যুদ্ধ, মানুষ হত্যা আর “মুক্তমনা”র বোধ !

গত পর্বে লিখেছিলাম যে আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা” সারা দুনিয়াকে চারটি ভাগে ভাগ করছেন তাঁর লেখায়, ইসলামী দুনিয়া, কমিউনিস্ট দুনিয়া, হিন্দু দুনিয়া আর আমেরিকা। তারপরে তিনি প্রমান করছেন কেনও আমেরিকাই শ্রেষ্ঠ। সেটা প্রমান করতে গিয়ে তিনি একে একে প্রমান করেছেন কেনও ইসলামী, কমিউনিস্ট আর হিন্দু দুনিয়া বড়ই খারাপ – অচল। দেখুন তাঁর কিছু নমুনাঃ

ইসলামী দুনিয়া সম্পর্কে বলছেন –

সুতরাং ইসলাম যখন আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে সহিংস উপায়ে, আমরা ভীত। কারন ইসলামের সংস্কৃতিতেই আছে রক্ত আর যুদ্ধ। মেয়েদের দাসী বানানো। এটি একটি মধ্যযুগীয় আরব সংস্কৃতি-যা একবিংশ শতাব্দিতে চলে না”
(জুলাই ৩, ২০১৬)

দারুন সত্যি কথা। একথা তো ইতিহাস থেকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে ইসলামের ইতিহাসের পরতে পরতে আছে রক্তপাত আর হত্যার নজির। ইসলাম যেহেতু মধ্যযুগীয় আরব সংস্কৃতি তাই এটা একবিংশ শতাব্দীতে চলেনা। খুব ভালো কথা। দ্বিমতের সত্যিই কোনও সুযোগ নেই। কিন্তু এই ধরনের বক্তব্যের বিপদের দিকটা হচ্ছে এটা একধরনের “জাজমেন্ট” বা রায়, এই ধরনের কথায় নেই কোনও বিশ্লেষণ, কারণ অনুসন্ধান এমনকি এই ধরনের বক্তব্যে খানিকটা সত্য গোপনের মিশেলও থাকে। আরো বড় বিপদ হচ্ছে, এই ধরনের “মুক্তমনা”দের “মুক্তচিন্তা” এখানেই থেমে যায়। তার পরের প্রশ্নগুলো আর এঁদের মাথায় আসেনা। কোনও সন্দেহ নেই মুহাম্মদ আর তার সিপাহসালারদের হাতে যে ইসলাম বিকশিত হয়েছে, তা হত্যা আর রক্তের উপর দিয়েই বিস্তার লাভ করেছে সারা দুনিয়ায়, সেটা ঐতিহাসিক সত্য (যদিও ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারের একটি অহিংস সুফীবাদী ধারাও ছিলো বেশ জোরেশোরে।)। কিন্তু ইসলামের এই রক্ত – রক্ত খেলার সাম্প্রতিক ইতিহাসটি কেমন? সাম্প্রতিক ইতিহাসে ইসলামী দুনিয়ায় যে রক্ত – হানাহানি, হত্যা, ধ্বংস সেসবের কারণ কি? আজকের ইসলামী দুনিয়ায় আধুনিকতার প্রসারের প্রধান বাধাগুলো কি? কেনও ইরাকে বা লিবিয়ায় গনতন্ত্র রফতানী করা হয় কিন্তু কাতারে বা সৌদী আরবে নয়? কেনও মুয়াম্মার গাদ্দাফী কিম্বা সাদ্দাম হোসাইনের গলা ধরাধরি করা সম্পর্ক এঁদের হত্যাকান্ডের মধ্যে দিয়ে সমাপ্তি ঘটে? রাজনীতির সম্পর্কের এই পরিবর্তনের কারণগুলো কি ইসলাম? কিম্বা ইসলামের বর্বর চরিত্র? নাকি এংলো-অ্যামেরিকান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখার লড়াই?

