প্রাককথন

কখনও কখনও দুই-একটি শব্দই একটি সময়ের ইতিহাস বলে দিতে পারে কিম্বা ইঙ্গিত করতে পারে। একটি সময়ের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে ব্যাখ্যা করতে পারে এই দুই-একটি শব্দ। বাংলাদেশে আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের তেমনি একটি শব্দ হচ্ছে “বামাতি” কিম্বা ওপার বাংলায় যার নাম “বামইস্লামিক”। এই “বামাতি”র সমার্থক আরো কিছু শব্দ তৈরী হয়েছে,”চিংকু বাম”,  “ভাম”, “ঝান্ডুবাম”, “লালছাগু” ইত্যাদি। সবগুলো শব্দই বামপন্থী রাজনীতির সমর্থক মানুষদের বোঝানোর জন্যে এই শব্দগুলোর আবিষ্কার হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। “বামাতি” কিম্বা “বামইস্লামিক” অর্থাৎ যে সকল মানুষ “বামপন্থী কিন্তু ইসলাম ধর্মের প্রতি সহানুভুতিশীল”। এই যে ইসলাম ধর্মের প্রতি “সহানুভূতিশীল” বলা, এটা আসলে একটা দাবী। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে কিম্বা বামপন্থীদের আন্তর্জাতিক কোনও সংগঠনের মাধ্যমে বামপন্থীরা নিজেদের সম্পর্কে এই দাবী করেন না, বরং তাঁদের বিরোধী শিবির থেকেই এই দাবী তোলা হয় যে বামপন্থীরা আজকের যুগের “ইসলাম” কিম্বা আরো সরাসরি করে বলা হলে “ইসলামী সন্ত্রাসবাদ” সম্পর্কে সহানুভূতিশীল। চলে আসলো আরেকটি শব্দ “ইসলামী সন্ত্রাসবাদ” অর্থাৎ এই শব্দটিও আরেকটি উল্লেখযোগ্য শব্দ যা আমাদের সময়ের একটি বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিকে ব্যাখ্যা করে। আমার এই লেখাটি আপাতত এই একটি শব্দ “বামাতি” কে  বোঝার চেষ্টা।  

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজ থেকে “বামাতি আর জামাতি” দের কালো হাত ভেঙ্গে দেয়ার ডাক দেয়া হচ্ছে।

বিস্তারিত বলার আগে, একটা কৃতজ্ঞতার কথা বলে নেয়া ভালো। আমি প্রায় বছর দুয়েক ধরে  ভাবছিলাম, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের তরুনদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের বহুল ব্যবহৃত এই শব্দগুলোর বোঝাপড়া নিয়ে একটা দীর্ঘ রচনা লিখতে চাই। লিখতে চাই, কয়েক পাতা লিখে ভাবি, নাহ ! কি হবে লিখে, কি আসে যায় এসবে, ইত্যাদি। কখনও কখনও টের পাই, আমার নিজের আলস্যকেই আসলে জায়েজ করছি এই ধরণের ভাবনা দিয়ে ইত্যাদি। অর্থাৎ আমি লিখতে পারছিলাম না, আমার এই লিখতে না পারাকে জায়েজ করছিলাম নানান ধরণের অযুহাতে। কেনা জানেন বাঙালীর তিনটা হাত, ডানহাত, বাম হাত আর অযুহাত? খুব সম্প্রতি রেহনুমা আহমেদ এর “সিপি গ্যাং এর বেশ্যা ব্যানার” পুস্তকটি পাঠ করার পরে আবার নিজের মাঝে বল খুঁজে পেলাম, নতুন এনার্জি টের পেলাম। রেহনুমা আহমেদ তার এই নতুন পুস্তকে দেখিয়েছেন, আওয়ামীলীগের তরুন – যুবক কর্মীরা যারা নিজেদের কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র ঠিকাদার মনে করেন, তারা আসলে চরিত্রগত ভাবে, চেতনাগত ভাবে মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিক, দারুন ভাবে অগণতান্ত্রিক ও মাস্তান সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এরা মাস্তানীতে রূপান্তরিত করেছে। অথচ রেহনুমা আহমেদ দেখিয়েছেন, ১৯৭১ এর সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা যারা মুখোমুখি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আক্রমন করেছেন, যুদ্ধ করেছেন তারা এঁদের সংস্কৃতিকে ধারণ করতেন না। রেহনুমা আহমেদ এর পুস্তকটি আমাদের এই সময়ের একটি শ্রেষ্ঠ পুস্তক এবং এর উপরে আরো বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে অন্যত্র। আমি শুধু আমার নতুন করে উতসাহী হয়ে ওঠার প্রেরণা হিসাবে বইটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করলাম। আমার মনে হলো, আসলে আমাদের সকলেরই লিখে যাওয়া উচিৎ এই সকল শব্দগুলোরে পেছনের রাজনীতি ও সংস্কৃতি’র ইতিহাস ও তার বোঝাপড়ার কথা। কিভাবে রাষ্ট্র, ক্ষমতার রাজনীতি আমাদের সমাজের সবচাইতে সৃজনশীল তরুন সমাজের মস্তিষ্কে ঘিনঘিনে উপনিবেশ তৈরী করে, কিভাবে চিন্তার জগতকে নষ্ট রাজনীতি দখল করে নেয় আর তারপরে সেই নষ্ট মস্তিষ্কের মানুষগুলোকে দাঁড় করিয়ে দেয় বাকী সকল মানুষের বিরুদ্ধে, সেই বিশ্লেষণটুকু হাজির করা দরকার। তাই, এই দারুন অভিনব শব্দ “বামাতি” নিয়ে আমার এই লেখার আয়োজন। লেখাটির মূল অংশে প্রবেশের আগে একটু দেখে নেই, যারা এই শব্দটি ব্যবহার করেন তারা শব্দটিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেন।

