গত পর্বের লেখায় অনেক পাঠক ব্যক্তিগত ভাবে জানতে চেয়েছেন, সংশয় প্রকাশ করেছেন, এই লেখার শিরোনামে রাজা রামমোহন রায় কে “ব্রাহ্মণ পুত্র” হিসাবে উল্লেখ করার সঠিকতা নিয়ে। অনেকেই বলেছেন, রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মণ কাস্ট এর ছিলেন না, কিম্বা রায় আসলে ব্রাহ্মণ পদবী নয় ইত্যাদি। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে, শুধু এই টুকু বলছি, একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্রে বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে যে, রাজা রামমোহন রায়ের পরিবার একটি প্রথাগত ব্রাহ্মণ পরিবার ছিলো। প্রয়োজনে এই বিষয়ে পরে সূত্র সহ আরো আলোচনা করা যাবে। আগ্রহীরা, লেখার শেষে দুইটি তথ্যসূত্র মিলিয়ে দেখতে পারেন। (১,২)

আজকের পর্বে রাজা রাম মোহন রায়ের মাদ্রাসায় পড়া এবং এ সংক্রান্ত পিনাকি ভট্টাচার্য – সৈয়দ মবনু দের দাবীর বিষয়ে খানিকটা আলোচনা করবো। এদের উদ্দেশ্য এবং সত্যনিষ্ঠাকে খানিকটা খতিয়ে দেখার চেস্টা করবো। গত পর্বে লিখেছিলাম রাজা রামমোহন রায় ও বর্তমান সময়ের কওমি মাদ্রাসা নিয়ে এরা এক ভয়ংকর সরলীকরনে মেতেছেন,যার পুরোটাই উদ্দেশ্য প্রনোদিত। তাই এই পর্বের আলোচনার জন্যে আমরা দুইটি স্ক্রিনশট ব্যবহার করবো। পাঠকের হাতে সময় থাকলে স্ক্রিন শট টির দিন-ক্ষণ মিলিয়ে সেই পোষ্টটিতে করা অসংখ্য কমেন্ট পড়ে দেখতে পারেন, তাতে এদের উদ্দেশ্য এবং অবস্থান আরো ভালো করে বোঝা যাবে। জনাব সৈয়দ মবনু’র লেখা একটি ব্লগ এর লিংক এই লেখা শেষে দিয়ে দিলাম, সেটাও পড়ে দেখা যেতে পারে। পিনাকী ভট্টাচার্য ও সৈয়দ মবনু দুজনেই উচ্চ শিক্ষিত এবং জ্ঞানী মানুষ। তাঁরা গুরুভাই, তাই তাঁদের মতামত একদম আইডেন্টিক্যাল, তাই দুইজনের লেখার মূল বিষয়গুলো এক সাথে আলোচনা করবো।

শুরুতে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্লগার পিনাকী ভট্টাচার্যর স্ক্রিনশট টি লক্ষ্য করুন। বাংলাদেশের জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রিজওয়ানা চৌধুরী বন্যার একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা র হয়ে তিনি ওকালতি করছেন রাজা রামমোহন রায়কে ব্যবহার করে। লক্ষনীয় যে তিনি রিজওয়ানা চৌধুরী কে উদ্ধৃত করছেন কোনও রকমের রেফারেন্স বা তথ্যসূত্র ছাড়াই। এবং সেই অসমর্থিত খবরের সাথে রামমোহন রায় কে ব্লেন্ড করে আজকের কওমি মাদ্রাসা কে মহিমান্বিত করছেন। জনাব সৈয়দ মবনু অবশ্য একটি তথ্য সূত্র উল্লেখ করেছেন তাঁর লেখায়, কিন্তু সেই লিংক ব্যবহার করে রিজওয়ানা বন্যার সংবাদ টি পাওয়া যায়নি। পাঠক আপ্নারাও চেস্টা করতে পারেন। স্ক্রিনশট দুইটি ভালো করে দেখুন। আমি স্ক্রিনশট গুলোর প্রথম অংশ রিজওয়ানা চৌধুরী বিষয় নিয়ে লিখতে চাইনা, এটা শ্রেফ নোংরামী এবং বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত মানুষদের অনেকেই এই সকল নোংরামী করে থাকেন, আমি তাতে অবাক হইনা। আমি বরং দ্বিতীয় অংশে মনোনিবেশ করতে চাই।