মধ্যপ্রাচ্যের এই সকল সন্ত্রাস কি ধর্মের লড়াই? নাকি রাজনীতি? এই “মুক্তচিন্তা” এর পরের প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবনা করেননা, কেনও করেননা? গত একশো বা দুশো বছরে সারা দুনিয়াতে যে হানাহানি হয়েছে – রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলো হয়েছে তার কতগুলোর জন্যে ইসলামী দুনিয়া দায়ী? কিভাবে দায়ী? মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদের যে প্রসার তার শুরুটা কবে থেকে? কবে থেকেই বা তার আকাশমুখী বিস্তার শুরু হলো? এই প্রশ্নগুলো যারা তোলেন, তাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার বদলে, তাদের কে ব্যক্তিগত আক্রমন করা হয়, নানা রকমের ট্যাগ দেয়া হয়, তার নমুনা দেখুনঃ

“জঙ্গী নিয়ে মুসলমান আর বামেদের অপযুক্তি এবং ঢ্যামনামো বন্ধ হৌক”

“আমেরিকা ২০০ বছর আগে কত রেড ইন্ডিয়ান হত্যা করেছে। ইরাকে ভ্রান্ত নীতি নিয়েছে। আমেরিকা ড্রোন দিয়ে এত নিরাপরাধ লোক মেরেছে। ভিয়েতনামে ন্যাপ ফেলেছে। ইত্যাদি। ইত্যাদি। এই যুক্তিগুলো হয় ছাগু মুসলিম না হলে বামাতিদের”।
(জুলাই ৩, ২০১৬)

অর্থাৎ, এই প্রশ্নগুলো যারা তোলেন তারা হয় “ছাগু মুসলিম” নয়তো “বামাতি”। ধরেই নিলাম এই সকল প্রশ্নকর্তারা “ছাগু মুসলিম” কিম্বা “বামাতি”, কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর কি কোনও মেরিট বা যৌক্তিকতা আছে? প্রশ্নগুলো কি ভিত্তিহীন? অর্থহীন? তারা কি মিথ্যা কথা বলছেন? তারা কি বানানো কথা বলছেন? যদি তারা মিথ্যা কথা বানোয়াট কথা বলে থাকেন, তার উত্তর কি ইতিহাস থেকে দেয়া সম্ভব? তাদের উত্তর কি তথ্য দিয়ে ভুল প্রমান করা সম্ভব?

কিন্তু আমাদের “মুক্তচিন্তা” এই সকল প্রশ্নের উত্তর দেবার চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেনা। অন্তত এই আলোচিত “মুক্তমনা”র মতো লেখকেরাতো বটেই। আর মাঝেমাঝে যখন এরা উত্তর দেবার চেষ্টা করেন, তার প্রতিটি লাইনে থাকে যুক্তির বদলে জাজমেন্ট, তথ্যের বদলে গালাগালি – স্টেরিওটাইপিং। কেনও এই “মুক্তমনা”র মতো মানুষেরা এই সকল প্রশ্নে কোনও সৃজনশীল ভাবনা উপস্থাপন ব্যর্থ হন? কারণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার জন্যে তিনটি বিষয়ের দরকার –

এক) ইতিহাসের নিবিড় পাঠ ও সেই পাঠের বিষয়ে সত্যনিষ্ঠা,
দুই) চিন্তার পদ্ধতিতে প্রতিক্রিয়ার বদলে অনুধাবনের উপর জোর দেয়া,
তিন) ধর্ম বর্ণ জাতি নির্বিশেষে মানুষ কে মানুষ মনে করা আর “ছাগু” বা “বামাতি” বলার আগে তাদের মানুষ মনে করা।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা”তো বটেই, আশেপাশের অনেক মুক্তমনা দাবীদারের মাঝেই এই তিনটি বিষয়ের দারুন অভাব।

আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ইসলাম একটি বর্বর ধর্ম, এর সংস্কৃতি হচ্ছে মধ্যযুগের আরবী সংস্কৃতি, তাই তা এই শতকে চলেনা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে আর কি কি চলে আসলে যা মধ্যযুগীয় নয়?
একবিংশ শতাব্দিতে কোনও একটি শক্তিমান রাষ্ট্রের পক্ষে ভিন্ন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনগনের উপরে যখন তখন আক্রমন করা হয়, সেটা কি একবিংশ শতকের মুল্যবোধের সাথে চলে? একবিংশ শতাব্দীতে কি অস্ত্র দিয়ে, টাকা দিয়ে, ষড়যন্ত্র দিয়ে বিভিন্ন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারকে পতন করানো চলে? শুধু এক সাদ্দাম হোসাইনকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে ছয় লক্ষ (কিম্বা মতান্তরে তিন লক্ষ) ইরাকীকে হত্যা করা চলে? সন্ত্রাস দমনের নাম করে বস্তুত স্বাধীন সার্বভৌম দেশগুলো দখল করে নেয়া চলে? সারা দুনিয়ার খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে নেয়া চলে? এমনকি প্রতিদিন নিজ দেশেরই আড়াই কোটি মানুষের টেলিফোনে আড়িপাতা চলে? নিজ দেশের বাইরে সারা দুনিয়ার কয়েক কোটি মানুষের টেলিফোনে গোপনে আড়িপাতা চলে? আমি কোনও জাজমেন্ট বা রায় দিচ্ছিনা, শুধু প্রশ্ন রাখছি। এই সকল “চলার” বিষয়গুলো কি মধ্যযুগীয়? নাকি আধুনিক? এই বিষয়গুলিতে আমাদের এই “মুক্তমনা” সাহেব তো বটেই, আমাদের অধিকাংশ মুক্তমনা কোনও বক্তব্য নেই।

