১.

আওয়ামী ব্লগার ও আওয়ামী অনলাইন পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ এর কল্যানে জানলাম যে সজীব ওয়াজেদ জয় এর জন্মদিন জুলাই মাসের ২৮ তারিখ (কিংবা ২৭ তারিখ)। শুভ জন্মদিন জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়।  তার জন্মদিন উপলক্ষে দুইটি প্রোপাগান্ডা মূলক প্রতিবেদন (মতামত) পড়ার সৌভাগ্য হলো। একটি লিখেছেন প্রখ্যাত আওয়ামী ব্লগার অমি রহমান পিয়াল এবং অন্যটি লিখেছেন নিশম সরকার নামের আরেকজন লেখক (লেখক হিসাবে আমি তাকে জানিনা) ।  লেখা দুটি পড়ে জনাব জয়ের জীবনের বহুল প্রচারিত কিছু তথ্য আবারো নতুন করে জানা গেলো। লেখা দুটির উদ্দেশ্য একই, সজীব ওয়াজেদ জয় এর পাবলিক ইমেজ গড়ে তোলা, ঠিক যেভাবে বাংলাদেশের মানুষ পছন্দ করে, অর্থাৎ দেখানো যে সজীব ওয়াজেদ জয় অনেক প্রতিকূলতা – প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে একজন “বিশ্বমানের” মানুষে পরিনত হয়েছেন, হয়ে উঠেছেন এমন একজন মানুষ যিনি শুধু বাংলাদেশেই নয় দুনিয়ার জন্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কিন্তু মুশকিল হলো, যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো ক্ষেত্রে একজন সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের যে প্রোফাইল বা বিশেষত্ব থাকে, যে অভিজ্ঞতার ঝুলি থাকে, জ্ঞানের জগতে যে অবদান থাকে সেসব অর্জনের দিক থেকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঝুলি এতোটাই ফাঁপা যে প্রোপাগান্ডা তাকে খুব বেশীদূর এগিয়ে দেয়না। বিশেষত একটু জানাশোনা মানুষের কাছে, একটু যারা খতিয়ে দেখেন তাদের কাছে সজীব ওয়াজেদ জয় একজন ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ সরকারের পেইড কনসালট্যান্ট এর চাইতে বেশী কিছু হয়ে উঠতে পারেন না। যাই হোক এই দুটি লেখা পাঠ করার পরে বরং আমার নিজের কাছেই কিছু প্রশ্ন তৈরী হয়েছে, সেই প্রশ্ন গুলো আগ্রহী পাঠকের কাছে তুলে ধরছি।

২.

সালটি ছিলো ১৯৭১, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বছর। সেবছর আটাশে জুলাই জন্ম নিয়েছিলেন সজীব ওয়াজেদ জয়। একই দিনে কি আরও অনেক সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন বাংলাদেশের মায়েরা? ঠিক কতজন শিশু জন্ম হয়েছিলো সেদিন যুদ্ধ আক্রান্ত বাংলাদেশে? এই প্রশ্নগুলো খানিকটা অবান্তর কেননা আমরা জানি নিশ্চিত ভাবেই সেদিন আরও হাজার খানেক শিশু জন্ম হয়েছিলো যুদ্ধ আক্রান্ত বাংলাদেশে। যুদ্ধ জীবন কে থামিয়ে দিতে পারেনা। তাই সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মদিনে তিনি ছাড়াও আরও অসংখ্য শিশু জন্ম হয়েছিলো যুদ্ধ আক্রান্ত বাংলাদেশে।  সজীব ওয়াজেদ জয় এর জন্ম হয়েছিলো কোনো একটি শহুরে আধুনিক হাসাপাতালে যেখানে সেনাবাহিনীর পাহারা ছিলো। যেখানে বেগম ফজিলাতুননেসা কিংবা কবি সুফিয়া কামালের মতো মানুষেরা তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। যদিও পাকিস্তানী সেনা অফিসারেরা তাদেরকে বেশী সময় দেয়নি দেখার জন্যে। কিন্তু জয়ের জন্ম হয়েছিলো একটি আধুনিক হাসপাতালে, রিফিউজি ক্যাম্পে নয়, বনে বাদাড়ে নয়, প্রত্যন্ত গ্রামে নয়। হাসপাতালটি পাকিস্তানী সৈনিকেরা পাহারা দিলেও সেখান থেকে জয় ও তার মাতা শেখ হাসিনা বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন, জীবন নিয়ে, নিরাপদেই। কিভাবে সেই পাকিস্তানী আর্মিদের পাহারা দেয়া হাসপাতাল থেকে মা ও ছেলে বেরিয়ে এসেছিলেন?  সশরীরে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন এটা নিশ্চয়ই মঙ্গলের কথা কিন্তু কিভাবে? অর্থাৎ তখনও, সেই চরম ঝঞ্জামূখর একাত্তরেও শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয় এর জীবনের এক ধরনের “নিরাপত্তা” ছিলো। কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই ১৯৭১ এর জুলাই মাসের আটাশ তারিখে বাংলাদেশের সকল সন্তান সম্ভবা মা তাদের সন্তানকে যথাযথ ভাবে নিরাপদে এই দুনিয়াতে নিয়ে আসতে পারেন নি। এঁদের মাঝে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে, অনেককেই সন্তান জন্ম দিতে হয়েছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, পলায়নপর অবস্থায় কোনো গ্রামে কিংবা সীমান্তবর্তী কোনো রিফিউজি ক্যাম্প এ। সেদিন নিশ্চিত ভাবেই আরও হাজার হাজার মা তাদের সন্তান জন্ম দেয়ার জন্যে কোনো হাসপাতালে যায়গা পান নি, যেতে পারেন নি।  সেদিক থেকে নিশ্চিত ভাবেই সজীব ওয়াজেদ জয় তার জন্ম থেকেই বাংলাদেশের আরও হাজার টি শিশুর চাইতে লক্ষ গুনে “প্রিভিলেজড”, বাংলায় আমরা যাকে বলে “সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া” শিশু। সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম কাহিনীর সাথে বাংলাদেশের সেইদিনে আরও হাজার টি শিশুর জন্ম কাহিনীর কথা কেউ মেলাবেন না, তুলনা করবেন না, কেননা সজীব ওয়াজেদ জয় হচ্ছেন “রাজবংশ” সুতরাং কোনো একটি ঝঞ্জামূখর দিনে তার জন্মই ইতিহাসে জন্যে একটা “বিশেষ” ঘটনা, অন্তত প্রোপাগান্ডার জন্যে তো বটেই। এতো গেলো জন্ম কাহিনী, আসুন এবারে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বড় হয়ে ওঠা জেনে নেই আওয়ামী ব্লগারদের কাছ থেকে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে কেনো সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মদিন টি মহিমান্বিত? সেদিন তো বাংলাদেশে আরও ভয়ংকর পরিস্থিতিতে আরও হাজার টি শিশুর জন্ম হয়েছিলো, তাদের জন্মদিন কেনো মহিমান্বিত নয়?

