বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্লগ অঞ্চলের জনপ্রিয় লেখক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্লগার পিনাকী ভট্টাচার্য এবং মাদ্রাসা শিক্ষক সৈয়দ মবনুরা বলছেন, বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা গুলোতে হিন্দু বা বিধর্মী ছাত্রদের পড়তে কোনও বাধা নেই। কারন রাজা রামমোহন রায় পাটনা মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, সুতরাং এখনকার হিন্দু ছাত্ররাও কওমি মাদ্রাসায় পড়তে পারেন। কিন্তু হিন্দু ছাত্ররা যান না সেখানে পড়তে (১)। এই বিশয়টির উপরে আজকের আলোচনা।

কেনও চরিত্রগত দিক থেকে পাটনা মাদ্রাসা এবং বর্তমান সময়ের কওমি মাদ্রাসা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারনা, ভিন্ন প্রতিষ্ঠান?

রামমোহন রায়ের পাটনা মাদ্রাসায় পড়া কখনই প্রমাণ করেনা যে আজকের কওমি মাদ্রাসায় হিন্দু বা ভিন্ন ধর্মের ছাত্ররা পড়তে পারে। কারন পাটনা মাদ্রাসার সাথে বর্তমান যুগের কওমি মাদ্রাসার আছে হাজার মাইলের দূরত্ব। প্রাক কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা গুলোর সাথে দেওবন্দি বা কওমি মাদ্রাসাগুলোর পার্থক্য নিয়ে বেশ কিছু গবেষণামূলক লেখা আছে, তাঁর কিছু কিছু অনলাইনে বিনে পয়সায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী রিয়াজ এর একটি আলোচিত গবেষণামূলক রিভিউ আছে এই বিষয়ে (২)। এই প্রবন্ধ টিতে সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে প্রাক-কলোনিয়াল যুগ ও কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা গুলোর চরিত্রগত পার্থক্য এবং তাঁর কারন গুলোকে।

সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রবন্ধ থেকে যা জানা যায় তাতে, একটি কওমি মাদ্রাসার সাথে পাটনা মাদ্রাসার বা প্রাক-কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা গুলির তিনটি প্রধান পার্থক্য আছে।

প্রথম পার্থক্য

পাটনা মাদ্রাসা বা প্রাক কলোনিয়াল যুগের প্রায় সকল মাদ্রাসার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো মুসলিম শাসকদের দরবারের জন্যে কর্মচারী সরবরাহ করা (২,৩,৪)। অর্থাৎ ছাত্রদের কে মুসলিম শাসকদের আমলা, কাজী ও কেরানী হিসাবে কাজ করার মতো করে গড়ে তোলা। সেকারনেই প্রাক কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা গুলোতে সেই সকল বিষয়গুলোই পড়ানো হতো যা রাজ দরবারের কাজ চালানোর জন্যে দরকারী ছিলো। মুসলিম আইন ছাড়াও সেই সময় বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ানো হতো কারণ রাজকার্যের জন্যে এই বিষয়গুলোর দরকার হতো। এই অর্থে প্রাক-কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা গুলো ইহজাগতিক বা সেকুলার ছিলো, অর্থাৎ বর্তমান সময়ের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে যে বিদ্যা ও দক্ষতা দরকার ছিলো সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীদেরকে তৈরি করা হতো।

বর্তমান কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার মূল লক্ষ্য কি? আমরা কি জানি? আসুন একটু দেখে নেয়া যাক। প্রস্তাবিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষানীতির মূল ডকুমেন্ট থেকে কোট করে দিচ্ছিঃ

“এ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো – আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টি অর্জন। এ ছাড়া পরকালিন মুক্তি সহ দুনিয়ায় মানবতার বিকাশ সাধন এবং দেশপ্রেমিক যোগ্য নাগরিক তৈরী এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য”

সংক্ষিপ্ত এই অংশটুকুর পরে মোট পচিশটি ধারা উল্লেখ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বর্ণনা করা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্যগুলোর কয়েকটি পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হবে।

