এই সিরিজটি শেষ করবো এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস নিয়ে আরেকটি দরকারী সিরিজ শুরু করবো। সুতরাং এটাই এই শিরোনামের শেষ পর্ব।তাই সরাসরি শেষ প্রসঙ্গতে চলে যাই। পিনাকী ভট্টাচার্য, সৈয়দ মবনু এবং তাঁদের সমর্থকদের কওমি মাদ্রাসাপ্রেমের স্বপক্ষে আরও দুটি জোরালো যুক্তি হচ্ছেঃ


– ভারতের অনেক মাদ্রাসায় হিন্দু ছাত্র পড়তে পারে এবং এই সকল মাদ্রাসায় মুসলমান ছাত্রদের চাইতে হিন্দু ছাত্রদের সংখ্যাই বেশী। (সৈয়দ মবনু’র ব্লগ)

– ইউরোপ সহ পৃথিবীর সকল দেশেই ধর্মীয় শিক্ষা আছে, তাহলে বাংলাদেশে থাকলে কি সমস্যা? নরওয়ে তে খ্রিসচিয়ান স্কুল আছে। (পিনাকী ভট্টাচার্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম)

দুইটি যুক্তিই দাঁড়িয়ে আছে বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপরে ভিত্তি করে। পিনাকী বা মবনুরা জানেন যে আজকাল এসব তথ্য আর কেউ পরীক্ষা করে দেখেন না, তাই মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও কোনও ক্ষতি নেই। বরং লাভ আছে, তাতখনিক লাভ হচ্ছে জনপ্রিয়তা। যেহেতু আমরা পরীক্ষা করিনা, তাই, ভারতের মাদ্রাসায় হিন্দু ছাত্রদের পড়াশুনা বিষয়ে আল-জাজিরা, ডয়েসে-ভ্যালে, রেডিফ বা দৈনিক হিন্দু পত্রিকার শিরোনাম দেখেই আমরা বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা নিয়ে আমাদের স্বস্তির সিদ্ধান্ত গ্রহন করি। দুর্ভাগ্য হচ্ছে আমরা সেই সকল খবরের ভেতরের অংশটুকু পড়ে দেখিনা, যদি পড়তাম তাহলে এই সকল পন্ডিত মানুষদের অসততা গুলো খুব সহজেই বোঝা যেতো। সৈয়দ মবনু তাঁর ব্লগে লিখেছেন যে, ভারতের মাদ্রাসা গুলোতে মুসলমান ছাত্রদের চাইতে হিন্দু ছাত্র – ছাত্রীরাই বেশী। প্রথমত কথাটি সত্যি নয়, ভারতের বদলে বলা উচিৎ পশ্চিমবঙ্গের একটি মাদ্রাসায় মুসলিম ছাত্রদের চাইতে অমুস্লিম ছাত্র-ছাত্রী বেশী। কিন্তু সার্বিক ভাবে, পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসাগুলোতে শতকরা ৩০ ভাগ ছাত্র অমুসলিম। কিন্তু জনাব মবনু লেখেননি, কোন সে মাদ্রাসা, সেই সকল মাদ্রাসা কি কওমি মাদ্রাসা? সেখানে হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীরা কি কি বিষয় পড়াশুনা করেন? কুরআন – হাদিস – সুন্নাহ নাকি পদার্থবিজ্ঞান – রসায়ন বা বায়োলজি? কিছুই লেখেন নি। আসল সত্যি কথাটি হচ্ছে – ভারতের যে সকল মাদ্রাসা গুলোতে হিন্দু বা ভিন্ন ধর্মের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়তে যাচ্ছে, সেই সকল মাদ্রাসার কোনটিই কওমি মাদ্রাসা নয়, অন্তত প্রকাশিত সংবাদগুলো বলছেনা যে সেই মাদ্রাসাগুলো কওমি মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসাগুলো মুলত পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা বোর্ড এর অধীনে নিবন্ধিত হাই মাদ্রাসা ও সিনিয়র মাদ্রাসা সমূহ, যেখানে হিন্দু ধর্মের সহ অন্যান্য সকল ধর্মের ছাত্র-ছাত্রীরা “নন-মুসলিম” ক্যাটেগরীতে পড়তে পারেন। এবং এই সকল মাদ্রাসায় “নন-মুসলিম” হিসাবে শুধুমাত্র দুইটি বিষয় আবশ্যিক হিসাবে পড়তে হয়, এক – আরবী ভাষা এবং দুই – ইসলাম শিক্ষা। ইসলাম শিক্ষা হচ্ছে ইসলাম বিষয়ে একটি সাধারণ শিক্ষা ভিত্তিক বিষয়। নন-মুস্লিম ছাত্র ছাত্রীরা বাকী আটশো বা এক হাজার নাম্বার এর বিষয় গুলো পড়তে পারেন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, বায়োলজি, ভুগোল, গনিত, ইংরাজী, কম্পিউটার বিজ্ঞান ইত্যাদি সকল কিছু। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা বোর্ড এর অধীনে নিবন্ধিত মাদ্রাসা গুলোর সাথে ভারতের প্রথাগত মূলধারার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল গুলোর পাঠ্যক্রমের কোনও পার্থক্য নেই। ভারতের নিবন্ধিত মাদ্রাসাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত তিনটি বড়ো সংস্কার বা রিফরম কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে এর পাঠ্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার মুলনীতির ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছে। যার ফলাফল হচ্ছে আজকের ভারতীয় মূলধারার মাদ্রাসা গুলো অংশগ্রহন মূলক হয়ে উঠছে, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের শিক্ষার অধিকার কে বিভক্ত করছে না। ভারতের কওমি বা খারিজি মাদ্রাসা গুলো কিন্তু হাটছে ঠিক এর উল্টো পথে। জোর দাবী থাকা সত্ত্বেও ভারতের কওমি মাদ্রাসা গুলোতে এই ধরনের সংস্কার কর্মসূচীর কোনও ধরনের লক্ষন নেই।

বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি যদি পড়ে দেখা যায়, তাহলে বোঝা যাবে, মাওলানা আহমেদ শফির নেতৃত্বে কওমি মাদ্রাসা বোর্ড কি ভীষণ ভাবে সংস্কার বিরোধী। এই ইসলামী নেতৃবৃন্দ সকল ধরনের আধুনিক সমকালীন বিশয়ের অন্তর্ভুক্তির তীব্র বিরোধী। ভিন্ন ধর্মের ছাত্র-ছাত্রীর অংশগ্রহন তো দুরের কথা।

সৈয়দ মবনু বা পিনাকী ভট্টাচার্যর মতো পন্ডিত মানুষেরা কি তথ্য সহ ব্যাক্ষা করতে পারবেন, দেখাতে পারবেন যে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষানীতিতে কোনও “নন-মুসলিম” ক্যাটেগরী আছে কিনা? কিম্বা “নন-মুসলিম” ছাত্র ছাত্রীরা কি তাঁদের মতো করে জাগতিক বিষয়সমুহ (পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, বায়লজি,কম্পিউটার বিজ্ঞান, গনিত, জ্যামিতি ইত্যাদি) পড়তে পারে? পিনাকী – মবনু’রা কখনই এই বিষয়ে পরিস্কার করে কিছু লিখবেন না, কারন তাতে তাঁদের সস্তা জনপ্রিয়তায় খানিকটা ভাটা পড়তে পারে, এটা অস্বস্তিকর, তাঁদের জন্যে।

নরওয়ের তিনটি ক্রিশ্চিয়ান স্কুল এবং আমাদের কওমি মাদ্রাসা প্রসঙ্গ !

