দানবায়নের বুদ্ধিবৃত্তিঃ রাসেল থেকে চমস্কি

 “বামাতি” আসলে কে?

গত পর্বে আওয়ামীলীগ, জামাতে ইসলামী ও বামপন্থীদের প্রতিনিধি হিসাবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র থেকে উল্লেখ করেছিলাম এই তিনটি রাজনৈতিক ধারার মূলনীতি অর কর্মসূচী এবং এটা খুব স্পষ্ট যে এই তিনটি দলের দলীয় মূলনীতি ও কর্মসূচী সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদের রাজনৈতিক দর্শন ভিন্ন, এদের নেতা কর্মীদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ভিন্ন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভিন্ন এমন কি এদের রাজনীতির কথ্য ভাষাও ভিন্ন। এদের রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন। যদি মিলের প্রশ্ন তুলতেই হয় তাহলে বরং আমাদের সমকালীন  রাজনীতিতে ইসলামী করনের ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ ও জামাতে ইসলামের মাঝে দারুন সব মিল রয়েছে। কিন্তু সকল অর্থেই জামাতে ইসলামীর ঠিক বিপরীত রাজনীতি হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির বা বামপন্থী দলগুলোর রাজনীতি। এমন কি কমিউনিস্ট পাটি বা আরো কিছু বামপন্থী দল প্রায় তিরিশ বছর ধরে জামাতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবী জানিয়ে আসছে, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবী জানিয়ে আসছে। কিন্তু তারপরেও কেনো বামপন্থীদের সাথেই জামাতে ইসলামীর তুলনা, কেনো জামাতের সাথে আওয়ামীলীগের তুলনা নয়? গত পর্বে কয়েকটা প্রচলিত লক্ষণ উল্লেখ করেছিলাম “বামাতি” হওয়ার। আজকে আরেকটু গুছিয়ে উল্লেখ করবো, “বামাতি” হবার কারণ সমূহ, উল্লেখ করবো এই “বামাতি” ধারণার পেছনের রাজনীতিটা আসলে কি, সেটা।

মোটের উপরে এটা পরিস্কার, “বামাতি” শব্দটা আসলে আওয়ামীলীগের অনলাইন ষন্ডাবাহিনীর আবিষ্কার ও এদের দ্বারাই বহুল ব্যবহৃত। আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সবচাইতে বড় বেইমানী করেছে। এটা যারা আগ্রহী পাঠক তারা, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বিষয়ক যেকোনো একটি প্রকাশনা পড়ে দেখতে পারেন এবং তার প্রেক্ষিতে আওয়ামীলীগের গত চল্লিশ বছরের রাজনীতিকে মিলিয়ে দেখতে পারেন। কিন্তু এই বোধের কথা বলা যাবেনা, বললেই আপনি “বামাতি” হয়ে যাবেন। আওয়ামীলীগের শাসনকালেই উত্থান ঘটেছে চরম মৌলবাদের, রাজনীতিতে ও বাঙালীর সাংস্কৃতিক জীবনে, সমাজের সকল স্তরে ভয়াবহ ইসলামীকরনের ঘটনা ঘটেছে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু সেটা নিয়েও কোনও আলোচনা করা যাবেনা, করলে আপনি হয়ে যেতে পারেন “বামাতি”। এইসব হচ্ছে “বামাতি” শব্দটির আওয়ামী লক্ষণ। এবার আসুন অন্য ধারায় যাই।

