এক. 

শাশ্বতী বিপ্লব নামের একজন লেখক মূলধারার সরকারপন্থী অনলাইন পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ডটকম এ দুই পর্বের একটি মতামত প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন যার শিরোনাম “বাংলাদেশ নিয়ে শহিদুল আলমের মিথ্যাচার এবং বিভ্রান্ত প্রজন্ম” (আগ্রহী পাঠকেরা এখান থেকে পড়ে নিতে পারেন লেখাটি  প্রথম পর্ব  এবং  দ্বিতীয় পর্ব  )। লেখার শিরোনামটি সহজ এবং পাঠককে দুটি বিষয় বলছে, প্রথমত – শহিদুল আলম বাংলাদেশ নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন আর দ্বিতীয়ত তাঁর এই সকল মিথ্যাচারে “প্রজন্ম” বিভ্রান্ত হয়েছে বা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। যদিও “প্রজন্ম” এখানে কারা সেই বিষয়ে লেখক বিপ্লবের কোনও ব্যাখ্যা নেই, এই প্রজন্ম কি যারা আওয়ামীলীগ করেনা তারা? যারা আওয়ামীলীগ সমর্থন করে তারা? নাকি বাংলাদেশের সকলেই?। আর কেনইবা তারা “বিভ্রান্ত” অর্থাৎ কিভাবে বোঝা গেলো যে কথিত “প্রজন্ম” বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে সেটা পরিস্কার নয়। তাঁর লেখাটি মূলত শহিদুল আলম “বাংলাদেশ নিয়ে” যে মিথ্যাচার গুলো করেছেন তা নিয়ে। আমরা এই ব্লগে দেখবো, শাশ্বতী বিপ্লবের এই অভিযোগ কতটা সত্যনিষ্ঠ এবং বাস্তবত কে আসলে “বিভ্রান্ত”, শাশ্বতীর কথিত “প্রজন্ম”? নাকি লেখক শাশ্বতী বিপ্লব নিজেই বিভ্রান্ত। আসুন খানিকটা গোড়ার কথা দিয়ে শুরু করি।

গনজাগরন মঞ্চের স্বপক্ষে এবং রাজাকার – আলবদর তথা যুদ্ধ অপরাধীদের বিচারের দাবীতে শহিদুল আলমের লেখা একটি সংক্ষিপ্ত মতামত নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে, মূলধারার প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় এই ধরনের “মতামত” প্রকাশের অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা সকলেই জানেন যে এই ধরনের লেখা হতে হয় খুবই প্রাসঙ্গিক, খুবই সংক্ষিপ্ত এবং পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির সাথে সরাসরি বিরোধিতা করেনা এমন। শহিদুল আলমের লেখাটি খুবই সংক্ষিপ্ত এবং স্বাভাবিক কারণেই লেখটিতে তাঁর মূল পাঠক অর্থাৎ ইংরাজী ভাষাভাষী পশ্চিমা দেশগুলোর পাঠকের কথা মনে রাখতে হয়েছে। তাই লেখাটিতে ছিলোনা শেখ মুজিব বন্দনা কিম্বা তাঁর বিপক্ষের মানুষদের নিয়ে দাত-মুখ খিঁচিয়ে লেখা কোনও বাক্য। লেখাটি ভীষণ নিয়ন্ত্রিত, সম্ভবত এর পাঠকদের কথা মনে রেখেই।

মোটের উপরে লেখাটি একটি প্রেরণাদায়ক লেখা এবং যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো গণজাগরণ মঞ্চের প্রেক্ষাপট ও দাবীর ন্যায্যতা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা। এই লেখাটি খুব সংক্ষেপে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষিতটি তুলে ধরেছে এবং কেনো চল্লিশ বছর পরেও বাঙালী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার হয়ে পথে নেমেছিলো তার একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। লেখাটি পড়ে যেকোনো মনযোগী পাঠকের মনে হবে এর উদেশ্য হচ্ছে শাহবাগ আন্দোলন সম্পর্কে ইংরাজী ভাষাভাষী আন্তর্জাতিক বিশ্বে একটা সদর্থক সমর্থন তৈরী করা। এখানে লেখাটি পড়ে নেয়া যেতে পারে ।

ইংরাজী জানা যেকোনো সাধারণ পাঠকের কাছেই লেখাটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বপক্ষের একটি লেখা মনে হবে, যেখানে গণজাগরণ মঞ্চের তরুণদের এই সংগ্রামকে সদর্থক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে, শাহবাগের আন্দোলন সম্পর্কে বলা হয়েছে “নিছক ফাঁসীর দাবীর আন্দোলন নয়”, শাহবা্গের বিক্ষোভ কে বলা হয়েছে “গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ”, “সুবিচারের আকুলতা” ইত্যাদি । লেখাটিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের “স্থপতি” হিসাবে আর কিভাবে তাঁর হত্যাকান্ড পরবর্তীতে সামরিক শাসকেরা কিভাবে  বাংলাদেশকে একটি ইসলামী মৌলবাদী রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত করেছে সেকথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এসবের পরেও লেখাটিকে শাশ্বতী বিপ্লবের মনে হয়েছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে “মিথ্যাচার”। সেই বিষয়টিকেই আমরা এখানে খানিকটা বোঝার চেষ্টা করবো।

দুই. 

আমরা অনেকেই যারা পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী হয়ে আছি, যে দেশগুলোতে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হিসাবে “ফাঁসী” বহু বছর আগেই বাতিল হয়ে গেছে, তাঁদের পক্ষে রাজাকারদের ফাঁসীর দাবীতে সংগঠিত শাহবাগের এই আন্দোলনকে সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করাটা খুব জটিল ছিলো। পশ্চিমের সমাজ ও মানবতাবাদী মানুষেরা যেকোনো অপরাধের শাস্তি হিসাবে এখন আর মৃত্যুদন্ড চায়না। অথচ শাহবাগের আন্দোলনের একটা উল্লেখযোগ্য দাবী ছিলো কুখ্যাত রাজাকার আলবদরদের “ফাসী”র দাবী। শাহবাগ আন্দোলনের এই দাবীটি আমাদের মতো বাঙালী মানবতাবাদীদের এবং পশ্চিমা অনেক মানবতাবাদী মানুষকে বিব্রত করেছে। কিন্তু তবুও আমরা শাহবাগ আন্দোলনের সাথে নীতিগত ভাবে ছিলাম, আছি এখনও। কিন্তু কেনো?  সেই ব্যাখ্যাটাই করতে চেয়েছেন শহিদুল আলম এই লেখাটিতে। তিনি বলতে চেয়েছেন – শাহবাগ আন্দোলন কেবল রক্তের দাবীতে জড়ো হওয়া নয়, বরং শাহবাগ ছিলো সকল অর্থেই “সুবিচার” পাওয়ার দাবীতে আন্দোলন, যে “সুবিচার” গত চল্লিশ বছর ধরে বকেয়া রয়ে গেছে। এটাই ছিলো শহিদুল আলমের লেখাটির মোদ্দা কথা। কিন্তু বিধি বাম, এই লেখাটিকেই ব্যবহার করা হচ্ছে শহিদুল আলম কে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের মানুষ হিসাবে চিহ্নিত করতে।

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত শহিদুল আলমের মতামত প্রবন্ধটির প্রচ্ছদ

শহিদুল আলমের লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে ছাপা হয়েছে ২০১৩ সালে আজ থেকে প্রায়  ছয় বছর আগে। কিন্তু শাশ্বতী বিপ্লব কেনো আজকে এই লেখাটি নিয়ে রিভিউ লেখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন? কেনো বিগত  ছয় বছর নয়? কিম্বা কেনো অন্য কোনও আওয়ামী ব্লগার বা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ব্লগার এই লেখাটি নিয়ে লিখলেন না বিগত  ছয় বছর? এর একটি কারণ হয়তো বলা হবে যে এতোদিন এই লেখাটির কোনও খোঁজ ছিলোনা। কিন্তু প্রকৃত কারণটি হচ্ছে, আওয়ামীলীগ সরকার যখন শহিদুল আলম কে ফ্যাসীবাদী কায়দায় গ্রেফতার করলো তখন একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমর্থক বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও অনলাইন একটিভিস্টরা এর প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলেন তেমনি অন্যদিকে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে তাঁর চরিত্র হননের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন একদল আওয়ামীলীগ সমর্থক লেখক, অনলাইন কর্মীরা।  আজ অনেকেই শহিদুল আলমের পক্ষচারন করতে গিয়ে এই লেখাটির উল্লেখ করেছেন বিধায় এই লেখাটি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।  আজকে একটি বিশেষ প্রেক্ষিত তৈরী হয়েছে যখন শহিদুল আলম কে দানবায়ন করাটা জরুরী হয়ে পড়েছে, কারণ আজকে শহিদুল আলমকে ভিলেইন না বানালে রাষ্ট্রের ফ্যাসীবাদী চরিত্রটিকে আড়াল করা যাবেনা। তাই রাষ্ট্র তাঁর সকল শক্তি ও উপায় দিয়ে চেষ্টা করছে শহিদুল আলম কে একজন “ভিলেইন” হিসাবে হাজির করতে এবং এই প্রচেষ্টার স্বপক্ষে রাষ্ট্র তার অনুগত মিডিয়া ও লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবিদের ব্যবহার করছে। শাশ্বতী বিপ্লব এই রকমের একজন অনুগত লেখক আর বিডিনিউজ২৪ হচ্ছে রাষ্ট্রের অনুগত সেই ভাড়াটে মিডিয়া। রাষ্ট্র, তার অনুগত লেখক ও ভাড়াটে মিডিয়া এই ত্রয়ীর যৌথ উদ্যোগে রচিত হয় রাষ্ট্রের বয়ান। শাশ্বতী বিপ্লবের লেখাটি মূলত একটি রাষ্ট্রীয়  প্রোপাগান্ডা, যার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা প্রমান করা যে শহিদুল আলম আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে  “মিথ্যাচার” করেছেন, তিনি বাংলাদেশ নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন, তিনি “রাস্ট্রদ্রোহী” সুতরাং তাঁকে রাষ্ট্র কর্তৃক “তুলে নেয়া”টা জায়েজ, তাঁকে পুলিশী হেফাজতে নির্যাতন করাটা “জায়েজ”।

