মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা ছিলোনা! এটা আমাদের ইসলামপন্থী – ডানপন্থীদের বয়ান। এই ইসলামপন্থীরা যেমন আছেন কওমি আলেমদের মাঝে, তেমনি আছেন জামাত-শিবির, বিএনপি এমন কি সরকারী দল আওয়ামীলীগের মাঝেও।  এদের রয়েছে কিছু অনলাইন পুরোহিত, যারা নানান সব যুক্তি দিয়ে প্রমানের চেষ্টা করছেন যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ “ছিলোনা”। এই রকমের কয়েকজন ইসলামীপন্থী’র (ইসলামী আলেম বলবো কি? আলেম মানে তো শিক্ষিত বা জ্ঞানী মানুষ, এরা তো নিজেদেরকে জ্ঞানী মানুষই দাবী করেন)  সাথে এ বিষয়ে বিতর্কের সুযোগ হয়েছিলো আমার, সাম্প্রতিক সময়ে।

বেশ কয়েকজন ইসলামপন্থী ও কওমি আলেম আমাকে শেখালেন যে –

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কখনই ধর্ম নিরপেক্ষতা ছিলোনা। কারণ “ধর্ম নিরপেক্ষতা” শব্দটা ছয় দফার দাবীসমূহের মধ্যে নেই, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণায়ও নেই এমন কি মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়কার দলিলপত্রের মাঝেও এর উপস্থিতি নেই। যেহেতু “ধর্মনিরপেক্ষতা” শব্দটি নেই, সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতা ছিলোনা। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে এই শব্দটি বা শব্দবন্ধটির অনুপস্থিতি প্রমান করছে যে আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বলে কিছু ছিলোনা। এইই হচ্ছে এই সকল ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষদের বয়ান।

এই ইসলামপন্থীদের যুক্তিকাঠামো ও চিন্তাপদ্ধতি আমার অপরিচিত নয়। তাই  তাদের মাঝে এক হুজুরকে বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করলাম, “ইসলাম একটা শান্তির ধর্ম” কিম্বা “ইসলাম একটি পূরনাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা” এই দুইটা বাক্য হুবহু কুরআনের কোথায় আছে আমাকে একটু দেখিয়ে দিতে পারবেন?

ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে, আজকাল আমাদের কওমি আলেমগণ দারুন স্মার্ট। তো সেই কওমি আলেম আমার কুরআন পাঠ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন – সুরা আরাফ এর ৯৬ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্ট ভাবে আল্লাহ্‌ ঘোষণা করেছেন এই  বিষয়টি। আমাদের কওমি আলেম সাহেবেরা তাদের পাঠ্যক্রমে যুক্তিবিদ্যা পড়ে থাকেন। কিন্তু তাদের যুক্তির অসংলগ্নতা আমাকে সবসময়ই আগ্রহী করে তাদের চিন্তার প্রেক্ষিতটা বোঝার জন্যে। যেমন এই ইসলামপন্থী ভাইয়ের দেয়া কুরআনের রেফারেন্সটি খুঁজতে গিয়েও খুঁজে পেয়েছি তার যুক্তির অসংলগ্নতা। আমার কাছে পিডিএফ হার্ড কপি ও অনলাইন মিলিয়ে কয়েকটি কুরআন শরীফ আছে, তার একটিতে সুরা আরাফ এর ৯৬ তম আয়াতে কি লেখা আছে তার তরজমা পড়ে দেখলাম।  আপনারাও পড়ে দেখুন-

 

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُواْ وَاتَّقَواْ لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ وَلَـكِن كَذَّبُواْ فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُواْ يَكْسِبُونَ

“আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং পরহেযগারী অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানী ও পার্থিব নেয়ামত সমূহ উম্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি তাদের কৃতকর্মের বদলাতে।” [ সুরা আরাফ ৭:৯৬ ]

লিংক এখানে 

 