কওমি মাদ্রাসা কে জায়েজ করবার জন্যে পিনাকী ভট্টাচার্য হাজির করেছিলেন এই তত্ত্ব ও তথ্য। তিনি বলেছিলেন, সারা দুনিয়াতেই ধর্মীয় শিক্ষার নজির আছে তাহলে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা কি দোষ করলো? আলোচনার সুত্রপাত হয় মাদ্রাসা শিক্ষা বিষয়ক ডঃ মঞ্জুর এ খোদা টরিক এর একটি ব্লগ থেকে। সেখানে তিনি ও তাঁর সমর্থকেরা প্রশ্ন তোলেন “পৃথিবীর সব দেশেই ধর্মীয় স্কুল আছে, বাংলাদেশে থাকলে সমস্যা কি?”। অর্থাৎ পৃথিবীর সব দেশেই ধর্মীয় স্কুল আছে, বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা থাকলে সমস্যা কি? মাদ্রাসা বা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠান হিসাবে থাকাকে কেউ কোনদিন আপত্তি করেছে বলে আমার জানা নেই। মূল আপত্তির জায়গাটি হচ্ছে মাদ্রাসাতে কি পড়ানো হবে তা নিয়ে। মাদ্রাসার ছেলেমেয়েরা যেন পার্থিব – কর্মমুখী শিক্ষা পায়, যা দিয়ে তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে মূলধারার শ্রম বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে সেইটাই মূল কথা।

এই প্রসঙ্গের প্রেক্ষিতে আমি ব্যক্তিগতভাবে জনাব পিনাকী ভট্টাচার্য কে প্রশ্ন করি স্ক্যান্ডিনেভিয়াতে ধর্মীয় স্কুল আছে কিনা? তার উত্তরে তিনি বলেন, তিনি নরওয়েতে তিনটি খ্রিসচিয়ান স্কুল খুঁজে পেয়েছেন এবং নরওয়ের এই কথিত খ্রিসচিয়ান স্কুলের উল্লেখ করে জায়েজ করতে চেয়েছেন আমাদের দেশের কওমি মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে, তা ঠিক, নরওয়েতে যদি খ্রিস্টান স্কুল থাকতে পারে তাহলে আমাদের দেশে কওমি মাদ্রাসা থাকলে কি সমস্যা? প্রশ্নটি যৌক্তিক কিন্তু অসৎ ও বিভ্রান্তিকর। কেনও তা লিখছি নিচে –

আমি বিস্তারিত জানার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি বলেন “গুগোল করলেই পাবেন”। “গুগোল করলেই পাবেন” এটাকে তিনি মনে করেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো। তিনি অবশ্য কোথাও বলেননি স্কুল গুলোর নাম কি? ঠিকানা কোথায়? সেখানে কারা পড়তে যায়? সেখানে কি কি বিষয় পড়ানো হয়? সেই স্কুলগুলো কি নরওয়ের প্রতিনিধিত্তশীল স্কুল কিনা? সেখানে নরওয়ের মোট ছাত্র- ছাত্রীদের কতো অংশও পড়াশুনা করে? ইত্যাদি ইত্যাদি! ফেসবুকের “লাইক” নিশ্চিত করার জন্যে এতো গভীরে যাবার কোনও দরকার নেই, তাই তিনি এসবের প্রয়োজন বোধ করেননি। আমার ফেসবুকের লাইক পাবার ব্যাপারে আগ্রহ প্রায় শূন্যের কোঠায়, তাই আমি শুধু গুগোল-উইকিপেডিয়ার দেয়া তিনটি নামেই আটকে থাকিনি। আমি আরেকটু সময় ব্যয় করেছি। গুগোল উইকিপেডিয়ার পরেও আরেকটু খোঁজ -খবর করে যা পেলাম তাই আজ আপনাদের জানাবো।

গুগোলে যদি ”Christian School in Norway” লিখে আপনার কম্পিউটার এর এন্টার বাটন এ চাপ দেন, তাহলে হাজারো হিটস এর মধ্যে প্রথম হিটটি আসবে একটি উইকিপেডিয়ার লিঙ্ক যেখানে ক্ষ্রিস্টান স্কুলের শ্রেণীর নিচে মোট পাচটি নাম পাবেন! মাস ছয়েক আগে যখন এই লিংক এ তিনটি স্কুলের নাম ছিলো।