শহিদুল আলম বাংলাদেশে অচেনা মানুষ নন। এমন কি আমরা যদি ধরেও নেই যে শহিদুল আলম একজন জনৈক সাধারণ নাগরিক, তাহলেও যে প্রশ্নটি শাশ্বতী বিপ্লবের প্রতি করা দরকার তা হচ্ছে – যখন একজন নাগরিককে অন্যায় ভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো, আইনী কর্তৃত্বের বাইরে আচরণ করা হলো, তাঁর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে মামলা করা হলো, তাঁর বক্তব্যকে বিকৃত করে পুলিশের এফআইআর লেখা হলো তখন কি এই মামলাটির কোনও ভিত্তি থাকে? শাশ্বতীর মতো লেখকেরা যদি লেখকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তাহলে কি তাঁরা আসলে রাষ্ট্রের এই নিপীড়নের একজন ভিক্টিমের বিপক্ষে দাঁড়াতে পারেন? এই প্রশ্নটা হয়তো শাশ্বতীর মতো লেখকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, কিন্তু সাধারণ পাঠকের কাছে এই প্রশ্ন রাখাটি জরুরী। শাশ্বতী শহিদুল আলমের পক্ষে দাঁড়ান নি, বরং শহিদুল আলমের বিপক্ষে রাষ্ট্র স্পন্সর করা যে “দানবায়ন প্রজেক্ট” সেই প্রজেক্ট এ শামিল হয়েছেন। সেজন্যেই আমার এই ব্লগ লেখার আয়োজন। আমি একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এই নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে চাই।

তিন. 

কিন্তু শহিদুল আলমের মতো একজন মেধাবী ও বরেন্য মানুষকে এভাবে ভিলেইন বানানোর দরকার পড়লো কেনো? সেটাই হচ্ছে শাশ্বতী বিপ্লবের এই ব্লগটি লেখার প্রেক্ষিত, আসুন সেই প্রেক্ষিত সম্পর্কে একটু জেনে নেই।

শহিদুল আলম গত ৫ আগস্ট চলমান ছাত্র আন্দোলন এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মিডিয়া আল-জাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার তুলে ধরেছেন। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি একজন নাগরিক হিসাবে তাঁর মতামত তুলে ধরেছেন। ইংরাজিতে দেয়া তাঁর সাক্ষাৎকার টি শুনে নেয়া যেতে পারে এখানে । বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে যেকোনো বিবেচনাবোধ সম্পন্ন মানুষই বুঝবেন শহিদুল আলম তাঁর এই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাই বর্ণনা করেছেন। এমন কি আমি বা আমরা অনেকেই যদি তাঁর এই  মতামতের সাথে একমত পোষণ নাও করি, তিনি একজন নাগরিক হিসাবে তাঁর মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাধীন। বাংলাদেশের সংবিধান তাঁকে এই মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার প্রদান করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় ন্যূনতম বিশ্বাসী এমন মানুষেরা শহিদুল আলমের এই মতামত কে তাঁর মত প্রকাশের স্বাধীনতার নাগরিক অধিকারের চর্চা হিসাবেই দেখবেন। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র তা দেখেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র রাতের অন্ধকারে, শহিদুল আলমের এপার্টমেন্ট ভবনে হানা দিয়েছে, অজ্ঞাত পরিচয় মানুষেরা শহিদুল আলম কে নিপীড়নমূলক পন্থায় বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। কে বা কারা তাঁকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে সেটা যেনো বোঝা না যায় সেজন্যে প্রথমে তার এপার্টমেন্ট ভবনের সিসি ক্যামেরাগুলোকে অকার্যকর করে দেয়া হয়েছে, তারপর তাঁকে টেনে হেঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে জানা যায় সরকারী নির্দেশে সরকারী গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরাই তাঁকে দুলে নিয়ে যায়। সারা দেশব্যাপী শহিদুল আলমের গ্রেফতারের বিপক্ষে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের মাঝে রাষ্ট্র ও সরকারী দল আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। শুধু তাইই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় বরেন্য মানুষেরা শহিদুল আলমের এই ধরণের মধ্যযুগীয় কায়দায় গ্রেফতার ও নিপীড়নের বিরোধিতা করে বিবৃতি দেন। এই রকম পরিস্থিতিতে, রাষ্ট্র আর তার পাহারাদার শাশ্বতী বিপ্লবদের মতো ব্লগারদের হাতে কেবল একটি অস্ত্রই বাকী থাকে প্রয়োগের জন্যে, তাহচ্ছে “ডেমোনাইজেশন” বা দানবায়ন। শহিদুল আলমের উপরে স্পর্শকাতর কালিমা লেপন। আর বাংলাদেশে কোনও মানুষের উপরে কালিমা লেপনের সবচাইতে সহজ উপায় হচ্ছে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়া। শাশ্বতী বিপ্লব সেই সহজ পথটি বেছে নিয়েছেন। তাই গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের বদলে সস্তা সমালোচনার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। শাশ্বতী বিপ্লবের দুই পর্বের লেখাটি কয়েকবার পাঠ করে যে সমস্যা গুলো পেয়েছি, তা বলাটা জরুরী।

 

শাশ্বতী বিপ্লবের লেখাটির প্রধান সমস্যাগুলো এই রকমেরঃ

 

১ – অযথার্থ উপস্থাপন বা “মিসরেপ্রেজেন্টেশন”, অর্থাৎ শহিদুল আলমের লেখাকে যথার্থ ভাবে উপস্থাপন না করে বরং সেই লেখা থেকে শাশ্বতী নিজে যা ব্যাখ্যা করতে চান তাকেই শহিদুল আলমের বক্তব্য বলে চালিয়ে দিয়েছেন, যা অনৈতিক এবং যেকোনো লেখকের সম্পর্কে ভয়ংকর ভুল ধারণা তৈরী করে ।

 

২ – অত্যন্ত দুর্বল অনুবাদ করেছেন শহিদুল আলমের ইংরাজী টেক্সট এর। কয়েকটি স্থানে তিনি শুধু দুর্বল অনুবাদই নয়, ভয়ংকর রকমের ভুল অনুবাদ করেছেন এবং সেই ভুল অনুবাদের উপরে ভর করে শহিদুল আলম কে ভিলেইন বানিয়েছেন। এই রকমের একটি ভয়ংকর ভুল অনুবাদ তিনি কোনও রকমের ভুল স্বীকার না করেই তাঁর লেখা থেকে সরিয়ে নিয়েছেন যা অনৈতিক ও লেখালেখির নীতিবর্জিত কাজ।

 

৩ – “চেরী পিকিং” বা অন্যের লেখা থেকে নিজের পছন্দমত অংশ প্রেক্ষিত বিহীন ভাবে উল্লেখ করে তার পছন্দসই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ শহিদুল আলমের লেখাটির উপর কিম্বা আল-জাজিরা টিভিতে দেয়া সাক্ষাৎকারটির মূল বক্তব্য বিষয়ে কোনও রকমের আলোকপাত না করে, শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন কিছু বাক্য তুলে ধরে তাঁকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে আওয়ামী স্বার্থের সুবিধা অনুযায়ী।

 

৪ – শহিদুল আলমের লেখাকে তিনি বিচার করেছেন “আওয়ামী” মানদন্ডে তারপর তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করেছেন। অর্থাৎ যা আওয়ামী বয়ানের সাথে মেলেনা, তাইই মিথ্যা।

 

এবারে আসুন এই লেখকের মূল লেখাটি থেকে আলোচনা করা যাক। শাশ্বতী বিপ্লব শহিদুল আলমের ইংরাজী লেখাটিতে পাঁচটি “মিথ্যাচার” এর অভিযোগ এনেছেন। দেখে যাক এই অভিযোগ গুলোকে। লেখকের লেখা থেকে সরাসরি কোট করছি।

একটি যথার্থ সমালোচনার জন্যে, আমি শাশ্বতী বিপ্লবের লেখা থেকে প্রথমে হুবুহু তুলে ধরবো, তারপরে আমার নিজের ব্যাখ্যা পাঠকের কাছে পেশ করবো।

কোটেশন – ১ (শাশ্বতী বিপ্লবের লেখা থেকে সরাসরি তুলে দিচ্ছি )

 

“প্রথমে আসি নিউইয়র্ক টাইমস এ ‘আ ফরটি ইয়ার কোয়েস্ট ফর জাস্টিস’ নিবন্ধে শহিদুল লিখেছেন,

 

Bangladesh’s founding leader, Sheikh Mujibur Rahman, set up special tribunals to try the collaborators. Several thousand cases were filed, but the quest for justice was derailed in late 1973 when Sheikh Mujibur declared a general amnesty for the collaborators against whom trial had not yet been initiated.

