খানিকটা ব্যক্তিগত সাফাই !

আমি সত্যিই দুঃখিত যে এই সিরিজটির সূত্র ধরে দুইজন ব্লগার এর নাম আমাকে বার বার উল্লেখ করতে হচ্ছে। এটাকে অনেকেই ভালোভাবে নাও দেখতে পারেন, আমি চেস্টা করেছি এবং এখনও চেস্টা করছি, এই দুজন ব্লগার এর নাম বারবার লেখার ধরণটা যেন তাঁদের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার জায়গাটি নস্ট না করে। এদের একজনকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে বহু বছর ধরে জানি এবং অপরজনের কিছু লেখা সাম্প্রতিক সময়ে গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। দুজনেই পন্ডিত মানুষ, জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারায় এদের পড়াশুনার প্রমাণ আমি দেখেছি এবং পৃথিবীর বহু দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা আছে এদের। সুতরাং জ্ঞান বিজ্ঞানের আধুনিক খোজ খবর রাখার ক্ষেত্রে এই দুজনই অনেক এগিয়ে থাকা মানুষ, এ বিষয়ে অন্তত আমার ব্যক্তিগত কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আগেই লিখেছি জ্ঞানী মানুষ মাত্রই সত্যনিষ্ঠ হবেন এমনটা নাও হতে পারে। সত্যনিষ্ঠা হচ্ছে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর প্রপঞ্চ, যা খোদ নিজেকেও মুক্তি দেয়না। সত্যনিষ্ঠ থাকার অর্জনটি ভীষণ মধুর, সত্যনিষ্ঠা মানুষকে পূর্ণ করে তোলে, ভরিয়ে তোলে, সমাজ এগিয়ে যায় সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসের উপরে ভর করে। আর কে না জানে সত্য কখনো বঞ্চনা করেনা।

আমার মস্তিস্কের ভেতরের তাড়নাটি হচ্ছে সত্যিটি বলা। আমি বড়শী কে “বড়শী”ই বলতে চাই, ” এক ধরনের বাকানো লোহা” বলতে চাইনা। পিনাকী – মবনু’রা “বড়শী”কে বলছেন “এক ধরনের বাকানো লোহা”, এটা বিভ্রান্তিমুলক, চতুর। আমার দায়িত্ব এই প্রবনতাটি পাঠকের সামনে তুলে ধরা। এর অর্থ কখনই এটা নয় যে এই দুজন মানুষের প্রতি আমার কোনও রকমের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ আছে। যদি তেমনটা প্রকাশিত হয় আমার লেখার কোনও একটি অংশে, যেকোনো পাঠক দেখিয়ে দিলে, বিনা শর্তে সম্পাদনা করে দেবো।

মূল প্রসঙ্গঃ কওমি মাদ্রাসার “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকা

আসুন এই প্রশ্নের শুরুতেই দেখি নেই পিনাকী ভট্টাচার্য ও সৈয়দ মবনু সাহেব কি বলেছেন। পিনাকী ভট্টাচার্য’ র একটি প্রিয় কথন হচ্ছে –

“মাদ্রাসা শিক্ষার যে এন্টি কলোনিয়াল এলিমেন্ট আছে, তাঁকে অস্বীকার করলে ইতিহাসকেই অস্বীকার করা হয় … !”