আরেকটি দল এই শব্দটিকে ব্যবহার করেন, কিন্তু সেই দলটি আদতে কোনও সংগঠিত রাজনৈতিক “দল” নয়। এঁরা হচ্ছেন আমাদের নয়া-নাস্তিক্যবাদী বা নিও-এথিস্ট বন্ধুরা। এদের একটা অংশ দেশে থাকেন এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ছদ্মনামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও ব্লগে লেখালেখি করেন। এদেরই আরেকটি অংশ, কয়েকজন প্রখ্যাত নয়া-নাস্তিক্যবাদী লেখক ব্লগার তাঁদের জীবন শংকা থাকার কারণে এখন পশ্চিমের দেশগুলোতে থাকেন। এরাও বামপন্থিদের অবলীলায় “বামাতি” বলে উল্লেখ করেন যখনই নাস্তিকতা প্রসঙ্গে, বিশেষত মুসলিম জনগোষ্ঠী প্রসঙ্গে বামপন্থীদের সাথে এদের মতের ভিন্নতা তৈরী হয়। এখানে চালক বিষয়টি হচ্ছে দ্বিমত বা ভিন্নমত। ধরুন ইসরায়েল প্যালেস্টাইন নিয়ে বামপন্থিদের মতামত এদের কাছে মনে হয় জামাতের মতো। কারণ রাজনৈতিক ভাবে জামাত এ ইসলামী বাংলাদেশও ইজরায়েলের দখলদারিত্ব ও ভয়াবহ আগ্রাসনের বিরোধিতা করে। সুতরাং যেহেতু জামাত ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের সংকটে প্যালেস্টাইনের পক্ষচারন করে এবং ইজরায়েল-আমেরিকা জোটের বিরোধিতা করে, তাই অন্য যেকোনো মানুষ বা যেকোনো দল যদি ভিন্ন কারনেও ভিন্ন কোনও ব্যাখ্যাতেও কিম্বা ভিন্ন কোনও রাজনৈতিক অবস্থানের কারনেও আমেরিকা-ইজরায়েল জোটের বিরোধিতা করে, তাহলে তারাও “বামাতি” হয়ে যান, কেননা ইজরায়েল- প্যালেস্টাইনের সংকটে ইজরায়েল এর বিরোধিতা করাটাই হচ্ছে “জামাতি” ব্যাপার স্যাপার। বিশ্বাস হচ্ছেনা? একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী নয়া-নাস্তিক্যবাদী লেখকের লেখা থেকে তুলে দিচ্ছি এখানে –  তিনি তাঁর একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধে ফিলিস্তিনি জনগনকে পরামর্শ দিচ্ছেন তাদের কি করা উচিৎ সে বিষয়ে, বলাই বাহূল্য তিনি নিজে “বামাতি” নন কেননা তাঁর পক্ষচারন হচ্ছে ইজরায়েল এর পক্ষে, আর ইজরায়েলকে যারা সমর্থন করেন তারাতো আর যাইই হোন না কেনো “বামাতি” নন। দেখুন তাঁর পরামর্শ টা –

 

“ফিলিস্তিনীরা যদি নিজের জন্য সত্যিই শান্তি ও স্বাধীন একটি রাষ্ট্র চায় তাহলে প্রথমেই তাদের ইজরাইল রাষ্ট্রকে মেনে নিতে হবেআন্তর্জাতিক বামাতী বুদ্ধিজীবীদের উশকানিতে কান না দিয়ে তাদের অবশ্যই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করতে হবে”। লিংক এখানে 

 

যাক, তাহলে আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবিরাও “বামাতি” হতে পারেন, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবিরা যারা বাংলাদেশে থাকেন না, বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট নন একেবারেই, তারাও জামাতিদের মতো করে ভাবতে পারেন, কথা বলতে পারেন, তাইতো? অন্তত এই নয়া-নাস্তিক্যবাদী লেখকের মতে তো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু কিভাবে? কেনো? অর্থাৎ একজন আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবি কিভাবে “বামাতি” হতে পারেন যার জামাতে ইসলামীর সাথে কোনও যোগাযোগই নেই কোনও সংশ্লিষ্টতাই নেই? আর কেনোইবা তিনি জামাতি দৃষ্টিভঙ্গীর অনুসারী হবেন? কারণ সেই একই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যদি কেউ মার্কিন – ইজরায়েল দোস্তালীর বিরোধিতা করেন, তাঁদের ভাগ্যেও একই তকমা – “বামাতি”। এই আলোচনাই দ্বিতীয় অংশে তুলে ধরবো দুজন কথিত “আন্তর্জাতিক বামাতি”র উদাহরণের মধ্যে দিয়ে। পাঠককে অনুরোধ করবো প্যালেস্টাইনি জনগনকে দেয়া আমাদের এই প্রখ্যাত নাস্তিক ব্লগারের পরামর্শটি একটু ভালো করে পড়ুন এবং মনে রাখুন, খানিক পরেই এই বিষয়ে ফিরে আসবো।