 

তার এ লাইনগুলোর মানে দাঁড়ায়, শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধাপরাধী বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করলেও ১৯৭৩ সালের সাধারণ ক্ষমার কারণে সেটি কক্ষচ্যুত হয়। এবং কয়েক হাজার মামলা হয়েছিলো মাত্র।

 

অর্থাৎ ২০১৩ এর আগে যুদ্ধাপরাধের কোন বিচার হয়নি এবং সেই না হওয়ার কারণও বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা”।

 

পাঠক দেখুন, তিনি লিখছেন “তার এই লাইনগুলোর মানে দাঁড়ায়” অর্থাৎ শহীদুলের লেখা টেক্সট এর তরজমা না করে নিজের বোঝাপড়াটিকে শহিদুল আলমের টেক্সট এর অর্থ বলতে চাচ্ছেন। যারা ইংরাজী বোঝেন তারা কি মানবেন শহিদুল আলমের ইংরাজী টেক্সট এর অর্থ আর শাশ্বতী বিপ্লব যা প্রকাশ করেছেন এখানে তা একই? আসুন শহিদুল আলমের টেক্সটটির একটু আপাত মূলানুগ বাংলা অনুবাদ করি –

“বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান দালালদের বিচার করার জন্যে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেছিলেন। বেশ কয়েক হাজার মামলা হয়েছিলো তখন কিন্তু সুবিচারের প্রত্যাশা কক্ষচ্যুত হয় যখন ১৯৭৩ সালের শেষদিকে শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন সেই সকল দালালদের যাদের বিরুদ্ধে তখনও বিচারকাজ শুরু করা যায়নি”।

শহিদুল আলম কি উপরের কোনও অংশে শাশ্বতীর উল্লেখিত কথা্ গুলো বলেছেন? এই অংশটুকু আবার একটু মিলিয়ে দেখুন তো?

“২০১৩ এর আগে যুদ্ধাপরাধের কোন বিচার হয়নি এবং সেই না হওয়ার কারণও বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা”। – এটা কি শহীদুলের লেখার কোথাও আছে?

 না, শহিদুল আলম তা বলেন নি, লেখেন নি । এমন কি শহিদুল আলম যা লিখেছেন সেই অংশ থেকে কোনও ভাবেই এটা বলা যায়না যে তিনি বলেছেন ২০১৩ সালের আগে যুদ্ধাপরাধীদের কোনও বিচার হয়নি। বরং আসুন শহিদুল আলমের মূল লেখাটি থেকে দেখে নেই তিনি আসলে এই প্রসঙ্গে কিভাবে লিখেছেনঃ

 

Militias affiliated with the Islamist party Jamaat-e-Islami collaborated with the Pakistani military. They informed on, hunted out, and participated in the rape, killing and torture of ordinary citizens. They targeted hundreds of intellectuals, who were killed in cold blood.

 

 After Bangladesh achieved independence, with help from India, in December 1971, the new government promised to punish the razakars, or collaborators.

 

We all knew who they were. But realpolitik in a young nation surrounded by powerful neighbors inevitably led to compromises. Bangladesh’s founding leader, Sheik Mujibur Rahman, set up special tribunals to try the collaborators. Several thousand cases were filed, but the quest for justice was derailed in late 1973 when Sheik Mujibur declared a general amnesty for the collaborators against whom trials had not yet been initiated. Two years later, he was assassinated, and a series of military coups followed.

 

(এখানে অনুবাদ দেখুনঃ ইসলামী দল জামাতে ইসলামীর সদস্যরা পাকিস্তানী বাহিনীর দালালি করেছিলো। এরা পাকিস্তানী বাহিনীকে তথ্য দিয়েছে, মানুষকে ধরিয়ে দিয়েছে, হত্যা, ধর্ষণ ও নিপীড়নের মতো ভয়ংকর সব অত্যাচার করেছে। এরা শত শত বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষদের টার্গেট করেছে এবং এদেরকে ঠান্ডা  মাথায় খুন করেছে।

 

ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা অর্জন করলো তখন নবগঠিত সরকার রাজাকার আর দালালদের বিচারের প্রতিশ্রুতি করেছিলো।আমরা সবাই জানি এরা কারা ছিলো। কিন্তু একটি সদ্য স্বাধীন দেশ যাদের চারপাশে রয়েছে অন্যান্য শক্তিশালী – প্রভাবশালী, তাঁদের পক্ষে এই বিশয়গুলোতে নানান রকমের আপোষ প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।  বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান দালালদের বিচার করার জন্যে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেছিলেন। বেশ কয়েক হাজার মামলা হয়েছিলো তখন কিন্তু সুবিচারের প্রত্যাশা কক্ষচ্যুত হয় যখন ১৯৭৩ সালের শেষদিকে শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন সেই সকল দালালদের যাদের বিরুদ্ধে তখনও বিচারকাজ শুরু করা যায়নি। এর দুবছর পরে শেখ মুজিব কে হত্যা করা হয় এবং অনেকগুলো ধারাবাহিক সেনা অভ্যুত্থান ঘটে”।)

 

দেখুন তো এই পুরো অংশটুকুতে এমন কিছু কি বলা হয়েছে যা ইতিহাসে ঘটেনি? জামাতে ইসলামীর সদস্যদের ভয়ংকর ভূমিকা, রাজাকার-আল বদরদের সাধারণ ক্ষমা, শেখ মুজিবের হত্যাকান্ড ও সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান – পালটা অভ্যুত্থান, এই ঘটনা গুলো কি ইতিহাসে ঘটেছিলো? এই সবই ইতিহাসের সত্য। আওয়ামীলীগের আর ব্লগার শাশ্বতী বিপ্লবের গাত্রদাহের কারণ হচ্ছে, শহিদুল লিখেছেন সাধারণ ক্ষমা দালালদের বিচারের প্রত্যাশা কে কক্ষচ্যুত করেছিলো। এটাও কি মিথ্যা? দালালদের সাধারণ ক্ষমা কি মানুষের সুবিচারের প্রত্যাশায় আঘাত করেনি? সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশাকে কি আঘাত করেনি? মানুষ কি আশাহত হয়নি?

বলাই বাহূল্য, শাশ্বতী বিপ্লব উপরে উল্লেখিত শহিদুল আলমের লেখার অংশ থেকে বোল্ড করা অংশ টুকু বাদ দিয়েছেন। তিনি আগের অংশটুকুও বাদ দিয়েছেন, শেষ বাক্যটিও বাদ দিয়েছেন।কেনো দিয়েছেন? এই বোল্ড অক্ষরের অংশগুলো কি প্রাসঙ্গিক নয়? দেখুন এই বোল্ড করা অংশটুকুতে শহিদুল বর্ণনা করেছেন জামাতে ইসলামী ও তাদের সদস্যদের ভয়ংকর ভুমিকার কথা। তিনি এই বোল্ড করা অংশে উল্লেখ করেছেন যে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার জনগন কে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার। শুধু তাইই নয়, তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন অনেক শক্তিধর প্রতিবেশী  রাষ্ট্রের প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের মতো একটি নবীন রাষ্ট্রের পক্ষে তার নিজের রাজনৈতিক আকাংখা বাস্তবায়নটাও একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিলো, যার প্রভাব পড়েছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও। শেখ মুজিবুর রহমানের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেই ঘটনার কথা বলার মানে কি শেখ মুজিব বা সেই সময়ের সরকার যাদের কে বিচারের আওতায় এনেছিলেন সেই ঘটনাকে অস্বীকার করা? শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা সত্যিকারের সুবিচারের প্রত্যাশাকে আশাহত করেছিলো এই কথা বলা কি শেখ মুজিবুর রহমানের যে প্রচেষ্টা ছিলো দালালদের বিচার করার সেই প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করা? বিবেচনাবোধ সম্পন্ন পাঠক নিশ্চিত ভাবেই এই দুইটি প্রসঙ্গকে একে অপরের বিপরীত বা মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ বলে স্বীকার করবেন না।

উপরের টেক্সট এ শহিদুল আলম কি বলেছেন এখানে যে শেখ মুজিব সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন? তিনি কি বলেছেন যে শেখ মুজিব দোষী ব্যক্তিদের ছেড়ে দিয়েছেন? তিনি তা বলেন নি। উপরের অংশে তিনি যা বলেছেন তার মোদ্দা কথা চারটি –

 

১ – জামাত শিবির এক ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধের সাথে সম্পর্কিত ছিলো।

 

২ – শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার এই সকল যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো এবং সেই মোতাবেক তারা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শুরু করেছিলেন এবং অনেক অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা হয়।

 

৩ – কিন্তু একটি সদ্য নতুন দেশের উপরে তাঁর চারপাশের শক্তিমান প্রতিবেশী দেশগুলোর নানান রকমের চাপ থাকে, ফলে অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরী হয়।

 

৪ – সাধারণ ক্ষমার ফলে, অনেক যুদ্ধাপরাধী যাদের বিরুদ্ধে তখনও মামলা করা যায়নি কিম্বা মামলা হলেও বিচার কাজ শুরু করা যায়নি, তারা বেঁচে যায়।

 

এবার মিলিয়ে দেখুন তো শাশ্বতী বিপ্লব যেভাবে শহিদুল আলমের লেখার মানে দাঁড় করিয়েছেন তা কতটা সততাপূর্ণ? শাশ্বতী শহীদুলের লেখা থেকে সেই টুকুই বুঝেছেন যতটুকু বুঝলে তাঁকে দানব রুপ দেয়া যায়, যতটুকু বুঝলে তাঁকে ভিলেইন বানানো যায়।

এবারে আসুন শাশ্বতীর কথিত “মিথ্যাচার-২” নিয়ে কথা বলা যাক।এখানে শাশ্বতী তার দ্বিতীয় অভিযোগের তীরটি ছুড়ছেন শহীদুলের দিকে, আসুন প্রথমে দেখে নেয়া যাক তিনি হুবুহু কি লিখেছেন।

কোটেশন – ২ (শাশ্বতী বিপ্লবের লেখা থেকে সরাসরি তুলে দিচ্ছি )

 

মিথ্যা

এরপর শহিদুল আলম লিখেছেন-

Only in 2010 was a tribunal at last established to investigate the 1971 war crime.