পাঠক, ভেবে দেখুন, উদ্দেশ্য ও লক্ষের দিক থেকে পাটনা মাদ্রাসা এবং আজকের কওমি মাদ্রাসার মধ্যে কোনও রকমের মিল আছে? নাকি সম্পূর্ণ বিপরীত? পাটনা মাদ্রাসার শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিলো ইহজাগতিক অর্থাৎ সেই সময়ের চাহিদা মেটানোর জন্যে, শ্রম বাজারের উপযোগী কর্মী তৈরী করা আর আমাদের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টি অর্জন, এই দুটি বিষয় কি এক হলো? নামে মাদ্রাসা হলেও, মুসলিম শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত হলেও পাটনা মাদ্রাসা এবং সেই সময়ের অনেক মাদ্রাসাই ছিলো এক একটি ইহজাগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর বর্তমান সময়ের কওমি মাদ্রাসা হচ্ছে একটি ধর্ম ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে পারলৌকিক সিদ্ধি লাভ করা। যারা দেওবন্দি মাদ্রাসার ইতিহাস ন্যূনতম জানেন, তাঁরা স্বীকার করবেন যে দেওবন্দি বা কওমি মাদ্রাসা হচ্ছে ব্রিটিশ ভারত থেকে চলে আসা মুসলমানদের “আইডেন্টিটি পলিটিক্স” এর একটি একাডেমিক শাখা। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনে হতাশ মুসলমান এলিটদের একটি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পুরনের উদ্যোগ হচ্ছে দেওবন্দি বা কওমি মাদ্রাসা। এই সকল প্রতিষ্ঠানে হিন্দু বা বিধর্মী ছাত্র তো দুরের কথা, শিয়া বা আহমদিয়া মুসলমানদেরও পড়ার কোনও সুযোগ নেই।

দ্বিতীয় পার্থক্য

প্রাক কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা গুলো স্বীকারোক্তিমূলক ছিলোনা। অর্থাৎ মাদ্রাসায় পাঠ করতে হলে কোনও নির্দিষ্ট বিশ্বাসের প্রতি স্বীকারোক্তির কোনও প্রশ্ন ছিলো না। শিক্ষার উদ্দেশ্য কোনও বিশেষ ধর্ম বিশ্বাস কে প্রতিষ্ঠা করা ছিলোনা, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করাটা মাদ্রাসার দায়িত্ব ছিলোনা, এটা শাসক ও ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বের মধ্যে ছিলো। মাদ্রাসার চরিত্র কেমন হবে এটা অনেকাংশে নির্ভর করতো ওই অঞ্চলের শাসকদের মতামত এবং মাদ্রাসা গুলোর উপরে শাসকদের প্রভাবের উপরে। ফলে মাদ্রাসা গুলো এক ধরনের আপাত স্বাধীন ও সেকুলার চরিত্র বজায় রাখতে পারতো। মাদ্রাসা গুলোর এই সেকুলার চরিত্র ছিলো তাঁদের ছাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবং তাঁদের পাঠ্যক্রম নির্বাচনের ক্ষেত্রে। ফলে ভিন্ন ধর্মের ছাত্ররাও সেখানে পড়তে যেতে পারতো। এবং শুধু পারতো না, কোনও কোনও শাসকের আমলে সেটা আইনের অংশ ছিলো। অধ্যাপক আলী রিয়াজ তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে রীতিমত আইন করে মাদ্রাসায় হিন্দু মুসলমান সহ সকলের পড়াশুনার ব্যবস্থা করে হয়েছিলো। শুধু তাইই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিন্দু ছাত্ররা যেন তাঁদের ধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ে পড়তে পারে সেই বিষয়টি রাজকীয় আইন দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছিলো। এমন কি হিন্দু মেধাবী ছাত্রদের মুসলিম ছাত্রদের মতই বৃত্তি দেবার প্রথা প্রচলন করেছিলেন তিনি (৩)। আজকের কওমি মাদ্রাসায় কি হিন্দু ছাত্রদের তাঁর নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষা লাভের সুযোগ আছে? নেই, একবিন্দুও নেই। আমরা বিস্তারিত দেখবো কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম আলোচনা করার সময়। প্রাক কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসাগুলো ধর্মীয় স্বীকারোক্তি মূলক না হবার কারন হচ্ছে, প্রাক কলোনিয়াল যুগে মাদ্রাসাসমুহ খুব সংগঠিত বা অরগানাইজড ছিলোনা এবং প্রাক কলোনিয়াল যুগে মুসলিম শাসনব্যবস্থা বহাল থাকায় মুসলমানদের আত্ম পরিচয়ের সংকট ছিলোনা, সে কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সমাজ গঠন বা পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিতে হতনা।