আসুন আরেকটি উদাহরণ দেখি। সারা বিশ্বজুড়েই নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের বা নিও-এথিস্টদের নাস্তিকতা চর্চার একটা প্রধান প্রসঙ্গ হচ্ছে ইসলাম এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর নানান প্রসঙ্গ নিয়ে। সেটার যৌক্তিক কারণও আছে। কিন্তু প্রায়শই এদের চর্চায় ধর্মের সমালোচনা, গঠনমূলক সমালোচনার গন্ডী পেরিয়ে ঘৃণার রাজ্যে প্রবেশ করে সেটাকেও এই সকল নয়া-নাস্তিক্যবাদী সঠিক মনে করেন। তারা অনেকেই মনে করেন এই ঘৃণার চর্চাও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অংশ। ধরুন, সাম্প্রতিক সময়ে, একজন প্রখ্যাত নয়া-নাস্তিক লন্ডন ভ্রমনে যাচ্ছেন, যাবার আগে তিনি লন্ডনের বন্ধুদের সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন, কিন্তু তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে কোনও মসুলিম মানুষের সাথে দেখা করবেন না, তিনি শুধু মুক্তমনাদের সাথেই দেখা করবেন, সেটাও খুব স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পরিকল্পনা, কিন্তু তাঁর প্রকাশের ভাষাটি পড়ে দেখুনঃ

 

“লন্ডন এখন পাগল কুকুরে ভরে গেছে শুনেছি। পাগলা কুকুর, ঘোঁতঘোঁত করা বুনো শুকর সমতুল্য মুমিনদের সাথে আলাপ করা সম্ভব নয়। যারা মুক্তচিন্তার মানুষ শুধু তাদের সাথে দেখা করা যেতে পারে”।

 

(এই অংশটুকু আসিফ মহিউদ্দিন নামের একজন অতিশয়  বিখ্যাত বাঙালী নয়া-নাস্তিক্যবাদী ও আত্মদাবীকৃত “মানবতাবাদী”র ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া, যার ছবি রয়েছে লেখকের কাছে)

 

এই ভদ্রলোক নিজেকে একজন “মানবতাবাদী” হিসাবে দাবী করেন এবং ইউরোপের বিভিন্ন মানবতাবাদী সংস্থার সভা-সমিতিতে অংশগ্রহনও করে থাকেন। কিন্তু  বাংলায় লেখা এই অংশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি কি কোনও রকমের “ঘৃণা”র আলামত দেখতে পাওয়া যায়? এই ভদ্রলোক কি ইংরাজিতে লেখা একটি প্রবন্ধে বা ব্লগে এই হুবুহু লাইনগুলো ব্যবহার করতে পারবেন? যদি লেখেনও, সেটা কি তাঁর কোনও ইউরোপীয় মানবতাবাদী বন্ধুর সাথে শেয়ার করতে পারবেন? সম্ভবত না। তবুও, নিশ্চিত ভাবেই, এই রকমের লেখালেখিকে বাংলা ভাষাভাষী “মুক্তচিন্তকেরা” মত প্রকাশের স্বাধীনতার অংশ মনে করেন। সে না হয় মনে করা গেলো, কিন্তু আপনি একজন আলাদা মানুষ হিসাবে যদি এই ধরণের মনোভাব কে “ঘৃণাবাদী” হিসাবে চিহ্নিত করেন, সাংস্কৃতিক বর্ণবাদ হিসাবে চিহ্নিত করেন, ইসলামোফোবিয়ার প্রকাশ হিসাবে চিহ্নিত করেন, তাহলেই আপনি হয়ে যাবেন “বামাতি”।

অর্থাৎ, নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের চিন্তাকাঠামোর বাইরে থেকে আপনি যদি প্যালেস্টাইন সমর্থক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি “বামাতি”, আপনি যদি ইজরায়েল এর আগ্রাসনের বিরোধিতা করেন তাহলে আপনি “বামাতি”, আপনি যদি মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণাসূচক বাক্যের ব্যবহারের বিরোধিতা করে থাকেন, তাহলেই আপনি হয়ে যাবেন “বামাতি”। আপনি নাস্তিক কিন্তু নয়া-নাস্তিক্যবাদী চিন্তাকাঠামোকে অনুসরণ করেন না, সুতরাং আপনি “বামাতি”।

 