 

এর মাধ্যমে তিনি ট্রাইব্যুনাল নিয়ে শুধু মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমাকে দায়ী করেই ক্ষান্ত হননি। আসলে দালাল আইনের কী হয়েছিলো এবং কে বন্ধ করেছিলো রাজাকার আলবদরদের বিচার সেটি সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। আসুন আবার ইতিহাস খুঁজি।

 

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট শেখ মুজিব সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এবং ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করে রাজাকার আলবদলের বিচার বন্ধ করে দেন। আটক অপরাধীরা তো অবশ্যই, এমনকি ২০ জন ফাঁসির আসামীসহ দণ্ডপ্রাপ্ত ৭৫২ জন রাজাকার আলবদরকে ছেড়ে দেয়া হয়। তাহলে যুদ্ধাপরাধীর বিচার ‘ডিরেইলড’ করেছিলেন কে? শেখ মুজিব? নাকি জিয়াউর রহমান?

 

পাঠকের কাছে প্রশ্ন রইলো, শহিদুল আলমের এই ইংরাজী একটি বাক্য দিয়ে কি আসলে বোঝা যাচ্ছে তিনি ট্রাইবুন্যাল নিয়ে ঠিক কি মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন? না, তিনি ট্রাইবুন্যাল নিয়ে কোনও মিথ্যা তথ্য দেন নাই।  এমন কি যদি আমি প্রেক্ষিত বিহীন ভাবে কেবল এই একটি বাক্যকে বাংলায় তরজমা করি, তাহলে তা দাঁড়ায় এই রকম –

“এই সেদিন ২০১০ সালে শেষ পর্যন্ত একটা ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধ তদন্ত করার জন্যে” । 

এই বাক্যটিতে কি তিনি ট্রাইবুন্যাল সংক্রান্ত কোনও বিষয়ে শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমাকে দায়ী করছেন? হয়তোবা  এই বাক্যটিতে মনে হতে পারে শহিদুল বলছেন যে ২০১০ সালের আগে কখনই  বিচারের কোনও উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন্তু আসলে তা নয়। যদি এই বাক্যটির আগের অংশটুকু শাশ্বতী উল্লেখ করতেন, তাহলে শহীদুলের প্রকৃত বক্তব্যটি পাওয়া যেতো। আর ব্লগার শাশ্বতী কেনো আগের এবং পরের কথা গুলোকে বাদ দিয়ে কেবল একটা লাইনই উল্লেখ করলেন? কারণ তাতে তার নিজের কথা শহিদুল আলমের মুখের উপরে বসিয়ে দেয়াটা সহজ হয়। আসুন এখানেও শহিদুল আলমের মূল লেখাটিতে দেখি কি লিখেছিলেন তিনি –

 

Bangladesh’s original Constitution had four basic principles: nationalism, democracy, socialism and secularism. Military dictators replaced that with “absolute trust and faith in the Almighty Allah as the basis of all actions” in 1977, and made another change in 1988 that led to our once-secular nation’s being redefined as an Islamist one. Martial law, amnesty and political deals allowed the collaborators to go free and Jamaat-e-Islami to gradually rejoin the political mainstream.

 

Only in 2010 was a tribunal at last established to investigate the 1971 war crimes. It delivered its first verdict last month, sentencing a former Jamaat member, Abul Kalam Azad, to death. In a second decision, on Feb. 5, it sentenced a top current Jamaat leader, Abdul Quader Mollah, to life in prison — a sentence the protesters regard as far too lenient.

 

(অনুবাদ দেখে নিন এখানেঃ বাংলাদেশের মূল সংবিধানে চারটি মূলনীতি ছিলো। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর সেকুলারিজম। সামরিক সাশকেরা ১৯৭৭ সালে এসব প্রতিস্থাপন করেছিলো “মহান আল্লাহর উপর অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস” দিয়ে আর ১৯৮৮ সালে আরেকটা সংশোধন করা হয় যা দিয়ে বাংলাদেশ কে সেকুলার রাষ্ট্রের বদলে একটা ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সামরিক শাসন, রাজাকারদের ক্ষমা করে দেয়া আর আঁতাতের রাজনীতির কারণে রাজাকাররা মুক্ত হয়ে যায় আর ধীরে ধীরে জামাতে ইসলামীর মতো শক্তি মূলধারার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়।

 

এই সেদিন  ২০১০ সালে শেষমেষ একটা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হয় ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ তদন্ত করার জন্যে। এই ট্রাইব্যুনাল গতমাসে জামাত নেতা আবুল কালাম আজাদ কে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। দ্বিতীয় রায়ে আরেক জামাত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে যা এই প্রতিবাদকারীদের কাছে মনে হয়েছে গুরুপাপে খুব লঘুদন্ড”।)

 

বলুন তো উপরে শহিদুল আলমের মূল টেক্সট শহিদুল আলম কি বলেছেন আর আমাদের লেখক বন্ধু শাশ্বতী কি অভিযোগ করছেন? শহিদুল আলমের মূল লেখাটি উপরে পড়ে দেখুন তো তিনি কি এমন কিছু  বলেছেন যা ইতিহাসে ঘটেনি? বাংলাদেশ সংবিধানের চার মূলনীতি কি মিথ্যা? ১৯৭৭ সালের সেকুলারিজম বিসর্জন আর ১৯৮৮ সালে ইসলাম রাস্ট্র ধর্ম কি মিথ্যা কথা? সামরিক শাসন, রাজাকারদের ক্ষমা ঘোষণা আর রাজনৈতিক আঁতাতের ফলে ইসলামী শক্তি গুলো এবং জামাতে ইসলামীর পুনর্বাসন কি মিথ্যা কথা? আসল কথা হচ্ছে শাশ্বতীর মস্তিষ্ক যেহেতু আওয়ামী বয়ানে গিজগিজ করে থাকে সারাক্ষণ, তাই তিনি ইতিহাস কে আওয়ামী ভাষার বাইরে আওয়ামী বয়ানের বাইরে প্রকাশ করাকেই মিথ্যাচার মনে করেন। শহিদুল ইসলামের টেক্সট এর প্রধান সমস্যা হচ্ছে শহিদুল ইতিহাস কে ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠতা দিয়েই প্রকাশ করেন, আওয়ামী বয়ান দিয়ে নয়।

মিথ্যাচার-২ এর অধীনে বরং শাশ্বতী নিজেই মিথ্যাচার করেছেন, অনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি শহিদুল কে আংশিক উদ্ধৃত করেছেন, ভীষণ আংশিক, ভীষণ খন্ডিত ভাবে দারুন উদ্দেশ্যপূর্ণ ভাবে উদ্ধৃত করেছেন এমন কি সেই আংশিক উদ্ধৃতিতেও শহিদুল যা বলেন নি, বাজে তরজমা করে সেটাই তাঁর উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন। পাঠক পড়ে দেখুন শহিদুল আলমের পূর্ণ টেক্সট আর তারপরে লেখক শাশ্বতী বিপ্লবের অভিযোগ পড়ুন, বোঝা যাবে কি দারুন অগোছালো ভাবে তিনি অভিযোগ করছেন।

এবারে আসুন শাশ্বতীর তৃতীয় অভিযোগটি দেখা যাক, এই অভিযোগটি আগের অভিযোগটির সাথে সম্পৃক্ত, কিন্তু তিনি এই অংশটি আলাদা করে উত্থাপন করেছেন।

কোটেশন – ৩ (শাশ্বতী বিপ্লবের লেখা থেকে সরাসরি তুলে দিচ্ছি )

 

মিথ্যা -৩

শহিদুল আলম লিখেছেন-

Bangladesh’s original Constitution had four basic principles: nationalism, democracy, socialism and secularism. Military dictators replaced that with “absolute trust and faith in the Almighty Allah as the basis of all actions” in 1977, and made another change in 1988 that led to our once-secular nation’s being redefined as an Islamist one. Martial law, amnesty and political deals allowed the collaborators to go free and Jamaat-e-Islami to gradually rejoin the political mainstream.