উপরের এই আয়াতটিতে ঠিক কোথায় লেখা আছে যে “ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম” তা আমার বোধগম্য হয়নি। কিন্তু আমার কওমি আলেম বন্ধুরা  ব্যাখ্যা করেন  এই আয়াতটির মূল বক্তব্য নাকি শান্তি বিষয়ক। যদিও কোথায় শান্তির কথা লেখা আছে তা আমার চোখে পড়েনা (কি জানি হয়তো আমার মতো নগন্য মানুষের চোখ বলে কথা !)  যাক, তাহলে লেখা যাইই থাক না কেনো – মূল বক্তব্যটা ভিন্ন হতে পারে এবং মূল বক্তব্যটির জন্যে সেই শব্দ বা শব্দবন্ধটি উপস্থিত না থাকলেও চলে। অন্তত ইসলামী যুক্তিতে এটা দেখা যাচ্ছে।

এটা বলে নেয়া ভালো যে,  কুরআন শরীফে যদি “ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম” এই বাক্যটি সরাসরি না থাকে তাহলেই ইসলামকে কেউ শান্তির ধর্ম বলে দাবী করতে পারবেনা, এমনটা আমি ভাবিনা বা মনে করিনা। দাবী করবার বিষয়টি ব্যক্তিগত। কিন্তু যে ধরণের বেকুবীয় যুক্তিতে ছয় দফা বা স্বাধীনতার ঘোষণায় “ধর্ম নিরপেক্ষতা” শব্দটার অনুপস্থিতিকেই পুঁজি করে এই সকল কওমি হজুরেরা প্রচার করছেন যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় “ধর্ম নিরপেক্ষতা” ছিলোনা, সেই একই যুক্তিতে বলা যায়, কুরআনের কোথাও সরাসরি লেখা নেই যে “ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম”  অতএব এই ধরণের দাবী গুলো মিথ্যা বা ভুয়া। “ইসলাম শান্তির ধর্ম” এবং কুরআনে তার সরাসরি উপস্থিতির এই যুক্তিটি উল্লেখ করার কারণটি কেবল এই সকল ইসলামী আলেমদের যুক্তি কাঠামোটি ও তাদের চিন্তাপদ্ধতির কথা বলার জন্যে। এরা “ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ” শব্দটির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি  দিয়ে বিচার করছেন, মুক্তিযুদ্ধের পেছনের যে রাজনীতি তাতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ছিলো কি ছিলোনা।  কিন্তু কুরআনে নেই এমন হাজার হাজার ধারণাকে কুরানীয় বলে চালিয়ে দিচ্ছেন দিনের পর দিন, হাজার জন হাজার রকমের ব্যাখ্যা দিয়ে। অর্থাৎ এই সকল ক্ষেত্রে তাদের আক্ষরিক বা শাব্দিক অর্থের দিকে না তাকালেও চলে। ইসলাম ধর্মের বয়ানে এরা অন্তর্নিহিত অর্থ বা implicit meaning এর  উপরে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন কিন্তু অন্যান্য সকল সামাজিক রাজনৈতিক প্রপঞ্চ কে বোঝার ক্ষেত্রে এরা  স্পষ্ট ভাবে বর্ণিত বা explicitly stated শব্দের উপরেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এই দ্বৈততাটি গুরুত্বপূর্ণ।

বলাই বাহুল্য, “শান্তির ধর্ম” বিতর্কটি ইচ্ছাকৃত ভাবেই করা, এটা এই লেখার মূল বিষয় নয়।  ইসলাম কেমন শান্তির ধর্ম তা ইসলামের ইতিহাসেই রয়েছে। ইসলামের সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসে তা আমরা দেখতে পাই, সারা দুনিয়ার একটা বিরাট অংশ জুড়ে ইসলামী দখলদারিত্বের ইতিহাসে। সেই আলোচনা ভিন্ন সময়ে করা যাবে। আজকের প্রসঙ্গ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ। মূল আলোচনায় প্রবেশ করা যাক –

