বিজ্ঞানের আবিষ্কার, ইতিহাস এবং “মুক্তমনা” বয়ান !

এবারে আসুন ফাইনাল কাউন্ট-ডাউন দেখা যাক। “মুক্তমনা” সাহেব লিখছেন –

“এবার বাকী থাকল আমেরিকান কালচার-যার উদ্ভব আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং গৃহযুদ্ধ থেকে। এর বীজ ছোট সরকার , কম ট্যাক্স, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যাক্তিউদ্যোগ, মার্কেট এবং আল ইনক্লুসিভনেস। আমেরিকা কোন ইউটোপিয়া না। এখানেও অনেক গরীব, অনেকেই চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে না। কিন্ত লোকে খেতে পায়। ৯৯% লোকের মাথার ওপরে ছাদ আছে। সব থেকে বড় কথা এই সংস্কৃতিই আমাদের যাবতীয় সব কিছু আবিস্কার দিয়েছে-সে ইলেক্ট্রিসিটি, ল্যাম্প, তেল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, স্মার্টফোন-যাই বলুন না কেন”

যাক এতক্ষণে “অরিন্দম” ঘোষণা করছেন তার স্বপ্নের রাজ্যের কথা। তিনি বলছেন – আমেরিকা একটি “আল ইনক্লুসিভ” দেশ। “আমেরিকান কালচার”ই আমাদের যাবতীয় সব কিছু আবিষ্কার দিয়েছে। সব? আমেরিকার কালচারই আমাদের “সব কিছু আবিষ্কার” দিয়েছে? আচ্ছা ধরেই নিচ্ছি সব নয়, অনেক কিছু। কিন্তু না, এই “মুক্তমনা” এই “সবকিছু” বিষয়টিকে কোয়ান্টিফাই করছেন বা সংখ্যার বিচারে নির্দিষ্ট করছেন –

“সভ্যতার আসল অগ্রগতি প্রযুক্তিতে। আর তা আমেরিকারই দান মূলত ৮০%”।

তাহলে, আমেরিকান কালচারই আমাদের কে সবকিছু আব্বিস্কার করে দিয়েছে। নিদেনপক্ষে, পৃথিবীর সব আবিষ্কার আর প্রযুক্তির সংখ্যার হিসাবনিকাশে আমেরিকান কালচার পৃথিবীর ৮০% প্রযুক্তি দান করেছে, আর সভ্যতা আসলে এগিয়ে যায় প্রযুক্তির কারনেই।

কি দারুন “মুক্তচিন্তা” ভেবে দেখা যায়?

আগেই উল্লেখ করেছি, এই আলোচিত মুক্তমনা শুধু রায় দেন, কোনও ব্যাখ্যা দেন না, তথ্য – পরিসংখ্যান দেন না। কিন্তু এই রায় দেয়ার ধরনের মধ্যে আছে নিদারুন মিথ্যাচার আর বিভ্রান্তি, অতি সাধারণীকরণ বা ওভার সিমপ্লিফিকেশন, ওভার জেনারালাইজেশন ।

“সভ্যতার আসল অগ্রগতি” কি? এটা একটা দার্শনিক প্রশ্ন। এই মুক্তমনার সাথে দার্শনিক প্রশ্ন তোলাটা অর্থহীন, কেননা আমাদের চারপাশে মুক্তমনাদের যে মিছিল তার একটা বিরাট অংশ হচ্ছেন “বিজ্ঞান” দিয়ে পৃথিবীর সকল প্রশ্ন দেখার দলের মানুষ, দর্শনের প্রশ্নগুলো তাই এঁদের কাছে অবান্তর। বরং আসুন, সহজ-সরল বিজ্ঞানের প্রসঙ্গেই থাকি।

প্রযুক্তিতে আমেরিকার অবদানের কথাটিই ভেবে দেখি। প্রযুক্তি আবিষ্কারের বেলায় আমেরিকার অবদান ৮০%, এই তথ্যের ভিত্তি কি? কোনও রেফারেন্স আছে? সভ্যতা এগিয়ে নেবার বেলায় “প্রযুক্তি” বা টেকনোলজির এর ইতিহাস কি তা বলে? অবশ্য বিজ্ঞানের আবিষ্কার বলতে কেউ যদি শুধু ইলেক্ট্রনিক গেজেট বোঝেন, তাহলে কিছু বলার নেই। কিন্তু বিজ্ঞানের আবিষ্কার আসলে তা নয়।