 

তাহলে কী দাঁড়ালো?  উনার ভাষ্যমতে, সামরিক আইন, বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা এবং রাজনৈতিক ঐক্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে ফিরিয়ে আনে। কি নির্লজ্জ মিথ্যাচার! আসুন আবার সত্য খুঁজি।

 

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ ধারা অনুসারে সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে জামায়েতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়।

 

এর বিপরীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দল বিধির আওতায় মওলানা আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা এর ব্যানারে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। ১৯৭৯ সালে জিয়া সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে জামায়াতে ইসলামী আবার স্বনামে বাংলাদেশে রাজনীতি শুরু করে।

 

মজার ব্যাপার হলো, জামাতকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমার কোনও ভূমিকা না থাকলেও শহিদুল আলম তাই দাবী করেছেন।

 

অন্যদিকে ১৯৭৭ এবং ১৯৮৮ সালে কারা সংবিধান চেইঞ্জ করেছিলো সেই নামগুলো সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। অনেকটা ভাসুরের নাম মুখে না আনার মতো। আবার ১৯৭৯ সালে জিয়া সরকারের জামাতকে পুরোদমে পুনর্বাসনের কথাও চেপে গেছেন”।

 

এতো দীর্ঘ কোটেশন উল্লেখ করার একটাই কারণ হচ্ছে, আমি শাশ্বতীর মতো অসততায় আক্রান্ত হতে  চাইনা। পাঠক দেখুন তো শহিদুল আলম কি লিখেছেন আর শাশ্বতী তার কি তরজমা করছেন বা কি বুঝেছেন। ইংরাজি অংশটিতে শহিদুল আলম কি শুধু “বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা” নিয়েই লিখেছেন? শহিদুল লিখেছেন

সামরিক শাসন, সাধারণ ক্ষমা আর রাজনৈতিক আঁতাত (শাশ্বতী লিখেছেন রাজনৈতিক ঐক্য – আহা কি করুন অনুবাদ) এই তিন মিলে রাজাকারদের রাজনীতিতে আসার সুযোগ করে দিয়েছে, জামাত কে ধীরে ধীরে মূল ধারার রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেছে।

এটা কি মিথ্যাচার? 

শাশ্বতী বলছেন জামাতকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সাধারণ ক্ষমার কোনও ভূমিকা নেই, আসলেই কি তাই? শাশ্বতী উল্লেখ করেছিলেন – শেখ মুজিব জামাত কে নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শেখ মুজিব কি জামাতের নেতা কর্মীদের গ্রেফতার ও শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন তাদের অপকর্মের জন্যে? রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন?  শেখ মুজিব কি রাষ্ট্রের কাজ থেকে ধর্মকে বিযুক্ত করেছিলেন? আচ্ছা বলুন তোঃ

১ – দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে পাকিস্তান সরকারের যে প্রাদেশিক সরকার ছিলো অর্থাৎ ডা মালিক এর মন্ত্রী পরিষদ ছিলো, এই মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা প্রত্যেকেই গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ চলমান ছিলো? তাঁর ব্যাপারে শেখ মুজিবের সিদ্ধান্ত কি ছিলো? ইতিহাস বলে তারা সকলেই মুক্তি পেয়েছিলেন সাধারণ ক্ষমার অধীনে।

২ – বহুল আলোচিত ও কুখ্যাত রাজাকার খান এ সবুর কবে মুক্তি পেয়েছিলো? তিনি মুক্তি পেয়ে কি আবার রাজনীতিতে এসেছিলেন? কোনও পার্টি গঠন করেছিলেন? ইতিহাস বলে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন সরাসরি শেখ মুজিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে।

৩ – রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা একে এম ইউসুফ কবে মুক্তি পেয়েছিলেন? তিনি কি মুক্তি পাবার পরে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন? ইতিহাস বলে একেএম ইউসুফ ছিলেন রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনিও মুক্তি পেয়েছিলেন সাধারণ ক্ষমার অধীনেই এবং পরের ইতিহাসে আমরা দেখেছি তিনি আবারো জামাতের রাজনীতিতে শীর্ষপদে ফিরে আসেন।

কিন্তু একজন বোনাফাইড আওয়ামীলীগার হিসাবে শাশ্বতী মানতে রাজী নন যে বাংলাদেশে রাজাকার – আল বদর ও জামাত – শিবির এর রাজনীতির পুনর্বাসনে শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমার কোনও ভূমিকা আদৌ আছে। আর এজন্যেই তিনি শহীদুলের উপরে মিথ্যাচারের কালিমা লেপন করছেন।

শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমার পেছনের কারণ কি ছিলো, প্রেক্ষিত কি ছিলো সেটা আজও জানা যায়নি, আওয়ামীলীগের বোনাফাইড সদস্যরা এই সাধারণ ক্ষমাকে শেখ মুজিবের মহানুভবতা বলে চালাতে চান, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। তবে ইতিহাসনিষ্ঠ সত্যি হচ্ছে এই সাধারণ ক্ষমার অধীনে কলমের এক খোচায় যেভাবে তিরিশ হাজার অভিযুক্তকে মুক্তি দেয়া হয়েছিলো তাতে নিশ্চিত ভাবেই বহু প্রকৃত অপরাধী ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলো। নইলে, রাতারাতি জিয়াউর রহমানের বদান্যতার সুযোগে এই সকল মৌলবাদী আবার রাজনীতিতে চলে আসতে পারতোনা। এটা একটা কমন সেন্স বা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের বিষয়। সুতরাং একমাত্র সাধারণ ক্ষমাই রাজাকারদের পুনর্বাসন করেছে এমনটা বলাটা যেমন সত্যনিষ্ঠ নয় তেমনি তেমনি রাজাকার – আলবদর দের সামাজিক ও রাজনৈতিক পূনরবাসনে সাধারণ ক্ষমার কোনও ভুমিকাই নেই এটা বলাটাও মিথ্যাচার। কেননা সাধারণ ক্ষমার অধীনে বহু চিহ্নিত রাজাকার মুক্ত হয়েছিলো। তাই এই ক্ষেত্রে শহিদুল নন, বরং শাশ্বতীই ভোঁতা মিথ্যাচার করছেন।

শাশ্বতী বলছেন – “মজার ব্যাপার হলো, জামাতকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমার কোনও ভূমিকা না থাকলেও শহিদুল আলম তাই দাবী করেছেন”। যদিও শহিদুল আলম কোথাও দাবী করেননি জামাতকে ফিরিয়ে আনার জন্যে সাধারণ ক্ষমা দায়ী, শহিদুল বলেছেন – সামরিক শাসন, সাধারণ ক্ষমা আর রাজনৈতিক আঁতাত এই তিনে মিলে ধীরে ধীরে জামাত ও অন্যান্য ইসলামী মৌলবাদীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছে। এটা কি মিথ্যা?  আসুন আমরা এই বিষয়ে আরও একটু অনুসন্ধান করে দেখি।

শহিদুল আলমের প্রবন্ধ প্রকাশের প্রায় পচিশ-ছাব্বিশ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কয়েকজন শ্রদ্ধেয় গবেষক কি বলছেন – লিখেছেন। “একাত্তরের ঘাতক দালালেরা কে কোথায়” একটি গবেষণাধর্মী পুস্তক এবং ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কাজী নূরুজ্জামানের নেতৃত্বে এই বইটির সম্পাদকমন্ডলীতে আরও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফ এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শাহরিয়ার কবির। এই বইটই থেকে সরাসরি তুলে দিচ্ছি –

 

“বাঙ্গালী জাতির জন্য এটা অতঃন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলো সরকার গঠিত হয়েছে, প্রত্যেকে একাত্তরের ঘাতকদের পুনর্বাসনের জন্য কম বেশী দায়ী। শেখ মুজিবর রহমান ঘাতক ও দালালদের বিচার না করে ক্ষমা করেছিলেন, জিয়াউর রহমান তাদের রাজনীতি করার অধিকার দিয়ে নিজের মন্ত্রীসভায়ও ঠাঁই দিয়েছেন এবং বর্তমানে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ একই নীতি নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন।…ফলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে এই সব সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস সরকারীভাবে রচিত হবে সেখানে সত্য গোপন করা হবে, ঘাতকদের আড়াল করা হবে।” [পৃষ্ঠা ১১-১২]

 

“ক্ষমতাসীন আওয়ামি লীগ সরকারের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য সদস্য এই হত্যাযজ্ঞকে নজিরবিহীন বর্বরতা বলে উল্লেখ করে এর বিচারের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা জেনেভা কনভেনশনের সুবিধা পাওয়ার অধিকার হারিয়েছে বলেও তাঁরা মত প্রকাশ করেন। কিন্তু এর ভেতরে চলছিল ভিন্ন আর এক খেলা। স্বাধীনতাবিরোধী কুখ্যাত খুনী দালালদের জনরোষ থেকে বাঁচানোর জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ১৬ ডিসেম্বর থেকেই প্রচেষ্টা চালানো শুরু করে। ১৬ ডিসেম্বর বিকাল থেকে কুখ্যাত খুনী এবং দালালদের জন্য একমাত্র নিরাপদ স্থল হয়ে দাঁড়ায় জেলখানা। কুখ্যাত দালালদের কাছ থেকে সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে ১১ হাজার লিখিত আবেদনপত্র জমা পড়েছিলো, তাদেরকে জেলখানায় সরিয়ে নেয়ার জন্য। এদের বিচারের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার কালক্ষেপন নীতি গ্রহণ করেন।” [পৃষ্ঠা ১৭]

 

 

“বিভিন্ন মহল থেকে দালালদের বিচারের জন্য সংক্ষিপ্ত আদালতের দাবীকে উপেক্ষা করে ২৪ জানুয়ারী জারী করা হয় ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২’। দালালদের বিচারের জন্য এই আইনে দুবছরের জেল থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়। এই আদেশ অনুযায়ী আসামীর ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করার অধিকার থাকলেও ফরিয়াদীকে ট্রাইব্যুনালের বিচার্য অপরাধের জন্য অন্য কোন আদালতের বিচার প্রার্থনা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। গণহত্যাকারী ও দালাল নেতাদের সুকৌশলে রক্ষা করার জন্যই প্রণীত হয়েছিল এই আইন। কারণ আইনের ৭ম ধারায় বলা হয়েছিল, থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি যদি কোন অপরাধকে অপরাধ না বলেন তবে অন্য কারো কথা বিশ্বাস করা হবে না, অন্য কারো অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার হবে না ট্রাইব্যুনালে। অন্য কোন আদালতেও মামলা দায়ের করা যাবে না। দালালদের আত্মীয়-স্বজনের ওসিকে তুষ্ট করার মত আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল, স্বজন হারানো নির্যাতিত দরিদ্র জনসাধারণের তা ছিল না।” [পৃষ্ঠা ১৯]

 

এই বক্তব্যগুলো “একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়” পুস্তকটিতে এখনও রয়েছে। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৮৭ সালে এবং এর পরে বইটির অনেকগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বইটির সম্পাদনার সাথে যারা যুক্ত ছিলেন তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির কয়েকজন বরেন্য ব্যক্তিত্ব। এরা কি প্রজন্ম কে “বিভ্রান্ত” করছেন এতো বছর ধরে?