পৃথিবীর প্রায় সকল জাতি তাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছেন একটা চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসাবে। সরাসরি যুদ্ধ সেখানে এসেছে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের শেষ ধাপ হিসাবে। যুদ্ধের মাঝে তাই সমরকৌশল ও সমরনীতি যতটা থাকে, রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ্য সরব প্রচার ততটা থাকেনা।এমন কি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের মনোবল ধরে রাখার জন্যে ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ কিম্বা আরো অনেক বিষয়ের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এমন নজির ভুরি ভুরি আছে।  এমন কি দেশে দেশে এই সকল সংগ্রামে সেই সকল আন্দোলনের রাজনৈতিক চেতনা সব সময় যে কড়ায় গন্ডায় লিখে তারপরে যুদ্ধ করেছেন সবাই, এমনটা ঘটেনি। রাজনৈতিক চেতনা সবসময়েই কাজ করে প্রকাশ্য ও অন্তর্গত উভয় অর্থেই। অর্থাৎ রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ প্রতিদিন একই রকমের পথে প্রকাশিত হয়, তেমনটা  ঘটেনা। এমন কি প্রকাশ্য ঘোষণার ভেতরেও থাকে আরো গভীর অন্তর্গত চেতনা। আর যুদ্ধের প্রসঙ্গে বলা চলে,  প্রত্যেকেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সময়ের তাগিদে। তাই রাজনৈতিক চেতনার বয়ান লিপিবদ্ধ করার বিষয়টি ঘটে দীর্ঘ সময় ধরে, নানান চড়াই উতরাই এর মাঝে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এমনকি যুদ্ধ জয়ের পরেও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে বা সংগঠিত ভাবে রচিত হয়েছে সেইসব সংগ্রামের রাজনৈতিক আকাংখা ও প্রত্যাশা, যার উপর ভিত্তি করে রচিত হয় এই সকল দেশ ও জাতির সংবিধান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আকাংখা। একটি দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পরে যে সংবিধান রচনা করে তা তাদের স্বাধীনতার সংগ্রামের চেতনাকেই প্রত্যক্ষভাবে প্রতিফলিত করে এটা খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের ব্যবহারেই অনুধাবন করা যায়। সেজন্যেই, বাহাত্তরের সংবিধান হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক আকাংখার সংগঠিত ও গোছানো প্রকাশ। সেজন্যে বলা হয়ে থাকে বাহাত্তরের সংবিধানেই প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। এই সকল কওমি আলেম আবার বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে কথা বলতে চান না। যেহেতু বাহাত্তরের সংবিধান রচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরে, তাই সময়কালটিকে প্রধান ধরে তারা বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু বাস্তবত উল্টোটাই সত্যি। বাহাত্তরের সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকেই রচিত। বাহাত্তরের সংবিধানই মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বহিঃপ্রকাশ।  এই সংবিধানেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গন-আকাংখার প্রতিফলন ঘটেছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মাঝে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে খারিজ করার আরেকটা যুক্তি দিয়ে থাকেন আমাদের কওমি আলেম ও তাদের আধুনিক পুরোহিতগণ । এই যুক্তিগুলো হচ্ছে এমন –

বহু মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র পাশে রেখে নামাজ আদায় করতেন। মুক্তিযুদ্ধের বহু দলিলে “আল্লাহ’র নামে” যুদ্ধ শুরু করার কথা লেখা আছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলার অনেক নেতা তাদের বক্তৃতায় মহান আল্লাহর উপর আস্থা রাখার বিষয়টি উল্লেখ করতেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সকল ঘটনার মধ্যে দিয়ে যে যুক্তি কাঠামোটি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয় তাহলো –

যেহেতু মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ বা অনেকেই নামাজ আদায় করতেন সুতরাং তাদের চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হতে পারেনা।

মুশকিল হচ্ছে ব্যক্তি মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় আচরণ আর রাজনৈতিক গণ-আকাংখার মাঝে যে তফাৎ তাকে গুলিয়ে ফেলা হয় এই ধরণের যুক্তি দিয়ে। যুক্তি হিসাবে এইসকল কথাবার্তা দারুন পপুলার ও স্পর্শকাতর, তাই খুব সহজেই আবেগী বাঙ্গালীকে ধরাশায়ী করে ফেলা যায়। কিন্তু একজন ব্যক্তি মানুষের নামাজ পড়ার সাথে যে সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কোনও সরাসরি সংঘর্ষ নেই, সেটা এই যুক্তি দেবার সময় সচেতন ভাবেই চেপে যাওয়া হয়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে আস্থাবান একজন মানুষ তার ব্যক্তিজীবনে কোনও একটি বিশেষ ধর্মের চর্চা করতেই পারেন, তার ধর্ম পালন তাকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে নাও দিতে পারে। পৃথিবীতে সকল ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যক্তি মানুষের ধর্ম চর্চার অধিকারকে কেড়ে নেয়াতো দূরের কথা বরং আইন করে সংরক্ষণ করে থাকে।

মুক্তিযোদ্ধারা মুনাজাত করছেন। এই ধরণের ছবি পৃথিবীর সকল দেশের মুক্তি সংগ্রামে দেখতে পাওয়া যায়। কোনও কোনও দেশের সেনাবাহিনীর মাঝেও ধর্মীয় সেবা দেবার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু তাতে কি সেইসব মুক্তি সংগ্রামের রাজনৈতিক চেতনার ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র খারিজ হয়ে যায়?