প্রথমত প্রশ্ন হচ্ছে, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলোকে এভাবে জাতীয়তার গন্ডিতে তালিকাবদ্ধ করা যায় কি? । কেননা বিজ্ঞানের আবিষ্কার গুলো বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই একটি দীর্ঘ সময়ের গবেষণার ফলাফল যেখানে অনেক বিজ্ঞানী – গবেষকের মিলিত কাজ ও শ্রমের অবদান থাকে। প্রায়শই দেখা যায় বেশ কয়েকজন প্রধান বিজ্ঞানী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই বিষয়ের উপরে গবেষণা করেন এবং প্রায় একই রকমের আবিষ্কার করে ফেলেন। কখনও কখনও একজনের শেষ বিন্দু থেকে আরেকজন শুরু করেন। তাই বিজ্ঞানের আবিস্কারগুলোকে এভাবে একজনের কৃতিত্ব বা একটি দেশের – জাতির বলে ঘোষণা দেয়াটা শুধু অবৈজ্ঞানিকই নয়, বালকসুলভও বটে। আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা” নিজের অজান্তেই এখানে একজন জাতিয়তাবাদী “বালক” এ পরিনত হয়েছেন। যদি তর্কের খাতিরে আমরা এই “মুক্তমনা”র মতো বালকসুলভও হয়ে যাই, তাহলেও বলা যায়, ইতিহাসের আসল সত্যি হচ্ছে আজ পর্যন্ত মানব ইতিহাস বদলে দেয়া বা যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলোর বেশীর ভাগই আমেরিকান নয়। আবারো বলছি – পৃথিবীর বেশীর ভাগ যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো ভৌগলিক ভাবে আমেরিকার নয়, ভিন্ন দেশের, ইউরোপের, চীনের এমন কি ভারতের। কিন্তু এর মানে এই নয় যে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে আমেরিকার ভুমিকা তুচ্ছ বা খাটো, বরং পৃথিবীর ইতিহাস পড়লে, জ্ঞান বিজ্ঞানের ইতিহাসে ইউরোপের অগ্রসর থাকার কারণটি ব্যখ্যা করাটা কঠিন নয়। দেশ হিসাবে আমেরিকা আবিষ্কার এবং পরবর্তীতে অপরের কলোনি হয়ে থাকাটা একটা বড় কারণ। আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা”দের মতো মানুষদের মাঝে পৃথিবীর ইতিহাস পড়ার বদলে কেবল “টেকনোলজি” দিয়ে দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করার প্রবল আসক্তির কারণে, তারা এই সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা গুলো বুঝে উঠতে পারেন না।

গুটেনবার্গ এর আদি প্রিন্টিং প্রেস এর রেপ্লিকা

 

কাগজ, কাগজের নোট আর ছাপা খানা, এই তিনটি আবিষ্কার পৃথিবীর বিকাশের গতিপথ বদলে দিয়েছিলো। এর কোনটাই আমেরিকান আবিষ্কার নয়। ইউরোপের ছোট্ট দেশ স্লোভেনিয়ায় চাকার আবিষ্কার সেই সময়ের সমাজের গতি বদলে দিয়েছিলো, যদিও পরিবহন আর যোগাযোগ ব্যবস্থার ধারণা এসেছে তারও বহু বছর পরে। বায়োলজিক্যাল সায়েন্স এ মানুষের শরীরের এনাটমি ও ফিজিওলজি এই দুটোর কোনটাই আমেরিকান আবিষ্কার নয়। মানুষের শরীরের রক্ত সঞ্চালনের পদ্ধতি আমেরিকান আবিষ্কার নয়। রোগ প্রতিরোধের জন্যে ভ্যাক্সিন এবং সংক্রমন প্রতিরোধের জন্যে এন্টিবায়টিক, এই দুইটি আবিষ্কার নতুন যুগের সুচনা করেছিলো, মানুষের মৃত্যুহার কমিয়ে এনেছিলো জাদুকরী ভাবে, এই দুটি আবিষ্কারের কোনটাই আমেরিকান নয়।