শাশ্বতী বিপ্লবের দাবী অনুযায়ী দেশে জামাত – শিবির সহ মৌলোবাদী রাজনীতির উত্থানের দায় হচ্ছে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের, শেখ মুজিবের “সাধারণ ক্ষমা”র কোনও ভূমিকা নেই এই প্রসঙ্গে। এটা একটা আওয়ামী বয়ান, বরং আসুন আমরা সত্যিকারের ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে শুনি তা কিভাবে দেখেন শেখ মুজিবের “সাধারণ ক্ষমা”কে। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ১৯৮৭ সালের স্বাধীনতা দিবসে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে যেখানে শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমা নিয়ে শহীদ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের মতামত তুলে ধরা হয়। সাপ্তাহিক বিচিত্রার সেই প্রতিবেদনের অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে “একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়” বইটিতে। সেখান থেকে তুলে ধরছি,  আসুন দেখি এই রকমের কয়েকটি মতামত –

 

জাহানারা ঈমাম 

“স্বাধীনতা যুদ্ধে শহিদ তরুণ মুক্তিযোদ্ধা রুমির মা লেখিকা জাহানারা ইমাম বলেছেন, ‘গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যায় যাদের ভূমিকা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল, স্বাধীনতার পর পরই তাদের ফাঁসি দেয়া উচিত ছিলো। কিন্তু সাধারণ ক্ষমার জন্য সেটা হয় নি। তৎকালীন সরকারের সাধারণ ক্ষমার সিদ্ধান্ত ছিল মারাত্মক একটি ভুল। সেদিন ক্ষমা ঘোষণা করা না হলে ঘাতকরা নিজেদের সমাজে পুনর্বাসিত করার সুযোগ পেতো না।” [“একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়”, পৃষ্ঠা ২২-২৩]

 

 

পান্না কায়সার 

“প্রখ্যাত সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার বলেন, বর্তমানে রাজাকার, আল বদরদের যে দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে তা শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমারই ফল। ওই ক্ষমা ছিল বিচার-বুদ্ধি হীন। সেদিন সরকার যদি ঘাতকদের বিচার করে সাজা দিত, তাহলে আজ এ অবসথা হত না।” “পান্না কায়সার বলেন, আওয়ামীলীগের প্রথম সারীর কোনও নেতা যুদ্ধে আপঞ্জন হারাননি। ফলে স্বজন হারানোর ব্যথা তাদের জানা ছিলোনা। ঘাতকদের তারা সহজেই ক্ষমা করে দিতে পেরেছিলেন। তাই আজ খালেকের মতো ঘাতকেরা বুক ফুলিয়ে সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং নতুন হত্যার ইন্ধন যোগাচ্ছে”। (ঐ) [ পৃষ্ঠা ২৩]

 

 

বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা 

“স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুতে নিহত জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার স্ত্রী বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা সাধারণ ক্ষমা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন তোলেন যে, ১শ’ ৯৫ জন যুদ্ধ অপরাধী পাক সামরিক অফিসারদের কেন বিচার হল না? শেখ মুজিব তো বহুবার বললেন, যুদ্ধ অপরাধী পাক সামরিক অফিসারদের বিচার করবেন। কিন্তু পারলেন না। আবার তিনি এ দেশীয় ঘাতকদেরও ক্ষমা করে দিলেন। আর এই ক্ষমাটাই সব এলোমেলো করে দিলো। সেদিন যদি ক্ষমা না করে অন্তঃত দু’একজন ঘাতকেরও যদি সাজা হতো তাহলে অনেক শহীদ পরিবারই শান্তি পেতেন। তাছাড়া ঘাতকরাও আজ আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারতো না।” (ঐ) [পৃষ্ঠা ২৪]

 

 

মুক্তিযোদ্ধা শামশুল হুদা 

“দেশ স্বাধীন হবার একদিন আগে, ১৫ ডিসেম্বর আলবদর, রাজাকার রা এক পরিবারের তিন সহোদর ভাইকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। প্রদিন ১৬ ডিসেম্বর, যুদ্ধের চুড়ান্ত বিজয়ের দিনে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে তিন ভাইয়ের লাশ পাওয়া যায়। এই তিন ভাই হচ্ছেন শহীদ বদিউজ্জামান, শহীদ শাহজাহান ও শহীদ কারিফুজ্জামান ওরফে মুল্লুক জাহান।

 

তিন শহীদ ভাইয়ের পিতা-মাতা অনেক আগেই মারা গেছেন। এখন শুধু শহীদ বদি’র বিধবা স্ত্রী ও চার ছেলে মেয়ে বেঁচে আছে। অপর দু’ভাই অবিবাহিত ছিলেন। শহীদ বদি পরিবারের সার্বিক দেখাশোনা করেন তাদের ফুপাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হুদা। তিনি ২ নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের অধীনে যুদ্ধ করেছেন।

 

শহীদ বদি পরিবারের মুখপাত্র হয়ে মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হুদা আওয়ামীলীগ সরকারের সাধারণ ক্ষমা সম্পর্কে বলেন – রাষ্ট্র প্রধান যে কাউকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু যারা লাখ লাখ স্বাধীনতাকামী লোককে হত্যা করেছিলো তাদের ক্ষমা করে দেয়াটা অমারজনীয় অপরাধ ছিলো। ছিলো একটা চরম ভুল সিদ্ধান্ত। তিনি বলে শুধু ক্ষমা নয়, ঐ সরকার শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাও প্রদর্শন করেনি।

 

সাধারণ ক্ষমার কারণে ৭১ এর ঘাতকেরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে একথা উল্লেখ করে শামসুল হুদা বলেন, এই দেশ যদি সত্যি স্বাধীন হয়ে থাকে, তাহলে এই স্বাধীন দেশে ঘাতকদের রাজনীতি করার অধিকার বন্ধ করে দিতে হবে”। (ঐঃ পৃষ্ঠা ২৫ – ২৬)

 

 

 

 

গনহত্যার নায়ক ডা মালিক ও তার মন্ত্রীসভার সদস্যদের মুক্তি 

 

১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাসের ২৪ তারিখে আওয়ামীলীগ নেতা কামরুজ্জামান ঘোষণা করেন তাদের হাতে তিরিশ জন শীর্ষ বেসামরিক দালাল আটক হয়েছেন এবং তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা। এমন কি জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয় যে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা এএম মালিক কে গনহত্যার মতো অপরাধে যুক্ত থাকার জন্যে শাস্তি দেয়া হবে। বলাই বাহূল্য, শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার অধীনে শুধু গনহত্যার নায়ক ডা মালিক নয় তার পুরো মন্ত্রীসভার সবাই মুক্তি পান। এসব ইতিহাসের সত্য ঘটনা। ছবিটি দেখুন। (সূত্র এখানে )

 

পাঠক তাহলে বলুন তো জাহানারা ঈমাম, পান্না কায়সার, বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা কিম্বা মুক্তিযোদ্ধা শামশুল হুদা এরা সকলেই কি মিথ্যাচার করছেন শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমা নিয়ে? এরা সকলেই কি প্রজন্ম কে “বিভ্রান্ত” করছেন? গনহত্যাকারী ডা মালিক ও তার মন্ত্রীসভার মুক্তি ঘটে শেখ মুজিবের ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে, এটা কি ইতিহাসের অংশ? এটা বলা কি “প্রজন্ম” কে “বিভ্রান্ত” করা?

৪.