৩.

শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পরে শেখ হাসিন ও শেখ রেহানা কে চলে যেতে হয় তাদের রাজনৈতিক আশ্রিত জীবনে। নিশ্চিত ভাবেই রিফিউজি জীবন কোনো কাংখিত জীবন নয়, বিশেষত যখন পরিবারের সবাইকে ভয়ংকর হত্যাকান্ডে হারিয়ে শরণার্থী জীবন বেছে নিতে বাধ্য হতে হয় কাউকে। শেখ হাসিনার পরিবার কে বেছে নিতে হয়েছিলো তেমনই একটা ভয়ংকর জীবনকে। আগেই বলেছি পারিবারিক যে ভয়ংকর ট্র্যাজেডি শেখ হাসিনার পরিবারে ঘটে গেছে, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলাটাও বাতুলতা। কিন্তু ভারতে শরণার্থী জীবনে শেখ হাসিনা পরিবার কেমন ছিলেন? নিশ্চিত ভাবেই ভালো থাকার কথা নয়। যাঁদের পরিবারের প্রতিদিনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে সংযুক্ত, তাদের তো ভারতে শরণার্থী জীবন ভালো লাগার কথা নয়। কিন্তু সেখানে সজীব ওয়াজেদ জয়ের পড়াশুনার অবস্থা কেমন ছিলো? জনাব নিশম সরকার এর লেখাটি থেকে জানা যাচ্ছে –

 

“জয়কে নৈনিতাল এর সেইন্ট জোসেফ স্কুল এ ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে তামিল নাড়ুর কোদাইকানাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সে পড়াশুনা করে”।

 

ভারতের বোর্ডিং স্কুল গুলো সম্পর্কে যাঁদের ন্যুনতম ধারণা আছে তারা জানেন, এই স্কুলগুলো খরুচে বা “একস্পেন্সিভ”। খোদ ভারতেরই সাধারণ মানুষের সন্তানেরা এই সকল স্কুলে পড়তে পারেনা। তাহলে ভারতের কোন পরিবারের সন্তানেরা এই সকল স্কুলে পড়াশুনা করেন? নিশ্চিত ভাবেই ধনী, উচ্চবিত্ত, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের সন্তানেরা এই সকল স্কুলে পড়াশুনা করার সুযোগ লাভ করেন। বাংলাদেশের কোন পরিবারের সন্তানেরা ভারতের এই সকল বোর্ডিং স্কুলে পড়াশুনার সুযোগ লাভ করেন? এখানেও উত্তর টা একই। খুবই সুবিধাভোগী বা প্রিভিলেজড শ্রেনীর সন্তানেরাই কেবল এই সকল স্কুলে পড়াশুনা করতে পারেন। হ্যাঁ, সজীব ওয়াজেদ জয়ের “শরণার্থী” জীবন নিশ্চিত ভাবেই আরও হাজারটা শরণার্থী পরিবারের সন্তানদের মতো ছিলোনা। এখনও ইউরোপে হাজার হাজার শরণার্থী পরিবার তাদের সন্তানদের কাংখিত স্কুলে পাঠাতে পারেন না। শরণার্থী জীবন সেটা অনুমোদন করেনা। কিন্তু সজীব ওয়াজেদ জয়ের শরণার্থী জীবনও ছিলো “প্রিভিলেজড” বা সুবিধাপ্রাপ্ত, তাই তিনি নৈনিতালের অভিজাত স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন, হয়তো এটা ভারত সরকারের বদান্যতার কারনেও হতে পারে। ভারত সরকারের সরাসরি বদান্যতা কয়টি পরিবার লাভ করতে পারে?  বাংলাদেশের স্বাভাবিক জীবনেও দেশের ৯০% শিশু এই ধরনের স্কুলে পড়ার সুযোগ লাভ করে না, দারুন সুখস্বপ্নেও তারা এমন অভিজ্ঞতা লাভ করেনা। এই প্রশ্নটি তোলাটা জরুরী এই কারণে যে কি ধরনের “পিভিলেজড” অবস্থার মধ্যে দিয়ে জনাব জয়ের শিক্ষা জীবোন কেটেছে তা বোঝার জন্যে।