আলেকজান্দার ফ্লেমিং, এন্টিবায়োটিকের আবিস্কারক, আজও কোটী কোটী মানুষের জীবন রক্ষা করে চলেছে তাঁর আবিষ্কৃত পেনিসিলিন।

 

প্রথম ভ্যাক্সিন ছিলো কলেরা রোগের জন্যে, যে রোগটি এক সময় গ্রামের পর গ্রামের উজাড় করে দিতো, এমন কি ইউরোপেও। স্প্যানিশ এবং ইতালিয়ান দুজন চিকিৎসক প্রথম কলেরা জীবানু ইনকুলেইট করেন আর অপ্রিয় হলেও সত্যি যে একজন রাশান মাইক্রোবায়োলজিস্ট ভাল্ডেমার হফকিন প্রথম ভ্যাক্সিন হিসাবে কলেরা ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন। আর এন্টিবায়টিকের আবিস্কারক যে স্কটিশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং সেতো সবারই জানা। সভ্যতা বদলে দেবার আরেকটা ব্রেক-থ্রু আবিষ্কার ছিলো বাষ্পীয় ইঞ্জিন। বলুন তো কে তার আবিস্কারক? আমি জানি প্রাইমারী স্কুলের ছাত্রও তা পারবেন, হ্যাঁ, ইংলিশ বিজ্ঞানী জেমস ওয়াট। প্রথম গাড়ীর আবিস্কারক জার্মানির কার্ল বেনজ আর প্রথম মোটর এঞ্জিন (Combustion Engine) আবিস্কারন ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হুগেনস। মুক্তমনা নাস্তিকদের প্রিয় বিষয় “ইভলিউশন” বা বিবর্তনের তত্ত্বও ব্যাখ্যাত হয়েছিলো এক ইউরোপীয় বুড়ো – ডারউইনের হাত ধরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার এক্স-রে আর ডিএনএ’র আবিস্কারও ইউরোপে, যথাক্রমে জার্মানির রন্টজেন সাহেবের হাতে আর যুক্তরাজ্যের ক্রিক – ওয়াটসন জুটির হাত ধরে।

ইলেক্ট্রিসিটি ও ইলেক্ট্রিক মোটর আবিষ্কারের জন্যে অমর হয়ে আছেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে

আমাদের আলোচিত মুক্তমনা বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও প্রযুক্তিতে আমেরিকার অবদান ৮০% বলে ঘোষণা দেবার পরে ছয়টি প্রযুক্তিকে উদাহরন হিসাবে হাজির করছেন। সভ্যতা এগিয়ে নেবার যত প্রযুক্তি তার ৮০% হচ্ছে আমেরিকারই অবদান, এই বলে তিনি উদাহরন দিচ্ছেন – ইলেক্ট্রিসিটি, ল্যাম্প, তেল, ইন্টারনেট, ফেসবুক আর স্মার্টফোন। নিদারুন পরিহাসের বিষয় হচ্ছে যে, এই ছয়টি আবিষ্কারকেও “আমেরিকান আবিষ্কার” বলাটা দারুন কঠিন, সত্যের অপলাপ হবে। বিশ্বাস হচ্ছেনা? আসুন আমরা এই ছয়টি আবিষ্কারের অন্তত কয়েকটির ইতিহাস জানার চেষ্টা করি –

হাইস্কুল পড়ুয়া যেকোনো শিশু ইলেক্ট্রিসিটি আবিষ্কারের ইতিহাস জানে। ইলেক্ট্রিসিটি আবিষ্কারের ইতিহাসের শুরুটা হচ্ছে প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিক থেলিস এর হাত ধরে। এর পরে, একে একে যে কয়জন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর হাতে তড়িৎ বিদ্যুৎ বা ইলেক্ট্রিসিটি আবিষ্কারের পথ এগিয়ে গিয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন – লুইগি গ্যালভানি, আলেসসান্দ্রো ভোল্টা, যোসেফ প্রিস্টলি, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন আর মাইকেল ফ্যারাডে। এই ছয় বিজ্ঞানীর মাঝে কেবলমাত্র একজন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ছিলেন মার্কিন গবেষক। বিদ্যুৎ কিম্বা তড়িৎ বিদ্যুৎ কি করে আমেরিকান আবিষ্কার হয়ে গেলো যেখানে থেলিস হচ্ছেন গ্রীসের, গ্যাল্ভানি আর ভোল্টা হচ্ছেন ইতালিয়ান, প্রিস্টলি আর ফ্যারাডে হচ্ছেন ব্রিটিশ? ভেবে দেখবেন পাঠক?