পৃথিবীর প্রায় সকল মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে বিশ্বাসী ও ধার্মিক মানুষেরা অংশ গ্রহন করে থাকেন। এমন কি দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট আন্দোলনেও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের দিক থেকে আস্তিক ও ধর্মপরায়ন মানুষের অংশগ্রহন ছিলো। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মুক্তি  সংগ্রামে প্রগতিশীল বামপন্থীদের সাথে চার্চের পাদ্রীদেরও একসাথে সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ধর্ম পরায়ন মানুষের অংশগ্রহনই কোনও একটি রাজনৈতিক সংগ্রামের চরিত্র কে ধর্মীয় করে তোলেনা। পৃথিবীর দেশে দেশে এই সকল মুক্তিসংগ্রাম তার প্রমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়মিত বাহিনীর সাথে খ্রিস্টান পাদ্রীদের অনেকেই অংশ নিয়েছিলেন। কৌশলগত কারণে স্ট্যালিন বেশ কিছু চার্চ খুলেও দিয়েছিলেন। এই সকল চার্চের পাদ্রীরা সমরক্ষেত্রে সৈনিকদের উদ্বুদ্ধ করতেন। এমন কি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাহিনীর মাঝে সমরাঙ্গনেও অস্থায়ী চার্চ এবং পাদ্রীদের উপস্থিতি ছিলো এবং থাকে। আমেরিকা এবং পশ্চিমের অনেক দেশেরই সামরিক বাহিনীতে military chaplains এর পদ রয়েছে যাদের কাজ হচ্ছে যুদ্ধকালীন সময়ে সৈনিকদের মাঝে যারা আগ্রহী তাঁদেরকে ধর্মীয় সেবা প্রদান করা। ধার্মিক মানুষ ও পাদ্রীদের এই ধরণের অংশগ্রহন সেকুলার পশ্চিমের চরিত্র বদলে দিতে পারেনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে, মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বড় অংশ মুসলমান ছিলেন, কিন্তু সেই একই যুদ্ধে ছিলেন অন্যান্য সকল ধর্মের মানুষেরাও। এরা কেউই তাদের ধর্মের টানে যুদ্ধ করতে যাননি। সুতরাং মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস কে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিপরীতে দাঁড় করানোর এই চেষ্টাটি একটি ইসলামী বদমাইশী ব্যতীত আর কিছুই নয়।