যে তিনটি স্কুলকে উইকিপেডিয়া খ্রিস্টান স্কুল বলে শ্রেনীবদ্ধ করেছে তাদের ওয়েব ঠিকানা গুলো নিচে দেয়া হোল। আমার লেখাকে বিশ্বাস করার দরকার নেই।বরং সময় থাকলে পড়ুন এবং নিজেই এই স্কুলগুলোর ওয়েবসাইটগুলো পরীক্ষা করে দেখুন। আপনি গুগোল ট্রান্সলেটরের সাহায্য নিতে পারেন।

Kvitsund Gymnas ( http://kvitsund.vgs.no/ )
Kristelig Gymnasium (http://www.kg.vgs.no/videregaende-skole/ )
Grimstad Bible School ( http://bibelskolen.no/ )

এই স্কুল তিনটির প্রথম দুটির শিক্ষা ও বিষয় বস্তুতে ধর্ম বা বাইবেল বা খ্রিস্টিয়ানিটির কোনো নাম গন্ধও নেই। এই দুইটি স্কুল আরো সাধারন স্কুলের মতই নিয়মিত স্কুল।
 অন্যান্য সাধারন স্কুল যেমন “ধর্ম ও নৈতিকতা” বলে একটি বিষয় আছে এই স্কুল দুটিতেও সেই বিষয়টিই আছে। আর আছে পদার্থ বিজ্ঞান, গনিত, জীববিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস এর পাশাপাশি আছে বিদেশী ভাষা শিক্ষা (ইংরাজি, স্প্যানিশ এবং ফ্রেঞ্চ)। এই দুইটি স্কুলকে কিভাবে খ্রিস্টিয়ান স্কুল বলা যায় তা আমার ক্ষুদ্র মাথায় প্রবেশ করে না। আমার জন্যে আরো কঠিন হচ্ছে এই দুটি স্কুল কিভাবে আমাদের কওমি মাদ্রাসাকে সমর্থন করে- সেটা বোঝা। যদি প্রথম দুইটি স্কুল আমাদের কওমি মাদ্রাসার সাথে তুলনীয় হতে পারে তাহলে বলতেই হবে যে কওমি মাদ্রাসাই আসলে বাংলাদেশের সবচাইতে আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কারন এখানে উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞান, গনিত, জীববিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান এবং ফ্রেঞ্চ- স্প্যানিশ একটি বিদেশী ভাষা শেখানো হয়। আসলেই কি কওমি মাদ্রাসায় এসব বিষয় পড়ানো হয়? (যদিও আমরা জানি কওমি মাদ্রাসায় দুইটি বিদেশী ভাষা পড়ানো হয়, আরবী আর উর্দু)।

এবারে আসি তৃতীয় স্কুলটি প্রসঙ্গে (উইকিপেডিয়াতে এলফাবেটিক্যাল অর্ডারে এই স্কুলটি প্রথমে আছে। এই স্কুলটির নামের সাথে আছে “বাইবেল” শব্দটি।

বাইবেল স্কুল নরওয়ে (http://www.bibelskolen.no/)