বস্তুত, বিজ্ঞানের আবিষ্কার কে এইভাবে জাতি বা দেশের গন্ডিতে হিসাব করাটাই এক ধরনের অবৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রকাশ। কারণ বিজ্ঞানের গবেষণা ও আবিষ্কারগুলো হচ্ছে এক একটা চলমান বিষয়, বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাই প্রায়শই দেখা গেছে একই বিষয় প্রায় একই সময়ে আবিষ্কার করেছেন একাধিক বিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন ভৌগলিক অবস্থানে থেকে। কখনও কখনও কোনও একটি বিশেষ আবিষ্কার পাওয়া যায় কয়েকজনের কাজকে বা কয়েকটি ছোট ছোট আবিস্কারকে জোড়া দিয়ে, ঠিক যেমনটা ঘটেছে বিদ্যুতের বেলায়। শুধুমাত্র বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন আমেরিকান ছিলেন বলেই যদি তড়িৎ বিদ্যুৎ আমেরিকার আবিষ্কার হয়ে যায়, তাহলে অবশ্য বলার কিছু নেই, কিন্তু বিজ্ঞান মনস্ক মানুষের কাছে তা কি গ্রহনযোগ্য?

দ্বিতীয় উদাহরনটিতে জনাব “মুক্তমনা” আমেরিকার আবিষ্কার হিসাবে “তেল” উল্লেখ করেছেন। ধরে নিচ্ছি এই তেল সরিষার তৈল নয়, এটা বরং জ্বালানী তেল বা পেট্রোলিয়াম। এই উদাহরনটিও কি করে আমেরিকান “আবিষ্কার” হলো বোঝা সত্যিই দায়। তেল আবিষ্কারের ইতিহাসটিও খুব দীর্ঘ। অন্তত আধুনিক কালের ইতিহাস বলছে – তেল বা পেট্রোলিয়াম আবিষ্কারের ইতিহাসের পরিক্রমায় প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিটি হচ্ছেন স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ইয়াং তিনি কয়লা থেকে এক ধরনের প্যারাফিন জাতীয় তেল তৈরী করেন যা দিয়ে প্রদীপ জালানো সম্ভব হয়েছিলো, সে ঘটনা বেশিদিন আগের নয়, ১৮৪৭ সালের। এর পরে ক্যানাডিয়ান ভূতত্ত্ববিদ আব্রাহাম পিনিও গাসনার কয়লা ও বিটুমিন থেকে তেল পরিশোধন করেন এবং পরে ১৮৫০ সালে তিনি নিজে কেরোসিন তেল বিক্রি করার কোম্পানি খুলে বসেন। পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালে পোলিশ বিজ্ঞানী লুকাস এ ইতিহাসে যুক্ত হন। পয় যে তিনজন বিজ্ঞানীর নাম সবার আগে আসে (অন্তত তাদের কাজের সাল অনুযায়ী) তাদের একজন স্কটিশ, একজন ক্যানাডিয়ান আর একজন পোলিশ। কি করে “তেল” আমেরিকান আবিষ্কার হলো? পাঠক বলবেন? এমন কি পেট্রোলিয়াম তেলের কমার্শিয়াল বা বানিজ্যিক উত্তোলন নিয়েও বিতর্ক আছে, কেউ কেউ মনে করেন, প্রথম বানিজ্যিক উত্তলন শুরু হয়ে ১৮৫৭ সালে পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় আবার কেউ মনে করেন আমেরিকার পেন্সিল্ভানিয়াতে ১৮৫৯। কিন্তু বানিজ্যিক উত্তোলন আর আবিষ্কার কি এক কথা? ( এখানে দেখুন সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের জন্যে)