খুব ভালো কথা। তিনি এই কথাটি বার বার লিখেছেন বিভিন্ন প্রসঙ্গে। প্রথমবার তিনি এই কথাটি লিখেছিলেন ডা মঞ্জুর এ খোদার লেখা মাদ্রাসা শিক্ষার উপরে লেখা একটি প্রবন্ধের প্রসঙ্গে। ড মনজুর এ খোদার লেখায় মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস ১৯৪৭ এর পর থেকে শুরু করায় ব্যাথিত হয়েছিলেন, যদিও ড টরিকের লেখাটি ছিলো মুলত আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রিক এবং আলিয়া মাদ্রাসা ইতিহাসে তো ইংরাজ কলোনীর সময় থেকেই। কিন্তু পিনাকী ভট্টাচার্য যেহেতু কওমি মাদ্রাসার একজন একনিষ্ঠ উকিল তাই তাঁর ইতিহাসটি শুরু হয় ১৮৬৬ সাল থেকে, যখন কওমি মাদ্রাসার যাত্রা শুরু, কেননা সেটা হলে মাদ্রাসার “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকার কথা টা ভালো করে প্রচার করা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বারংবার কওমি মাদ্রাসার এই “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকার কথা লিখেছেন। এটা তার সবচাইতে প্রিয় বিশয়ের একটি, কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে- প্রগতিশীল, সেকুলার শিক্ষা ব্যবস্থার সমর্থক কর্মীদের কেউ কি এই বিশয়ের সাথে প্রকাশ্যভাবে দ্বিমত করেছেন? মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার বা আমুল পরিবর্তন দাবীকরা মানুষদের লেখা কোনও প্রবন্ধ – দলিল আছে যেখানে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এদেশের মুসলিম ও উলামাদের ভুমিকার কথা অস্বীকার করা হয়েছে? পিনাকী বা মবনু সাহেবরা যদি তেমন কোনও সিরিয়াস লেখালেখির সন্ধান দিতে পারেন, তাহলে আমিও তাঁর যথাযথ প্রতিবাদ করবো। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দলোনে এদেশের উলামা – সুফী মুসলিম সাধকদের কারো কারো ভুমিকা আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। আমি সেই সংগ্রামের ঐতিহ্য কে আমার ঐতিহ্য বলে ধারন করি কারন সেই ঐতিহ্য আমার দাদা – পরদাদার অংশগ্রহনের সাথে সম্পর্কিত। দেওবন্দী মাদ্রাসার এই ভুমিকার সম্পর্কে আমি অবহিত, এটা ইতিহাসের অংশ, যদিও এটাই সমগ্র সত্য নয়। কিন্তু কোনও এক অদ্ভুত কারনে, বাংলাদেশের যে সমস্ত গবেষক ও শিক্ষাবিদেরা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার দাবী করেন তাঁদের কে তিনি কওমি মাদ্রাসার “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকার অবজ্ঞাকারী হিশাবে ইঙ্গিত করেন। অন্যদিকে, যে নিষ্ঠুর কথাটি তিনি চেপে যান তাহলো, ভারতবর্ষের ইতিহাসে, গোটা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাটাই যে একটি কলোনিয়াল শক্তির উৎপাদন সেই সত্যি ইতিহাসটি। এই সত্যি ইতিহাসটি চেপে যাওয়ার জন্যেই পিনাকী ভট্টাচার্যদের “মাদ্রাসার ইতিহাস” শুরু হয় ১৮৬৬ সালের পর থেকে যখন ইংরাজরা প্রতিষ্ঠা করেন “আলিয়া মাদ্রাসা” আর “ইসলামী জাতিয়তাবাদী” মুসলমানেরা প্রতিষ্ঠা করেন “দেওবন্দি মাদ্রাসা”। বাস্তব সত্যি হচ্ছে, ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষার শুরুটা আরো অনেক পেছনে, প্রায় অস্টম শতকের গোড়া থেকে। আসুন আরেকজন সত্যনিষ্ঠ মুসলিম গবেষকের লেখা থেকে পাঠ করিঃ ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক জাফরুল ইসলাম এর একটা সাম্প্রতিক লেখা থেকে অনুবাদ তুলে দিচ্ছি –

“আধুনিক লেখকদের মাঝে মাদ্রাসা আন্দোলন বা মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে লেখার সময় এটা একটা সাধারণ প্রবনতা হয়ে দাড়িয়েছে যে, মাদ্রাসা শিক্ষার শুরু হিশাবে তাঁরা ১৮৫৭ সালের ব্যর্থ বিপ্লবের ঘটনা টিকে যুক্ত করতে চান এবং সেই সাথে সেই সময়ের মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সংকট কেও এর সাথে যুক্ত করতে চান। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠার দিক থেকে এটা বলাটা বাস্তব সম্মত নয় যে ভারত বর্ষে মাদ্রাসার শুরুটা ১৮৫৭ সালের পর থেকে এবং প্রধানত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্যে এবং পশ্চিমা সামাজিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে মুসলমান সমাজকে রক্ষা করার জন্যে। অবশ্যই এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে ১৮৫৭ উত্তর সময়ে মাদ্রাসা এক ধরনের পুনরজন্ম লাভ করে, একদল উলামা নিজেদের কে সম্পূর্ণ ভাবে নিয়োজিত করেন এক নতুন ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যে এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ’র আদর্শে পুরনো মাদ্রাসা গুলোর সম্প্রসারনের কাজে” (১)।