 

নিশম সরকার জানাচ্ছেন –

 

“স্কুল-কলেজের পাট চুকিয়ে সে ভর্তি হলো ব্যাংগালোর ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সে”।

 

 

বেশ ভালো কথা, স্কুল ও কলেজ এর পাট চুকিয়ে জনাব জয় “ব্যাঙ্গালোর ইউনিভারসিটি” তে পড়তে শুরু করলেন। কিন্তু সেটা কোন বছর ছিলো? আমাদের ইতিহাস বলছে জনাব জয় এর মা আমাদের সাম্প্রতিক বাংলাদেশের অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন ১৯৮১ সালে, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আনুকূল্যে। সেই সময়ের হিসাবে অর্থাৎ তার মা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অবতরন করেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে অর্থাৎ সেই সময়ের সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের তেরোদিন আগে, যখন জয় এর বয়স ছিলো দশ বছরের কম। এই দশ বছর বয়সের জয় কেনো বাংলাদেশে ফিরে আসলেন না? বাংলাদেশে কি নৈনিতাল বোর্ডিং স্কুলের সমকক্ষ কোনো স্কুল ছিলোনা আশির দশকে? এমন কি বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বুয়েটের মতো বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও জনাব জয় কে কেনো কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার জন্যে ব্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ে থাকতে হলো? বিশেষত যখন তাঁর মা বাংলাদেশের একজন অন্যতম ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ?  আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানিনা। শুধু জানি… জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় চাইলে তাঁর দশ বছর বয়সেই বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারতেন, এখানকার স্কুলে পড়তে পারতেন, বাংলাদেশের কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারতেন। তিনি তা করেন নি। কেনো করেন নি? আমরা জানিনা।

 

আমার প্রশ্ন হচ্ছে ১৯৮১ সালের মে মাসে সজীব ওয়াজেদ হয়তো তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেনীতে পড়তেন, তিনি কেনো মায়ের সাথে বাংলাদেশে ফিরে আসলেন না? কেনো তিনি সেই ছোট্ট বালক বয়সে বাবা – মা উভয়কে ছেড়ে ভারতে পড়াশুনা করলেন? কেনো কলেজে তিনি বাংলাদেশে পড়লেন না? কেনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বাংলাদেশে পড়লেন না? তিনি যদি বাবা-মায়ের টাকায় ব্যাঙ্গালোরে না পড়তেন, তিনি কি আসলে বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আদৌ সুযোগ পেতেন?

 

এরপরে জনাব নিশম সরকার জানাচ্ছেন –

 

“নিজেকে আরও যোগ্য করে তুলতে সেকেন্ড ব্যাচেলর ইন কম্পিউটার সায়েন্স ডিগ্রী নিতে পাড়ি জমালো আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে। আরও শানিত হতে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স করলেন কেনেডি স্কুল অফ গভার্নমেন্ট অ্যাট হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে”।

 

 

তার মানে হচ্ছে – ব্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়ের “ব্যাচেলর” ডিগ্রিটি তাকে কোনো মাস্টারস ডিগ্রির জন্যে প্রস্তুত করতে পারেনি, তাই তিনি আরেকটি অর্থাৎ “সেকেন্ড ব্যাচেলর ইন কম্পিউটার সায়েন্স” ডিগ্রি নিতে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন পড়তে। সেটা কত সাল? সেটা কি জনাব জয়ের মা প্রধান মন্ত্রী হবার আগে পরে কোনো সময়ে?  নিশম সরকার বা অমি পিয়ালেরা এই সকল বিষয়ে একটু “মেছো” Fishy আচরণ করেন।  এরা কখনই সাল দিন ক্ষন উল্লেখ করেন না। কেনো করেন না? ব্যাঙ্গালোর থেকেও কি তিনি বাংলাদেশে আসতে পারতেন না? দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করতে পারতেন না তাঁর পড়াশুনা? না, ততদিনে তিনি আরও অধিক “প্রিভিলেজড” মানুষে পরিনত হয়েছেন, তাই মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে নিজ টাকায় পড়াশুনা করার ক্ষমতা তৈরী হয়েছে তাঁর। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর মাতা সাম্প্রতিক সময়ের অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন যে তিনি টাকার অভাবে জয় কে “এমআইটি তে পড়াতে পারেন নি”, অর্থাৎ টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি নিজের টাকাতেই পড়েছিলেন সেটা অন্তত পরোক্ষ ভাবে জানা যায়। আচ্ছা বলুন তো – কোনো একটি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের টাকায় টিউশন ফি দিয়ে পড়াটা ঠিক কেনো একটি “মহান” ও “মহিমান্বিত” বিষয়? হ্যাঁ, প্রোপাগান্ডার বিষয়ে অবশ্যই সেটা মহিমান্বিত।