১.

বাংলা অনলাইনে “বামাতি” এবং এর সমার্থক শব্দগুলো যে সকল লেখকদের বা এক্টিভিস্টদের প্রতি সবচাইতে বেশীবার ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের একজন অন্যতম হলেন লেখক, সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ।মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ফারুকের লেখা আছে। মধ্যপ্রাচ্যের অব্যাহত সন্ত্রাস ও যুদ্ধের সংকটে ফারুকের রাজনৈতিক অবস্থান আমেরিকা-ইসরায়েল ও সৌদী আরব ত্রয়ীর বিরুদ্ধে । ফারুক আমেরিকার বিদেশনীতির কট্টর সমালোচক। তাই ফারুক ওয়াসিফকে বহুবার শুনতে হয়েছে “বামাতি” এই শব্দটি।  ফারুক তাঁর নিজের একটি লেখায় “বামাতি” শব্দটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন মূল লেখাটির ফুটনোটে। তিনি সেই পত্রিকা সম্পাদকের বরাতে “বামাতি” শব্দটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবেঃ 

 

“বামাতি একটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহৃত শব্দ।বামপন্থীদের মধ্যে যারা ইসলাম প্রশ্নে সহনশীল বা সহানুভূতিশীল তাঁদেরকে নেতিবাচক অর্থে জামায়াতি হিসেবে চিহ্নিত করে বামাতি বলা হয়ে থাকে।(মূলধারা বাংলাদেশ সম্পাদক)” (লিংক এখানে )

 

বাংলা অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ব্লগ চত্বরে খান আসাদ একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক এবং গভীর চিন্তার মানুষ হিসাবে স্বীকৃত। সমাজবিজ্ঞানের গবেষক হিসাবে তিনি নানান বিষয়ে ব্লগ লিখে থাকেন। তিনিও তাঁর একটি লেখায় “বামাতি” শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। যদিও তাঁর লেখাটি বাংলা অনলাইনের একজন বিশেষ ব্যক্তিকে নিয়ে লেখা, যিনি সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী মৌলবাদীদের স্বপক্ষে রাজনৈতিক প্রচারনায় সক্রিয় এবং ঘটনাচক্রে তিনি দীর্ঘদিন বামপন্থী একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। খাঁন আসাদ “বামাতি” শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন একেবারেই ভিন্ন ভাবে –

 

“বামাতি” অভিধাটি কিন্তু কোন তিরস্কার মূলক শব্দ নয়। বামাতি তারাই যারা মুক্তিযুদ্ধকে, বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে, ধর্মনিরপেক্ষতাকে, সমাজতন্ত্রকে, নানা ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, এমন সব ভাষা প্রয়োগ করে, যা বামপন্থী কর্মীরা ব্যাবহার করে। যেমন, এক বামাতি লিখেছে, “জ্বিহাদ হচ্ছে শ্রেণীসংগ্রাম”। এই বামাতিটি সাম্যবাদী সমাজের জন্য শ্রেণীসংগ্রামকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের জ্বিহাদের সহিংসতার সাথে সমান্তরালে এনে দিল। অথবা বলে দিল, শাহবাগ আন্দোলন হেফাজত উত্থানের কারণ। এভাবে তারা সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের নৈতিক বৈধতা দেয়ার রাজনীতি করে। বামাতিরা সেকারণে জঙ্গিদের চেয়েও ভয়ঙ্কর শত্রু। সেকারণে বামাতিদের মুখোশ উন্মোচন খুব জরুরী”। (লিংক এখানে)