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হামফ্রাই ডেভি’র আবিষ্কৃত প্রথম বৈদুতিক বাতি যা মাইনার’স সেফটি ল্যাম্প নামে বিখ্যাত হয়েছিলো

বৈদুতিক বাতির সাথে থোমাস আল্ভা এডিসনের নামটাই সবচাইতে বেশী শোনা গেলেও, বিজ্ঞানের ইতিহাস বলছেন এডিসন ছিলেন বৈদুতিক বাতি আবিষ্কারের শেষের দিককার মানুষ। এডিসনের কৃতিত্ব বেশীরভাগ এই প্রযুক্তির কমারশিয়ালাইজেশনে। আবিষ্কারের দিক থেকে প্রথম যে মানুষটির নাম আসে তিনি ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হামফ্রাই ডেভি, পরে একই দেশের জোসেফ সোয়ান এবং সব শেষে আমেরিকার দুই বিজ্ঞানী চার্লস ফ্রান্সিস ব্রাশ এবং থোমাস আলভা এডিসন। বাস্তবত, ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সোয়ান আর এডিসনের আবিষ্কার প্রায় কাছাকাছি হওয়ায়, প্যাটেন্ট ঝামেলা এড়াতে দুজনে মিলেই একটা কোম্পানি করেন এই বাতির। বলুন তো কি করে বৈদুতিক বাতিকে আমেরিকান “আবিষ্কার” বলা চলে?

একই রকমের ইতিহাস দেখা যাবে ইন্টারনেট কিম্বা স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও। যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী একই সময়ে কাজ করেছেন, কখনও কখনও প্রায় একই সময়ে একই আবিষ্কার করেছেন। সুতরাং সভ্যতার অগ্রগতিতে ভুমিকা রাখা প্রযুক্তির ৮০% আমেরিকার দান এই রকমের একটা খেলো যুক্তি অন্তত কোনও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ দেবেন না। এজন্যেই, বিজ্ঞানের বিষয়ে পড়া আর সত্যিকারের বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠা দুটো আলাদা বিষয়। এই মুক্তমনার মতো, আরো অনেকের মাঝেই তাই দেখা যায় বিজ্ঞানের অতিশয় স্থুল বোঝাপড়া, যার ফল হয় এই রকমের যুক্তির উৎপাদন।

পৃথিবীর প্রযুক্তির বাজারে মার্কিন অবদান কে খাটো করার কোনও ইচ্ছাই আমার নেই। বরং আমি জানি, জ্ঞান বিজ্ঞানের গবেষনার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচাইতে বড় বিনিয়োগকারি দেশটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যদিও আমেরিকা ও ইউরোপের আর এন্ড ডি বাজেট কমেছে গত কয়েক বছরে পক্ষান্তরে চীনের বাজেট বেড়ে তা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকার কাছাকাছি যাচ্ছে (দেখুন এখানে)। কিন্তু এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একক দেশ হিসাবে সরবোচ্চ বিনিয়োগ করে থাকে বৈজ্ঞানিক গবেষনায়। কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানের গবেষণায় বিনিয়োগ করা আর বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে নিজের বলে দাবী করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা” মহাশয় এই বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিজ্ঞানের গবেষণা এবং বিজ্ঞানের উদ্ভাবনের সাথে সেই সকল উদ্ভাবনের বাজারীকরন বা কমার্শিয়ালাইজেশন কে গুলিয়ে ফেলাটাও বিপদজনক। এই দুটি বিপদজনক কাজই করেছেন আমাদের এই “টেকি” মুক্তমনা সাহেব। তিনি বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে সেই সকল আবিষ্কারের কমার্শিয়ালাইজেশন কে গুলিয়ে ফেলেছেন।

কোনও সন্দেহ নেই, আমেরিকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার সবচাইতে বড় বাজার, কিন্তু ওয়ার্ল্ড ইনোভেশন ইনডেক্স বলছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৃজনশীল গবেষনার শীর্ষস্থানীয় দেশগুলো এখনও ইউরোপেরই। বহু বছর ধরে ইনোভেশন ইনডেক্স এর এক নাম্বার দেশটি হচ্ছে ইউরোপের ছোট্ট একটি দেশ সুইটজারল্যান্ড, এর পরে আছে সুইডেন এমন কি কোনও কোনও বছর এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর ও আমেরিকার উপরে অবস্থান করেছে। (আগ্রহীরা এখানে দেখে নিতে পারেন)

আসুন শিমপানজি’র চাইতে আরেকটু মেধাবী হয়ে উঠি !