এই স্কুলটির নামের সাথে যেহেতু বাইবেল আছে, এটাকে হয়ত খ্রিস্টান স্কুল বলা যেতে পারে। এটিকে খ্রিস্টান স্কুল বলার আগে আসুন জেনে নিই স্কুলটি সম্পর্কে। প্রথমত এটি কোনো নিয়মিত স্কুল নয়, অর্থাৎ এটি কোনো প্রাইমারী স্কুল বা হাই স্কুল বা কলেজ নয়। এই স্কুলটি কোনও ডিগ্রী দেয়না পড়াশুনা শেষে, একটি ডিপ্লোমা বা অংশগ্রহন সার্টিফিকেট পাওয়া যায় শুধুমাত্র। এটি একটি ভোকেশনাল স্কুল যেখানে ছাত্র- ছাত্রীরা এক বছরের একটি প্রোগ্রাম করতে পারে। সাধারনত মূল ধারার শিক্ষা শেষে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ছাত্র-ছাত্রীরা এই স্কুলে পড়তে পারে। এরা বছরে ৭০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে থাকে (উইকিপেডিয়া তে অবশ্য আছে ৮৫ জন) এবং সারা পৃথিবী থেকেই ছাত্র-ছাত্রীরা আসতে পারে। এটা একটি প্রাইভেট স্কুল, নরওয়ের লুথেরান চার্চ এই স্কুলের মালিক। তাই এখানে সবাইকে পয়সা দিয়ে পড়তে হবে তবে বিভিন্ন চার্চগুলো এখানে পড়তে আসার জন্যে বৃত্তি দিয়ে থাকে। যে সমস্ত ছাত্র ছাত্রী ভবিষ্যতে মিশন ধরনের চাকুরিতে আগ্রহী তারা এই ধরনের অতিরিক্ত ডিপ্লোমা নেবার জন্যে এই স্কুলে আসে। এই স্কুল থেকে পড়লেই পাদ্রী হওয়া যায় না। এবারে আসুন এই স্কুলে কি কি পড়ানো হয় দেখা যাক।

এক বছরের এই প্রোগ্রামে পাঁচটি বিষয়ের যেকোনো একটি প্রধান কোর্স হিসাবে নেয়া যেতে পারে, এই বিষয়গুলো হলো –

স্পোর্টস এন্ড রিক্রিয়েশন – এ বছর নেপালে ভ্রমনের মধ্য দিয়ে এই কোর্সটিতে অংশও নিয়েছে ছাত্র-ছাত্রীরা। নেপালে বিভিন্ন এডভেঞ্চারমূলক কাজকর্ম ছিল এই কোর্সের বিষয় বস্তু।

নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা – এই কোর্সের অংশও হিসাবে ছাত্ররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করবে এবং আগ্রহ উদ্দীপক হচ্ছে এই কোর্সের অংশ হিসাবে ছাত্ররা ক্যালিফোর্নিয়ার হলিউডও পরিদর্শন করবে।

সঙ্গীত – একটি ব্যান্ড গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত চর্চা এবং কোর্স শেষে স্কুলেরই পেশাদার স্টুডিওতে ব্যান্ড এর এ্যালবাম রেকর্ড করা। দুটি কনসার্ট এই কোর্সের অন্তর্গত, একটি সাউথ আফ্রিকাতে এবং একটি নরওয়েতে।

বিশ্ব ভ্রমন ও অভিজ্ঞতা – একাধিক মহাদেশের কয়েকটি দেশভ্রমণ ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিলে কিছু প্রজেক্ট করা। বিদেশে খ্রিস্টান মিশনগুলোর কাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করা। এই কোর্সের অধীনে ইকুয়েডর, থাইল্যান্ড, জাপান, কেন্যা, ইস্রায়েল ও প্যালেস্টাইন এই দেশগুলোর যে কোনো একটি বা একাধিক দেশে মোট ৫ মাস থাকতে হয়ে ছাত্রদের।

জনসেবা – এটা হচ্ছে সামাজিক সেবা, যার অংশ হিসাবে থাকবে লন্ডনে ৫ দিনের ইন্টারনশিপ।
এই পাঁচটি বিষয়ের যে কোনো একটির সঙ্গে বাইবেল শিক্ষার একটি কোর্স নিতে হবে। বাইবেল শিক্ষার কোর্সটিতে আছে –

বাইবেল শিক্ষা – বাইবেল এর জন্ম ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা

নৈতিকতা – বিভিন্ন ধর্ম ও নৈতিকতা বিষয়ে লেকচার

মিশন জীবন –পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মিশনে কাজ করার জন্যে যে সমস্ত প্রায়োগিক দক্ষতা দরকার সে সব বিষয়ে পাঠ।