 

আচ্ছা এসব প্রশ্ন না হয় বাদই দেয়া গেলো । তিনি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলেন। বাবা-মা’র পয়সায়? নাকি বৃত্তি নিয়ে? না, আমি এমনটা বলছিনা যে বাবা-মা’র পয়সায় পড়তে গেলে সেই পড়াশুনাটা বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাওয়ার চাইতে আলাদা কিছু হয়। কিন্তু আমি শুধু জানতে চাই, তিনি কি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বৃত্তি নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন? যদি সেটা না হয়, তাহলে নিশ্চিত ভাবেই তিনি পড়তে গিয়েছিলেন আরও দশটা “হাই প্রিভিলেজড” সন্তানের মতোই। সে ধরনের পড়াশুনা টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র করে থাকেন। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের শেখদের সন্তানেরাও আমেরিকার সবচাইতে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে থাকেন। অবশ্যই নিজেদের টাকায়। এই পড়াশুনা করাটা কেনো আরও হাজার জন ছাত্রের চাইতে অধিক মহিমান্বিত? বরং প্রতিবছর বাংলাদেশের হাজার খানেক ছাত্র ইউরোপে ও আমেরিকার বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়তে আসেন, কেনো তাঁদের পড়াশুনা করাটা সজীব ওয়াজেদ জয়ের পড়াশুনার মতো এতো মহিমান্বিত নয়?

 

বাস্তবত সজীব ওয়াজেদ জয় এর ছাত্রজীবন আরও দশ বারোজন “হাই প্রিভিলেজড” সন্তানের ছাত্র জীবনের মতোই। সেটা নিয়ে অমি পিয়াল কিংবা নিশম সরকারের মতো দলীয় লেখকেরা যতই প্রোপাগান্ডা করুন না কেনো যে সকল মানুষ আজকের যুগে দলদাসত্ব করেন না, তাঁদের পক্ষে সত্যটি জানা খুব কঠিন কিছু নয়।

 

৪. 

অমি পিয়াল অভিজ্ঞ প্রোপাগান্ডিস্ট। তিনি ভাষা ও শব্দ দিয়ে খেলেন, তথ্য দেন না, পরিসংখ্যান দেন না। কেননা তথ্য ও পরিসংখ্যান মানুষ কে আলোকিত করে, ধন্দে ফেলেনা। আর ফ্যাসিবাদ টিকে থাকে ইলিউসন বা ধন্দ তৈরী করে। আওয়ামী প্রোপাগান্ডার প্রধান দিক হচ্ছে সেটাই। তাই অমি পিয়ালের লেখাটাতে কোনো তথ্য নেই, পরিসংখ্যান নেই, আছে সস্তা আবেগ। একটা নমুনা দিচ্ছি এখানে, জনাব পিয়াল লিখছেন এভাবে –

 

“বিদেশে পড়াশোনা করে অনেক বিশিষ্ট মানুষই দেশে ফেরত এসেছেন। ক্যারিয়ার শিকেয় তুলে ছুটে এসেছেন জন্মভূমির ঋণ শোধে। অথচ এই সুধীজনের তালিকায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম নিতে সবারই কুণ্ঠা। কারণ? তিনি শেখ মুজিবের নাতি। শেখ হাসিনার ছেলে। এদের প্রশংসা করতে নেই”।

 

 

সজীব ওয়াজেদ জয় কি আসলে বিদেশে পড়াশুনা করে দেশে ফিরে এসেছেন দেশের টানে? তিনি কি আসলেই তাঁর “ক্যারিয়ার শিকেয় তুলে ছুটে এসেছেন জন্মভুমির ঋণ শোধে”? আসেন অমি পিয়ালেরই আরেক “ধর্মভাই” নিশম সরকার কি লিখেছেন দেখি –

 

“বিনয়ী, স্বল্পভাষী ও বুদ্ধিদীপ্ত এই মানুষটি ভালোবাসেন গিটার বাজাতে, ফটোগ্রাফি করতে। ক্ষমতার কাছে থেকেও কখনও ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করেননি। আওয়ামী লীগ এর ২০তম কাউন্সিলে তাকে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের পদের জন্য বারবার অনুরোধ করা হলে তিনি অস্বীকৃতি জানান, কারণ হিসেবে বলেন যে, বছরের একটা বড় সময় তিনি দেশে থাকেন না, এই পদের প্রতি সুবিচার তো তিনি করতে পারবেন না”।

 

 