“বামাতি” প্রসঙ্গে একটা উপরভাসা গবেষণা ও তার ফলাফল

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট, লেখক, ব্লগারকে  জিজ্ঞাসা করেছি, “বামাতি” শব্দটির অর্থ। কাউকে কাউকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনায় জিজ্ঞাসা করেছি, কাউকে মেসেজ ও চ্যাট অপশনে জিজ্ঞাসা করেছি এমনকি কয়েকজনের সাথে দীর্ঘ ফোনালাপ করেও বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের “বামাতি” সংক্রান্ত আলোচনার সূত্র গুলো লক্ষ্য করেছি খুব আগ্রহ নিয়ে। এদের একটা বড় অংশ বলেছেন এটা হচ্ছে একটা “স্ল্যাং” বা গালি ধরণের, বামপন্থিদের মাঝে যারা জামাতে ইসলামীর মতো করে কথা বলেন, মতামত দেন, তাদেরকেই “বামাতি” বলা হয়। প্রায় সবাইকেই আমি প্রশ্ন করেছি, একটা ঠিক-ঠাক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে কি যেখানে বামপন্থীরা জামাতে ইসলামীর মতো করে কথা বলেন? দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমি একজনও পাইনি, যিনি আমাকে একটি ব্যবহারিক উদাহরণ দিতে পারেন, যেখানে জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বামপন্থিদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি একই বিষয়ে একই প্রেক্ষিতে একই রকমের। কেউ বলতে পারেননি, কেউ ব্যাখ্যা করতে পারেননি।  বামপন্থীরা কেউ মনে করেননা প্যালেস্টাইনের ভুমির দাবীটি তাঁদের ধর্মীয় “পূন্যভুমি”র দাবী, বরং তারা মনে করেন ঐতিহাসিক ভাবে এই ভুমিটি আরব অধিবাসীদের, যাদের একটা বড় অংশ ঘটনাচক্রে মুসলিম, সেখানে খৃস্টান এবং ইহুদী সকলেই আছেন। প্যালেস্টাইন আন্দোলন তাই তাঁদের কাছে নিরেট একটা জাতিয়তাবাদী মুক্তিসংগ্রাম। পক্ষান্তরে জামাতে ইসলামী কিম্বা যেকোনো ইসলামী দল মনে করে, প্যালেস্টাইনের সংগ্রামটি ধর্মের সংগ্রাম। ইসলামী ও ইহুদীবাদের মধ্যে সংগ্রাম। প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গে এই দুটো দৃষ্টিভঙ্গি কি এক? কিন্তু যেহেতু উভয় পক্ষেরই অবস্থান ইজরায়েল – আমেরিকার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, সুতরাং যেই এই আগ্রাসনের বিরোধিতা করুক না কেনো, তাঁদের সবাইকে এক নামে ডাকতে হবে, তা সে রাজনৈতিক ভাবে যতই ভিন্ন হোক না কেনো।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের বিরোধিতার জন্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকেও পেতে হয়েছে “বামাতি” খেতাব।   

এখন আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে আবার ফিরে আসি। ফরহাদ মজহার এক সময় বামপন্থী ছিলেন এবং এখন আওয়ামী বিরোধী রাজনীতির ধারায় বিএনপি ও ডানপন্থী দলগুলোর সাথে তাঁর সখ্য রয়েছে, তাই আওয়ামী ঘরানার এক্টিভিস্টদের কাছে তিনি “বামাতি”, নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের কাছে তিনি “বামাতি”। কিন্তু প্রফেসর আনু মুহাম্মদ কেন “বামাতি”? গন-সংহতি আন্দোলনের প্রধান নেতা জোনায়েদ সাকী কেনো “বামাতি”? সংগ্রামী ছাত্রনেতা বাকী বিল্লাহ কেনো “বামাতি”? কিম্বা পেশাদার সাংবাদিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর কেনো “বামাতি”? আনু মুহাম্মদ, জোনায়েদ সাকী, বাকী বিল্লাহ বা নূরুল কবীরদের চিন্তার সাথে জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক চিন্তার মিলের জায়গাটি কোথায়? লেখক ও সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফের লেখালেখি আছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আত্ম-পরিচয়ের সংকট বিষয়ে, তিনিও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, তাই, তাকেও “বামাতি” হিসাবে হরহামেশাই উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কেনো? ফারুকের চিন্তার সাথে জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক চেতনার মিল টা ঠিক কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারেননি। পারেননি তার কারণটা হচ্ছে এসব প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই।

“বামাতি” প্রসঙ্গে আমাদের আওয়ামী বন্ধুরা কিম্বা নয়া-নাস্তিক্যবাদী বন্ধুরা কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলেও বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন নয়। যাদেরকে “বামাতি” বলা হচ্ছে, যে সকল প্রসঙ্গে এক পক্ষকে “বামাতি” বলা হচ্ছে, সেই মানুষগুলোর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান ও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রসঙ্গে তাদের দ্বিমতের যায়গাগুলোকে বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। যেকোনো আগ্রহী লেখক-পাঠক এই বিষয়ে সামান্য কয়েক ঘন্টা ব্যয় করলেই বুঝতে পারবেন। আমার খুব নাতিদীর্ঘ ও খানিকটা উপরভাসা পদ্ধতিতে করা এই গবেষণায় তিনটি বিষয় বা কারণ খুবই উল্লেখযোগ্য ভাবে খুঁজে পেয়েছি –