 

সাব্বির আহমেদও বাংলা অনলাইন সামাজিক যোগাযোগা মাধ্যম ও ব্লগ চত্বরে পরিচিত মুখ। তিনি নিজে দেশের বিভিন্ন মূলধারার পত্রিকায় লেখালেখি করেন।রাজনৈতিক ভাবে শাসক গোষ্ঠীর কাছের মানুষ এই লেখক মূলধারার সংবাদ মাধ্যম বিডিনিউজ২৪ডটকম পত্রিকার ব্লগ পাতায় “বামাতি” শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে।

 

“ভাসানীর অনুসারী যারা বিএনপিতে যোগ দেয়নি তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ। এরা এখনো নিজেদের বামপন্থী বলে পরিচয় দেয়; শ্রেণি সংগ্রাম দেখতে পায় জঙ্গিবাদের মাঝে; রাজনৈতিক সহযোগী হয় হেফাজত-জামায়াত-বিএনপি’র; সমর্থন করে পেট্রোল বোমা আন্দোলন। মুখপোড়ারা এদের বলে বাম + জামাতি = বামাতি”।  (লিংক এখানে )

 

হিমু জামান নামের একজন আপাত অখ্যাত ব্লগার তাঁর নিজের ব্লগসাইটে লিখছেন “বামাতি” কারা। তিনি অবশ্য নাম গুলো বলার আগে আক্ষেপ করে লিখেছেন যে “বামাতি” শব্দটি ব্যবহার করার পর থেকে অনেকেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছেন আসলে কারা বামাতি, তাই তিনি এক রকম বাধ্য হয়েই নাম উল্লেখ করে দিচ্ছেন কারা কারা বামাতি। তিনি তাঁর ব্লগটিতে “বামাতি” হিসাবে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁরা হচ্ছেন – বদরউদ্দিন উমর, লেখক জাকির তালুকদার, ফরহাদ মজহার, জোনায়েদ সাকী, ফারুক ওয়াসিফ ও সলিমুল্লাহ খান। স্বভাবতই বোঝা যাচ্ছে বড় বিচিত্র মানুষেরা এই “বামাতি” প্রজাতির মধ্যে পড়ে গেছেন। (লিংক এখানে  )

আরো অসংখ্য লেখক স্বনামে ও ছদ্মনামে নিজেদের লেখালেখিতে হরহামেশাই “বামাতি” শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং শব্দটির ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। শব্দটির ব্যবহার এতো বিস্তৃত হয়েছে যে, সুন্দরবনের নিকটে বিদ্যুতকেন্দ্র করার বিরোধিতা যারা করেছেন তাঁদেরকে বলা হচ্ছে “বামাতি”। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের হাসপাতালের শয্যাশায়ী ছবি দিয়ে তাঁকে বলা হচ্ছে ‘বামাতি”। সাংবাদিক গোলাম মোরতজাকে বলা হচ্ছে “বামাতি”। নিউ এজ পত্রিকার সাংবাদিক নূরুল কবীর কে বলা হচ্ছে “বামাতি”। মোটা দাগে, “বামাতি” শব্দটির ব্যবহার সত্যিই দারুন বিস্তৃত এখন। প্যালেস্টাইনে ইসরায়েলী দখলদারিত্বের সমালোচনা করলে তিনি “বামাতি”। প্যালেস্টাইনের জনগনের স্বাধীনতার সংগ্রামের সমর্থন করলে “বামাতি”। আফগানিস্তান কিম্বা পাকিস্তানে ড্রোন হামলা করে সাধারণ মানুষ, শিশু ও নারী হত্যার সমালোচনা করলে তিনি “বামাতি”। মার্কিন বিদেশনীতির সমালোচকদের বলা হচ্ছে “বামাতি”। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নেতৃত্বে ভয়ংকর ধ্বংসলীলার সমালচকদের বলা হচ্ছে “বামাতি”। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে আশ্রয় দেয়া ও তাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে মিয়ানমার সরকারের উপরে চাপ তৈরীর কথা বলাও “বামাতি” হবার কারণ হতে পারে।   এমন কি প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রসঙ্গে আওয়ামীলীগের সমালোচনা করাটাও “বামাতি” হবার লক্ষণ। 