হাওয়াই দিয়ে শুরু হয়েছিলো ১৮৯৮ সা্লে, সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন স্বাধীন দেশের মোট ৫৭ টি সরকারকে পতন ঘটানোর চেষ্টা করেছে আমেরিকা। টাকা দিয়ে, গোয়েন্দাগিরি করে এবং সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৩৫ টি সরকার কে পতন ঘটাতে সফল হয়েছিলো আমেরিকা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিদেশ প্রতিনিধি স্টিফেন কিনসার একটি পুস্তক লিখেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন স্বাধীন দেশের সরকার পতনের ক্ষেত্রে আমেরিকার সক্রিয় ভুমিকা নিয়ে। “Overthrow ” নামের এই পুস্তকটিতে তিনি তথ্য প্রমান দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন সরকার পতন ঘটায়। তিনি উদাহরন হিসাবে ১৪ টি দেশের সরকার পতনে আমেরিকার অংশগ্রহন কে ব্যাখ্যা করেছেন। খোদ আমেরিকান সরকারের ডিক্ল্যাসিফাইড ডকুমেন্টস গুলোই বলছে মাত্র এককোটির কিছু বেশী জনসংখ্যার ছোট্ট একটি দ্বীপ কিউবার বিরুদ্ধেই আমেরিকা মোট পাঁচ শতাধিকবার চেষ্টা করেছিলো ফিদেল কাস্ত্রো কে হত্যার মধ্য দিয়ে কিউবার সরকারের পতন ঘটানোর। দেখে নিন এখানে

এসব কি একবিংশ শতকের মুল্যবোধের সাথে চলে? এসব কি গণতান্ত্রিক মুল্যবোধের সাথে চলে? এই সমস্ত প্রশ্নে আমাদের মুক্তচিন্তা থেমে যায়। মুক্তচিন্তার চর্চায় সত্যনিষ্ঠার এই অভাব হয়তো একক ব্যক্তি মানুষের জন্যে বিপদজনক নয়, কিন্তু সভ্যতা ও গণতান্ত্রিক মুল্যবোধের বিকাশের জন্যে নিঃসন্দেহে বিপদজনক।

ইসলামের সংস্কৃতিতে আছে রক্ত আর যুদ্ধ, আগেই বলেছি, বড়ই সত্যি কথা। কিন্তু আমেরিকার সংস্কৃতিতে কি আছে? আমাদের আলোচনার এই “মুক্তমনা” কখনও রেফারেন্স দেন না, পরিসংখ্যান দেন না, তিনি খানিকটা বিচারক ঢঙের মানুষ। যদিও বিচারকেরাও তাদের প্রতিটি বক্তব্যের পেছনে যুক্তি দেন, রেফারেন্স দেন, পূর্ববর্তী আইনের ধারার উল্লেখ করেন। আমি প্রায় নিশ্চিত “মুক্তমনা” দাবীদারদের মাঝে সকলেই এই রকমের বিচারক ধরনের মানুষ নন। তাই রায় দেবার বদলে আসুন আমরা বরং একটু পরিসংখ্যান দেখিঃ

গত সাইত্রিশ বছরে আমেরিকা ১৪ টি স্বাধীন মুসলিম দেশে ভয়াবহ রকমের বোমাবাজি করেছে। এই বোমাবাজি আমেরিকার বস্টনের ম্যারাথন দৌড়ের মাঝে ইসলামী মৌলবাদীদের দ্বারা বোমাবাজি নয়। এই সকল বোমাবাজিতে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে অসংখ্য শহর, পাড়া, মহল্লা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, জনপদ। দুই যুগেও মেরামত করা যায়নি এই সকল জনপদের অনেক গুলোকে। একবার – দুবার নয়, বহু বহুবার। আসুন মোটা দাগে দেখি সে তথ্যগুলো –