সুইডিশ অধ্যাপক হানস রোসলিং কে বলা হয়, পরিসংখ্যানের যাদুকর। সারা পৃথিবীতে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক পরিসংখ্যানকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে যদি দু’চারজন শ্রেষ্ঠ মেধাবী মানুষের নাম করা হয়, তাহলে সম্ভবত অধ্যাপক হানস রোসলিং তাদের অন্যতম হবেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়াত এই অধ্যাপকের অসংখ্য বক্তৃতা আছে যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন – পৃথিবীকে জানার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের ছাত্র – শিক্ষক – পেশাদার কর্মী – রাজনীতিবিদ – নাগরিকদের জ্ঞানের সীমা একটি শিমপানজির চাইতেও নিম্ন মানের (তিনি এটা রুপক অর্থে ব্যবহার করেছেন কিন্তু বিষয়টি দারুন ভাবে সত্যি, এই ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন তা যাচাই করার জন্যে এখানে )।

পৃথিবী সম্পর্কে পশ্চিমাদের সীমাহীন অজ্ঞানতার কথা বলছেন প্রফেসর হানস রোসলিং। পশ্চিমাদের এই অজ্ঞানতার কুৎসিত দিকটাই দুঃখজনক ভাবে সংক্রমিত হয়েছে আমাদের এই লেখার আলোচিত “মুক্তমনা” ধরনের মানুষদের মাঝে। এরা দুনিয়াকে জানে শুধু আমেরিকা আর বাকী দুনিয়া, বড়জোর, আমেরিকা, ইউরোপ আর গরীব দেশগুলো। এরা দুনিয়াকে জানে উন্নত দেশ আর মুসলমানদের দেশ ইত্যাদি। এঁদের কাছে সবসময়েই দুনিয়াটা দুইভাগে বিভক্ত – আমরা আর ওরা।

তিনি তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায় দেখিয়েছেন, পশ্চিমা বিশ্ব তাদের আভিজাত্যবোধের কারণে বিশ্বের যে অংশটিকে “তৃতীয় বিশ্ব” বলে বিবেচনা করে থাকে, সেই কথিত “তৃতীয় বিশ্ব” আসলে বহু বছর আগেই স্বাস্থ্য – শিক্ষা – চিকিৎসা – মানবসম্পদ উন্নয়ন – নারীর খমতায়ন ইত্যাদি নানান সুচকে পৃথিবীর কথিত “প্রথম বিশ্ব”র কাঁধের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। “তৃতীয় বিশ্ব”র দেশগুলোর এই অভূতপূর্ব উন্নতি পশ্চিমা দেশের গোচর হয়নি এই জন্যে নয় যে এইসব খবর, ড্যাটা, তথ্য, উপাত্ত বা পরিসংখ্যান সবকিছু গোপন, বরং প্রথম বিশ্ব জানতেই পারেনি এই সকল দেশের সাফল্যের কথা, তার প্রধান কারণ হচ্ছে – এই সকল দেশ সম্পর্কে বা নিজের দেশের বাইরের বিশ্ব সম্পর্কে পশ্চিমা দেশগুলোর জনগনের “শুচিবায়ুগ্রস্থ” মানসিকতা। প্রফেসর হানস রোসলিং একে বলেছেন – “প্রি-কনসিভড আইডিয়া” । “শুচিবায়ুগ্রস্থ” মানসিকতা বা “প্রি-কনসিভড” আইডিয়া হচ্ছে একজন আধুনিক – লিবারাল মানুষের প্রধান শত্রু। আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা” লেখকটি কিম্বা তাঁর মতো আরো অনেক “মুক্তমনা” দাবী করা মানুষেরা “চিন্তার শুচিবায়ু” রোগে আক্রান্ত। এই রোগের নাম “প্রি কনসিভড আইডিয়া”।

চিন্তার শুচিবায়ুতায় আক্রান্ত কেউ কি করে “মুক্তমনা” হতে পারেন?