 

এক  – বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করা বা আওয়ামী বয়ানের পক্ষে না থাকা

দুই  – আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রসঙ্গে অ্যাংলো – আমেরিকান বলয়ের বিরোধিতা করা বা এদের বয়ানের পক্ষে না থাকা

তিন  – নাস্তিকতার চর্চার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক “নয়া-নাস্তিক্যবাদী”দের চিন্তা কাঠামোর বিরোধিতা করা বা এদের বয়ানের স্বপক্ষে না থাকা

 

মোটের উপরে শাসক দলের বয়ানের স্বপক্ষে না থাকাটাই হচ্ছে এই “বামাতি” উপাধি পাবার যোগ্যতা। আরেকদিকে নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের মতো করে নিরীশ্বরবাদীতার চর্চা না করাটাই হচ্ছে এই “বামাতি” উপাধি পাওয়ার শর্ত। 

বোঝা গেলো ব্যাপারটা আসলে ভিন্ন মতের মানুষের মতামতকে “ভিলেইন” বানানোর একটা চর্চা, কৌশল। কিন্তু ভিলেইন বানানোর জন্যে কেনো জামাতের সাথে তুলনা? কেনো “বামপন্থী বাজে লোক”, “ভুয়া বামপন্থী”, “পতিত বামপন্থী”, “মন্দ বামপন্থী”, “খারাপ বামপন্থী”, “প্রতারক বামপন্থী” ইত্যাদি নয়? কেনো জামাতিদের সাথে সমান্তরাল করে “বামাতি” বলা? কেনো জাতীয়তাবাদীদের সাথে তুলনা নয়, কেনো তবলীগী মুসলমানদের সাথে তুলনা নয়, কেনো কওমি বা দেওবন্দীদের সাথে তুলনা নয়? কেনো জামাত এ ইসলামীর সাথে তুলনা? এর পেছনের কারণটা হচ্ছে দানবায়নের রাজনীতি ও সংস্কৃতি। আর কিছুই নয়। আমার মতের সাথে মেলেনা এমন ব্যক্তি, দল, রাজনৈতিক মতাদর্শকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে মোকাবেলার বদলে একটা স্থায়ী “দানব” ইমেজ দেয়া গেলে ভবিষ্যতের পরিশ্রম কমে যায় এবং খুব সহজেই জনগনের সমর্থন আদায় করা যায়, কোনও কিছু ব্যাখ্যা না করেই। আর এই দানব ইমেজটা যদি সমাজে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত কোনও দানব ইমেজ কে ব্যবহার করে করা যায়, তাহলে তো আরো ভালো। জামাত এ ইসলামী ১৯৭১ এ তার রাজনৈতিক ভুমিকার কারণে আমাদের সমাজে আজও একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে স্বীকৃত। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, ১৯৭১ সালে জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক ভাবেই সংগ্রাম করেনি, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে হওয়া যুদ্ধ অপরাধ ও গনহত্যার সক্রিয় অংশীদার ছিলো এই দলটি। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি সত্যিকারের “দানব” হচ্ছে জামাতে ইসলামী। সুতরাং কাউকে দানবায়ন বা “ডেমনাইজেশন” করতে হলে, বাংলাদেশে জামাতে ইসলামীর চাইতে কোনও মোক্ষম সমান্তরাল উদাহরণ আর নেই।   

তাই, একজন মানুষ কেনো সুন্দরবনের পাশে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করছে, কেনো এই বিরোধিতাটি আসলে সঠিক নয়, তার ব্যাখ্যা দেয়ার চাইতে  যদি সেই ব্যক্তিটিকে “জামাত” এর চিন্তার ও রাজনীতির প্রতিরুপ বা প্রতিনিধি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে খুব সহজেই জনগনের কাছে তাঁকে একজন “দানব” হিসাবে হাজির করা যায় এবং একজন “দানব” তো আর যাই হোক কোনও মানবিক কিছুর প্রচারক হতে পারেনা, সুতরাং তাঁকে খারিজ করে দেয়াটা সহজ হয়। অতএব, আনু মুহাম্মদের সকল সংগ্রামকে কয়েক মিনিটে খারিজ করে দেয়া সম্ভব যদি তাঁকে “বামাতি” হিসাবে প্রচার করা যায়। জোনায়েদ সাকি কিম্বা নুরুল কবীরের সকল বুদ্ধিবৃত্তিকে খারিজ করে দেয়া যায় যদি তাঁদেরকে “বামাতি” হিসাবে প্রচার করা যায় এবং প্রতিষ্ঠিত করা যায়। 