স্ক্রিনশট টির দ্বিতীয় অংশের শুরুতে পিনাকী ভট্টাচার্য লিখছেন এক সময় হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মাদ্রাসায় পড়েছেন। ভালো কথা, কিন্তু কোন সময় সেটি? এখন কেনও হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মাদ্রাসায় পড়তে পারেনা? সেটা কি হিন্দুদের দোষের কারনে পড়তে পারেনা? হিন্দুরা খারাপ তাই? নাকি সেই সময়ের মাদ্রাসার তুলনায় এখনকার মাদ্রাসার এমন কোনও চরিত্রগত পরিবর্তন হয়েছে যে কারনে হিন্দু সহ ভিন্ন ধর্মের মানুষেরা এখন আর মাদ্রাসায় পড়তে পারেন না? সত্যি টা আসলে কি? এটা বলার সৎ সাহস পিনাকী ভট্টাচার্যের নেই, কারন তাতে জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়বে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের “লাইক” নামের ইগো বুস্টার কমে যাবে।

বাস্তব সত্য হচ্ছে রাজা রামমোহনের সেই পাটনা মাদ্রাসা আর আজকের পিনাকী – মবনুদের কওমি মাদ্রাসা হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নামে মাদ্রাসা হলেও, চরিত্রের দিক থেকে, শিক্ষা দর্শনের দিক থেকে, কাঠামোর দিক থেকে, রাজনৈতিক অংশ গ্রহনের ও উচ্চাভিলাষের দিক থেকে এই দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ আলাদা। পাটনা মাদ্রাসা আর আজকের কওমি মাদ্রাসা চরিত্রগত দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বলেই, রাজা রামমোহন রায়ের মতো অভিজাত হিন্দু পরিবারের ছেলেরা সেই সময় মাদ্রাসায় পড়তে পারতো আর আজকের কওমি মাদ্রাসা মানেই হচ্ছে বিধর্মী – অবিশ্বাসীদের জন্যে মূর্তিমান আতংক।

সেদিনের মাদ্রাসা আর আজকের কওমি মাদ্রাসা কেনও আলাদা এবং কখন থেকে আলাদা হয়ে গেলো আমরা মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস থেকে তা দেখবো, পরের পর্ব গুলোতে। প্রাক কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসার ইতিহাস এবং আজকের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষানীতি পাশাপাশি তুলোনা করে আমরা দেখবো কেনও পাটনা মাদ্রাসা আর বর্তমানের কওমি মাদ্রাসা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা। শুধু আপাতত দেখে রাখুন, পিনাকী ভট্টাচার্যের মতো একজন এলিট শিক্ষিত মানুষ রামমোহন রায়ের মাদ্রাসা পাঠ দিয়ে আজকের কওমি মাদ্রাসা কে জায়েজ করছেন এবং একজন বাঙ্গালী শিল্পী কে হেনস্থা করার ব্যবস্থা করছেন। সচেতন সংস্কৃতি প্রেমী বাঙ্গালীর জন্যে পিনাকী ভট্টাচার্যদের এই ধরনের প্রবনতাকে সাবধানে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

