহাসে কি ভয়ংকর সব গণহত্যা আর নিপীড়নের সাথে যুক্ত। নানান পথে এই সকল পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের কৃতকর্মগুলো তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করেছে, মুছে দিয়েছে তাদের করা এই সকল গনহত্যার ইতিহাস। গণহত্যা আর ঔপনিবেশিক নিপীড়নের ইতিহাস মুছে দেয়ার নানান পদ্ধতির সাথে সাম্প্রতিকতম সংযোজন হচ্ছে রাস্ট্রীয় নথীপত্র গায়েব করে দেয়া। 

ঐতিহাসিক এই রাষ্ট্রীয় নথীগুলো গায়েব হয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাবার মতো দাবীগুলো আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে যখন গবেষকেরা ব্রিটেন কিংবা তার মিত্র দেশ যেমন আমেরিকার করা নানান রকমের সন্ত্রাসবাদী ও ষড়যন্ত্রমূলক কাজের অনুসন্ধান করতে চেয়ে এই নথীগুলো দাবী করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর করা নানান ধরণের গোপন অপরাধমূলক কাজের অনুসন্ধানের জন্যে কিছু নথী চাওয়ার প্রেক্ষিতে ব্রিটীশ সরকারের উত্তর ছিলো সেই সংশ্লিষ্ট নথীগুলো পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে সেই সকল নথী আর পাওয়া যায়নি ব্যবহারযোগ্য অবস্থান। যা আসলে ব্রিটেনের পরম মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ কে গোপন করার একটি কৌশল মাত্র। 

ব্রিটিশ দৈনিক ‘দি গারডিয়ান’ চমস্কির মতো করেই মন্তব্য করেছে যে – “বহু ব্রিটীশ নাগরিক এই রকমের একটা বিশ্বাস নিয়ে বড় হয়ে উঠেছে যে তাদের দেশ, রাষ্ট্র দুনিয়াকে সভ্য করেছে, সারা দুনিয়াকে অসভ্যতার হাত থেকে বাচিয়েছে, কিন্তু এই সকল নাগরিকদের কাছে তাদের দেশের করা ভয়ংকর সব গণহত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো কখনই উল্লেখ করা হয়না। ব্রিটেনের প্রতিটি সরকার নাগরিকদের মাঝে এই সকল ইতিহাস বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ক্রমাগত ভাবেই এই বিষয়গুলোতে অজ্ঞানতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। এই বিষয়ে কোনো ট্রুথ কমিশন গড়ে তোলার কিংবা ব্রিটেনের যাদুঘর গুলোতে ঔপনিবেশিক সময়ের ইতিহাস সংরক্ষনের কিংবা স্কুল – কলেজগুলোতে ঔপনিবেশিক সময়ের ইতিহাস পড়ানোর মতো সকল ধরণের উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার গুলো”।

মাউ মাউ বিদ্রোহের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার অপরাধে গ্রামের পর গ্রাম এভাবেই তল্লাশী চালিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো সাধারণ মানুষদের।

শুধুমাত্র নথীপত্র গায়েব করার মাধ্যমেই যে ইতিহাস কে মুছে ফেলার এই আয়োজন চলছে তা নয়, বরং আরও নানান পথে ইতিহাসের নথীপত্র জনগনের কাছ থেকে আড়াল করে রাখার প্রচেস্টা চলছে এই সকল কথিত ’উন্নত’, ’সভ্য’ দেশগুলোতে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিশেষ ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে যে ব্রিটীশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় এক কোটি বিশ লক্ষ নথী যে সকল নথী বহু আগেই জনগনের জন্যে অবমুক্ত হয়ে যাবার কথা ছিলো, সেই সকল নথীকে সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছে এবং জনগনের জন্যে অবমুক্ত বা ’ডিক্ল্যাসিফায়েড ঘোষণা করা হচ্ছেনা। সাম্প্রতিক সময়ে যখন কিছু কেনিয়ান নাগরিক ব্রিটেন রাষ্ট্র ও এর সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা করে বসে ১৯৫০ সালে কেনিয়ার মাউ মাউ গনহত্যার জন্যে, সেই ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরও বিপুল পরিমানে রাষ্ট্রীয় নথী বেআইনী ভাবে গোপন করে রাখার ঘটনাটি বেরিয়ে পড়ে। গারডিয়ানের সূত্র অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের একটা গোপন দফতরে এই বিপুল পরিমানে নথীপত্র গোপন করে রাখা হয়েছে বহু বছর ধরে। এই সকল নথীর কিছু কিছু নথী অবমুক্ত হবার কারণে জানা গেছে যে কেনিয়ায় মাউ মাউ গনহত্যায় যে সকল মানুষের মৃত্যুকে একদা দূষিত পানি পান করে মৃত্যু বলে চালানো হয়েছিলো সসেসব ছিলো পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা, হোলা বন্দীশিবিরে মাউ মাউ বিপ্লবীদের যারা নিহত হয়েছিলেন তাদেরকে আসলে হত্যা করা হয়েছে ব্রিটীশ সরকারের প্রতি বশ্যতা স্বীকার না করার অপরাধে আর অন্যান্য বন্দী বিপ্লবীদের মনোবল ভেঙ্গে দেবার জন্যে। যে সকল নথী হয় গোপন করা হয়েছে নয়তো ’হারিয়ে’ ফেলা হয়েছে তাদের বেশীরভাগই এই রকমের অস্বস্তিকর সত্যকে উন্মোচন করছে যা সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন সহ তার ইউরোপীয় মিত্রদেরকেও অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে।

একদিকে পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা আরেকদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের করা ভয়ংকর সব মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের স্মৃতিকে নষ্ট করে দেয়ার এই দ্বিবিধ পদ্ধতি মোটের উপরে পৃথিবীর ইতিহাসে পশ্চিমাদের চরম অসভ্য ভুমিকাকে হয়তো একদিন মুছে দেবে। মানুষকে ভুলিয়ে দেয়া হবে পৃথিবীর বুকে কি বীভৎস সব অসভ্য কাজের সাথে জড়িয়ে আছে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সংশ্লিষ্টতা। পশ্চিমের যে আধুনিক প্রকল্প আমরা দেখছি, পৃথিবীকে বিভাজিত করার ও বিভক্ত রাখার দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক প্রকল্প – ’আমরা ও তারা’, ’উন্নত পশ্চিম’ ও ’অসভ্য বাকী বিশ্ব’ এই বিভাজন আরও সহজ হয়ে উঠবে। আর এই বিভাজনের জন্যে পশ্চিমের নতুন কৌশল – ইতিহাস কে মুছে দেয়া, ইতিহাস কে ধ্বংস করে দেয়া, মানুষের ইতিহাস জানার অধিকার কে খর্ব করা।

অসভ্য ইতিহাসের মালিক পশ্চিমের এই তৎপরতা কতটা সভ্য? এই প্রশ্ন করাটা জরুরী আমাদের সকলের জন্যে।

দায় স্বীকার 

ব্রিটেনের সংবাদপত্র ‘দি গারডিয়ান’ এর কয়েকটি প্রতিবেদনের উপরে ভিত্তি করে লেখা।

Spread the love