ধর্ম নিরপেক্ষতা কেনো বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের অনিবার্য আকাংখা হয়ে উঠেছিলো তা বোঝার জন্যে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া জরুরী। আমরা সবাই জানি, দেশ বিভাগ হয়েছিলো ধর্মের ভিত্তিতে। পাকিস্তান হলো ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলাম সেখানে সকল রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি, আইন ও অনুশাসন রচিত হয়েছিলো ইসলামের আলোকে। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় অংশেই জনগোষ্ঠীর মূল অংশ ছিলো মুসলমান। কিন্তু তারপরেও কেনো ইসলাম এই দুই অংশকে এক সূত্রে বেঁধে রাখতে পারলোনা? ধর্মের কি সেই শক্তি ছিলো এই দুই অংশের মুসলমানদের একত্রে সংগঠিত রাখার? কেনো স্বাধীনতার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মেনে নিতে এদেশের মুসলমানেরা অস্বীকার করলো? ভাষা হিসাবে তো উর্দুই ইসলামের সংস্কৃতির সাথে নিকটতর। ইসলামের সকল পুস্তক প্রধানত উর্দুতেই লেখা হতো তখন তাইনা? যদি পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক চেতনা ইসলাম-প্রধান হতো তাহলে তো তাদের উর্দুকে আলিঙ্গন করার কথা ছিলো, তাইনা? কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানেরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় দেখতে চাইলেন না কেনো? উর্দু’র বিরুদ্ধে এই যে অস্বীকৃতি, তার রাজনৈতিক চেতনাটি কি ছিলো? এই চেতনাটি কি ইসলামী ছিলো? অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের চেতনা কি ইসলামী চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ছিলো? নাকি এটা বাঙালী সংস্কৃতিকে তুলের ধরার জন্যেই দেশব্যাপী সংগ্রাম ছিলো? ভাষার দাবীতে যারা সংগ্রাম করেছেন তাদের মাঝে সকল ধর্মের মানুষই ছিলেন। কারণ ভাষার দাবীটি  ছিলো একটি ধর্মনিরপেক্ষ দাবী, এটা মুসলমানের দাবী ছিলোনা, এটা ছিলো বাঙালীর দাবী। যদি তা না হতো, তাহলে পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা উর্দুকে প্রতিহত করতে জীবন দিতেন না। উর্দু যে ইসলামের ভাষা, অন্তত আমাদের এই উপমহাদেশে, তার প্রমান হচ্ছে আজও আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার প্রধান ভাষা হচ্ছে উর্দু। সেই উর্দুকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বাঙালী ১৯৫২ সালে, কেনো? এর কোনও ইসলামী ব্যাখ্যা আছে? এর সহজ ব্যাখ্যাটি হচ্ছে ভাষা আন্দোলন ছিলো বাঙালীর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চেতনার প্রথম স্ফুরণ। বাঙালী তার মুসলমানিত্ব থেকে বেরিয়ে এসে বাঙালী হয়ে উঠেছিলো বলেই তা্রা মাতৃভাষার জন্যে জীবন দিয়েছিলো। তাই ভাষা আন্দোলন মুসলমানের আন্দোলন ছিলোনা, যদিও ব্যক্তি মানুষ হিসাবে সেই সংগ্রামের বেশীরভাগই ছিলেন মুসলিম এমন কি যারা প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁরাও ছিলেন মুসলিম পরিবার থেকেই আসা। ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্রের কোথাও হয়তো “ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ” শব্দটি পাওয়া যাবেনা, কিন্তু চেতনাগত ভাবে মানুষ যখন ধর্মকে উত্তোরন ঘটিয়ে তার নৃতাত্ত্বিক উৎসের দিকে ফিরে যায়, সেই ফিরে যাওয়াটা কি ধর্মগত? নাকি ধর্ম নিরপেক্ষ? ইসলাম ধর্মের যে বিপুল মাতমের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়েছিলো মাত্র দুই দশকের মাথায় তা থেকে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার  যে আন্দোলন গড়ে তোলে বাঙালী, সেই আন্দোলনের আকাংখা হিসাবে কি ধর্ম নিরপেক্ষতার চাইতে আর কোনও শ্রেয়তর পথ খোলা ছিলো? শুধুমাত্র ধর্মীয় ঐক্য যে মানুষের মাঝে সমতাভিত্তিক সমাজের নিশ্চয়তা দিতে পারেনা, পাকিস্তান ছিলো এক জলন্ত উদাহরণ আর সেকারনেই বাঙালীর সামনে ইসলামী সমাজের বিপরীতে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমতাভিত্তিক সমাজের বিকল্প কোনও আকাংখা ছিলোনা, এটাই ইতিহাসের সত্য।

ইডেন কলেজের মেয়েরা বকশীবাজারের মোড়ে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ তৈরী করছেন। বলুন তো এখানে ইসলামী চেতনা কাজ করেছে? নাকি ধর্ম নিরপেক্ষ বাঙ্গালিয়ানা?

বস্তুত, বায়ান্নো’র চেতনাই আরো বিকশিত হয়ে বাঙ্গালীকে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়, যার মূল চেতনা ছিলো বাঙালী’র স্বাধীন ভুমি, স্বাধীন শাসন। সেই স্বাধীন ভুমির দাবীটি ছিলো বাঙালীর জন্যে, মুসলমানের জন্যে নয়। সেজন্যেই মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান ছিলো “বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালী”। মুক্তিযুদ্ধের এই শ্লোগানে বাংলার “হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ-মুসলমানের” যে এক হয়ে যাওয়া, তার ভিত্তি ছিলো বাঙ্গালীত্ব, আর বাঙালী পরিচয় কোনও ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং ধর্ম-নিরপেক্ষ জাতিগত পরিচয়। আমরা মানি বা না মানি, আমাদের ভালো লাগুক বা দারুন বেদনার্ত মনে হোকনা কেনো, এটাই বাস্তবতা, এটাই সত্য।