কিন্তু আজকের কওমি মাদ্রাসা একটা সুস্পস্ট ভাবে স্বীকারোক্তিমূলক শিক্ষা ব্যাবস্থা। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাস স্থাপনের পূর্বশর্ত পুরনের মধ্যে দিয়েই কেবল এখানে পাঠ গ্রহন করা যায়। দেখুন বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষানীতি – ২০১২ থেকে তুলে দিচ্ছি এখানে। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ

১ – শিক্ষার সর্বস্তরে আল্লাহ তায়ালার একত্তবাদের বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটানো এবং আল্লাহ তায়ালার যাত ও সিফাতের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন।

২ – আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্কীদা সংরক্ষন ও অনুসরন।

৩ – হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সরবশেশ নবী ও রাসুল এ বিশ্বাস মনে প্রানে স্বীকার করা এবং যাবতীয় করমপন্থা রাসুলের সুন্নৎ অনুযায়ী সম্পাদনের শিক্ষা প্রদান।

৪ – সুন্নতের চেতনায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রানিত করে সাহাবা, তাবেঈন, তাবে তাবেঈনদের অনুসরনে তাঁদের ব্যাক্তি সত্তা ও চরিত্রের গুনাবলীর বিকাশ ঘটানো।

৫ – হাজার বছর ধরে চলে আসা ইসলামী মূল্যবোধ, তাহজীব – তামাদ্দুনের আলোকে শিক্ষারথীর চিন্তা-চেতনা ও স্রিজনশীলতার বিকাশে সহায়তা করা।

পাঠক ভেবে দেখুন, পিনাকী মবনুদের মতে পাটনা মাদ্রাসাও যা আজকের কওমি মাদ্রাসাও তা, একই কথা। সুতরাং পাটনা মাদ্রাসায় যদি হিন্দু রামমোহন পড়তে পারে তাহলে আজকের কওমি মাদ্রাসাতেও হিন্দুরা পড়তে পারে। এরা বলেছেন রামমোহন যেহেতু পাটনা মাদ্রাসার কারিকুলাম মেনে পড়তে পেরেছিলেন, সেহেতু এখনও হিন্দু – বৌদ্ধ – খ্রিস্টান ছাত্ররা কওমি মাদ্রাসার নিয়ম মেনে পড়তে পারবে। পাঠক, “আল্লাহ্‌র একত্তবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও তাঁর যাত ও সিফাতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার” অর্থ টা কি? এই নিয়মটা যদি কাউকে মানতে হয়, তাহলে তাঁর নিজের ধর্মের প্রতি আনুগত্য থাকে কি? এর অর্থ কি ধর্মান্তর নয়? অর্থাৎ মুসলমান হয়ে কওমি মাদ্রাসায় পড়া? তাহলে অবশ্য আমি পিনাকী – মবনুদের যুক্তির সাথে একমত। কোনও হিন্দু – খ্রিস্টান – বৌদ্ধ যদি ধর্মান্তরিত হয় তাহলে অবশ্য তাঁর কওমি মাদ্রাসায় পড়তে কোনও বাধা থাকার কথা নয়। “হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সর্বশেষ নবী ও রাসুল এ বিশ্বাস মনে প্রানে স্বীকার করা এবং যাবতীয় কর্মপন্থা রাসুলের সুন্নৎ অনুযায়ী সম্পাদনের শিক্ষা প্রদান।” এই নিয়ম টি মেনে একজন হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ ছাত্র’র পক্ষে কি পড়া সম্ভব? রামমোহন রায়কে কি আল্লাহ্‌র একত্ববাদ কে স্বীকার করে পড়তে হয়েছিলো? সত্যি হচ্ছে – না, রামমোহন পড়েছিলেন, যা তিনি পড়তে চেয়েছিলেন। সুতরাং রামমোহনের পাটনা মাদ্রাসার সাথে আজকের কওমি মাদ্রাসার সমতার কথা উল্লেখ করা এক ধরনের প্রতারণা। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে পিনাকী ভট্টাচার্য এবং সৈয়দ মবনু’র মতো উচ্চমানের পন্ডিত মানুষেরা এই প্রতারণা গুলো করে চলেছেন।

