প্রসঙ্গ কমিউনিজম, বামপন্থা এবং মুক্তচিন্তা

কমিউনিজম, বামপন্থা ও বামপন্থীদের প্রসঙ্গ হচ্ছে আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা”র একটি প্রিয় বিষয় ব্যক্তিগত ঘৃণা উগড়ে দেবার জন্যে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে – “একথা সেকথা, দে বুড়ি আলাপাতা”। আক্ষরিক অর্থ ধরলে এর মানে হচ্ছে, যে সকল বয়স্ক মহিলা অন্য মহিলাদের সাথে কথা বলার কিছুখনের মধ্যেই মুখে চিবুনোর জন্যে তামাক পাতা চেয়ে বসেন, তাদের প্রসঙ্গে এই প্রবাদ। অর্থাৎ, যারা ইনিবিনিয়ে একই প্রসঙ্গ সবসময় বলে থাকেন, দু-তিন কথার পরেই সেই একই প্রসঙ্গ চর্বিত চর্বণ করেন তাদের প্রসঙ্গে এই প্রবাদ। আমাদের মুক্তমনা চিন্তকের অনেক লেখাতেই, কারণে – অকারনে, প্রসঙ্গে – অপ্রসঙ্গে একটা বিষয় কমন, তাহলো, কমিউনিজম, বামপন্থা আর বামপন্থীদের প্রতি তীব্র বিষোদগার আর ঘৃণা। বিষোদগার আর ঘৃণা দিয়ে কার্যকর কিছু হয় কিনা তা আমার জানা নেই, কিন্তু এটা জানি কোনও মতামতকে অপছন্দ করলে, তার অসারতা প্রমানের সবচাইতে কার্যকর পথ হচ্ছে সেই মতামত বা দার্শনিক – রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গভীর যৌক্তিক আলোচনা করা, তত্ত্ব, তথ্য, ইতিহাস, পরিসংখ্যান দিয়ে সেই দর্শনের অসারতা প্রমান করে দেয়া। আর সবচাইতে দুর্বল – অকার্যকর পথটি হচ্ছে ঘৃণা, বিষোদগার করা, গালিগালাজ করা। আমাদের এই মুক্তমনা কমিউনিজম সম্পর্কে প্রায়শই দ্বিতীয় পথটিকেই বেছে নেন। বলাই বাহুল্য গালিগালাজের পথ সবসময়ই সহজ পথ, পড়াশুনার ঝামেলা নেই। আর তাছাড়া, মর্ষকামী মানুষেরা গালিগালাজ করে এক ধরনের আনন্দও লাভ করেন, সেটাও তো কারো কারো জন্যে জরুরী, তাই না? দেখুন তাঁর কিছু নমুনাঃ

“বামপন্থী, দক্ষিন পন্থী সবাই ধার্মিকদের পা চাটা কুকুর। এটাই ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে”।

“বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতির পথেই উন্নত ডিজিটাল গণতন্ত্র আনা সম্ভব-এবং গণতান্ত্রিক পথেই আমাদের এই দ্বন্দ্বগুলিকে সমাধান করতে হবে। লেনিনবাদের মতন ভুয়ো কিছু তত্ত্ব এবং পার্টির পাল্লায় পড়ে কিছু আদর্শবাদি তরুণ যেন তাদের জীবন নষ্ট না করে। কমিনিউজম আরেক ধরনের মৌলবাদ যা ধর্মীয় মৌলবাদের চেয়েও ভয়ংকর”।
(জুন ০৮, ২০১০)

“কমিনিউজম এবং ধর্ম, দুটোই দাঁড়িয়ে রূপকথা এবং তার অলীক সত্যের প্রচারের ওপরে। গুচ্ছ গুচ্ছ মিথ্যে জনগণকে খাইয়ে তৈরী হয় কমিনিউস্ট বা ধর্মীয় প্রফেটদের বিগার দ্যান লাইফ চরিত্র”।
(নভেম্বর ২৮, ২০১৬)