এই স্কুলের ছাত্রদের কোর্স ও ছাত্র জীবনের কিছু ছবি আছে তাদের ওয়েবসাইটে, আগ্রহী পাঠক সেগুলো একটু দেখে নিতে পারেন আর নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন যে এই স্কুলটি কি আসলেই বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে? আমার কথা সরাসরি বিশ্বাস করার দরকার নেই, আমার লেখাটি পড়ার পর সময় করে এই তিনটি স্কুলের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্য নিয়ে ইংরাজি ভার্শনটি দেখুন এবং নিজেকে প্রশ্ন করুন আসলেই কি এই স্কুলগুলো ধর্মীয় স্কুল? আসলেই এই স্কুলগুলো আমাদের কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে তুলনীয় হবার মতো? আসলেই কি এই স্কুলগুলো খ্রিস্টান পাদ্রী তৈরি করে, যাদের চার্চ ছাড়া আর কোথাও কাজ করার সুযোগ থাকে না? করেনা।
তাহলে এই তিনটি স্কুলকে খ্রিস্টান স্কুল হিসাবে প্রচার করে যারা কওমি মাদ্রাসাকে জায়েজ করতে চান তারা কি যৌক্তিক মানুষ? তাদের কি সত্যি সত্যিই গঠনমূলক আলোচনায় বিশ্বাস করা যায়?

স্কুলে “ধর্ম শিক্ষা” নামে একটি বিষয় পড়ানো আর একটি সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা ধর্মের উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা টি যে কতটা ভিন্ন বিষয় তা পিনাকী ভট্টাচার্য বা সৈয়দ মবনুদের মতো পণ্ডিত মানুষেরা জানেন এবং বোঝেন, কিন্তু তাঁরা সেই সকল বিষয়ে সত্যনিষ্ঠ নন, কারন এই ধরনের সত্যনিষ্ঠা দেশের ডানপন্থী – মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে তাঁদের যে জনপ্রিয়তা আছে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করবে। আর কে না জানেন, সত্যনিষ্ঠার চাইতে জনপ্রিয়তা অনেক উপভোগ্য এবং কাংখিত।

পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন ধর্মীয় শিক্ষা সারা পৃথিবীতেই আছে এবং তিনি এর সাথে ইউরোপ কে যুক্ত করেন। নরওয়ের তিনটি কথিত খ্রিসচিয়ান স্কুলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার পক্ষে ওকালতি করেন, যা সত্যিই দুঃখজনক ও বিভ্রান্তিকর। আমি মনে করি, ইউরোপের সাথে আমাদের দেশ গুলোর তুলোনাটি অসম, কিন্তু তবুও বলছি, ইউরোপের কোথাও কওমি মাদ্রাসা ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে সামাজিক ও রাস্ট্রিয় স্বীকৃতি দেয়া হয়না এবং হয়নি। ইউরোপীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্ম বিষয়ে পড়া যায় কিন্তু ধর্ম ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার কোনও সুযোগ নেই। অর্থাৎ স্কুলে ধর্ম বিষয়ে পড়া যায় কিন্তু শুধুমাত্র ধর্মীয় এক্সপার্ট বা উলামা বা পাদ্রী তৈরির কোনও শিক্ষা ব্যবস্থা এখানে নেই। এখানে পাদ্রীরাও সাধারণ স্কুল থেকেই আসেন এমন কি বহু পাদ্রী আছেন যারা রীতিমত বিজ্ঞানের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চতর পড়াশুনা শেষ করে পেশা হিসাবে পাদ্রিত্ত কে বেছে নিয়েছেন। ইউরোপের ধর্মীয় শিক্ষার একটা বড়ো অংশ হচ্ছে অপশনাল এবং বিশ্বাস বিহীন (নন-কনফেশনাল)। ইউরোপে “মুসলিম স্কুল” আছে, “জিউশ স্কুল” আছে কিন্তু তাঁর কোনটিতেই সমগ্র পাঠ্যক্রম ওই বিশেষ ধর্মের উপরে ভিত্তি করে প্রণীত নয়।বরং এই স্কুল গুলোতে সকল মূলধারার বিশয়ের সাথে অতিরিক্ত বিষয় হিসাবে যেকোনো একটি ধর্ম পড়ার সুযোগ থাকে। ঠিক যেমনটি বাংলাদেশের সাধারণ স্কুল গুলোতে পড়ানো হয়। সুতরাং কওমি মাদ্রাসা কে জায়েজ করবার জন্যে ইউরোপের ধর্মীয় স্কুল বা ধর্মীয় শিক্ষাকে উল্লেখ করাটা শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, এক ধরনের ধাপ্পাবাজী। দুর্ভাগ্য পিনাকী ভট্টাচার্য বা সৈয়দ মবনুদের মতো পন্ডিত মানুষদের কাছ থেকে আমাদের এই ধরনের ধাপ্পাবাজি পেতে হয়।