এই দানবায়নের রাজনীতিটা পুরোনো, মধ্যযুগে ছিলো, পরবর্তীতে অ্যাংলো-আমেরিকান রাজনীতিতে এটা আধুনিক রুপ পায় এবং অতি সাম্প্রতিক সময়ে বুশ-ডকট্রিনে এসে তার ধ্রুপদী রুপান্তর ঘটে। আসুন খুব সংক্ষেপে দুইটি উদাহরণ দেখি এই অ্যাংলো-আমেরিকান রাজনীতির “দানবায়ন” সংস্কৃতির ইতিহাস থেকে। আর এই পশ্চিমা “দানবায়ন” সংস্কৃতির  অত্যন্ত দুর্বল ও নোংরা বাঙালী ভার্শন হচ্ছে “বামাতি” শব্দটি আর যার আড়ালে রয়েছে আওয়ামী ও নয়া-নাস্তিক্যবাদী প্রচারনা।

 

বারট্রান্ড রাসেল এক “কমিউনিস্ট দানব” এর প্রতিকৃতি

বারট্রান্ড রাসেল কি কমিউনিস্ট কিম্বা বামপন্থি ছিলেন? কিম্বা নাস্তিক? দুটো প্রশ্নেরই উত্তর বিতর্কের জন্ম দেবে।

রাসেল কমিউনিজমকে বলেছিলেন এক্সপেরিমেন্টএবং শুরুর দিকে তিনি এই এক্সপেরিমেন্ট বিষয়ে বেশ খানিকটা আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু তাঁর  সকল আগ্রহের করুণ মৃত্যু ঘটে যখন তিনি ১৯২০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমন করলেন এবং সদ্য বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া লেনিনের সাথে দেখা করলেন। পুরো সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রতি তিনি দারুন বিরক্ত হয়েছিলেন, কমিউনিস্ট সংস্কৃতির নামে যে যান্ত্রিকতা দেখেছিলেন তার প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন। সোভিয়েত রাশিয়া থেকে ফিরে এসে তিনি লিখেছিলেন – “The Practice and Theory of Bolshevism” । বলাই বাহুল্য, পুস্তকটিতে তিনি কমিউনিজমের সমালোচনায় মূখর হয়েছিলেন। তিনি কমিউনিস্টদের বলেছিলেন প্রেম, ভালোবাসা, সৌন্দর্য কিম্বা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক বৃত্তিগুলো না বোঝা কিছু মানুষ। খোদ লেনিনকে তিনি ধর্মবাদীদের মতোই উগ্র বলে বর্ণনা করেছিলেন। লেনিন কে তার মনে হয়েছিলো মানুষের স্বাধীনতা বিষয়ে একজন শীতল অনুভবের মানুষ।  

তবুও রাসেলের বন্ধুমহলে অনেক বামপন্থি ও সাবেক বামপন্থি ছিলেন। তাঁদের সাথে তিনি কিছু যৌথ লেখালেখিও করেন, বলাই বাহুল্য সেই সকল লেখালেখিতে কমিউনিজমের ধারালো সমালোচনাই করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে রাসেল আরেক ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল এর সাথে মিলে ধারাবাহিক ভাবে কিছু লেখা লেখেন যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলো কমিউনিজমের সমালোচনা। স্ট্যালিনের আমলে যে মার্কসবাদের চর্চা ছিলো, তাকে তিনি বলেছিলেন আরেক ধরনের ডগমা” ! কমিউনিজমের কিম্বা টোটালিটারিয়ানিজম বা কর্তৃত্ববাদী শাসন ও সমাজ ব্যবস্থার সমালোচক হিসাবে জর্জ অরওয়েল এর চাইতে প্রখ্যাত কেউ নেই আজকের দুনিয়ায়, রাসেল ও অরওয়েল যৌথ ভাবে কমিউনিজমের সমালোচনা করে একাধিক লেখা লিখেছেন। এমন কি বারট্রান্ড রাসেল কমিউনিজমের প্রতি তাঁর তীব্র বিরোধিতা জানানোর জন্যে ১৯৫৬ সালে একটা প্রবন্ধ লেখেন – “Why I am Not a Communist” শিরোনামে। এই প্রবন্ধটি এতোটাই সূচালো সমালোচনা যে পুজিবাদীদের পক্ষ থেকে কমিউনিজম বা মার্কসবাদের সবচাইতে ভয়ংকর সমালোচনাকেও হার মানায়। ধরুন এই প্রবন্ধে রাসেল লিখছেন এভাবে –

 

The theoretical doctrines of Communism are for the most part derived from Marx. My objections to Marx are of two sorts: one, that he was muddle-headed; and the other, that his thinking was almost entirely inspired by hatred.