”বামেদের মূল যন্ত্রনা, অপূর্ন অভিলাশের শুরু এই “বাম” শব্দটির ন্যারেটিভ থেকে। এটা অনেকটা মদ্যপানের মতন- কিছু কিছু মানুষ নিজেকে বাম, হিন্দু, মুসলমান, বাঙালী এলিট এইসব পরিচিতির মাদকে “হাই” ফিল করে ! এই ধরনের আইডেন্টিটি-তাদের নিজেদের কাছে গর্বের বিষয়। কারন এরা মনে করে তারা এক মহান চিন্তাধারা, মহান আদর্শের ধারক এবং বাহক। যদিও এই মনে করার পেছেন আছে অজস্র মিথ বা রূপকথার গল্প-যা ঐতিহাসিক সত্য না”।
(মে ২৮, ২০১৬)

“কমিনিউস্টরা বহুদিন সোভিয়েত ইউনিয়ানকে শ্রমিক শ্রেনী তথা সাম্যের স্বর্গরাজ্যে বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। যদিও বাস্তবে আজ এটাই সত্য হিসাবে প্রমানিত লেনিন এবং স্টালিনের আমলে সোভিয়েত ইউনিয়ান ছিল কৃষক এবং শ্রমিকদের বধ্যভূমি । সোভিয়েত ইউনিয়ানের মিথ ফাটার পর কমিনিউজমের পালে আর হাওয়া নেই”।

“কমিনিউস্টরা খাদ্য বাসস্থান শিক্ষা চিকিৎসার নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্ত দিতে পারে এমন প্রমান নেই। উলটে তারা মানুষের মৌলিক অধিকার হরন করে। আপাতত সব কমিনিউস্ট রাষ্ট্র মানুষকে যন্ত্রনা এবং দাসত্ব ছাড়া কিছু দেয় নি।”

মনে প্রানে একজন আমেরিকা প্রেমিকের কাছ থেকে এই রকমের বক্তব্য খুব অস্বাভাবিক নয়। আমেরিকান বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে ব্যাক্তিভোগবাদ এর উপরে, যেখানে একক ব্যক্তিই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আর সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া ছিলো কালেক্টিভিজমের উপরে দাঁড়িয়ে, অর্থাৎ যেখানে একক ব্যক্তির চাইতে সমাজের গুরুত্ব ছিলো বেশী। কমিউনিস্ট দুনিয়াকে খারিজ না করে আমেরিকান ব্যক্তিভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড়াতে পারেনা, সমগ্র শীতল যুদ্ধের যুগটিতে সারা দুনিয়ায় আমেরিকান এই প্রচারনার জমজমাট অবস্থা ছিলো। সুতরাং আমেরিকান ব্যক্তিভোগবাদের সমর্থক হিসাবে এই মুক্তমনা কমিউনিস্ট সমাজ গুলোকে খারিজ করবেন, তা অস্বাভাবিক নয়। সেটা দোষেরও কিছু নয়, কিন্তু তাই বলে এভাবে? কোনও রকমের যুক্তি, প্রমান, তথ্য, ড্যাটা, পরিসংখ্যান ছাড়াই? মৌলবাদীরাও তো তাদের দাবীর স্বপক্ষে কিছু যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করেন, কিছু প্রমান দেয়ার চেষ্টা করেন। এই “মুক্তমনা”র সেসব কিছুর দায় নেই। তিনি কমিউনিজম কে গালিগালাজ করার রেফারেন্স হিসাবে উপস্থাপন করেন তাঁর জ্যাঠামশাই কয়েকবার সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন সেই গল্প, আহা এটা মুক্তচিন্তার নমুনা?


(প্রথম মানুষ হিসাবে কমিউনিস্ট রাশিয়ার ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশ যাত্রার সংবাদ)