বরং এটাই ইতিহাসের সত্য যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ধর্মের জুজুকেই ব্যবহার করা হয়েছিলো সবচাইতে জোরেসোরে। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি, ধর্মীয় ঐক্য বাঙ্গালীকে পাকিস্তানের সাথে ঐক্যবদ্ধ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়াকে রুখতে পাকিস্তানী শাসকদের পক্ষ থেকে প্রধান যুক্তি কি ছিলো? কারো মনে আছে? এমন কি পূর্ব-পাকিস্তানে জামাতে ইসলামী ও অন্যান্য ধর্মীয় দলগুলোর মূল প্রচারনা কি ছিলো? সেটা ছিলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানে হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সদস্যরা কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করতো পাকিস্তানকে এই সকল “কাফের”দের চক্রান্ত থেকে মুক্ত করার। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টি জুড়ে তারা প্রচার করেছে – এটা ভাইয়ে ভাইয়ে ভাঙ্গন ধরানোর ভারতীয় চক্রান্ত। আজও বহু পাকিস্তানী (ইসলামপন্থী বহু বাংলাদেশীও) মনে করে, পাকিস্তান ভেঙ্গে মুসলিম ঐক্যকে বিভাজিত করেছিলো ভারত। কিন্তু বাস্তবত আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কি ইসলামের বিরুদ্ধে ছিলো? ছিলোনা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো বাঙালীর জন্যে একটি স্বাধীন ভুমি পাওয়া, যে ভুমি হবে ধর্মনির্বিশেষে সকল বাঙালীর। এটা আক্ষরিক অর্থে হয়তো ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ নয়, কিন্তু এই চেতনাটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ থেকেই উৎসারিত। এই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চেতনার উত্থান না ঘটলে, বাংলার হিন্দু-বাংলার খ্রিস্তান-বাংলার বৌদ্ধ-বাংলার মুসলমান এক সাথে কাঁধে কাঁধ জুড়ে যুদ্ধ করতে পারতোনা।

যারা মুক্তিযুদ্ধের দলিলে একটি শব্দ “ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ” খুঁজে না পেয়ে উপসংহার টানেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্ম-নিরপেক্ষতা ছিলোনা, তাদের মূল সমস্যা হচ্ছে গাছের জন্যে বন দেখতে না পাওয়ার মতন। পানির জন্যে নদী দেখতে না পাওয়ার মতন। চেতনা কখনও দাবীনামায় অক্ষরে অক্ষরে লেখা থাকেনা। চেতনা হচ্ছে সমগ্র আর রাজনৈতিক দাবীনামা, বক্তৃতা, বিতর্ক এসব হচ্ছে একক। একক আর সমগ্রের সম্পর্ক যারা বোঝেন না তারাই ছয় দফার মাঝে “ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ” খোঁজেন এবং সেখানে সেটা না পেয়ে প্রচার করতে থাকেন বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের চেতনা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ ছিলোনা। এটা রাজনৈতিক বদমাইশি, যার মূলে রয়েছে ধর্মভিত্তিক বিশেষত ইসলামী রাজনৈতিক শক্তিগুলো আর তাদের পোশাকী অনলাইন  পুরোহিতেরা । গোলাম আজম – নিজামীরা ১৯৭১ এ হাজার চেষ্টাতেও যা পারেননি আজ মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সাতচল্লিশ বছর পরে বাংলাদেশের অব্যাহত ইসলামীকরনের ধারায় ইসলামী মৌলবাদীদের সেই উদ্যোগ অনেকটাই সফল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিষয়ে আমাদের তরুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে তোলার এই বিপুল প্রচারনায় দল নির্বিশেষে ইসলামী শক্তিগুলো একজোট হয়েছে। এটা লক্ষ্য করার মতো বিষয়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আমাদের নিবিড় পাঠ ও গভীর অনুধাবনই পারে এই সকল রাজনৈতিক বদমাইশীর চরিত্র উন্মোচন করতে।

 

 

Spread the love