এই নতুন ধরনের মাদ্রাসাটাই হচ্ছে আজকের কওমি মাদ্রাসার শুরু যার সাথে ১৮৬৬ পূর্ব মাদ্রাসার রয়েছে বিরাট গুনগত পার্থক্য। এবার আসুন, মাদ্রাসা শিক্ষার শুরুটা কিভাবে হয়েছিলো সেটা একটু জানার চেস্টা করি অধ্যাপক জাফরুল ইসলাম এর লেখা থেকে।

“মাদ্রাসা শিক্ষা না কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার বা প্রেক্ষিত এর উপজাত (বাই প্রোডাক্ট) না মাদ্রাসা শুধুমাত্র সরকারী বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সাহায্যের উপরে ভর করেও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটা আসলে মুসলমান সমাজের এক ধরনের অন্তর্গত ব্যবস্থা মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষা বিস্তারের জন্যে কাজ করেছে বহু বছর ধরে। ভারতের ক্ষেত্রে এটা বরং খানিকটা সারপ্রাইজিং বা অবাক করা বিষয় যে ভারতে মাদ্রাসা শিক্ষার শুরুটা হয় আরব ব্যবসায়ীদের হাতে। প্রাথমিক ভাবে “মক্তব” হিশাবে শুরু হয় মাদ্রাসার যাত্রা, দক্ষিন ভারতে, বিশেষ করে মালাবার দ্বীপে এবং সময়টি হচ্ছে সপ্তম শতাব্দীর শেষের দিকে যখন আরব ব্যবসায়ীরা তাঁদের পরিবার নিয়ে তাদেরই নতুন কলোনী “ভারত” এ বসবাস শুরু করেছে। সিন্ধু প্রদেশে আরব শাসনের সময় (৮ম – ১০ম শতক) মাদ্রাসা শিক্ষা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ধরণ লাভ করে কারণ আশে পাশের এলাকা গুলোতে অনেক মাদ্রাসা স্থাপিত হয় এবং এই অঞ্চল ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি কেন্দ্র হিশাবে গড়ে ওঠে”(১)।

পাঠক লক্ষ্য করে দেখুন ভারতবর্ষে মাদ্রাসার শুরুটা হচ্ছে সপ্তম শতকের শেষের দিকে, সিন্ধু অঞ্চল থেকে। যে অঞ্চলটি মুসলিম আক্রমণকারীদের বর্বরতার সাক্ষর হয়ে আছে ইতিহাসে, যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু আক্রমন ও দখল করে নেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধু দখল করার পরে সেখানে আসে আরব ব্যবসায়ীরা, কিছু আরব অভিবাসী এবং ধর্ম প্রচারক। স্থানীয় অধিবাসীদের একটা বড়ো অংশ মুহাম্মদ বিন কাশেমের বাহিনির হাতে নিহত হয়েছে এবং বাকীরা হয় দাস নয়ত ধরমান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছে, তাই সিন্ধু এলাকায় খুব দ্রুতই মুসলমান প্রধান কলোনীতে পরিনত হয়। যখন সিন্ধু ও এর আশেপাশের এলাকা আরব মুসলমানদের কলোনীতে পরিনত হয় তখন প্রয়োজন দেখা দেয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার, ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিশাবে মাদ্রাসা ব্যবস্থার প্রচলন। তাহলে, একথা স্পষ্ট যে, ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা আদতে একটি কলোনিয়াল শক্তি বা আরব আক্রমণকারী দের হাত ধরে এসেছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ আছে? ঠিক যেমনটা ইংরাজী শিক্ষা ব্যবস্থা এসছিলো আরেকটি কলোনিয়াল শক্তির হাত ধরে। আরবরা চেয়েছিলো ধর্মীয় সাম্রাজ্য আর ব্রিটিশ রা চেয়েছিলো অর্থনৈতিক বা বানিজ্জ সাম্রাজ্য, এছাড়া এই দুই আক্রমনকারীর মধ্যে কোনও পার্থক্য আছে? মাদ্রাসা শিক্ষার শুরুটা যে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের সাথে সাথেই শুরু হয়েছিলো একথা পাকিস্থানী গবেষক মুহাম্মদ মইজ এর লেখা “The Deoband Madrassah Movement, counter cultural trends and tendencies” শিরোনামের পুস্তকটিতেও পাওয়া যায়। মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত জয়কে কোনও কোনও ঐতিহাসিক ভারত বর্ষের সাধারণ মানুষকে কচু কাটা করার ইতিহাস হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছেন, তাই মাদ্রাসা প্রেমিকদের জন্যে মাদ্রাসার ইতিহাসটি মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত জয়ের সাথে যুক্ত করাটা খানিকটা অস্বস্তিকর। তাই পিনাকী ভট্টাচার্য পন্ডিত মানুষ হয়েও মাদ্রাসা শিক্ষার “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকা দেখেন কিন্তু এর “কলোনিয়াল” উৎস ভুমি দেখেন না। ব্রিটিশ বিরোধিতা বিশয়টা যেহেতু পাবলিক “ভালো খায়”, তাই তাঁর মাদ্রাসার ইতিহাস শুরু হয় ১৮৬৬ সালের পর থেকে, ব্রিটিশ বিরোধিতা দিয়ে। মাদ্রাসা শিক্ষার আগ্রাসী বিস্তারের কারনে ভারতবর্ষ থেকে হিন্দু সমাজের প্রথাগত যে দুই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “টোল” ও “পাঠশালা” ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যেতে বাধ্য হয়, সেই ইতিহাসটিও তার চোখ কান এড়িয়ে যায়। পিনাকী ভট্টাচার্যদের বুদ্ধিবৃত্তিতে “কলোনিয়াল” শক্তি মানেই ইংরাজ, আরবরা কলোনিয়াল নয়। যেন আরব – তুর্কী মুসলমান আক্রমণকারীদের ভারতের সাধারণ মানুষেরা দাওয়াত করে এনেছিলো ইতিহাসে। ইংরাজদের ভয়াবহ শাসন আমরা নিকট ইতিহাস বলে মনে রেখেছি কিন্তু আরব আগ্রাসনের মর্মান্তিক স্মৃতি আমাদেরকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছেন পিনাকী – মবনু দের মতো পন্ডিত বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষেরা। কিন্তু বাঙ্গালী যদি চোখ – কান বন্ধ করে থাকে, তাহলেই তো পৃথিবীটা স্থবির হয়ে যায়না, তাই পৃথিবীর ইতিহাসে লেখা আছে ভারতবর্ষে ইসলামী আগ্রাসনের কথা।