আমার সংশয়বাদী মন, তাই প্রশ্ন করি অন্য মুক্তমনাদের – যদি কমিউনিজম মানুষকে যন্ত্রনা আর দাসত্ব ছাড়া কিছুই দিয়ে না থাকে, তাহলে কমিউনিস্ট দেশগুলোতে সাহিত্য, শিল্প, দর্শন এবং বলাই বাহুল্য বিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব উন্নতির কারণটি কি? কিভাবে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো পদার্থবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং কিম্বা বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়েছিলো? যদি কমিউনিস্ট দুনিয়া বিশ্বকে দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই না দিয়ে থাকে তাহলে পুজিবাদী দুনিয়ার প্রবর্তিত পুরস্কার নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় প্রায় একশোজন কি করে নোবেল পেয়েছিলেন কমিউনিস্ট দুনিয়া থেকে? এঁদের বেশীর ভাগই ছিলেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, তথাকথিত শান্তি পুরস্কার নয়। কেনও এবং কিভাবে রাশিয়া একটি পরাশক্তি হয়ে উঠেছিলো সারা দুনিয়ায়? কেনও কমিউনিস্ট দুনিয়ার সাথে আমেরিকার দীর্ঘ বছরের ঠান্ডা যুদ্ধ চলল? কেনও আমেরিকাকে সারা দুনিয়া ব্যাপী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছিলো শুধু কমিউনিস্ট দুনিয়ার বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরিতে? যার হিসাব নিকাশ খোদ আমেরিকারই “ডিক্ল্যাসিফায়েড” ডকুমেন্ট গুলোর মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসছে? কিভাবে সোভিয়েত রাশিয়া আমেরিকার আগেই মহাকাশে প্রথম মানুষ ইউরী গ্যাগারিন কে পাঠাতে পারলো? এই সকল প্রশ্নের কোনও উল্লেখ পাওয়া যাবেনা এই ধরনের “মুক্তমনা”দের লেখায়। বাস্তব সত্যি হচ্ছে – কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও পাল্লা দিয়ে এগিয়ে গেছে বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, শিল্পে, সাহিত্যে। এক ধরনের সামাজিক স্থিতিশীলতা না থাকলে, উৎপাদনশীলতা না থাকলে মানুষ কেবল দাসত্ব আর যন্ত্রণা নিয়ে নিজের দেশকে আমেরিকার মতো এক পরাশক্তির সাথে পাল্লা দেবার মতো পাল্টা পরাশক্তি হিসাবে গড়ে তুলতে পারেনা, এটা সম্ভব হয়না। যদিও আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়নের এই প্রতিযোগিতার নেট ফলাফল ছিলো মানব সভ্যতার জন্যে আতংক জনক, ঠান্ডা যুদ্ধ।

কিন্তু ধনতান্ত্রিক সমাজের সাথে আর্থসামাজিক চরিত্রগত পার্থক্যের কারণে দুই ধরনের অর্থনীতি ও সমাজের বিকাশ হয়েছে দুই ভিন্ন ধারায়। সোভিয়েত রাশিয়া আর আমেরিকার উন্নয়নের তুলনা করে হাজার খানেক একাডেমিক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। এই রকমের গড়পড়তা “মুক্তচিন্তা” দিয়ে সেই পার্থক্যটি বোঝার কথা নয়। সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন প্রেক্ষিতের দুটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুচক গুলোর মধ্যে তুলনা করবার জন্যে শুরু করতে হয়, দুটি দেশের বেইসলাইন থেকে, দুটি দেশ কোথায় থেকে শুরু করেছিলো আর একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। নোয়াম চমস্কি তাঁর “আন্ডারস্ট্যান্ডিং পাওয়ার” পুস্তকে বিষয়টির চমৎকার ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি আমেরিকানদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন – ১৯১০ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ছিলো আমেরিকার তুলনায় নিছক একটা গন্ডগ্রাম। মাত্র পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে সেই গন্ডগ্রামটি হয়ে উঠেছিলো আমেরিকার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী এক পরাশক্তি। তাহলে কে বেশী উন্নতি করেছিলো? নোয়াম চমস্কি তাই বলছেন – আমেরিকা ও রাশিয়ার তুলোনা করতে তাই দেখতে হবে একটি নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন ১৯১০ সালের রাশিয়া বা বিপ্লবপূর্ব রাশিয়া আর একই সময়ের আমেরিকা) আমেরিকার অর্থনীতি কেমন ছিলো আর রাশিয়ার অর্থনীতি কেমন ছিলো।