এবারে আসুন শাশ্বতী’র দেয়া চতুর্থ মিথ্যাচারের অভিযোগটি দেখি। এও প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, যদি কেউ শহিদুল আলমের মূল ইংরাজী লেখাটি পড়েন আর তারপরে শাশ্বতী বিপ্লবের বাংলা ব্লগ টি পড়ে দেখেন, তাহলে দেখবেন, শাশ্বতী’র ইংরাজীর বোঝাপড়া দারুন দুর্বল। এটা শুধু শাশ্বতীর নয়, আমাদের অনেকেরই ইংরাজীর দক্ষতা খুব ভালো নয়। আমি নিজেও যখন কোনও টেক্সট এর অর্থ উদ্ধার করতে পারিনা, তখন অভিধানের শরনাপন্ন হই বারবার, এমন কি বন্ধুদের সাহায্য নেই, কখনও কখনও ইংরাজি ভাষায় বিশেষজ্ঞ মানুষের সহায়তা নেই। লেখালেখির ক্ষেত্রে এটাই দায়িত্তশীলতা। কিন্তু এই দুই পর্বের লেখায় শাশ্বতী সেই দায়িত্ব শীলতা দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর অন্তত তিনটি করুন নজির রয়েছে তাঁর এই লেখায়। শহীদুলের বিরুদ্ধে দেয়া মিথ্যাচারের অভিযোগের এই “মিথ্যা-৪” তাদের একটি নমুনা। আসুন একটু ভালো করে পড়ে দেখুন –

কোটেশন – ৪ (শাশ্বতী বিপ্লবের লেখা থেকে সরাসরি তুলে দিচ্ছি )

 

মিথ্যা – ৪

শহিদুল আলম লিখেছেন-

Years of kleptocratic rule, nepotism, corruption and abuse of power have eroded trust in government in Bangladesh. People feel that the system is so corrupt that change cannot possibly emerge in the electoral arena. That’s why hundreds of thousands of Bangladeshis have gathered in the past month in a spontaneous movement that quickly spread across the country.

 

এই কথাগুলোরই পুণরাবৃত্তি করেছেন আবার শেষ প্যারায়। এটা নিয়ে আর কী বলবো? শাহাবাগ আন্দোলন কী নিয়ে ছিলো আপনারাই বলুন। হ্যা, অনেকেই দাবী তুলেছিলেন সরকারের নানা অনিয়ম নিয়েও শাহাবাগ সমাবেশ থেকে যেন প্রতিবাদ করা হয়। আর আমরা বলেছিলাম, আমরা আজ অংক পরীক্ষা দিতে এসেছি, অংক পরীক্ষাই দিবো। অন্য পরীক্ষা আরেকদিন দিবো। কী, মনে আছেতো আপনাদের?

 

শহীদুলের ইংরাজিতে লেখা টেক্সট এর কি ভয়ংকর বোঝাপড়া । উপরের ইংরাজী অংশটুকুতে শহিদুল আসলে কি লিখেছেন? আর শাশ্বতী কি বুঝেছেন? শহিদুল কি আসলেই দাবী তুলছেন বা তুলেছিলেন শাহবাগে অন্যান্য দাবী নিয়ে আন্দোলন করার? শহিদুল কি এখানে বলছেন যে সরকারের অন্যান্য অনিয়ম নিয়েও শাহবাগে আন্দোলন করতে হবে? শাশ্বতী কি আসলেই শহীদুলের লেখাটি পড়েছেন? শাশ্বতী’র এই রকমের বোঝাপড়া প্রমান করছে যে তিনি আসলে শহীদুলের লেখাটি মোটেও মনোযোগ দিয়ে পড়েন নি। শহিদুল মোটেও বলেননি বা লেখেননি যে শাহবাগ আন্দোলনে আরও অন্যান্য দাবী বা সরকারের দুর্নীতির দাবী নিয়ে আন্দোলন করতে হবে, কথা বলতে হবে। শহিদুল বরং লিখেছেন, সরকারের অপশাসন, দুর্নীতি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নানান অতীত অভিজ্ঞতার কারণে তরুন সমাজ আর সরকারকে বিশ্বাস করেনা। এই সরকার একটি দুর্নীতি পরায়ন সরকার, যারা নিজেরাই ২০ জন ফাঁসীর আসামী কে ক্ষমা করে দিয়েছে। তাই কোনও কারণে যদি সরকার পরিবর্তন হয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই সকল ঘাতকেরা রাষ্ট্রের আনুকূল্যে ছাড়া পেয়ে যেতে পারে, সেই আশংকা থেকেই এই এই সকল তরুন সারা দেশে এই প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। এখানে শহিদুল মোটেও অন্যান্য দাবী নিয়ে আন্দোলনের কথা বলেন নি। যার সমালোচনা করতে চাই, তাঁর লেখাটি ভালো করে পড়ে দেখারও ধৈর্য নেই শাশ্বতীর মতো আওয়ামী লেখকদের। এখানেও তিনি শহিদুলকে আংশিক উদ্ধৃত করে অভিযুক্ত করতে চেয়েছেন, অথচ শহীদুলের টেক্সটটিতে খুব পরিস্কার ভাবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কেনো এই তরুণদের আন্দোলন টি গড়ে উঠেছে সারা দেশ জুড়ে। আবারো ভালো করে পড়ে দেখুন শহীদুলের মূল লেখার অংশটুকু –

 

Jamaat belongs to an opposition coalition led by the Bangladesh National Party. There is widespread fear that if a new government comes to power in approaching parliamentary elections, it will pardon Mr. Mollah, Mr. Azad and other Jamaat members still facing trial — allowing the collaborators of 1971 go free once again. The current government has set a dangerous precedent: Since 2009, Ms. Hasina has pardoned some 20 death-row convicts, including hardened criminals charged with grisly murders.

 

Most of the young protesters in Shahbagh Square never lived under occupation or experienced the terror of midnight raids or the fear of rape, torture and wanton killing. But they are furious over government duplicity.

 

Years of kleptocratic rule, nepotism, corruption and abuse of power have eroded trust in government in Bangladesh. People feel that the system is so corrupt that change cannot possibly emerge in the electoral arena. That’s why hundreds of thousands of Bangladeshis have gathered in the past month in a spontaneous movement that quickly spread across the country.

 

(অনুবাদঃ জামাত বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বে জোটের অংশীদার। একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষের মাঝে এই আশংকা রয়েছে যে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে যদি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে (বিএনপি – অনুবাদক)তারা কাদের মোল্লাহ কিম্বা একে আজাদ সহ অন্যান্য বিচারাধীন জামাত নেতাদের মুক্ত করে দেবে। বর্তমান সরকার এই রকমের এক ভয়ংকর উদাহরণ ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, শেখ হাসিনা্র সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে প্রায় ২০ জন ফাঁসীর আসামীকে এবং আরও একশো জন খুনের আসামীর শাস্তি মওকুফ করে দিয়েছে।

 

এই সকল তরুনেরা কখনই দখলদার বাহিনীর অভিজ্ঞতা পায়নি, রাতের আধারে বাড়ীতে হামলা, ধর্ষণ নিপীড়নের অভিজ্ঞতা এদের নেই, কিন্তু সরকারের দ্বিমুখী আচরনে এরা ক্ষিপ্ত।

 

বছরের পর বছর জনগনের সম্পদ লুন্ঠন, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে এই সরকারের প্রতি জনগনের বিশ্বাস তাই তলানিতে ঠেকেছে। জনগন বুঝতে পারছে যে পুরো ব্যবস্থাটাই এতো দুরনীতিগ্রস্থ যে শুধু নির্বাচনী কায়দায় সম্ভবত পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেজন্যেই গত এক মাস ধরে সারা দেশেই হাজার হাজার বাংলাদেশী জড়ো হয়েছে এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে।)

 

বলুন তো শহিদুল আলম কি লিখেছেন আর শাশ্বতী কি উল্লেখ করছেন? এই রকমের দুর্ভাগ্যজনক ইংরাজীর দক্ষতা নিয়ে শহিদুল আলমের মতো একজন চোস্ত ইংরাজী জানা মানুষের লেখার সমালোচনা করার করুন পরিনতি হচ্ছে এই রকমের।

শহিদুল আলম বলেন নাই যে শাহবাগ আন্দোলন কে আরও অন্যান্য দাবী নিয়ে আন্দোলন করতে হবে, শাশ্বতীর ইংরাজির দুর্বলতা আর তার “প্রি-কনসিভড আইডিয়াজ” তাঁকে দিয়ে শহিদুল আলমের লেখার ভুল তরজমা করিয়ে নিয়েছে।  কিন্তু একথা ঠিক যে শাহবাগে নানান মত ও পথের মানুষ ছিলেন। নানান রাজনৈতিক দলের, সংগঠনের, বিশ্বাসের মানুষ ছিলেন। এমন কি পরস্পর বিরোধী মতের মানুষ ও ছিলেন যারা হয়তো রাজাকার – আল বদরদের শাস্তির দাবীতে একমত হয়েছিলেন। একথা ঠিক যে শাহবাগে রাষ্ট্রের আরও সব অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই এর প্রেরণা ছিলো এবং বাস্তবত পরবর্তীতে শাহবাগ বা গণজাগরণ মঞ্চ রাষ্ট্রের আরও সব অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কিন্তু শাশ্বতী আসলে “আমরা” বলতে কি বা কাদেরকে বোঝাচ্ছেন? আওয়ামীলীগ কে? রাষ্ট্র কে? বাস্তবত শাশ্বতীর এই “আমরা” হচ্ছে রাষ্ট্র কিম্বা শাসক গোষ্ঠী, তিনি এই “আমরা” দিয়ে শাহবাগের মালিকানা নিয়ে নিতে চাচ্ছেন, জনগনের জন্যে এটাও এক ধরনের সংকেত। এই ধরনের “আমরা” ধারণা গড়ে ওঠে ফ্যাসীবাদী মস্তিষ্কে, যখন শাসক গোষ্ঠী হয়ে ওঠে একক ও সমগ্র, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর নজির রয়েছে । শাশ্বতী সেই “আমরা”র একজন প্রতিনিধি, তাই তার সমগ্র ভাবনা জুড়ে রয়েছে শাসকের চিন্তা পদ্ধতি, সেখানে অন্য কোনও মানুষ নেই। “ভিন্ন” যারা আছে তাঁরা সবাই “মিথ্যাচার” করা মানুষেরা।

৫.