সত্য ইতিহাস হচ্ছে ভারতবর্ষের সবচাইতে বর্বর কলোনিয়াল শক্তি ছিলো নয়শ বছরের আরব বংশদ্ভুত মুসলমান শাসকেরা। পাটনা মাদ্রাসা “গ্র্যাজুয়েট” রাজা রামমোহন রায় ভারত বর্ষের নয়শ বছরের সাশন কে মনে করতেন লজ্জার, অপমানের, নিগ্রহের। এমন কি পিনাকী – মবনুদের বহুল প্রচারিত “মুক্তমনা” রাজা রামমোহন রায়, ইংরাজ শাসনকে অনেক আধুনিক, শ্রেয়তর মনে করেছিলেন ভারতবর্ষের জগদ্দল পাথর হয়ে থাকা ইসলামী শাসনের চাইতে। এই আগ্রাসী শাসকদের হাত ধরেই বিকশিত হয়েছিলো মাদ্রাসা শিক্ষা।

দেওবন্দী মাদ্রাসার ব্রিটিশ বিরোধিতার সাথে সেই সময়ের মূলধারার ব্রিটিশ বিরোধি সংগ্রামের মৌলিক ও গুনগত পার্থক্য আছেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ব্রিটিশ বিরোধিতা আর দেওবন্দী উলামাদের বিরোধিতার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও চরিত্র আলাদা। সেটা নিয়ে ভিন্ন কোনও সময় লেখা যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রিটিশ আমলে কওমি মাদ্রাসার “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকা কি আজ ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠান হিসাবে তাঁদের টিকে থাকাকে জাস্টিফাই করে?

একাধিক উদাহরণ দিচ্ছি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ তিতুমীর এর কথা আমরা জানি। ব্রিটিশ বিরোধিতার এক অনন্য আইকন হয়ে আছে তিতূমিরের বাশেরকেল্লা। তাঁর এই ব্রিটিশ বিরোধী বা “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকার কথা আমরা সবাই জানি, তো সেই “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকার জন্যে কি আমরা বাংলাদেশের সব কটি বড়ো সেনানিবাস কে ভেঙ্গে পুনরায় “বাঁশের কেল্লা” বানাবো? শিল্পী কবির সুমন তাঁর গানে আক্ষেপ করেছেন, কেনও ভারতের কোনও ব্যারিকেড এর নাম তিতুমীরের নামে নেই, আমি এখানে কবির সুমনের আধুনিকতার প্রশংসা করি। তিতুমীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যে বড়জোর তাঁর নামে কোনও ব্যারিকেড এর নামকরন হতে পারে, কিন্তু তাঁর ভুমিকাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নিশ্চয়ই ভারত বা বাংলাদেশের সেনানিবাস গুলিকে বাশেরকেল্লা বানানোটা যৌক্তিক নয়, তাই না? ঐতিহাসিক ভুমিকা ও ঐতিহ্য কে স্বীকার ও শ্রদ্ধা করার সাথে আধুনিক যুগোপযোগী হয়ে ওঠার কি কোনও সংঘর্ষ আছে? আমরা যারা আজকে দেশী বিদেশী আধুনিক পোশাক পরিধান করি প্রতিদিন, তারাকি হাতে ঘোরানো তাতের কাপড়ের যে ঐতিহাসিক ভুমিকা আছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে, সেই স্বদেশী আন্দোলন কে কি আমরা অস্বীকার করি? রজনীকান্ত সেন এর সেই আইকনিক গান তো আমরা আজও গাই তাই না?