সমাজ-অর্থনীতি বিষয়ে আমেরিকার সবচাইতে বনেদী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে “দি ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চ” (http://nber.org/) । প্রায় একশো বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটির ২৬ জন গবেষক নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের ১৩ জন গবেষক আমেরিকার রাস্ট্রপতির অর্থনৈতিক উপদেষ্টার ভুমিকা পালন করেছেন। এই এনবিইআর কমিউনিস্ট দুনিয়ার উপরে অসংখ্য গবেষণা আরটিকেল, রিপোর্ট আর পুস্তক প্রকাশ করেছে। সেসবের অনেক গুলোই এখন বিনামুল্যে সুলভ। সেই সকল রিপোর্টে কমিউনিজমের প্রশংসা করা হয়নি, বরং বৈজ্ঞানিক ভাবেই কমিউনিজম নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে, তাঁর ব্যর্থতা – সাফল্যের তালাশ করা হয়েছে। মার্কিন এই প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের গবেষণা বা লেখালেখি গুলো আমি পছন্দ করি বা না করি, এই লেখা গুলোতে তথ্য থাকে, তত্ত্ব থাকে, পরিসংখ্যান থাকে, যুক্তি থাকে, পদ্ধতি থাকে। একজন দায়িত্তবান লেখকের লেখার প্রধান অংশ হওয়া উচিৎ এই ধরনের কন্টেন্ট । এনবিইআর এর একটি রিপোর্ট (লিংক) বলছে – ১৯১৩ সালে, আমেরিকার জিডিপি ছিলো তিন হাজার সাতশো ডলার, ইংল্যান্ডের জিডিপি ছিলো তিন হাজার ডলার আর সোভিয়েত রাশিয়ার জিডিপি ছিলো নয়শো সত্তুর ডলার। বলুন তো আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের তুলনায় রাশিয়া কোথায় ছিলো? আর জিডিপির বিপরীতে যদি জনসংখ্যা বলি, তাহলে – ১৯১৩ সালে আমেরিকার জনসংখ্যা ছিলো ১০ কোটী, ইংল্যান্ডের চার কোটি আর রাশিয়ার ষোল কোটি। এই অবস্থা থেকে ১৯৬০ – ৭০ এর দশকে রাশিয়া হয়ে উঠলো আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, কিভাবে হলো? স্বপ্নে পাওয়া ঔষুধ খেয়ে? এটা বোঝার জন্যে দরকার পদ্ধতিগত পড়াশোনা, আলোচনা। এই ধরনের মেথডিক্যাল আলোচনা অবশ্য আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা”র জন্যে খুবই অপ্রাসঙ্গিক, কারণ তাঁর সাম্প্রতিক বেশ কিছু লেখা পড়ে যেকারো মনে হবে তিনি মেথডিক্যাল আলোচনার বদলে গালাগাল সর্বস্ব আলোচনায় অধিক দক্ষ। তাই তিনি যুক্তিবোধের ন্যূনতম ধার ধারেন না, বলে দিতে পারেন, কমিউনিস্ট দুনিয়া “যন্ত্রনা আর দাসত্ব ছাড়া কিছু দিতে পারেনি” মানুষ কে। এটা “মুক্তচিন্তা” ?

এই প্রসঙ্গে এই আলোচিত “মুক্তমনা”র ভিন্ন আরেকটি লেখা থেকে আরেকটা উদাহরন দেই –

“আমি কিউবাতে যায় নি-যাওয়ার ইচ্ছা এখনো আছে ষোলআনা, বিশেষত ক্যারিবিয়ান দীপপুঞ্জ আমার প্রিয় টুরিস্ট ডেস্টিনেশন। আগে আমেরিকা থেকে কিউবা যাওয়া সহজ ছিল না। ইদানিং ওবামা-রাউল চুক্তির দৌলতে এখান থেকে সরাসরি হাভানা যাওয়া যাচ্ছে। তবে আমার চেনাশোনা যেসব টুরিস্ট কিউবাতে গেছে, তাদের কাছ থেকে যা শুনেছি- হাভানাতে খাবারের শর্টেজ আছে এমনকি টুরিস্টদের জন্যও। তবে বেশ্যাদের রমরমা। মাত্র দশ ডলারেও শুতে রাজী হয়ে যায় যেকোন মেয়ে। কারন সবার বাড়িতেই খাবার দাবার থেকে বেসিক জিনিসের টানাটানি”।