এটা আগ্রহউদ্দীপক। আওয়ামীলীগের ২০ তম কাউন্সিল কবে হয়েছিলো? গুগোল করে দেখলাম সেটা হয়েছিলো সম্ভবত ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের ২১ – ২২ তারিখে, অন্তত বাঙলা ট্রিবিউনের ২০১৬ সালের অক্টোবর ২৩ এর সংবাদ গুলো তাইই বলছে। অর্থাৎ ২০১৬ সালের শেষ নাগাদও জনাব জয় বলছেন যে তিনি দেশের বাইরেই থাকেন বছরের বেশীর ভাগ সময়। তাহলে তিনি ঠিক কিভাবে “বিদেশে পড়াশুনা শেষ করে, ক্যারিয়ার শিকেয় তুলে ছুটে এসেছেন জন্মভূমির ঋণ শোধে”? অমি পিয়াল কি জেনে বলছেন? একজন মানুষ যার সকল ব্যবসা বানিজ্য আমেরিকাতে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হচ্ছে যার বিজনেস “ক্লায়েন্ট” যার কাছ থেকে তাঁর কোম্পানী নিয়মিত ফি আদায় করে থাকেন, সেই ব্যবসার অংশ হিসাবে তিনি বাংলাদেশে আসেন, তাকেই অমি পিয়াল বলছেন সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে “দেশের টানে” ফিরে আসা… আগ্রহ উদ্দীপক নয়?

বাস্তবত, জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় একজন আমেরিকান ব্যবসায়ী, তাঁর পক্ষে খুব সহজেই বাংলাদেশে এসে শিকড় গেঁড়ে বসাটা সম্ভব নয়। তিনি তো আর অমি পিয়াল বা নিশম সরকার নন যে আবেগ দিয়েই দুনিয়াকে হাওয়ায় ভাসাবেন। তিনি একজন প্রজ্ঞাবান ব্যবসায়ী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হচ্ছে তাঁর একজন ক্লায়েন্ট, ব্যাস।

 

৫.

এবারে আসুন, আমি আমার অনুসন্ধানের কথা জানাই। জনাব অমি পিয়ালের লেখাটি পড়ে আমি বাংলাদেশ সরকারের টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের ওয়েব সাইটের দারস্থ হই। অমি পিয়াল ও বিটিআরসি উভয়েই জনাব জয় কে উল্লেখ করেছে একজন “আই বিশারদ” হিসাবে। কোনো বিস্তারিত কিছু নেই। আমি আশা করেছিলাম অন্তত বিটিআরসি ওয়েব সাইটে জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটা ফর্মাল সিভি থাকবে, সেখান হয়তো ওনার বৈজ্ঞানিক কাজের কোনো বর্ণনা থাকবে, ওনার গবেষণা প্রকাশনার কিছু রেফারেন্স থাকবে। কিচ্ছু নেই, জি আমি আবার বলছি, কিচ্ছু নেই। এই যে বলছি “কিচ্ছু নেই” কেনো বলছি? কারণ যখন বিটিআরসি কিংবা অমি পিয়াল জনাব জয় কে আমাদের সামনে হাজির করছেন একজন “আইটি বিশারদ” হিসাবে, তখন একজন সামান্য আগ্রহী বা কিউরিয়াস নাগরিক হিসাবে আমার জানতে ইচ্ছে করে আসলে ঠিক কি কারণে জনাব জয় একজন “বিশারদ”?  আসলে বিশারদ কথাটির মানে কি? আমি দ্বারস্থ হলাম বাঙলা অভিধানে। ওখানে লেখা আছে – বিশারদ মানে হচ্ছে পারদর্শী, বিজ্ঞ, জ্ঞানী। এখন জনাব জয় নিশ্চিত ভাবেই আইটি’তে পারদর্শী, বিজ্ঞ ও জ্ঞানী হতে পারেন। সেটা তো জনাব পিয়াল কিংবা আমিও হতে পারি। তাহলে তাকে কেনো আলাদা করে “আইটি” বিষয়ে বিজ্ঞ, পারদর্শী, বিজ্ঞ বলে মানছি আমরা?

জনাব অমি পিয়াল খুব স্মার্ট মানুষ। তিনি তাঁর লেখায় বলেছেন যে জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় যে একজন আইটি বিশারদ এটা গুগোল করলেই পাওয়া যাবে। তিনি লিখছেন এভাবে –

 

“আইটি পার্ক, আসন্ন ফাইভ জি নেটওয়ার্ক কিংবা অন্তরীক্ষে চলমান বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে চাইলে অনেক কিছুই লেখা যায়। যাহোক ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় সময় নষ্ট না করি। সজীব ওয়াজেদ জয়ের গুণগানও নতুন করে গাওয়ার কিছু নেই। হাতের কাছেই গুগল, উইকিপিডিয়ায় নাম লিখে সার্চ দিলেই পেয়ে যাবেন সব তথ্যই”

 

 