বাংলা ভাষাভাষী নয়া-নাস্তিক্যবাদী আন্দোলনেও এই শব্দটি বেশ পরিচিত, ব্যবহৃত।বাংলা অনলাইন ও ব্লগ চত্বরে যে সকল নাস্তিক যারা বামপন্থী আন্দোলনের সাথে যুক্ত অথবা এক সময় যুক্ত ছিলেন, এদের মাঝে যারা এই সময়ের নয়া-নাস্তিক্যবাদী (নিও এথিস্ট ধারা) ধারার সাথে যুক্ত নন, তাঁদেরকেও মাঝে মাঝেই “বামাতি” অভিধা পেতে হয়।   

এবং বলাই বাহুল্য, আমার মতো একজন নগন্য ব্লগারকেও আমাদের নয়া-নাস্তিক্যবাদী (নিও-এথিস্ট) বন্ধুরা বলছেন “সুইডেন প্রবাসী বামাতি”।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সত্যিই কি এই শব্দটির এতগুলো অর্থ বাস্তব? নাকি এই শব্দটি কেবলই নিজের বিরুদ্ধ মতের মানুষদেরকে “দানবীকরনের” উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে? যেভাবে আওয়ামীলীগের অনলাইন ষণ্ডাদল দেশের স্বীকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষদের “বুদ্ধিবেশ্যা” নাম দিয়েছে কেবল আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করার জন্যে, বিষয়টি কি একই রকমের?

একটি বিষয় পরিস্কার, তাহলো, এই “বামাতি” শব্দটির উৎপত্তিগত উৎস হচ্ছে বামাতি = বাম+জামাতি। অর্থাৎ যারা বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী কিন্তু জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের মতো করে কথা বলেন, লেখালেখি করেন কিম্বা তাদেরই পারপাস সারভ করেন। আমরা এই পুরো বিষয়টিকে ইতিহাস ও বর্তমানের রাজনীতি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করবো। আসুন তাহলে মূল প্রসঙ্গে ঢুকিঃ   

২.  

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে বামপন্থীদের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলন বা জনপ্রিয় অর্থে “স্বদেশী” আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কিম্বা পরবর্তী প্রতিটি গণ আন্দোলনে, প্রগতিশীল আন্দোলনে বামপন্থীদের সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস প্রমানিত। অখন্ড ভারতের উপনিবেশিক শাসনের শেষ পঞ্চাশ বছরের ব্রিটিশ বিরোধী গণসংগ্রামের বেশীরভাগ বিপ্লবী কোনও না কোনও ভাবে বামপন্থী রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যদিও তাঁদের বামপন্থার সাথে কখনও কখনও তীব্র ভারতীয় জাতীয়তাবাদ মেশানো থাকতো কেননা উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার একটা কৌশল হিসাবে জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তিটা সবসময়ের মতোই গুরুত্ববহ ছিলো। নানান কাঠামোতে বিপ্লবী ব্রিটিশ বিরোধী ভূমিকা রাখার পর অবশেষে ১৯২০ সালে গঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। গঠনের পর থেকে একদিকে যেমন ব্রিটীশ বিরোধী সংগ্রামে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কমরেডগণ তেমনি ভারতের রাজনীতিতে গনমুক্তির আন্দোলন কে “ভুখা” মানুষদের মুক্তির সংগ্রামে পরিনত করার সংগ্রামটিও জারি রাখেন। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী ভগত সিং দেশের তরুন সমাজের প্রতি একটি দীর্ঘ চিঠিতে লিখেছিলেন ভারতের মুক্তির জন্যে সমাজতন্ত্র তথা কমিউনিজমের ভুমিকার কথা। পরের ইতিহাস আমরা জানি, ভারতবর্ষের সাধারণ গরীব মানুষের মুক্তির সংগ্রামে ভারতের বামপন্থীদের ভুমিকার কথা। ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রবল হিন্দুত্ববাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ভূমিকা, তারও একমাত্র প্রতিপক্ষ ও সমালোচক হচ্ছেন ভারতের বামপন্থীরা। সারা ভারত জুড়ে, বামপন্থীদের শক্তির ক্ষয় হয়েছে, বামপন্থীরা দুর্বল হয়ে পড়েছেন, জেগে উঠেছে প্রবল হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তি, কিন্তু তার পরেও এই প্রবল হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ভারতের সমাজে সমতা ও অধিকার কথা বলে চলেছেন বামপন্থীরাই। ভারত ভাগের পর, পাকিস্তান সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ভাষার আন্দোলনে বামপন্থিরাই মূল সংগঠক হিসাবে ভূমিকা রাখেন। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বামপন্থীরাই সেকুলার ও অসাম্প্রদায়িক সংগ্রামের প্রধান ধারক। অসাম্প্রদায়িক ও সেকুলার রাজনীতির প্রায় প্রতিটি প্রধান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে এদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকান্ডের পরে বাংলাদেশের সামরিক সরকার গুলো যখন মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার অন্যতম অসাম্প্রদায়িকতা ও সেকুলার বাংলাদেশের আকাংখাকে দলিত করে রাজনীতিতে ক্রমশই ধর্মের প্রবর্তন করছিলেন, মূলত রাজনীতিতে ইসলামিকরণ করছিলেন, তখন বামপন্থীরাই প্রথম দাবী তোলেন, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার। যেকোনো রাজনৈতিক কর্মী কিম্বা রাজনৈতিক মনস্ক মানুষ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবী সংক্রান্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখবেন, বামপন্থীরা এবং কেবলমাত্র বামপন্থীরাই এই দাবী নিয়ে প্রচার, প্রকাশনা, আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত কোনও শাসক দলকে দেখা যায়নি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন হিসাবে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা নিয়ে কোনও বক্তব্য, আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তথাকথিত ধারক  হিসাবে দাবীদার আওয়ামীলীগ কখনই এই দাবী নিয়ে রাজপথের সংগ্রামে শামিল হয়নি। বরং বিগত দুই দশকে আওয়ামীলীগের হাতেই ঘটেছে রাজনীতির চরম ইসলামীকরণ।