“গ্র্যাজুয়েট” শব্দটার বাংলা অর্থ হচ্ছে স্নাতক। আর স্নাতক পর্যায়ের পড়াশুনা হচ্ছে হাই স্কুল পেরিয়ে করতে হয়। পশ্চিমে পিএইচডি ছাত্রদের বলা হয় গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট। অন্তত গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের পড়াশুনা খানিকটা উচ্চতর পড়াশুনা, এই বিশয়টিই আমার জানা ছিলো। প্রাইমারী স্কুলের ছাত্রকেও যে “গ্র্যাজুয়েট” বলা যায় অবলীলায়, এটা পিনাকী ভট্টাচার্য ও তাঁর গুরুভাইদের কাছ থেকে শিখলাম। আমি জানি পিনাকী ভট্টাচার্য পাচটি অনলাইন অভিধান ঘেঁটে এসে বলতে পারেন যে আসলে “ছাত্র” মানেই “গ্র্যাজুয়েট” সে নার্সারির ছাত্র হোক বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হোক। আসুন সেটা ধরে নিয়ে এগিয়ে দেখি। রামমোহন রায় পাটনা মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন ১৭৮০ সালে যখন তাঁর বয়স ছিলো আট বছর (মতান্তরে নয় বা দশ বছর – আবিদুল গাজী’র পুস্তক দ্রষ্টব্য) এবং তিনি সেখানে পড়াশুনা করেছিলেন তিন বছর অর্থাৎ এগারো – বারো বা তেরো বছর বয়সে তিনি পাটনা মাদ্রাসা ত্যাগ করেন। তিন বছরে তিনি কি পড়েছিলেন, কোন ডিগ্রী লাভ করেছিলেন তাঁর কিছুই স্পষ্ট করে জানা যায়না, অন্তত গবেশকেরা সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। কিন্তু পিনাকী ভট্টাচার্য এবং তাঁর গুরুভাই সকল রামমোহন রায় কে ঘোষণা দিচ্ছেন পাটনা মাদ্রাসার “গ্র্যাজুয়েট” হিসাবে। কারণ এরা জানেন “ছাত্র” লেখার চাইতে “গ্র্যাজুয়েট” লিখলে পাবলিক “খাবে” ভালো।

পাটনা মাদ্রাসায় কিম্বা সেই সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষার ধরনটাই ছিলো ব্যক্তিগত পর্যায়ের অর্থাৎ কোনও একজন মৌলভীর ঘনিষ্ঠ সাহচর্যেই একজন শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহন চলত, নানান বিশয়ের উপরে। সকল মাদ্রাসায় একই রকমের Structured syllabus বা গোছানো পাঠ্যক্রম এর অধীনে পড়াশুনা তখনও হয়ে ওঠেনি। মাদ্রাসা থেকে মাদ্রাসায় এর ভিন্নতা ছিলো ব্যাপক। তাই পাটনা মাদ্রাসায় পড়ার কথা বা দুই একটি বিশয়ের কথা জানা গেলেও তাঁর বিস্তৃতি সম্পর্কে একদমই জানা যায়না। আমার বিশ্বাস পিনাকী ভট্টাচার্য বা সৈয়দ মবনু’র মতো জ্ঞানী ও পন্ডিত মানুষেরা এই সবকিছুই জানেন, কিন্তু তাঁরা এই সকল কিছু আলোচনা করাকে হয়ত অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। তাঁরা যেহেতু বিশয়টিকে সমগ্র হিসাবে দেখেন না, তাই রামমোহনের “রাজর্ষি” হবার পেছনে পাটনা মাদ্রাসাই হয়ে ওঠে প্রধান চালক শক্তি। রামমোহন রায় আসলে কি কি পড়েছিলেন, কতদিন পড়েছিলেন, তাঁর পাটনা মাদ্রাসার শিক্ষাজীবন কি কোনও নির্দিষ্ট ডিগ্রী বা টাইটেল ভিত্তিক ছিলো? পাটনা থেকে বেরিয়ে গিয়েই বা তিনি কি পড়েছিলেন – কি করেছিলেন? পিনাকী ভট্টাচার্য বা সৈয়দ মবনু দের মতো পন্ডিত মানুষদের এসব বিস্তারিত আলোচনার দায় নেই। পন্ডিত হলেও সত্যনিষ্ঠার দায় সবার থাকেনা, এটা আমরা জানি। তাই আসুন একজন সত্যনিষ্ঠ গবেষকের কাজ থেকে বিষয়টি জানার চেস্টা করি। গত এক দশকে রামমোহন রায়ের উপরে প্রকাশিত সবচাইতে আলোচিত পুস্তকটি হচ্ছে – প্রখ্যাত ভারতীয় ইসলামিক স্কলার, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, জনাব আবিদুল আল আনসারী গাজীর লেখা পুস্তক “Raja Rammohun Roy: An encounter with islam and christianity and the articulation of hindu self conciousness”। জনাব আবিদুল আনসারী গাজী নিজেও একজন মাদ্রাসার ছাত্র এবং সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বিশ্বের সেরা পাঁচশো জন মুসলিম প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাক্তির একজন (500 most influencial muslims) হিসাবে স্বীকৃত হয়েছেন। ভারতীয় অসংখ্য জীবনী মূলক পুস্তক কে বাদ দিয়ে আমি তাঁর পুস্তক টিকেই নিলাম এই জন্যে যে, পুস্তক টি সাম্প্রতিক, এই পুস্তক টি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পিএইচডি গবেষণার পরবর্তী অংশ (ফলে তথ্যগত সঠিকতা এবং মেথড বা গবেষণার পদ্ধতিগত দিক থেকে খানিকটা হলেও স্ট্যান্ডার্ড বা মান বজায় থাকবে) এবং এই পুস্তকটি রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে একটি মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ বা ‘মুসলিম ইটারপ্রিটেশন’।