উদাহরণ হিসাবে,কয়েকটি প্রাসঙ্গিক সাম্প্রতিক ডকুমেন্ট এর লিংক দিচ্ছি, ইউরোপের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ইসলামীশিক্ষার উপরে একটি রিপোরট এবং শেষ ডকুমেন্ট টি নরওয়ের শিক্ষানীতি নিয়ে। আগ্রহী পাঠক, এই ডকুমেন্ট গুলো উলটে পালটে দেখতে পারেন এবং ইউরোপ ও আমেরিকার ধর্মীয় স্কুল গুলো কিভাবে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার সাথে তুলনীয় হতে পারে সেই বিষয়টি বোঝার চেস্টা করতে পারেন। দেখতে পারেন, নরওয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় আসলেই কি কোনও খ্রিসচিয়ান স্কুলের অস্তিত্ব আছে কিনা। একজন সামান্য পাঠক হিসাবে এই ডকুমেন্ট গুলো থেকে আমি উদ্ধার করতে পেরেছি যে, ইউরোপের বিভিন্ন স্কুলে ধর্ম পড়ানো হয় আরও দশটি বিশয়ের একটি হিসাবে। আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের কোনও কিছুকে বাদ দিয়ে এখানে ধর্ম পড়ানো হয়না। আর আমাদের কওমি মাদ্রাসায় পৃথিবীর সকল জ্ঞানকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে কুরআন, হাদিস আর দেড় হাজার বছরের পুরনো ইসলামী আইন পড়ানো হয়। কওমি মাদ্রাসায় ইসলাম পড়ানো হয় এবং পৃথিবীর অন্যান্য সকল বিষয় কে পড়ানোকে প্রতিহত করা হয়। দুর্ভাগ্য যে, এই আদিম শিক্ষা ব্যবস্থাকেই পিনাকী ভট্টাচার্য – সৈয়দ মবনুরা মনে করছেন “বিপ্লবাত্মক” শিক্ষা ব্যবস্থা।

সবশেষে, আমার নিজের অবস্থান টি বলা দরকার। আমি মনে করি, শুধুমাত্র দারিদ্র্যর অজুহাতে দেশের প্রায় ৪০% শিশুকে একটি আদিম শিক্ষা ব্যবস্থায় বেঁধে রাখাটি অন্যায়। দুবেলা খাবার নিশ্চিত করার দোহাই দিয়ে ৪০% শিশুকে আধুনিক সমকালীন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করাটা একটি বিরাট নৈতিক অন্যায়। বরং একটি আপাত অন্তরবরতী দাবী হওয়া উচিৎ এই সকল শিশুকে মাদ্রাসা কাঠামোর মধ্যেই সকল জ্ঞান বিজ্ঞানের ও কারগরী বিষয় পড়বার ব্যবস্থা করতে হবে, যেনও এই শিশুদের অন্তত একটি অংশ হলেও মূলধারার শ্রমবাজারে আরও অনেক তরুন – যুবকের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। আর সেজন্যেই কওমি মাদ্রাসা সহ সকল মাদ্রাসার শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম কে আমুল সংস্কার করতে হবে, ঢেলে সাজাতে হবে যুগোপযোগী করে তোলার জন্যে।