বাংলাদেশের অনলাইন লেখালেখিতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কমিউনিটি ব্লগ ও ব্যক্তিগত ব্লগ-সাইটগুলোতে এমন কি মূলধারার অনলাইন পোর্টাল গুলোতে “বামাতি” শব্দটার প্রচলন দেখা যায় প্রধানত দুই ধরণের “লেখক” বা এক্টিভিস্টদের মাঝে। এদের একটা অংশ নয়া-নাস্তিক্যবাদী প্রচারনাবাদী একটিভিস্ট আর অন্যদলটি ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের সমর্থক, নেতাকর্মী বা সুবিধাভোগী। আসুন আমরা প্রথমেই এই “বামাতি” শব্দটির সাথে যুক্ত তিনটি রাজনৈতিক আদর্শ – আওয়ামীলীগ, জামায়াত এ ইসলামী এবং বামপন্থী একটি দলের রাজনৈতিক টেক্সট থেকে বিষয়টা খানিকটা বোঝার চেষ্টা করি প্রথমে। 

৩.

আওয়ামীলীগের গঠনতন্ত্র একটি প্রতারণামূলক গঠনতন্ত্র, কেননা এই দলটির রাজনীতিতে তাঁদের গঠনতন্ত্রের কোনও ভূমিকা নেই। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে জামাতে ইসলামী একটি ইসলামিক দল, এঁদের রাজনীতি আওয়ামীলীগের রাজনীতির মতো প্রতারণা নির্ভর নয়। অর্থাৎ এরা তাঁদের মৌলিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যা তাদের গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে তার সপক্ষেই রাজনীতি করে থাকে। জামাতে ইসলামের রাজনীতিতে খুব সুস্পষ্ট ভাবে লেখা আছে তারা বাংলাদেশে কি ধরণের সমাজ চায় এবং কি ধরণের আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে সেই সংগ্রামকে তারা হাসিল করতে চায়। জামাতের রাজনীতি এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচী যারা জানেন, তারা স্বীকার করবেন জামাতের গঠনতন্ত্র আর তাদের কর্মসূচীর মাঝে খুব বিশাল কোনও ফারাক নেই। কিন্তু আওয়ামীলীগের সংবিধানে যা লেখা আছে, যেকোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের কাছেই সেটা এক ধরণের কৌতুক বলে মনে হবে। অর্থাৎ এই দলটির মূলনীতি আর তাদের রাজনীতির মাঝে রয়েছে আকাশ পাতাল ফারাক। যেমন ধরা যাক, আওয়ামীলীগের গঠনতন্ত্রে সংগঠনটির মূলনীতি অংশের প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে এভাবেঃ

 

(ক) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংহত করা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখ-তা সমুন্নত রাখা। (আওয়ামীলীগের ওয়েবসাইটে “অখ-তা” শব্দটি সম্ভবত “অখন্ডতা” বোঝানো হয়েছে।)

(খ) প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা।

(গ) রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা।

(ঘ) মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়িয়া তোলা।

 

প্রস্তাবনার পরে, আওয়ামীলীগ সংগঠনের মূলনীতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবেঃ

“বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হইবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি”।