ইরান (১৯৮০, ১৯৮৭, ১৯৮৮), লিবিয়া (১৯৮১, ১৯৮৬, ১৯৮৯, ২০১১), লেবানন (১৯৮৩), কুয়েত (১৯৯১), ইরাক (১৯৯১, ২০০৩ থেকে এখনও চলছে), সোমালিয়া (১৯৯২, ১৯৯৩, ২০০৭ – থেকে এখনও চলছে), বসনিয়া (১৯৯৫), সউদি আরব (১৯৯১, ১৯৯৬), আফগানিস্থান (১৯৯৮, ২০০১ – এখনও চলছে), সুদান (১৯৯৮), কসভো (১৯৯৯), ইয়েমেন (২০০০, ২০০২ – এখনও চলছে), পাকিস্থান (২০০৪ এবং এখনও চলছে ড্রোন হামলা), সিরিয়া (২০১৬ – এখনও চলছ) – এখানে দেখে নিতে পারেন এখানে

(মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসের ইতিহাস নিয়ে এই গ্রাফটি, আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা” কিম্বা যারা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসের জন্যে আসলে ইসলাম দায়ী, তারা কি এই গ্রাফটিকে ব্যাখ্যা করতে পারবেন? বলাই বাহুল্য, মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসবাদের এই গ্রাফটি মার্কিন ড্যাটাবেইজ থেকেই তৈরী করা। মধ্যপ্রাচ্যে ২০০১ সালের আগে কি ইসলাম ধর্ম ছিলো?)

এখন প্রশ্ন করি আমেরিকার রক্তে, সংস্কৃতিতে কি আছে? এই প্রশ্নের সত্যনিষ্ঠ উত্তর কি হতে পারে? আমাদের মুক্তমনারা ইতিহাসের প্রতি সত্যনিষ্ঠ কিনা জানিনা, কিন্তু এই আলোচিত “মুক্তমনা”র ইতিহাস পাঠের দৌড় এবং তার প্রতি সত্যনিষ্ঠা সত্যিই করুণ পর্যায়ের। আসুন আমেরিকার আরেকটু পরিসংখ্যান নেয়া যাক। এই দেশটি তার জন্মের পর থেকে ২৩৯ বছরের প্রায় ২২২ বছরই কোনও না কোনও যুদ্ধে জড়িয়ে ছিলো (মতান্তরে, ২৩৫ বছরের মধ্যে ২১৪ বছর)। অর্থাৎ এই দেশটির নিজের ইতিহাসের প্রায় ৯৩% ভাগ সময় এরা যুদ্ধে লিপ্ত ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ অবধি মোট ৩৭ টি দেশে মার্কিন হামলা ও চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে মোট দুই কোটির মতো মানুষ নিহত হয়েছে। শুধু মাত্র তিনটি দেশ – আফগানিস্থান, পাকিস্তান ও ইরাকে প্রায় এক দশকের অধিক সময় ধরে চলে আসা চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে মোট তেরো লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে। ভাবা যায়? এই প্রতিটি মানুষ নিহত হয়েছেন আমেরিকা ও তার মিত্রদের গুলি ও এয়ার স্ট্রাইক বা আকাশ থেকে ফেলা বোমার আঘাতে। আমেরিকার সংস্কৃতিতে কি রক্ত আর যুদ্ধ আছে? এখানে দেখে নিতে পারেন

আমি কোনও রায় দিচ্ছিনা, পাঠকের কাছে প্রশ্ন রাখছি। এই বিপুল সংখ্যক সিভিলিয়ান হত্যার বিষয়ে এই “মুক্তমনা” নিজেও তার স্বভাবসুলভ “রায়” দিয়েছেন। আসুন দেখে নেই তাঁর সেই রায়ঃ

“আমি যদি বাকি তিনটে সংস্কৃতি দেখি, খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমেরিকার সংস্কৃতির সাথেই থাকব। তা যতই ভিয়েতনাম আর পাকিস্তানে বোমা ফেলুক”।

তিনি আমেরিকার সাথে থাকবেন। এটাতে তো কারো কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু তিনি ব্যক্ত করছেন – তিনি আমেরিকার পক্ষেই থাকবেন, তা যতই ভিয়েতনাম, পাকিস্তানে আমেরিকা বোমাবাজি করুক না কেনও।

ইন্টারেস্টিং নয়?

ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার সামরিক বাহিনীর দ্বারা মোট সাড়ে চৌদ্দ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ভিয়েতনামের গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন সাড়ে পাঁচ লক্ষ, বাকিরা সাধারণ মানুষ। এবার ভেবে দেখুনতো এই “মুক্তমনা”র বক্তব্যটি – অর্থাৎ আমেরিকা যদি আরেকটা কিম্বা আরো দশটা ভিয়েতনাম ম্যাসাকারও করে তাতেও এই ভদ্রলোকের কিছুই যায় আসেনা। কেননা তিনি নিজে তো ভালো আছেন আমেরিকাতে। খাচ্ছেন দাচ্ছেন শেভ করছেন সেক্স করছেন, আর কি চাই? এটা আমি ভালো বা মন্দ কিছুই বলছিনা। আমি শুধু বলছি – এই স্টেটমেন্ট বা বক্তব্যটি এই মুক্তমনার “মানবিক মুল্যবোধ”কেই প্রকাশ করছে। এটা কি আতংকজনক? শুধু চাপাতি হাতে কেউ ধাওয়া করলেই সেটা আতংকের হয়? আর চৌদ্দ লক্ষ মানুষের জীবনের হুমকি দেয়া যুদ্ধের স্বপক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন দেয়াটা আতংকজনক নয়? প্রকাশ্য লেখালেখি দিয়ে যারা গনহত্যাকে সমর্থন করেন, সেটা সভ্যতার জন্যে আতংকের নয়?

(ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেইসকল ভয়াবহতম দিন গুলোর একদিন, প্রানভয়ে পলায়নরত শিশুদের একটি দল !)

প্রশ্ন রাখছি শুধু। এটা কি মুক্তচিন্তা? হয়তোবা ! এটা হয়তোবা “মুক্তচিন্তা” আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু এটাযে মানবিক চেতনা নয়, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আমাদের চারপাশের অনেক “মুক্তমনা”ই ঈশ্বর আর ধর্মের সাথে যুদ্ধ করতে করতে মানুষের কথা ভুলে গেছেন, তাই ঈশ্বরের উপরে বোমা ফেলাটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে, মানুষের উপরে বোমা ফেলাটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এবারে দেখুন, তিনি আরো খোলাসা করে ব্যাখ্যা করছেন –

“সুতরাং ইসলামের খুন করা আর আমেরিকার সরকারী নীতির জন্য হত্যালীলাতে পার্থক্য আছে। একটি প্রগতিশীলতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, অন্যটি আমাদেরকে মধ্যযুগে পাঠানোর জন্য”।

অর্থাৎ ইসলামের খুন করা আর আমেরিকার খুন করা এক কথা নয়, দুটো আলাদা বিষয়। যদিও এখানে বাক্যের গঠনটি পরম্পরা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাক্যটি ব্যকরণগত ভাবে ভুল, তিনি সম্ভবত বলতে চেয়েছেন, আমেরিকা যখন সারা দুনিয়াতে, বিশেষত মুসলিম দুনিয়াতে হত্যালীলা চালায়, খুন করে বেড়ায় সেটা প্রগতিশীলতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আর ইসলামী মৌলবাদীরা যখন বোমাবাজি করে, জবাই করে মানুষ হত্যা করে, সেটা আমাদের কে মধ্যযুগে পাঠিয়ে দেবার জন্যে। তিনি এই বিষয়টি পরের প্যরায় আরো পরিস্কার করেছেন –

”সব হত্যালীলাই নিন্দার। কিন্ত আমেরিকার ড্রোন হামলার সাথে গুলশান হামলার তুলনা হাস্যকর। একটি প্রগতিশীলতার আধিপত্যবিস্তার-অন্যটি আমদের মধ্যযুগে ঠেলার পাঁইয়তারা-যেখানে খাদ্য, বস্ত্র চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক অধিকারগুলো নেই। সুতরাং আমেরিকার হত্যালীলার বিরুদ্ধে আমরা অতটা সোচ্চার নই, কিন্ত ইসলামি জঙ্গীদের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার। কারন পেছনের দিকে আমরা যেতে চাইছি না”।

(আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা”র ভাষায়, প্রগতিশীলতাকে,এগিয়ে নেবার জন্যে যে আমেরিকান ড্রোন হামলা চলেছে, তাঁর শিকার বহু শিশুর মাঝে কয়েকজনের লাশ এখানে।)

সব হত্যাকান্ডই নিন্দার তবে যখন আমেরিকা হত্যাকান্ড চালায় সেটা একটু আলাদা ঘটনা। আমেরিকার হত্যাকান্ড মহৎ উদ্দেশ্যে সাধিত হয়, সেই হত্যাকান্ডের সাথে হলি আরটিজান রেস্তোরার দশজন মানুষের হত্যাকান্ড কখনই এক নয়। কিন্তু কেনও? এই মুক্তমনা তাঁর উত্তর দিয়েছেন। আমেরিকার হত্যাকান্ড হচ্ছে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নেবার জন্যে আর গুলশানের হলি আরটিজান রেস্তোরায় জঙ্গীদের আক্রমনটি হচ্ছে আমাদেরকে মধ্যযুগে পাঠানোর জন্যে। আবার পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইয়েমেন সহ মুসলিম দেশগুলোতে ড্রোন হামলা করে হাজার হাজার সিভিল মানুষ হত্যা করাটা হচ্ছে প্রগতিশীলতাকে এগিয়ে নেবার জন্যে। আমেরিকার ড্রোন হামলা হচ্ছে সভ্যতাকে এগিয়ে নেবার জন্যে তাই “আমরা” এই সকল হামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার নই এবং না হলেও কোনও ক্ষতি নেই। কিন্তু আমরা যেহেতু পেছনের দিকে যেতে চাইনা, তাই ইসলামী জঙ্গীদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হবে।

ইন্টারেস্টিং নয়? এটা মুক্তচিন্তা?

পাকিস্তানে ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মাত্র ৪১ জন টার্গেট সন্ত্রাসীকে হত্যা করার জন্যে মোট ১১৪৭ জন সাধারণ সিভিলিয়ান কে হত্যা করা হয়েছে। পশ্চিমা বয়ানে এটাকে বলা হয় “কোল্যাটারাল ড্যামেজ”। এই টার্গেট ৪১ জনের মধ্যে ৩৭ জন মারা পড়েছে এবং চারজন এখনও বেঁচে আছে, সেই হিসাবে প্রতি একজন সন্ত্রাসীকে হত্যা করার জন্যে ৩১ জন সাধারণ সিভিলিয়ানকে হত্যা করা হয়েছে। ভিন্ন একটি হিসাব বলছে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩২৩ টি ড্রোন আক্রমন হয়েছে পাকিস্তানে এবং মোট ২৮১০ জন নিহত হয়েছে। আমাদের এই আলোচিত “মুক্তমনা” বলছেন এই সকল সিভিলিয়ান হত্যা হচ্ছে প্রগতিশীলতাকে এগিয়ে নেবার জন্যে। ভেবে দেখুন তো, এই ১১৪৭ কিম্বা ২০১৭ সাল পর্যন্ত ২৮১০ জন নিহত সাধারণ মানুষের একজন যদি আপনার পরিবারের হয়ে থাকে?

এখানে দেখে নিতে পারেন (এখানে ১

এখানে ২

(এই শিশুদের প্ল্যাকার্ড এর ভাষা বোঝার ক্ষমতা আছে আমাদের এই ধরনের “মুক্তমনা” দের?)

তিনি বলছেন সকল হত্যাকান্ডই নিন্দার, কিন্তু আমেরিকার নেতৃত্বে এই লাখ লাখ হত্যাকান্ড নিয়ে খুব সোচ্চার নন তিনি (তিনি অবশ্য উল্লেখ করেছেন “আমরা” হিসাবে), কারণ তিনি মনে করেন আমেরিকার নেতৃত্বে যে বিপুল হত্যাকান্ড ঘটছে গত দুশো বছর ধরে, তা আসলে প্রগতিশীল, সভ্যতাকে এগিয়ে নেবার জন্যে।

ইন্টারেস্টিং নয়? এটা মুক্তচিন্তা?

(চলবে)

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ইস্টিশন ব্লগে। লেখাটি এখান থেকেও পড়া যেতে পারে।

Spread the love