প্রথমে দেখি, রামমোহন রায়ের পাটনা মাদ্রাসায় যাবার বিষয়ে জনাব গাজী কি তথ্য দিচ্ছেন।

“এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে রামমোহনকে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার জন্যে ইস্ট ইন্ডিয়া প্রভাবিত কোলকাতায় কিম্বা বেনারসের হিন্দু পাঠশালায় পাঠানো হয়নি, বরং বাড়ী থেকে তিনশো মাইল দুরের পাটনা মাদ্রাসায় পাঠানো হয়েছিলো আরবী ও ফারসী ভাষা শেখার জন্যে, যা ছিলো সেই সময়ে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি অর্জনের জন্যে পাসপোর্ট এর মতন”। – আবিদুল আনসারী গাজী’র পুস্তক দ্রষ্টব্য, পৃষ্ঠা ৩৫ )

জনাব গাজী এই তথ্য দিচ্ছেন রাজা রামমোহন রায়ের জীবনীকার পন্ডিত শীবনাথ শাস্ত্রীর রেফারেন্স দিয়ে। অর্থাৎ সেই সময়ে, আরবী ও ফারসী ছিলো মুসলিম শাসকদের দফতরে বা আদালতের ভাষা, তাই অপেক্ষাকৃৎ এলিট পরিবারের সন্তানেরা তাঁদের শিক্ষার একটি অংশ মাদ্রাসায় যেতেন আরবী এবং ফারসী ভাষা শেখার জন্যে কারন হিন্দু পাঠশালায় আরবী এবং ফারসী ভাষা শেখানো হতনা। রাজা রামমোহন রায়ের কয়েকজন জীবনীকার এর মতে তিনি সেখানে আরবী ও ফারসী শিখেছিলেন পারিবারিক ভাবে ঘনিষ্ঠ একজন মৌলভীর তত্ত্বাবধানে।

পাঠকের কাছে প্রশ্নঃ

এখনকার বাংলাদেশে রাস্ট্রের বিভিন্ন দফতরের এবং আদালতের ভাষা কি? সেটা কি আরবী, উরদু এবং ফারসী? রাজা রামমোহন রায় শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আরবী এবং ফারসী পড়তে গিয়েছিলেন মাদ্রাসায়, আর এখনকার শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের মাদ্রাসা গুলো কি শিক্ষা দান করে?

পিনাকী ভট্টাচার্য আরো লিখছেন যে রাজা রামমোহন রায় “মাদ্রাসায় পড়ে বাংলার রেনেসার নেতৃত্ব দিয়েছেন”। এই কথাটির অর্থ আসলে কি? তাঁর মানে কি এই যে বাংলার রেনেসার নেতৃত্ব দেবার জন্যে যে জ্ঞান অর্জনের দরকার ছিলো তা তিনি পেয়েছেন পাটনা মাদ্রাসায় কাটানো তিন বছর থেকে? আসুন আবারো আবিদুল আনসারী সাহেবের বই এর থেকে দেখি, রামমোহন রায় পাটনা মাদ্রাসায় কি পড়েছিলেন?