“মায়ের দেয়া মোটা কাপড়
মাথায় তুলে নে রে ভাই
দীন দুখিনী মা যে তোদের
তার বেশী আর সাধ্য নাই।।

ঐ মোটা সুতোর সঙ্গে মায়ের
অপার স্নেহ দেখতে পাই
আমরা এমনি পাষাণ,তাই ফেলে
ঐ, পরের দোরে ভিক্ষে চাই।”

আগ্রহউদ্দিপক হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারতের পোশাক শিল্প এখন নানান দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। ভারতীয় বা বাংলাদেশের পোশাক এখন পৃথিবীর বাজারের একটি বড়ো অংশ দখল করেছে, বলাই বাহুল্য, সে প্রতিযোগিতায় আমরা হাতে চালানো তাতের তৈরী মোটা কাপড় নিয়ে যাইনি। বরং আমরা সকল রকমের আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েই সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছি। আমি ধারনা করছি পিনাকী ভট্টাচার্য বা সৈয়দ মবনু সাহেবেরা হাতে ঘোরানো তাতের সুতার মোতা কাপড় পরিধান করেন না তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে। তাই কওমি মাদ্রাসার “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকা নিয়ে পৌত্তলিকদের মতো শাঁখঘন্টা বাজানোর যে মহান কাজটি করছেন তাঁরা, তা আর যাই করুক, কওমি মাদ্রাসার শিশু ও ছাত্রদের জন্যে কোনও কল্যাণ বয়ে আনবেনা। বরং কওমি মাদ্রাসার “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকা কে স্বীকার করেই, শ্রদ্ধা করেই, দাবী জানানো উচিৎ, কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের, কারিগরি শিক্ষার সুযোগ। আজকের যুগের উপযোগী শিক্ষা গ্রহনের মধ্যে দিয়েই তাঁরা সমাজের আরো সক্রিয় মানুষ হয়ে উঠতে পারেন। সমাজের জন্যে প্রয়োজনীয় মানুষ হয়ে উঠতে পারেন।

আমি এবং আমরা সকলেই চাই, কওমি মাদ্রাসার শিশুরা মূলধারার প্রতিযোগিতায় উঠে আসুক। আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্বাস করি শহরের দশজন শিশুর যে গড় মেধা আমরা দেখি, কওমি মাদ্রাসার আমি নিশ্চিত কওমি মাদ্রাসার দশজন শিশুর গড় মেধাও একই রকমের, মুশকিল হচ্ছে তাঁদের পরবর্তী ১৫ বছরে আমরা তাঁদের কে কিভাবে গড়ে তুলছি… ! আমি আমার তারুণ্যে – যৌবনে সকলের সমান শিক্ষা পাবার অধিকারের জন্যে সংগ্রাম করেছি, মাদ্রাসা বিষয়ে আমার সকল লেখা – বিতর্কের উদ্দেশ্য এখনও সেটাই। সকলের জন্যে গনমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা চাই, সকল শিশুর অধিকার আছে আধুনিক, সমকালীন শিক্ষা লাভের। কোনও অজুহাতে তাঁদের কে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা।
(চলবে)

তথ্যসূত্রঃ
1. Origins of madrasa education in India predates muslim period, Prof. Zafarul Islam, The Milli Gazette, Published Online: Dec 03, 2010, Print Issue: 1-15 November 2010, http://www.milligazette.com/news/178-origins-of-madrasah-education-in-in…

2. The Deoband Madrassah Movement, countercultural trends and tendencies, Muhammad Moj, Diversity and popularity in south Asia series, Anthem Press 2015

Spread the love