আমার আগ্রহের বিষয় ছিলো সজীব ওয়াজেদ জয় কি একজন মেধাবী মানুষ? একজন মানুষ মেধাবী হতেই পারেন, নানান বিষয়ে হতে পারেন। এক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের দাবী হচ্ছে তিনি আইটি বিষয়ে একজন মেধাবী মানুষ। কিভাবে আমরা আইটি বিষয়ে তাঁর মেধার পরিচয় খুঁজে পেতে পারি? প্রথাগত ভাবে হয় তিনি একাডেমিক ভাবে খুব মেধাবী ছিলেন, নয়তো তিনি উদ্যোক্তা হিসাবে খুব মেধাবী ছিলেন, কিংবা “পলিসি” তৈরী করার বিষয়ে তাঁর মেধার দেখা পাওয়া যেতে পারে। সেজন্যেই আমি জানার চেষ্টা করেছি একাডেমিক দিক থেকে জনাব জয়ের কোনো কাজ আছে কিনা (বিশ্বমানের কাজের কথা না হয় বাদই দিলাম)। আমি জানার চেষ্টা করেছি একাডেমিক ক্ষেত্রে জনাব জয়ের অর্জন টা কি? আর হ্যাঁ, সবাইকে একাডেমিক ভাবেই সবকিছু অর্জন করতে হবে তা নয়, একজন মানুষ উদ্যোক্তা হিসাবেও অনেক বড় মাপের মেধার পরিচয় দিতে পারেন। সজীব ওয়াজেদ জয় উদ্যোক্তা হিসাবে কেমন? এই দুটি মূল প্রশ্নের উত্তরে গুগোল – উইকিপেডিয়া আমাদেরকে আলোকিত করতে পারেনি।  আসলে বাংলাদেশ সংক্রান্ত সবকিছুই বাংলাদেশ সরকারের প্রোপাগান্ডা, সুতরাং সেসব গুগোল করে জানার কিছু নেই। সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে জানার জন্যে  আমি বরং নীচের তালিকার প্রশ্ন গুলো করেছিলাম। আমার পরিশ্রম পন্ডশ্রমে পরিনত হয়েছিলো।

 

  • আইটি বিষয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় কি একজন স্কলার? ওনার স্পেশালাইজেশন কোন বিষয়ে?
  • ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে জনাব জয়ের কি কি কাজ আছে? কি কি প্রকাশনা আছে?
  • সবাইকেই কোনো বিষয়ে স্কলার হতেই হবে এমন কোনো দিব্যি নেই।  আইটি সেক্টরে কি জনাব জয় একজন উদ্যোক্তা? ওনার কি কি উদ্যোগ আছে? সেই সকল উদ্দোগের পরিনতি কি ছিলো?
  • পলিসি সেক্টরে কিংবা আইটি পলিসি সেক্টরে কি সজীব ওয়াজেদ জয় একজন স্কলার?
  • সজীব ওয়াজেদ জয় কি একজন সৃজনশীল বা “ইনোভেটিভ” স্টার্টআপ উদ্যোক্তা? সজীব ওয়াজেদ জয়ের যে দুটি স্টার্ট আপ এর খবর আমরা পাই সেই দুটি কোম্পানীর পরিনতি কি হয়েছিলো?
  • বাংলাদেশ সরকার ব্যতীত আর কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কোনো কনসাল্ট্যান্সি কি করেছেন সজীব ওয়াজেদ জয়?
  • আন্তর্জাতিক বেসরকারী খাতে কি অন্য  কোনো দেশের জন্যে বা কোম্পানীর জন্যে আইটি কনসাল্ট্যান্সি করেছেন জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়?
  • সজীব ওয়াজেদ জয়ের “ট্যাক্স বেইস” কোথায়? অর্থাৎ তিনি কোথায় আয়কর দেন? আমেরিকায়? নাকি বাংলাদেশে?
  • আমেরিকা বা বাংলাদেশ যেখানেই হোক না কেনো। সজীব ওয়াজেদ জয়ের গত দশ বছরের আয়ের হিসাব কি পাওয়া যাবে? বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে? অমি পিয়াল বা নিশম সরকারের কাছ থেকে?

 

এর প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়েছি “না”। এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকেও পাওয়া যায়না, এমনকি অমি পিয়াল বা নিশম সরকারের মতো আওয়ামী ব্লগারের কাছ থেকেও পাওয়া যায়না।   আগ্রহ উদ্দীপক বিষয় হচ্ছে যে যখন আমি গুগোলে লিখেছি “Sajeeb Wazed Joy scholarly article” গুগোলের সার্চ ফাইন্ডিংস বা খোঁজ করার পরের হিসাবে যে “মিসিং ওয়ার্ড” টি দেখিয়েছে সেটা হচ্ছে “Scholarly”, এটা খানিকটা হাস্যকর হলেও সত্য যে জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামের সাথে ইংরাজী “Scholarly” শব্দটি হচ্ছে মিসিং, অন্তত গুগোলের হিসাবে।  না, আমি বলছিনা যে  , গুগোল  জয় “ভাইয়া” সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। আচ্ছা এটা গেলো আইটি বিষয়ে। জনাব নিশম সরকার এর মারফতে আমরা জানতে পেরেছি যে জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় হার্ভার্ড এ কেনেডি স্কুল অফ পাবলিক পলিসি তে পড়েছেন। আচ্ছা বলুন তো কম্পিউটার সায়েন্স এ সেকেন্ড ব্যচেলর করে কেনো হঠাত করে জনাব জয় পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন পড়তে গেলেন? কেনো কম্পিউটার সায়েন্স এ মাস্টারস ও পিএইচডি করলেন না? জনাব নিশম সরকার এর বরাতে আমরা জানতে পারছি –

 

“জয়ের বাবা ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক পরমানু বিজ্ঞানী, ম্যাকগ্র-হিল থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত বই Fundamentals of Electromagnetics এর লেখক, ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। স্বভাবতই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি তার ছিলো তুমুল আকর্ষণ”।