“ইসলাম ধর্ম ও পারসিয়ান সুফি সাহিত্যের উপরে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্যে রামমোহন রায় কে জবরদস্ত মৌলভী বলা হতো, তবুও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই উপাধী অর্জনের পেছনে তাঁর পাটনা মাদ্রাসায় পাঠগ্রহন কে সরাসরি সংযুক্ত করা যায় কিনা সে বিষয়ে তথ্যগত ঘাটতি আছে। আমরা জানিনা তিনি সেখানে কি কি পুস্তক পাঠ করেছেন এবং কারা তাঁর শিক্ষক ছিলেন সেকথাও জানা যায়না। এমন কি তিনি সেখানে কতদিন ছিলেন তিন বা চার বছর তাও খুব পরিস্কার নয়। তিন চার বছরের একটি সময় কুরআন ও সুফিবাদের উপরে এই ধরনের পাণ্ডিত্য অর্জনের জন্যে খুবই ছোট সময় এবং বিশেষত যখন রায় ছিলেন একেবারেই বালক বা কিশোর। কিন্তু রামমোহনের ব্যক্তিগত অনুসন্ধিৎসা থেকে একথা ধারনা করা চলে যে তিনি আসলে মাদ্রাসার সময়ের পরেও তাঁর এই পড়াশুনা অব্যাহত রেখেছিলেন যা জ্ঞানের এই শাখাগুলোতে তাঁকে পন্ডিত হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিলো।”

আবিদুল আনসারী সাহেব উপরের বর্ণনা টুকুর জন্যে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করেছেন রামমোহনের আধুনিক সময়ের জীবনীকার ইকবাল সিং এর পুস্তক Rammohun Roy, Asia Publishing house, New York, 1958, pp. 30 – 31.

পিনাকীদের বয়ান অনুযায়ী, মাদ্রাসায় তাঁর বালক বয়সের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে তিনি বাংলার রেনেসার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পাঠক, রামমোহন গবেষকদের বয়ানের সাথে পিনাকী ভট্টাচার্যদের বয়ান একটু মিলিয়ে দেখুন।

এবারে আসুন, রামমোহন রায়ের অর্ধেক জীবনের উপরে একটু আলোকপাত করা যাক, খুব সংক্ষেপে। রামমোহন রায় পাটনা থেকে ফিরে এসে কিছুদিন বাড়ীতে অবস্থান করেন এবং পরিবারের সদস্যদের কে অতিষ্ঠ করে তোলেন ধর্ম বিষয়ে বিশেষত হিন্দু ধর্ম ও মূর্তি পূজা বিষয়ে নানান রকমের বিব্রতকর প্রশ্ন করে (এ বিষয়ে আমরা পরের পর্ব গুলোতে বিশদ আলোচনা করবো)। তাঁর পিতার উদ্যোগে তাঁকে বেনারসে হিন্দু পাঠশালায় পাঠানো হয় এবং সেখানে তিনি চার বছর থাকেন। এই চার বছরে তিনি হিন্দু ধর্মের গ্রন্থগুলো পাঠ করেন, বাংলা এবং সংস্কৃত ভাষায় উচ্চতর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। বেনারস পর্বের পরে তিনি ঘর ছাড়া হন এবং ভারতের বিভিন্ন অংশের পরে তিব্বতে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও লামাদের সাথে বছর দুয়েক খানেক থাকেন। পরবর্তীতে তিনি মুরশিদাবাদে যান এবং সেখানে সরকারী পদে কাজ করেন। মুশিদাবাদে থাকার সময় তিনি তাঁর প্রথম গ্রন্থ “তুহফাহ মুহাদ্দিন” রচনা করেন যা ছিলো ফারসীতে লেখা এবং ভুমিকা ছিলো আরবীতে।এই বইয়ের কারনে মুসলমানদের হাতে তাড়া খেয়ে তিনি কোলকাতায় পালিয়ে আসতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে তাঁর পুস্তকের সম্পাদক মুসলমানদের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন (এ বিষয়ে পরের পর্ব গুলোতে আরো আলোচনা করবো)।মি ডিগবী ও মি উডফোরড এর মতো দুজন ইউরোপীয়’র সাথে প্রায় এই এক যুগের কাজের সময়টিতে তিনি, ইংরাজী, হিব্রু ও গ্রিক ভাষা শেখেন এবং বাইবেল সহ বহু ইউরোপীয় ধর্ম ও দর্শন বিষয়ক পড়াশুনা করেন।