উপরের কোটেশনটিতে দেখুন তিনি এবার চড়াও হচ্ছেন কমিউনিস্ট রাস্ট্র কিউবার উপরে। কমিউনিজমের উপরে চড়াও হওয়াটা দোষের কিছু নয়, কমিউনিজম বিরোধিতা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার উৎস ছিলো একসময়। এমন কি বহু মানুষ তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান থেকেই কমিউনিজমের তীব্র বিরোধী, সেটাও কোনও কিছু দোষের নয়। কিন্তু আমাদের এই মুক্তমনার চড়াও হবার তরিকাটি দেখুন। এই “মুক্তমনা” ভদ্রলোক তিনি কখনই কিউবা যাননি। কেবলমাত্র সেখান থেকে ঘুরে আসা বন্ধুদের বয়ানে বলছেন – কিউবা খাদ্যের সংকট আছে এমন কি টুরিস্টদের জন্যেও, তিনি লিখছেন কিউবার যেকোনো মেয়ে দশ ডলারের জন্যে কি করে থাকে।

২০১৬ সালে মোট চল্লিশ লক্ষ টুরিস্টস কিউবা ভ্রমন করেছে। সংখ্যাটা চল্লিশ লক্ষ। এর মধ্যে আমেরিকান টুরিস্ট ছিলো ১ লক্ষ ৪৭ হাজার। এর মধ্যে পরিচিত কয়েকজন টুরিস্টের বয়ানে এই “মুক্তমনা” বলছেন কিউবার “যেকোনো মেয়ে” মাত্র দশ ডলারে “শুতে” রাজি হয়ে যায়। তাঁর মানে এই “মুক্তমনা”র মতে কিউবার “যেকোনো মেয়ে” মাত্র দশ ডলারের বিনিময়ে বেশ্যাবৃত্তি করে, কারণ তাদের বাড়ীতে খাবার সহ বেসিক জিনিষপত্রের অভাব রয়েছে। পাঠক ভাবতে পারেন তাঁর এই অভিমতটি? কি নিদারুন অসততা, নারী বিদ্বেষ জড়িয়ে আছে? আচ্ছা ঘরে বেসিক জিনিসের টানাটানি থাকলেই কি যেকোনো মেয়ে বেশ্যাবৃত্তি করে? ঘরে খাবারের টানাটানি থাকলেই কি সকল নারী বেশ্যাবৃত্তি করে? পৃথিবীর আরো অন্যান্য গরীব দেশে গুলো যেখানে জনগোষ্ঠীর প্রায় সবার ঘরেই খাবারের টানাটানি আছে, সেই সকল দেশে কি নারীরা “দশ ডলার” দিলেই “শুতে রাজী” হয়ে যায়? বাংলাদেশের কোটি কোটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার যেখানে মাসের অর্ধেকটাই টানাটানির মধ্যে দিয়ে কাটে, সেই সকল পরিবারের সকল নারীই কি “দশ ডলার” বা সাতশো টাকা দিলেই “শুতে রাজী” হয়ে যায়? ভারতের শতকরা সত্তুর ভাগ মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত যাদের বাড়ীতে বেসিক জিনিষপত্রের সংকট আছে, এই পরিবার গুলোর সকল নারীই কি পাঁচশো রুপি দিলে যে কারো সাথে “শুয়ে” পড়ে? আমরা সবাই জানি, না, বাস্তবে এমনটা ঘটেনা। মানুষের ঘরে অভাব থাকলেই মানুষ “বেশ্যাবৃত্তি”র রমরমা ব্যবসায় যায়না। কিন্তু এই “মুক্তমনা”র বয়ান বিশ্বাস করলে, কিউবাতে এটা ঘটে। কারণটা কি? কারণটা আর কিছুই নয়, কিউবা একটি কমিউনিস্ট রাস্ট্র আর আমাদের আলোচিত মুক্তমনার রয়েছে তীব্র কমিউনিজম ঘৃণা, শুচিবায়ুতা ।

(কিউবার পর্যটনের গ্রাফ)