তৃতীয় পার্থক্য

প্রাক কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রম ছিলো প্রয়োজন ভিত্তিক অর্থাৎ রাজকর্মচারী হিশাবে যে বিষয় গুলোর দরকার ছিলো সেই বিষয়গুলোই অন্তরভুক্ত ছিলো পাঠ্যক্রমে। ছিলো ভাষা শিক্ষা, ব্যাকরন, সাহিত্য, ইতিহাস, আইন, বিজ্ঞান, দর্শ্‌ন, চিকিৎসা বিজ্ঞান। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ থেকে উদ্ভুত র‍্যাশনাল সায়েন্স বা ইহজাগতিক বিজ্ঞানের নানান ধারা অন্তরভুক্ত ছিলো পাঠ্যক্রমে। রামমোহন আরিস্টটল ও প্লেটোর লেখা পড়েছিলেন মাদ্রাসাতে, তিনি আয়ত্ত করেছিলেন গনিত ও ইউক্লিড এর জ্যামিতি, মাদ্রাসায়।

আজকের কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে প্রাথমিক পর্যায় থেকে সরবোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত, গনিত, জ্যামিতি, রসায়ন, পদারথবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, চিকিতসাবিজ্ঞান এই সকল শাখার কোনও বিষয় কি অন্তর্ভুক্ত আছে? নেই।

নেই, তা সচেতন ভাবে বাদ দেয়া হয়েছে। প্রথাগত বিষয় ও র‍্যাশনাল বিষয় এই দুই ধারার বিশয়ের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় ছিলো প্রাক-কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা গুলোতে, কিন্তু পরবর্তীতে পরিকল্পিত ভাবে র‍্যাশনাল বিষয় গুলোকে বাদ দেয়া হয় “দেওবন্দি” মাদ্রাসার ধারায় (২)।

পাঠ্যক্রম এর পার্থক্যটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাদ্রাসার ইতিহাসের। প্রাক কলোনিয়াল মাদ্রাসার ইতিহাসে দেখা যায়, পাঠ্যক্রম নির্ভর করতো স্থানীয় রাজ দরবার এর চাহিদা অনুযায়ী, কিম্বা মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষকদের চিন্তা চেতনার উপরে অনেক খানি নির্ভর করতো সেই অঞ্চলের মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম, কিন্তু কলোনিয়াল যুগে দেওবন্দি মাদ্রাসার যেহেতু প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো “সহি মুসলমান উলামা” তৈরি করা, তাই দেওবন্দি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম দিন দিন আরো সংকীর্ণ ও সংরক্ষনবাদী হয়েছে। দেওবন্দী বা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রম সংস্কার এর দাবী চলে আ্সছে প্রায় দেড়শ বছর ধরে। স্যার সৈয়দ আহমদ, আল্লামা ইকবাল এবং ফজলুর রাহমান হচ্ছেন এই সংস্কার আন্দোলনের তিন জন প্রধান মানুষ। এরা গত এক শতাব্দির বিভিন্ন সময়ে দাবী তুলেছেন মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারের। দাবী তুলেছেন মাদ্রাসায় শিক্ষায় আধুনিক বিজ্ঞানের অন্তরভুক্তির জন্যে। কিন্তু পাকিস্থানে আবুল আলা মউদুদী, ভারতে দেওবন্দি মাদ্রাসা এবং ইন্দোনেশিয়া তে জামিয়া মুহাদ্দিয়া’র মতো মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান গুলো তীব্র ভাবে এর বিরোধিতা করেন, ফলে উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা আরো অনেক দূরে সরে যায় আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান থেকে। ভারতে খোদ দেওবন্দী গ্র্যাজুয়েটরাও দাবী তুলেছেন মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলাম সংস্কার এর পক্ষে (৫)। আজকে একজন কওমি মাদ্রাসার ছাত্র প্রথম শ্রেনী থেকে অস্টম শ্রেনী পর্যন্ত বছরে বিজ্ঞান পাঠ করেন মাত্র পঞ্চাশ নাম্বারের, অর্থাৎ এক হাজার বা বারোশ নাম্বারের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান হচ্ছে পঞ্চাশ নাম্বার। উচ্চ মাদ্ধমিক থেকে মাস্টারস সম পরিমানের পড়াশুনায় বিজ্ঞান বলে কোনও বিশয়ই নেই। বিজ্ঞানের বিশেশায়িত শাখা যেমন পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান এসবের কোনও বালাই নেই। তবুও পিনাকী বা মবনু দের মানুষেরা বলবেন এই শিক্ষার সমকালীন প্রয়জনীয়তা রয়েছে।

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম !

আসুন দেখা যাক বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম কেমন। প্রথম শ্রেনী থেকে স্নাতক ও সন্মান পর্যায় পর্যন্ত চারটি পর্যায়ের উদাহরণ দেখবো আমরা (৭)। দশম শ্রেনী, দ্বাদশ শ্রেনী এবং সন্মান শ্রেনীর পাঠ্যক্রম এবং পাঠক আপনারা নিজেরাই ভাববেন, এই পাঠ্যক্রম এর অধীনে কি কোন হিন্দু বা ভিন্ন ধর্মের ছাত্র’র পক্ষে পড়া সম্ভব? পরপর কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম এর ছবি গুলো দেখুন।

Image and video hosting by TinyPic

এটা দশম শ্রেনীর পাঠ্যক্রম। দেখুন মোট এগারোশো নাম্বারের মধ্যে গনিত হচ্ছে ৫০ নাম্বার এবং বিজ্ঞান হচ্ছে ৫০ নাম্বার। যেখানে সাধারণ শিক্ষায় গনিত ২০০ বা ৩০০ নাম্বার এবং বিজ্ঞান অন্তত পক্ষে ২০০ নাম্বার এর পাঠদান হয়ে থাকে।

 

এটা উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের শ্রেনীর পাঠ্যক্রম। এখানে বিজ্ঞান, গনিত কতটুকু আছে, দেখা যাচ্ছে?

Image and video hosting by TinyPic

এটা অনার্স সমমানের পড়াশুনা। পাঠক বলুন তো এখানে একজন হিন্দু – বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান ছাত্র’র জন্যে পড়ার কি কি বিষয় আছে?

Image and video hosting by TinyPic

এটা মাস্টারস সম মানের পড়াশুনা। ভেবে দেখুন।

পাঠকের কাছে একটা সহজ প্রশ্ন করে আজকের পর্ব শেষ করবো, আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন এই তিনটি পার্থক্যের বিষয় কে মেনে নিয়ে (শিক্ষার উদ্দেশ্য, আল্লাহ ও নবীর প্রতি স্বীকারোক্তি এবং ইসলামী পাঠ্যক্রম) একজন হিন্দু বা বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান ছাত্র’র পক্ষে কওমি মাদ্রাসায় পড়া সম্ভব?

আগামী পর্বে আলোচনা করবো কওমি মাদ্রাসার “এন্টি কলোনিয়াল” ভুমিকা নিয়ে।

আজ এ পর্যন্ত চিয়ারস !

তথ্যসূত্র
১- সৈয়দ মবনু, প্রেক্ষাপট কওমী মাদরাসা : ডা. পিনাকি ভট্টাচার্যের কিছুকথা বনাম গোষ্ঠিতান্ত্রিক দলান্ধতা, http://www.banglardhoni.com/2014/06/04/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7…
২ – Neyazi TA, 2010, Darul Uloom Deoband: Stemming the tide of radical islam in india, RSIS working paper no. 219
৩ – Riaz A, 2010, Madrassah education in pre/colonial and colonial south asia, Journal of Asian and African studies, 46(1), p. 69 – 86
৪ – Jaddon park, Sarfaroz Niyozov (2008), Madrasa Education in South Asia and South East Asia: Current Issues and Debates, Asia Pacific journal of Education, 28:4, p.323 – 351.
৫ – Mumtaz Ahmad, (2009), Madrasa Reforms and Perspectives: Islamic Tertiary Education in Pakistan, The National Bureau of Asian Research.
৬ – Yoginder Sikand, Reforming the Indian Madrassas: Contemporary Muslim voices, http://www.apcss.org/Publications/Edited%20Volumes/ReligiousRadicalism/P…
৭ – কওমি মাদ্রাসা শিক্ষানীতি ২০১২ (খসড়া)

Spread the love