শেষ প্রশ্ন

সকল প্রকার ধর্মীয় আলোচনায় মুসলিম বুদ্ধিজীবি ও আলেমদের একটি বড় যুক্তি হচ্ছে বিজ্ঞানের সাথে ইসলামের কোনও সঙ্ঘাত নেই, বরং মুসলিম আলোচকেরা সবসময়ই বলতে এবং লিখতে ভালোবাসেন যে পবিত্র কুরআনই সকল বিজ্ঞানের উৎস। যদি সত্যিই ইসলামের সাথে বিজ্ঞানের কোনও সঙ্ঘাত না থেকে থাকে, তাহলে কওমি মাদ্রাসায় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, চিকিতসাবিজ্ঞান, গনিত, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি পড়ানোর ক্ষেত্রে কি কোনও বাধা থাকা উচিৎ?

শেষ

পুনসচঃ

(সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিতর্ক নিয়ে এই লেখাটির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে কিছু ক্ষতিকর বিভ্রান্তির অবসান করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো খুব সহজ কিন্তু সেখানে সুস্থ বিতর্কের সুযোগ খুব কম, তাই ব্লগের আশ্রয় নেয়া। অজস্র স্ক্রিনশট দিয়ে লেখাটিকে ভারাক্রান্ত করতে চাইনি, তবে কেউ আগ্রহী হলে ব্যক্তিগত ভাবে অথবা ইস্টিশন মডারেটর এর মাধ্যমে সেসবের কিছু শেয়ার করা যেতে পারে।)

তথ্যসুত্রঃ

ভারতীয় মাদ্রাসায় অমুস্লিম ছাত্রদের অংশ গ্রহনের সংবাদ – ১ http://www.aljazeera.com/indepth/spotlight/indiaonline/2013/11/madrassas…

ভারতীয় মাদ্রাসায় অমুস্লিম ছাত্রদের অংশ গ্রহনের সংবাদ – ২ http://archive.indianexpress.com/news/bengal-madrasah-with-more-hindu-st…

ভারতীয় মাদ্রাসায় অমুস্লিম ছাত্রদের অংশ গ্রহনের সংবাদ-৩ http://www.rediff.com/news/report/why-many-hindu-students-study-in-bihar…

ভারতের মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার নিয়ে একটি বুক রিভিউ http://mrzine.monthlyreview.org/2010/sikand280310.html

পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এর ওয়েবসাইট, মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার ও কারিকুলাম বিষয়ে সংক্ষিপ্ত রিপোরট পাওয়া যাবে। www.wbbme.org

ইউরোপে ধর্মীয় শিক্ষা বিষয়ে রিপোরট – ১ http://resources.eun.org/etwinning/europa2.pdf

ড মঞ্জুরে খোদা টরিকের প্রাসঙ্গিক ব্লগ – ১ http://www.somewhereinblog.net/blog/torikbd/29946646

ড মঞ্জুরে এ খোদা টরিকের প্রাসঙ্গিক ব্লগ – ২
http://www.somewhereinblog.net/blog/torikbd/29960158

ইউরোপে ধর্মীয় শিক্ষা বিষয়ে রিপোরট – ২ http://www.nef-europe.org/wp-content/uploads/2013/03/Teaching-about-reli…

ইউরোপে ধর্মীয় শিক্ষা বিষয়ে রিপোরট – 3
http://www.zjr-online.net/v2010/zjr201007_davidsen_rez_alberts.pdf

ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে ইসলামধর্ম শিক্ষার উপরে একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট – http://www.brookings.edu/~/media/research/files/papers/2015/04/islamic-e…

নরওয়ের শিক্ষানীতি – http://www.udir.no/upload/brosjyrer/5/education_in_norway.pdf?epslanguag..

Spread the love