যেকোনো সৎ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন নাগরিক, যারা আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে গত চার দশক ধরে পরিচিত তারা জানেন, গনতন্ত্র শব্দটি কতটা অর্থহীন আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে। “প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগন” এটা কি ধরণের একটি প্রতারণাময় বাক্য বাংলাদেশের বাস্তবতায়। সত্যনিষ্ঠ মানুষেরা জানেন বাংলাদেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার “রক্ষায়” আওয়ামীলীগের ভুমিকার কথা। তারা জানবেন ধর্ম নিরপেক্ষতা আর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি কতটা অর্থহীন আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক চর্চার সাথে। আর সমাজতন্ত্রের বিষয়টি তো আপাদ মস্তক প্রতারণা। সবচাইতে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে প্রতি সম্মেলনেই আওয়ামীলীগের গঠনতন্ত্রে নানান ধরণের পরিবর্তন আনা হয়েছে, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তন গুলো করা হয়েছে কমিটির সংখ্যা বাড়ানোর জন্যে নয়তো নতুন পদ সংযুক্ত করার জন্যে, কিন্তু আওয়ামীলীগ কখনই তাদের সংবিধানের এই ফাঁপা অর্থহীন শব্দগুলো পরিবর্তন করেনি। এই দলটির প্রধান নেতা অবিরাম ভাবে বলে চলেছেন মদীনা সনদের আলোকে রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতির কথা কিন্তু সেটা এরা তাদের গঠনতন্ত্রে ঘোষণা করতে অপারগ। এবার আসুন জামাতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে এই সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য হিসাবে কি লেখা আছে। জামাতে ইসলামীর গঠন্তন্ত্রের প্রথম প্যারাগ্রাফ টি এই রকমেরঃ

 

“যেহেতু আল্লাহ্‌ ব্যতীত নিখিল সৃষ্টির কোন ইলাহ নাই এবং নিখিল বিশ্বের সর্বত্র আল্লাহ্‌র প্রবর্তিত প্রাকৃতিক আইনসমূহ একমাত্র তাঁহারই বিচক্ষণতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্বের সাক্ষ্য দান করিতেছে; যেহেতু আল্লাহ্‌ মানুষকে খিলাফতের দায়িত্ব সহকারে পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন এবং মানব রচিত মতবাদের অনুসরণ ও প্রবর্তন না করিয়া একমাত্র আল্লাহ্‌ প্রদত্ত জীবন বিধানের অনুসরণ ও প্রবর্তন করাকেই মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন; যেহেতু আল্লাহ্‌ তাঁহার প্রদত্ত জীবন বিধানকে বাস্তব রূপদানের নির্ভুল পদ্ধতি শিক্ষাদান ও উহাকে বিজয়ী আদর্শ রূপে প্রতিষ্ঠিত করিবার উদ্দেশ্যে যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছেন; যেহেতু বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্‌র সর্বশেষ নবী ও রাসূল এবং আল্লাহ্‌ প্রেরিত আল-কুরআন ও বিশ্বনবীর সুন্নাহই হইতেছে বিশ্ব মানবতার জীবনযাত্রার একমাত্র সঠিক পথ সিরাতুল মুস্তাকীম; যেহেতু ইহকালই মানব জীবনের শেষ নয় বরং মৃত্যুর পরও রহিয়াছে মানুষের জন্য এক অনন্ত জীবন যেখানে মানুষকে তাহার পার্থিব জীবনের ভাল ও মন্দ কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হইবে এবং সঠিক বিচারের পর জান্নাত বা জাহান্নাম রূপে ইহার যথাযথ ফলাফল ভোগ করিতে হইবে; যেহেতু আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন করিয়া জাহান্নামের আযাব হইতে নাজাত এবং জান্নাতের অনন্ত সুখ ও অনাবিল শান্তি লাভের মধ্যেই মানব জীবনের প্রকৃত সাফল্য নিহিত; যেহেতু আল্লাহ্‌র বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি দিক ও বিভাগে প্রতিষ্ঠিত করিয়াই মানুষ পার্থিব কল্যাণ ও আখিরাতের সাফল্য অর্জন করিতে পারে; যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ এবং বাংলাদেশের জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়া বাংলাদেশ বিশ্বেও মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করিয়াছে; সেহেতু এই মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে ইসলামী সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হইল”।

 

এর পরে জামাতে ইসলামী তাদের সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ও নীতি উল্লেখ করেছে এভাবেঃ

“বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা”।

জামাতে ইসলামীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সমাজের মূল ইসলামীকরণ ঘটেছে। একথা আমরা সবাই জানি। সেখানে অন্য দুই বড় দলের সমান ভূমিকা ছিলো এই ইসলামিকরনের প্রক্রিয়ায়, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে ইসলামের রাজনীতিকে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করেছে জামাতে ইসলামী।

কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন পাঠকেরা প্রশ্ন করুন নিজেদেরকে এই দুই দলের মূলনীতি বলে যা লেখা আছে তাদের সংবিধানে তার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? পার্থক্য হচ্ছে জামাতে ইসলামী যা লিখেছে তাদের রাজনীতিতে তার পূর্ণ প্রতিফলন রয়েছে, প্রতিফলন রয়েছে তাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মসূচীতে। আর আওয়ামীলীগ যা লিখেছে তাদের রাজনীতি হচ্ছে ঠিক তার উল্টোটা। আওয়ামীলীগ একটি চরম অগনতান্ত্রিক, ফ্যাসীবাদী দল, কিন্তু তাদের গঠনতন্ত্র বলছে গনতন্ত্রের লড়াইয়ের কথা। আওয়ামীলীগ একটি চরম সাম্প্রদায়িক দল, সারা দেশের সকল সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামাগুলোতে যে দলটির নেতৃত্ব পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, যে দলটির নেতারা গত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশের হিন্দু পরিবারগুলোর পৈত্রিক ভিটেবাড়ী দখল করেছে পদ্ধতিগত ভাবে এবং হিন্দু জনগোষ্ঠীকে বাধ্য করেছে পাশের দেশে অভিবাসনের মতো অপ্রীতিকর জীবন বেছে নিতে। আওয়ামীলীগ একটি দল যাদের শীর্ষ নেতা দাবী করেন ও ঘোষণা করেন যে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে “মদীনা সনদের আলোকে” সেই দলটি তাদের মূলনীতিতে বলছে ধর্ম নিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা আর বাঙালী জাতীয়তাবাদের কথা। মদীনা সনদের চেতনা কি বাঙালী জাতীয়তাবাদ এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ?

যদিও বাঙালী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত’র চেতনাগত অবস্থানে আওয়ামীলীগের এই প্রতারণাপূর্ণ রাজনৈতিক বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করাটা প্রায় অসম্ভব। এটা আওয়ামীলীগের একটা রাজনৈতিক সাফল্য, তারা বাঙালী মধ্যবিত্ত’র মস্তিষ্কে এই রকমের স্থায়ী ক্লীবত্ব তৈরী করতে পেরেছে।

আওয়ামীলীগ ও জামাতে ইসলামীর পরে আসেন একটি বামপন্থী দলের গঠনতন্ত্র থেকে তাদের মূলনীতিটা দেখে নেয়া যাক। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) তাদের মূলনীতি হিসাবে উল্লেখ করেছে –

 

“বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এ দেশের শ্রমিক শ্রেণী ও শ্রমজীবী জনগণের বিপ্লবী রাজনৈতিক দল। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এই পার্টির লক্ষ্য”।

 

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সিপিবি’র ঘোষিত আদর্শিক ভিত্তি হচ্ছে মার্কসবাদ – লেনিনবাদ। সিপিবি’র গঠনতন্ত্রে তারা উল্লেখ করেছে এভাবেঃ

“বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা তার সকল কর্মকান্ড পরিচালনায় ও নীতিসমূহ রচনায় সচেষ্ট থাকবে। সে ক্ষেত্রে পার্টি মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিনের চিন্তার বৈজ্ঞানিক মর্মবাণী ও বিষয়বস্তুকে অনুসরণ ও বিকশিত করে অগ্রসর হওয়ার ধারাকে পার্টির মতাদর্শগত ভিত্তি রূপে বিবেচনা করবে। মতাদর্শের ক্ষেত্রে পার্টি সঠিক মার্কসীয় চিন্তা অনুসরণে যে কোনো প্রকার মতান্ধতা, গোঁড়ামি, শাস্ত্রবদ্ধ চিন্তার প্রবণতা প্রভৃতি হতে মুক্ত থাকবে এবং তত্ত্ব ও প্রয়োগের আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে মার্কসীয় সূত্র অনুসারে তত্ত্ব ও প্রয়োগকে সকল সময় সৃজনশীলভাবে অগ্রসর ও বিকশিত করতে সচেষ্ট থাকবে”।

৪.