(“কমিউনিজমের তাত্ত্বিক ভিত্তি’র বেশীরভাগটাই নেয়া হয়েছে মার্কস এর কাছ থেকে। মার্কস বিষয়ে আমার আপত্তির যায়গাটা দুই ধরণের, এক – সে ছিলো সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত, এলোমেলো ধরণের আর দুই – তাঁর চিন্তার একটা বড় অংশই ছিলো ঘৃণা থেকে উৎসারিত”।)

সূত্রঃ The Basic Writings of Bertrand Russell, ৪৫৭ পৃষ্ঠা, রুটলেজ প্রকাশনী

 

 

মাত্র তিন পৃষ্ঠার এই প্রবন্ধটির ছত্রে ছত্রে রাসেল সমালোচনা করেছেন কমিউনিজমকে, অত্যন্ত রুঢ় ভাষায়। কার্ল মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন সহ আরো অনেকের তীব্র সমালোচনা করেছেন। কমিউনিজম সম্পর্কে রাসেলের লেখালেখি পাঠ করে যেকোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষই বুঝতে পারবেন যে, বারট্রান্ড রাসেল কখনই একজন কমিউনিস্ট ছিলেন না। বামপন্থা, সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের প্রতি তাঁর মোহভঙ্গ ঘটে ১৯২০ সালের দিকে, কিন্তু কমিউনিজম নিয়ে তীব্র ক্ষুরধার সমালোচনামূলক অসংখ্য লেখালেখির পরেও তাঁকে সারা জীবন ধরে শুনতে হয়েছে তিনি একজন “কমিউনিস্ট” বা কমিউনিস্ট সমর্থকের তকমা। সারা জীবন ধরে শুনতে হয়েছে তিনি কমিউনিস্টদের দালাল। বলুন তো কারণ টা কি? কারণটা ব্যাখ্যা করি বিস্তারিত –

আজীবন যুদ্ধ বিরোধী বারট্রান্ড রাসেল (ছবি – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

রাসেল বেঁচে ছিলেন ৯৭ বছর। দীর্ঘকালই বেঁচে ছিলেন ভদ্রলোক। এই দীর্ঘজীবনের পুরো সময়টাই তিনি ছিলেন পশ্চিমা দেশগুলোর বিদেশ নীতির ঘোর সমালোচক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বিরোধী একজন এক্টিভিস্ট হবার কারণে, রাসেল কে ধারাবাহিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। প্রথমে তাঁকে জরিমানা করা হয়। তারপর ব্রিটেনের ভেতরে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে তাঁর বৃত্তি বাতিল করা হয় এবং সবশেষে ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ সরকারের বিদেশনীতিতে অনাহুত হস্তক্ষেপ করার অপরাধে তাঁকে জেল দেয়া হয়। তিনি ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করেছিলেন এবং আমেরিকান সেনাবাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। ছয় মাস জেল খাটার পরে বেরিয়ে আসেন রাসেল, কিন্তু বিশ্ব যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো সময়কালটি তাঁকে কাটাতে হয় ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির মধ্যে। বাট্রান্ড রাসেল ছিলেন আজীবন পশ্চিমা বিদেশনীতির ঘোর বিরোধী। যুদ্ধ বিরোধী ভুমিকার কারণে তিনি সবসময়েই আমেরিকার এবং ইউরোপের প্রধান দেশগুলোর সরকারের কাছে এক রকমের চক্ষুশুল ছিলেন। প্রায়শই তিনি জনগণকে ডাক দিয়ে বসতেন যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে। জনমত গড়ে তোলার জন্যে নিজেই বসে পড়তে রাস্তায়, পাবলিক এলাকায়। হরহামেশাই যুদ্ধ বিরোধী প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন প্রতিবাদ করার জন্যে। প্রতিবাদ করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে, প্রতিবাদ করেছেন ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এমন কি মৃত্যুর দুদিন আগেও তিনি তাঁর শেষ বিবৃতিটি লিখেছিলেন প্যালেস্টাইনে ইসরাইলী আগ্রাসনের প্রতিবাদে জনমত গঠনের লক্ষ্যে।