ভেবে দেখুন তো যদি টুরিস্টদের জন্যেও খাবারের অভাব থাকতো, তাহলে কি প্রতিবছর কিউবার টুরিজম ১৫% করে বৃদ্ধি পেতো? আজকের যুগে টুরিস্টরা কি নির্বোধ? খাবারের অভাব জেনেও প্রতিবচ্ছর এই বিপুল পরিমান টুরিস্ট কেবল “বেশ্যা”র লোভেই পরিবার সমেত কিউবা ভ্রমন করছে? হ্যাঁ, এই “মুক্তমনা”র মত অনুযায়ী হয়তো, তাইই, কারণ দেশটা কিউবা, একটি কমিউনিস্ট দেশ। কিউবার জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি তেরো লক্ষ, ভেবে দেখুন মাত্র এক কোটি তেরো লক্ষ জনসংখ্যার দেশে চল্লিশ লক্ষ টুরিস্ট বেড়াতে যায় কি কেবল বেশ্যার লোভে নাকি আসলেই দ্বিপটির মাঝে বেড়ানোর মতো, সময় কাটানোর মতো আরো কিছু আছে? এই হচ্ছে কমিউনিজম সম্পর্কে আমাদের একজন ডাকসাইটে “মুক্তমনা”র চিন্তা, যাকে আমরা হরেদরে “মুক্তচিন্তা” বলে অভিহিত করে থাকি। কোনও একটি বিষয় বা ব্যবস্থাকে আপনি পছন্দ নাও করতে পারেন, কোনও একটি সমাজের মতাদর্শের সাথে আপনি দ্বিমত করতে পারেন, কিন্তু সেই আলোচনাটি তো হতে হবে, পদ্ধতিগত, যৌক্তিক, তাই নয়? এই সকল “মুক্তমনা”রাই জনগন কে র‍্যাশনালিজম শেখান, বিজ্ঞানমনস্কতা শেখান।

কোনও সন্দেহ নেই, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট দেশ গুলো হেরে গেছে তাদের কেন্দ্রীয় অর্থনীতির সমাজ কে এগিয়ে নিয়ে যেতে, কিন্তু তার মানে কি এই যে এই সমাজ গুলো পৃথিবীকে “যন্ত্রণা” ও “দাসত্ব” ছাড়া আর কিছুই দেয়নি? কোনও সন্দেহ নেই, দীর্ঘ বহু বছর আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে থাকা কিউবাকে লড়াই করতে হয়েছে তাঁর নিজের অরথনীতিকে ধরে রাখতে, পাশের দেশ আমেরিকা জৌলুসের তুলনায়, কিউবা নিতান্তই গরীব প্রতিবেশী, তাই বলে কিউবাকে হেনস্থা করার পদ্ধতি এইটা? এই রকমের চিন্তা বা বক্তব্যকে “মুক্তচিন্তা” বলে?

কিউবার যেকোনো নারীকে “বেশ্যা” বলার এই প্রবনতাটি যে কেবল আমাদের এই মুক্তমনার, তা নয়। লক্ষ লক্ষ “আধুনিক” দাবীদার মানুষের মাঝে এই ধরনের অতিসাধারণীকরণের প্রবনতা দেখা যায়। সাইকোলজির ভাষায় এর দুটি নাম আছে – স্টেরিওটাইপিং আর প্রেজুডিস। মানুষ যখন অবচেতন ভাবেই এই রকমের অতি সরলিকরন করেন, তাঁকে বলা হয় স্টেরিওটাইপিং আর যখন কেউ সচেতন ভাবেই এই ধরনের ওভারসিমপ্লিফিকেশন বা অতিসরলিকরন করেন তাঁকে বলা যেতে পারে “প্রেজুডিস” বা সংস্কার। আমাদের এই মুক্তমনার ক্ষেত্রে সন্দেহাতীত ভাবেই দ্বিতীয়টি ঘটেছে। স্টেরিওটাইপিং আর প্রেজুডিস থেকেই আসে বর্ণবাদী আচরণ, তাই অনেক মুক্তমনা বুঝেই উঠতে পারেন না, কখন তাদের মাথার ভেতরের সংস্কার গুলো জেগে ওঠে, তাদেরকে সংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের দলে ভিড়িয়ে দেয়। এই মুক্তমনার কমিউনিজম বিরোধিতা তার একটা দারুন উদাহরন। কমিউনিজমের প্রতি তীব্র ঘৃণা কিউবার সকল নারীকে তাঁর চোখে “বেশ্যা” বানিয়ে ছেড়েছে।

ইন্টারেস্টিং নয়?

(চলবে)

এই লেখাটি প্রথম ইস্টিশন ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিলো। লেখাটি এখান থেকেও পড়া যেতে পারে।

Spread the love