এবারে আসুন একটু প্রাইমারী স্কুলের পাটিগণিত করে দেখা যাক। মাদ্রাসায় ৩ বছর, পাঠশালায় ৪ বছর, বৌদ্ধ লামাদের সাথে দুই বছর, পথে পথে ঘুরে বেড়ানো বছর দুয়েক, সরকারী চাকুরী বছর তিনেক এবং ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে প্রায় টানা এগারো – বারো বছর। এই প্রায় আড়াই যুগের শিক্ষা পরিক্রমার তিন বছর হচ্ছে পাটনা মাদ্রাসায়, এবং আমাদের পিনাকী ভট্টাচার্য ও তাঁর গুরুভাইয়েরা সিদ্ধান্ত টানছেন যে মাদ্রাসায় পড়ে রাজা রামমোহন রায় প্রগতিশীল হয়ে উঠেছিলেন, মুক্তমনা হয়ে উঠেছিলেন বাংলার রেনেসার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বালক রামমোহনের মাদ্রাসার তিন বছরের পরের ইতিহাসে পিনাকী ভট্টাচার্যদের চোখ কান বন্ধ হয়ে যায়, কলমের কালি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সত্যনিষ্ঠ মানুষদের তা হয়না, তাই আবিদুল আনসারী একজন নামকরা মুসলমান তাত্ত্বিক হওয়া সত্ত্বেও যা বাস্তব, ঐতিহাসিক সত্য তাঁকে তুলে এনেছেন। রামমোহনের একজন পন্ডিত হয়ে ওঠার পেছনে পাটনা মাদ্রাসাকে অহেতুক মহিমান্বিত করেন নি। বরং রামমোহনের মতো একজন ব্রাহ্মণ পুত্রের ইসলামী পণ্ডিত হয়ে ওঠার কারন হিসাবে তাঁর নিজের অনুসন্ধিৎসা ও শ্রম কে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, পাটনা মাদ্রাসায় কাটানো তিন বছরের চাইতে। পাটনা মাদ্রাসায় পড়ার প্রায় ৩০ বছর পরে রামমোহন তাঁর প্রথম পর্যায়ের সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন, সাংগঠনিক ভাবে তাঁর ধারনা গুলোকে প্রচার করতে শুরু করেন। এই তিরিশ বছরে তিনি ইংরাজী, হিব্রু, গ্রিক সহ প্রায় সতেরো টি ভাষা আয়ত্ত করার চেস্টা করেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি ইউরোপিয় সাহিত্য ও রাজনৈতিক – ধর্মীয় প্রকাশনার মূল গ্রন্থ গুলো পড়ে ওঠেন। কুরআন, ত্রিপিটক, বাইবেল, জৈন কল্পশাস্ত্র সহ হিন্দু ধর্মের প্রায় সকল গ্রন্থ পাঠ করেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠার ঘটনা আরো পরে ১৮২৮ সালে যা রামমোহনের পাটনা মাদ্রাসা পর্বের প্রায় ৪০ – ৪৫ বছর পরে, কিন্তু পিনাকী – মবনু দের লেখা পড়লে বোঝা যায়, রামমোহন রায় পাটনা মাদ্রাসা থেকে বেরিয়েই এতো সব বিপ্ললব করে ফেললেন। পিনাকী – মবনুরা পন্ডিত মানুষ কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই পন্ডিত মানুষেরা তাঁদের পাঠকদের কে অন্ধ মনে করেন এবং সেই মনে করা থেকে হাতির লেজ ধরিয়ে দিয়ে বলে্ন হাতি একটি মোটা দড়ির মতো। আমরাও তাই বিশ্বাস করি, “হাতি একটি দড়ির মতন”। ঠিক যেমনটি রামমোহনের “রাজর্ষি রামমোহন রায়” হয়ে ওঠার জন্যে তাঁরা দিনের পর দিন পাটনা মাদ্রাসার তিন বছরের কথা প্রচার করছেন এবং তাই দিয়ে মহিমান্বিত করছেন আজকের কওমি মাদ্রাসা কে।