আসুন এবারে সবশেষ মিথ্যাচারের অভিযোগটি ব্যবচ্ছেদ করে দেখা যাক।

কোটেশন – ৫ (শাশ্বতী বিপ্লবের লেখা থেকে সরাসরি তুলে দিচ্ছি )

 

আর্টিকেলের শেষ প্যারার আগের প্যারায় লিখেছেন-

Young kids baying for blood will make many justifiably uncomfortable. And no court should be forced to alter a verdict because of popular pressure.

 

ব্যস, এবার পুরো গণদাবিটাকেই বিতর্কিত করে ফেলা গেলো। এর ব্যাখ্যা আপনারাই বলুন, যারা শাহাবাগ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। ঘুরে ফিরে এই একই কথাগুলো পাবেন সেইসময়ে ডেভিড বার্গম্যানের লেখায়, আমার দেশ পত্রিকায়, টোবি কাডম্যানের লেখাসহ জামায়াতি ঘরানার অনেকের লেখায়।

 

টোবি কাডম্যানকে মনে আছে তো? জামায়েত ইসলামীর উপদেষ্টা একজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ যিনি যুদ্ধাপরাধী বিচারের নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে মহা তৎপর ছিলেন।

 

পাঠক খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখুন। শাশ্বতীর দেয়া এই অভিযোগটির মাঝে দুই ধরনের অসততা আছে। প্রথমত – শাশ্বতী এই প্রসঙ্গে শহিদুল আলমের লেখাকে আবারো খন্ডিত করে উল্লেখ করছেন, তারপরে তিনি তাঁর ভুল ইংরাজির বোঝাপড়া দিয়ে শহিদুল আলম কে শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন, অর্থাৎ তিনি বলছেন উপরের বাক্যটি দিয়ে শহিদুল শাহবাগ আন্দোলন কে “বিতর্কিত” করে ফেলেছেন। আর তারপরে তিনি শহিদুল আলম কে আরও দুজন কথিত “বিতর্কিত” মানুষের সাথে তুলনা করছেন।

আসুন আমরা এই শেষ অভিযোগটিকে ব্যবচ্ছেদ করি। আমি যদি ধরেই নেই, শহিদুল আলম কেবল এই দুইটি বাক্যই লিখেছেন ইংরাজিতে, তাহলে এই দুইটি বাক্যের বাংলা তরজমা কি হবে?

“এই সকল তরুণদের এভাবে রক্তের দাবীতে (ফাঁসীর দাবীতে) পথে নামা অনেককেই সঙ্গত কারণেই বিব্রত করবে। এবং কোনও আদালতেরই জনপ্রিয় দাবীর মুখে প্রভাবিত হওয়া উচিৎ নয়”। 

বলুন তো এই দুটি বাক্যে কি আসলে শাহবাগ আন্দোলনকে বিতর্কিত করা হয়? যেকোনো বিবেচনাবোধ সম্পন্ন মানুষ কি একই কথা বলবেন না? শুধুমাত্র “ফাঁসীর” দাবী নিয়ে পথে নামাটা কি খুব স্বস্তিকর? কোনও দেশের আদালত কি এই ধরনের দাবীর দ্বারা প্রভাবিত হয়? হওয়া উচিৎ? উচিৎ নয়। সেটাই বলেছেন শহিদুল। তাহলে শাহবাগ কে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন শহিদুল আলম? মূলত সেটাই বলতে চেয়ছিলেন তিনি এই অংশে। যে অংশ টুকু শাশ্বতী বিপ্লব সচেতন ভাবে চেপে গেছেন, এবারে সেই অংশটুকু একটু পড়ে দেখুন। উপরে উদ্ধৃত দুই লাইনের পরেই শহিদুল আলম লিখছেন এভাবে –

 

“Young kids baying for blood will make many justifiably uncomfortable. And no court should be forced to alter a verdict because of popular pressure.

 

But the protests in Shahbagh must be seen as more than a demand for blanket death sentences. They are also a democratic outcry, demanding that justice finally be done — and an attempt by a nation to wrest control from failed leaders who have consistently put personal profit over national interest. The protests represent the spirit of 1971 — and a bigger war that is yet to be won”

 

“এই সকল তরুণদের এভাবে রক্তের দাবীতে (ফাঁসীর দাবীতে) পথে নামা অনেককেই সঙ্গত কারণেই বিব্রত করবে। এবং কোনও আদালতেরই জনপ্রিয় দাবীর মুখে প্রভাবিত হওয়া উচিৎ নয়।

 

কিন্তু শাহবাগের এই আন্দোলনকে আসলে দেখতে হবে শুধুমাত্র ফাঁসীর দাবীর চাইতেও ভিন্ন ভাবে। এই আন্দোলনের মাঝে রয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যে প্রত্যাশা, সুবিচার পাবার আকুতি। এই আন্দোলনে রয়েছে ব্যর্থ ও ব্যক্তিগত মুনাফাখোর জাতীয় নেতৃত্ব যারা সব সময়ই নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের উপরে স্থান দিয়েছে তাদের হাত থেকে মুক্তির আকাংখা। এই প্রতিবাদই একাত্তরের চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করছে, যে বড় যুদ্ধটিকে এখনও জয় করা হয়নি”।

 

বলুন তো পাঠক এই অংশটুকুতে কি শাহবাগ আন্দোলন কে বিতর্কিত করা হয়েছে? অতিশয় দুর্বল ইংরাজীর জ্ঞান আর আংশিক উদ্ধৃতি ব্যবহারের সচেতন অসততার কারণে শাহবাগের .পক্ষের উক্তিকেও শাশ্বতী দাঁড় করিয়েছেন শাহবাগের বিপক্ষের  চেতনা বলে। এই ধরনের অসততা কেবল  শাসক গোষ্ঠীর বুদ্ধিজীবিদেরকেই মানায়।

শেষ কথা

প্রখ্যাত মার্কিন ভাষাতত্ত্ববিদ অধ্যাপক নোম চমস্কির একটি বড় গবেষণা আছে, কিভাবে রাষ্ট্র তার নিজের টিকে থাকার জন্যে বানানো “সত্য” উৎপাদন করে আর কিভাবে রাষ্ট্র তার  সেই বানানো “সত্য”র স্বপক্ষে জনগনের সম্মতি আদায় করে। এটা এক দারুন চক্র। এই চক্রে রাষ্ট্র ব্যবহার করে তার ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী, ভাড়াতে মিডিয়া আর অন্যান্য রাষ্ট্রীয় শক্তি। এই ত্রয়ীর সম্মিলনে বছরের পর বছর রাষ্ট্র তার বিরোধী মানুষদের বিরুদ্ধে “জনমত” উৎপাদন করে। পশ্চিমে তো বটেই, বাংলাদেশের ইতিহাসেও এর হাজার হাজার নজির রয়েছে । শাশ্বতী বিপ্লবের মতো লেখকেরা রাষ্ট্রের সেই প্রোপাগান্ডা মেশিনের অংশ মাত্র। আমাদের লড়াইটি রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা মেশিনের বিরুদ্ধে, শাশ্বতী বিপ্লব তাদের একজন কাঁচা প্রতিনিধি মাত্র, শাশ্বতী এখানে উপলক্ষ্য মাত্র।

শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যে মামলাটি করেছে তা কুখ্যাত ৫৭ ধারায়। একজন লেখক হিসাবে শাশ্বতী কি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন? শহিদুল আলম যদি মিথ্যাচার করে থাকেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার মামলা হতে পারে, কিন্তু তার কথা বলার অধিকার কি রদ করা যায়? শাশ্বতী কি একজন লেখকের মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে দাড়াবেন? শাশ্বতী কি মনে করেন শহিদুল আলমের কথা বলার অধিকার আছে?  তিনি কি মনে করেন বাংলাদেশে সকল মানুষের স্বাধীন মতামত দেয়ার অধিকার আছে? নাকি তিনি মনে করেন শুধুমাত্র তাঁর মতো করে যারা ভাবেন তাদেরই অধিকার আছে মতামত প্রকাশের? শাশ্বতী কি কুখ্যাত আইন ৫৭ ধারাকে সমর্থন করেন? যদি না করে থাকেন, তাহলে কি তিনি শহিদুল আলম কে এই কালো আইনে গ্রেফতারের প্রতিবাদে পথে দাড়াবেন? এখন পর্যন্ত  তিনি দাঁড়ান নি, তিনি দাঁড়িয়েছেন রাষ্ট্রের স্বপক্ষে যে রাষ্ট্র শহিদুলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে তার বক্তব্যকে বিকৃত করে। হ্যাঁ, শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসাবে এফআইআর পত্রে যা লেখা হয়েছে, আল জাজিরা টেলিভিশনের সাথে শহিদুল আলমের সাক্ষাৎকারে সেসব বক্তব্য নেই। শহিদুলের কথাকে বিকৃত করে তার বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করা হয়েছে এবং সেই মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, তাঁকে রিম্যান্ডে নেয়া হয়েছে (দেখে নিন এখানে   )একজন লেখক হিসাবে শাশ্বতী কি দাঁড়াবেন রাষ্ট্রের এই মিথ্যাচারের প্রতিবাদে? তিনি তার পক্ষ নির্বাচন করেছেন ইতিমধ্যেই। আমাদের পক্ষ তাই শাশ্বতীর বিপরীত দিকে।

 

(আগামী পর্বে সমাপ্য।)

 

Spread the love