শেষ কথা

আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা চেনেন বা যারা আমার সামান্য লেখালেখির সাথে পরিচিত , তারা জানেন, আমি নিজেকে কখনই “মুক্তমনা” বলে দাবী করিনা। এর প্রথম কারণ এই শব্দবন্ধটি আমার কাছে অতিরিক্ত কোনও অর্থ বহন করেনা। আমি মনে করি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাটা জরুরী, সকলের জন্যে। আমার প্রচেস্টা তাই একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা। বিশেষত যখন এই আলোচিত লেখকের মতোর বুদ্ধিবৃত্তির মানুষদের কাতার হয়ে ওঠে “মুক্তমনা”দের কাতার, আমি সন্দেহাতীত ভাবে সেই দলের মানুষ নই। এই “মুক্তমনা” না হয়ে উঠতে পারাটা আমার জন্যে ভালো বা মন্দ কিছুই নয়। আনন্দ বা বিষাদের কোনটাই নয়। আমি কেবল এই ধরনের “মুক্তচিন্তার” মানুষ নই, দুনিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন – হত্যা করলেও যাদের কিছুই যায় আসেনা। হয়তো এই “মুক্তমনা”র ভাষায় আমি একজন “ছাগু” কিম্বা “বামাতি” কারণ ভিয়েতনামে, ইরাকে, আফগানিস্থানে, পাকিস্তানে, সিরিয়াতে বোমা ফেলায় আমার যায় আসে, আমার দিনগুলো বিষাদে ভরে ওঠে। লন্ডনের মেট্রো রেলে বোমাবাজি আমাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে, একই ভাবে সিরিয়ায় প্রান ভয়ে ছুটে বেড়ানো শিশু – নারী – পুরুষদের জীবন আমাকে বিষন্ন করে। আমার কাছে টুইন টাওয়ার হত্যাকান্ড যেমন জঘন্য ঘটনা, ইরাকের ছয়লক্ষ মানুষকে হত্যার ঘটনা বা কমিউনিজমের নামে বিরোধীদের হত্যার ঘটনাগুলোও একই রকমের জঘন্য ঘটনা, সবগুলোই সভ্যতা ধ্বংসকারী ঘটনা, একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে তাই সকল হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধেই সোচ্চার হই। আমেরিকার ড্রোন হামলা তাই আমার কাছে সভ্যতা ধ্বংসকারী তৎপরতা।

যে সকল মানুষ তাদের “প্রি – কনসিভড আইডিয়া”র কারণে আমেরিকার নেতৃত্বে হত্যাকান্ডগুলোকে মনে করেন “প্রগতিশীলতাকে এগিয়ে” নেয়া, তারা কি ধর্মীয় মৌলবাদীদের চাইতে কম বিপদজনক?

পাঠকের কাছে সেই প্রশ্নটি রেখে এই লেখা শেষ করছি।

(পুনশ্চঃ আমি ভেবেছিলাম, এই লেখকের যে সকল লেখা আমি এই সিরিজে ব্যবহার করেছি, তার তালিকাটি উল্লেখ করবো, কিন্তু আমি মত পাল্টালাম। লেখক অভিজিৎ রায়ের প্রতিষ্ঠিত মুক্তচিন্তার ব্লগ, যেখানে আমি নিজেও লিখেছি এবং লিখি, সেখানেই এই “মুক্তমনা” তাঁর এই সকল চিন্তা প্রকাশ করেছেন। আমি মনে করি, এই সকল মতামত এই আলোচিত “মুক্তমনা”র ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। আমি প্রায় নিশ্চিত, আমাদের মুক্তমনাদের অনেকেরই এই লেখকের এই সকল অমানবিক কথিত “মুক্তচিন্তার” বিষয়ে দ্বিমত আছে।)

 

এই লেখাটি প্রথম ইস্টিশন ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিলো। আগ্রহী পাঠকেরা এখান থেকেও পড়ে নিতে পারেন।

 

Spread the love