সন্দেহাতীত ভাবে রামমোহনের উপরে ইসলাম ও ইসলামী সাহিত্যের একটা দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব ছিলো। কিন্তু সেই প্রভাবটি যে তাঁকে বাংলার রেনেসার নায়কে পরিনত করেছিলো সত্যনিষ্ঠ গবেষকেরা সেটা বলেন না। তাই সত্যনিষ্ঠ গবেষকেরা যেমন ইসলাম ও ইসলামী সাহিত্যের ভুমিকার কথা লিখেছেন তেমনি তাঁরা রায়ের সারা জীবনের অন্যান্য শিক্ষা – অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে। কোনও একটি বিশেষ অংশ কে অসৎ ভাবে মহিমান্বিত করেন নি। প্রধান তিনটি ধর্ম হিন্দুত্ব, ইসলাম ও খ্রিস্টিয়ানিটি নিয়ে রামমোহন রায়ের গভীর পড়াশুনা ছিলো এবং সেই সাথে ছিলো ইউরোপিয় মানুষদের সাথে ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক। রামমোহনের জীবনের এই প্রধান দিক গুলোর প্রভাব কে জনাব গাজী তাঁর প্রায় তিনশো পাতার গবেষণার উপসংহার এ এইভাবে ব্যক্ত করেছেনঃ

“তিনি (রায়) মুসলমানের মতো জীবন যাপন করতেন, ইউরোপীয় দের মতো করে চিন্তা করতেন এবং একজন হিন্দুর মতো করে অনুভব করতেন, এই তিনটি বিষয় কে তিনি আত্তীকরণ করেছিলেন, নিজস্ব পরিমিতি বোধ দিয়ে” – আবিদুল আনসারীর পুস্তক, পৃষ্ঠা ২৬১)।

জনাব গাজী যেহেতু বাংলাদেশের ফেসবুকার নন, তিনি হার্ভার্ড এর গবেষক, তাই একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম গবেষক হওয়া সত্ত্বেও, তিনি সত্যনিষ্ঠ ভাবে লিখেছেন ইসলাম সহ সকল ধর্মের প্রতি রাজা রামমোহন রায়ের নির্মম সমালোচনা ও আক্রমনের কথা। তিনি নির্মোহ ভাবে উল্লেখ করেছেন – কুরআন ও মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে রাজা রামমোহনের কঠোর সমালোচনার কথা। রাজা রামমোহন রায় সকল ধর্মের সমালোচনা করেছেন, ভিন্ন ধর্ম থেকে ভালো দিক গুলো চিন্তার খোরাক হিশাবে নিয়েছেন, হিন্দু ধর্মকে সমালোচনায় জর্জরিত করেছেন, কিন্তু তিনি দিনের শেষে ফিরে গেছেন সত্যিকারের আদি ভারতীয় সংস্কৃতি ও প্রথার কাছেই। গাজী আনসারী খোলাখুলি ভাবে আলোচনা করেছেন, সকল বিশ্লেষণের পরে কেনও রাজা রামমোহনের কাছে প্রকৃত হিন্দু নৈতিকতা আরব ভিত্তিক ইসলামী নইতিকতার চাইতে অনেক শ্রেয়তর মনে হয়েছে।

এখানেই চতুর ফেসবুকারদের সাথে সত্যনিষ্ঠ গবেষকদের পার্থক্য। মুশকিল টা হলো, জগতটাই এখন ছুটছে জনপ্রিয় ফেসবুকারদের পেছনে, সত্যের পেছনে নয়।

আগামী পর্বে আলোচনা করবো, রামমোহনের জীবনে চিন্তায় ইসলাম ধর্মের ও ইসলামী শিক্ষার প্রভাব নিয়ে, কেনও চরিত্রগত দিক থেকে পাটনা মাদ্রাসা এবং পিনাকী-মবনুদের কওমি মাদ্রাসা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারনা, ভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আরো আলোচনা করবো, এক সময়ের ভীষণ অগ্রসর মাদ্রাসা শিক্ষাকে কারা আদিম শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিনত করলো। কেনো করলো? এতে লাভবান হলো কারা?

আজকের মতো শেষ করছি ! চিয়ারস !

(চলবে)

আগ্রহী পাঠকদের জন্যে তথ্যসূত্র যোগ করে দিলাম।

১ – http://www.thebrahmosamaj.net/founders/rammohun.html
২ – রাজর্ষি রামমোহনঃ জীবনী ও রচনা, শ্রী অনিল চন্দ্র ঘোষ
৩ – Raja Rammohun Roy, An encounter with islam and christianity and the articulation of Hindu self consciousness, Abidul Al Ansari Gazhi, Harvard University
৪ – http://chintaa.com/index.php/blog/showAerticle/246

Spread the love