বাংলাদেশে সবচাইতে বড় ইসলামিক রাজনৈতিক সংগঠনের নাম হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ যাদেরকে সংক্ষেপে বলা হয় “জামাত”। এঁদের ছাত্র সংগঠনের নাম হচ্ছে ইসলামী ছাত্র শিবির, তাই কখনও কখনও এদেরকে সংক্ষেপে বলা হয়ে থাকে “জামাত-শিবির”। জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিলো এবং এই দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথে সহায়তা করেছিলো বাংলাদেশের গনহত্যার ঘটনায়। এই দলের শীর্ষনেতাদের অনেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রাক্কালে দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সাথে জড়িত ছিলো।এই সকল করমকান্ডের জন্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচাইতে কুখ্যাত দল হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী।যুদ্ধাপরাধি হিসাবে এই দলের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সকল নেতা হয় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত হয়েছেন অথবা জীবনভর কারাদন্ড ভোগ করছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর রাজনীতিতে তাই সবচাইতে কুখ্যাত ও ঘৃণিত রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে জামাত-শিবির কে মনে করা হয়। এঁদের বিরুদ্ধে একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক শ্লোগান ছিলো – “জামাত শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়”। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলায় এই যুদ্ধাপরাধীরা ছিলো অনাকাংখিত, অপ্রত্যাশিত। দেশের প্রগতিশীল রাজনীতি ও সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই দলটিকে মনে করা হয় প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এই জামাতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবীটিও বামপন্থীরা জানিয়ে আসছে বহুদিন ধরে। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার মূল কারণ হচ্ছে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, সেই অর্থে বাংলাদেশের বামপন্থীরাই হচ্ছে একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি যারা গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিশিদ্ধ ঘোষণা করার দাবী জানিয়ে আসছে।

৫.

জামাতে ইসলামীর মতো এমন একটি কুখ্যাত রাজনৈতিক শক্তির সাথে নামকরন করে বামপন্থীদেরকে যুক্ত করার কায়দাটি বাংলা ভাষায় নতুন হলেও পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন নয়। বিরুদ্ধ মতের রাজনৈতিক মতবাদকে, রাজনৈতিক মানুষকে “দানবীকরনের” সংস্কৃতি বিশ্বব্যাপী। কিন্তু, বাংলাদেশে বামপন্থীদেরকে জামায়াতে ইসলামীর সাথে তুলনীয় করার কারণ কি হতে পারে? ভাষার দাবীতে যে সংগ্রাম, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলনের যে সংগ্রাম সহ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও রাজনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক করার দাবীতে সবচাইতে অগ্রগন্য রাজনৈতিক মানুষেরা হচ্ছেন এদেশের বামপন্থীরা। ইতিহাসে অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, নারীর প্রতি ধর্মীয় অনুশাসনের নামে নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রতিবাদী রাজনৈতিক ভুমিকায় থাকা একটা রাজনৈতিক শক্তিকে বা সেই শক্তির অংশীদার মানুষগুলোকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে ঘৃণিত রাজনৈতিক শক্তি “জামাত” এর সাথে যুক্ত করার কি কারণ থাকতে পারে? বামপন্থীরা কি আসলে জামাতের রাজনৈতিক আদর্শকে সমর্থন করেন? বামপন্থীরা কি জামাতের সাথে প্রকাশ্যে বা গোপনে রাজনৈতিক আঁতাত করেন? এদেশে কি জামাত কখনই বামপন্থীদের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা করেছে? কিম্বা উল্টোটা, অর্থাৎ বামপন্থীরা কি কখনও জামাতের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা করেছেন? যুগপৎ  আন্দোলন করেছে? তাহলে ঠিক কি অর্থে বামপন্থীদেরকে জামাতের সমান্তরালে বিবেচনা করা যেতে পারে? সেই সূত্রে যে সকল বামপন্থীকে মনে করা হয় “ইসলাম সহানুভূতিশীল” তাঁদের নামকরণ করা হয়েছে “বামাতি”। বামপন্থিরা আসলে ঠিক কি অর্থে “ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল”?  এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্যেই এই লেখাটির আয়োজন। “বামাতি” শব্দটির শুলুক সন্ধানই হয়তো আমাকে কিম্বা পাঠকদের অনেককেই আমাদের সমসাময়িক সময়ে বাঙালীর অন্তত একাংশের বুদ্ধিবৃত্তির নতুন কোনও বিন্যাস উপস্থাপন করবে। এই লেখাটির একমাত্র উদ্দেশ্য সেটাই। এই “বামাতি” নামকরনের পেছনে একটি রাজনীতি আছে এবং এর একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসও আছে। সেই রাজনীতিটাকে উল্লেখ করার জন্যেই এই লেখা। আগামী পর্বে থাকবে দুজন আন্তর্জাতিক “বামাতি”কে নিয়ে আলোচনা। 

 

(চলবে)

সূত্রঃ

আওয়ামীলীগ, জামাতে ইসলামী ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির গঠনতন্ত্র এই তিনটি দলের ওয়েবসাইট থেকে নেয়া হয়েছে।

 

Spread the love