 

জয়ের বাবা ছিলেন “বিখ্যাত পরমানু বিজ্ঞানী” তিনি একটি বইও বের করেছিলেন, কিন্তু জয় কি করেছেন সেই বাবার পুত্র হিসাবে? সেটা আমরা জানিনা তবে তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি “তুমুল আকর্ষণ” বোধ করতেন এটা আমরা জানতে পারছি জনাব নিশম সরকারের মাধ্যমে। তাহলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি “তুমুল” আকর্ষণ বোধ করা জয় কেনো হঠাত করে কম্পিউটার সায়েন্স এ ব্যাচেলর করে মাস্টারস করলেন “পাবলিক এডমিন” এ? বরং কম্পিউটার সায়েন্স নিয়েই জনাব জয়ের মাস্টারস ও পিএইচডি করার কথা নয় কি? এখানেও কোন সাল – দিন ক্ষনের হিসাব নেই, জনাব নিশম সরকারের লেখাতে ও নেই, অমি পিয়ালের লেখাতেও নেই। আসলে জয়ের হার্ভার্ড এ পড়ার সময় টুকু যদি জানা যায় তাহলে বোঝা যাবে যে ততদিনে তিনি ক্ষমতার মহাসড়কে উঠে গেছেন। তখন আসলে তাঁর আর একাডেমিক শিক্ষার দরকার নেই, তাঁর দরকার “সারটীফিকেইট”, ঠিক যেভাবে বাংলাদেশে এখন সবাই “জিপিএ ফাইভ” খরিদ করেন।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, জনাব জয় টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে মাস্টারস করলেন না কেনো? পিএইচডি করলেন না কেনো অন্তত নিশম সরকারের বরাতে আমরা জানি বিজ্ঞানের প্রতি ওনার অগাধ আগ্রহের কথা। কম্পিউটার সায়েন্স এ দুইটা ব্যাচেলর করে কেনো তিনি হঠাত করে “পাবলিক পলিসি” তে মাস্টার্স করলেন?

আচ্ছা ধরে নিলাম, যে জনাব জয় এর আগ্রহের পরিবর্তন হয়েছিলো। তিনি কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়লেও তিনি মনে করেছিলেন যে তাঁর আসলে পাবলিক পলিসি নিয়েই পড়া উচিৎ। আমি পাবলিক পলিসিতে জনাব জয়ের মেধা যাচাইয়ের চেষ্টা করলেম, অমি পিয়ালের দেখানো পথে অর্থাৎ গুগোল দিয়ে। পাবলিক পলিসিতে জনাব জয়ের একমাত্র কাজ হচ্ছে  “Stemming the Rise of Islamic Extremism in Bangladesh” শিরোনামের একটা প্রবন্ধ, এটা তিনি যৌথ ভাবে লিখেছিলেন আমেরিকান আর্মির একজন ইরাক যুদ্ধ ফেরত সৈনিক CARL CIOVACCO এর সাথে । মজার বিষয় হচ্ছে এই আর্টিকেল টি ছাপা হয়েছিলো  Harvard International Review Nov 2008 সংখ্যায়, আমি অনেক চেষ্টা করেও এই আর্টিকেল টির একটি অনলাইন কপি যোগাড় করতে পারিনি। সকল লিংক এখন অকার্যকর। এর সম্ভবত কারণ ও আছে।  প্রথমত বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে Harvard International Review এমন কোনো আহামরি জার্নাল নয়, বরং এটা আমেরিকার স্বপক্ষে ভাড়া খাটা রাজনৈতিক জার্নাল গুলোর  একটি জার্নাল। সেটা যদি আমরা উপেক্ষাও করি, তাহলেও বলতে হবে এটাই জনাব জয়ের একমাত্র প্রকাশিত আর্টিকেল, যৌথ ভাবে একজন আমেরিকান সামরিক অফিসারের সাথে প্রকাশিত। কিন্তু এটা কি বিষয়ে? এটা হচ্ছে  বাংলাদেশের ইসলামিজম নিয়ে। কত সালে প্রকাশিত? ২০০৮ সালে যখন যখন জনাব জয়ের মা প্রানপনে চেষ্টা করছে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করার। ইন্টারেস্টিং নয়? জনাব জয় যাকে একজন “আইটি মেধাবী” মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, কিন্তু আইটি বিষয়ে যার কোনো কাজ নেই, কোনো প্রকাশনা নেই এমন কি আইটি বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে কেউ জানেনও না চেনেনও না। আবার তিনি পাবলিক পলিসি বিষয়ে পড়েছে “হার্ভার্ড” এ কিন্তু পাবলিক পলিসি বিষয়ে তাঁর ন্যুনতম কোনো প্রকাশনা নেই, গবেষণা নেই এমন কি গড় পড়তা কোনো লেখালেখি ও নেই।  আগ্রহ উদ্দীপক নয়?

সেই আর্টিকেল টিতে জনাব জয় কি লিখেছিলেন? তিনি লিখেছিলেন বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ইসলামী মৌলবাদ ও ইসলামী সন্ত্রাসবাদ। এর এই সকলের প্রধান হোতা হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষা। তিনি ও তাঁর সহ-লেখক পরামর্শ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ কে ব্যাপক সেকুলারাইজেশন না করা গেলে রক্ষা করা যাবেনা। এজন্যে তারা সেই আর্টিকেলটিতে বাংলাদেশ কে একটি ব্যাপক সেকুলার দেশ হিসাবে গড়ে তোলার পন্থাও ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত আওয়ামীলীগের রাজনীতি যদি আমরা দেখি তাহলে কি দেখতে পাই আমরা? সেকুলার দেশ গড়ার বদলে কি আওয়ামীলীগ নিজেই একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দেশে পরিনত হয়েছে? সেজন্যেই কি সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই আর্টিকেল টি সরিয়ে নেয়া হয়েছে অনলাইন থেকে?

৬. 

বস্তুত, সজীব ওয়াজেদ জয় হচ্ছে পরিবারতন্ত্রের সুবিধা ছায়ায় বড়ো হয়ে ওঠা একজন “প্রিভিলেজড” মানুষ। পেশাগত ভাবে একজন ব্যবসায়ী, খুব বাস্তব বিবেচনায় একজন ব্যর্থ ব্যবসায়ী যার একমাত্র ক্লায়েন্ট হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। জনশ্রুতি আছে যে  বাংলাদেশ সরকার ব্যতীত সজীব ওয়াজেদ জয়ের আর কোনো সক্রিয় আয়ের উৎস নেই।  আওয়ামীলীগ সদস্য নন এমন অনেকেই অভিযোগ করেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছ থেকে টাকা নিয়েই জনাব জয়ের প্রতিষ্ঠা। সেটা খুব মন্দ কিছু নয়, যদি সেটা বৈধ পথে হয়ে থাকে।

সেটা কি বৈধ পথে?

৭.

বাংলাদেশের এই রাজপুত্রকে নিয়ে সকল ধরনের প্রোপাগান্ডার জবাবে কেবল কিছু প্রশ্ন করা দরকার, আর কিছুই নয়। আসেন প্রশ্ন করি। সজীব ওয়াজেদ জয়, ডেইলী স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম কে জেলে ঢোকাতে চেয়েছিলেন।    অভিজিৎ রায় ইসলামী মৌলবাদীদের হাতে খুন হবার পরে তিনি রয়টার কে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন এই বলে যে তারা আসলে ইসলাম বিষয়ে “চিকন দড়ির” উপর দিয়ে হাটছেন। ইংল্যান্ড ভিত্তিক আন্তর্জাতিক পত্রিকা “দি গারডিয়ান” সহ অনেক আন্তর্জাতিক মিডিয়া তাঁর এই বক্তব্যের সমালোচনা করে সেদিন  এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো।   যে সজীব ওয়াজেদ জয় ২০০৮ সালে আর্টিকেল লিখেছেন যে বাংলাদেশে “ব্যাপক সেকুলারাইজেশন” দরকার তিনিই আবার ইসলামী মৌলবাদীদের কাছে পোশা প্রানীর মতো কুই কুই করে মাথা নোয়াচ্ছেন। জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময়  আমেরিকায় থাকলেও তিনি গনতন্ত্র ও মানুষের গনতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা লাভ করেন নি। আওয়ামীলীগ আমলে ব্যাপক “গুম” বা “Forced Disappearance” এর ঘটনা ঘটলেও তিনি তা অস্বীকার করে গেছেন সকল ক্ষেত্রে। তাঁর এই ধরনের মিথ্যাচার নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বাধীন মিডিয়াগুলো সরব প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।    মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্বর্গ বলে পরিচিত আমেরিকাতে থেকেও তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সবসময়ই খরগহস্ত থেকেছেন। বাংলাদেশের সাংবাদিক তিনি মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমান বা শহিদুল আলমের মানুষদের জেলে ভরে রাখার পক্ষে আন্তর্জাতিক মতামত তৈরী করার চেষ্টা করেছেন যা আসলে তাঁর অগনতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী চরিত্রকেই প্রকাশিত করেছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে খর্ব করার প্রচেস্টায় সজীব ওয়াজেদ জয় এর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিবিসি সহ আরও অনেকেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।  মূলত আজীবন একাডেমিক পড়াশুনার মধ্যে দিয়ে কোনো “জ্ঞান” ও  “মূল্যবোধ” অর্জন করেন নি তিনি। পরিবারের টাকায় হার্ভার্ডে পড়লেও আধুনিক মূলয়বোধের অ আ ক খ ও অর্জন করতে পারেন নি তিনি। যা অর্জন করেছেন সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের “আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি”। তাই একজন আধুনিক মানুষ হবার সকল সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও রয়ে গেছেন একজন অনাধুনিক মানুষ হিসাবে। এই অনাধুনিক মানুষটিকে একজন মহিমান্বিত মানুষ হিসাবে প্রচার করার জন্যে জাতীয় মিডিয়ায় পাতার পর পাতা বরাদ্দ করা হচ্ছে, সরকারী কোষাগার থেকে ব্যয় করা হচ্ছে তাঁর ইমেজ নির্মাণের প্রকল্প গুলো।

আহা আহা জনগনের সম্পদের কি নিদারুন অপচয় আমাদের।

Spread the love