গত একশো বছরের প্রায় পুরো সময়টায় আমেরিকার প্রধান লক্ষ্য ছিলো “কমিউনিজম” ও কমিউনিস্ট রাশিয়াকে সারা দুনিয়াতে “ভিলেন” হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা। এই লক্ষ্য হাসিলের জন্যে আমেরিকা ব্যয় করেছে শত শত বিলিয়ন ডলার। দুনিয়ার একটা বিশাল অংশে এরা প্রমান করতে পেরেছিলো যে কমিউনিজম একটি ভয়ংকর মতবাদ এবং দুনিয়ার জন্যে দারুন ক্ষতিকর। এই ধারণাটির প্রতিষ্ঠার পর, অ্যাংলো – আমেরিকান বলয়ের কাজ খুব সহজ হয়ে যায়। যেকোনো ভিন্নমতের মানুষকে এরা কমিউনিস্ট বা কমিউনিস্টদের চর বলে উল্লেখ করতে শুরু করলো। “কমিউনিস্ট” বিষয়টাই যেহেতু ভয়ংকর খারাপ কিছু একটা ব্যাপার, তাই কাউকে “কমিউনিস্ট” বা কমিউনিস্টদের সমর্থক হিসাবে প্রচার করতে পারলে বাকী কাজটা সহজ হয়ে যায়।

এই একই পদ্ধতিতে চরম কমিউনিজম বিরোধী বারট্রান্ড রাসেলকেও প্রচার করা হয়েছে কমিউনিস্ট, কমিউনিস্টদের চর, কমিউনিস্ট বায়াসড ইত্যাদি নানান অভিধায়। তার প্রধান কারণ ছিলো রাসেলের অ্যাংলো – আমেরিকান যুদ্ধবাদী নীতির বিরোধিতা করা। রাসেলের কমিউনিজম বিরোধিতার শুরু ১৯২০ সাল থেকেই কিন্তু রাসেল কে সারাজীবন শুনতে হয়েছে “কমিউনিস্ট” এর তকমা। কেনো? কেননা, অ্যাংলো আমেরিকান বলয়ের দরকার ছিলো রাসেলকে দানব আকৃতির একটা ইমেজ দেয়া, আর নব্বুইএর  দশকের আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সেই দানব ছিলো “কমিউনিজম”। নইলে যে বারট্রান্ড রাসেল ১৯২০ সাল থেকেই চরম কমিউনিজম বিরোধী তাকেই কেনো ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এসে শুনতে হবে কমিউনিস্টদের প্রচারনার সমর্থক এর তকমা? রাসেল, আমেরিকা কে যুদ্ধ অপরাধের জন্যে দায়ী করেছিলেন। তিনি আমেরিকাকে যুদ্ধপরাধী হিসাবে আদালতের সামনে নেয়ারও আন্দোলন করেছিলেন এমন কি তিনি নিজেই একটি ট্রাইব্যুনাল করে আমেরিকা কে যুদ্ধপরাধী হিসাবে অভিযুক্ত করেছিলেন (লিংক এখানে )। আর তাঁর বিনিময়ে, আমেরিকা রাসেল কে সারা দুনিয়ার কাছে প্রচার করেছেন একজন “কমিউনিস্ট সমর্থক” হিসাবে।

 রাসেল বার বার বলছেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতার সাথে কমিউনিস্টদের প্রচারকে সমর্থন করার কোনও সম্পর্ক নেই, তিনি বলছেন ভিয়েতনাম বিষয়ে তাঁর তথ্যের সকল উৎস হচ্ছে পশ্চিমের প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও বিবৃতি, তবুও আমেরিকার মিডিয়াগুলো তাঁকে একজন কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডার সমর্থক হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এক পর্যায়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সম্পাদকের সাথে তাঁর একটি দীর্ঘ ও তিক্ত চিঠি চালাচালি হয়। এমন কি সেই চিঠিগুলোর একটিতে তাঁকে আবারো ব্যাখ্যা করতে হয় যে তিনি কতটা কমিউনিজম বিরোধী। কিন্তু তারপরেও ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতার কারণে রাসেলকে কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডার সমর্থক হিসাবেই প্রচার করা হয়েছিলো। (লিংক এখানে)

এই পর্বের লেখার শুরুতে একজন প্রখ্যাত নয়া-নাস্তিক্যবাদী উল্লেখ করেছেন যে ফিলিস্থিনিদের উচিৎ হবে “আন্তর্জাতিক বামাতি”দের উসকানি তে কান না দেয়া। দেখে নিন, একজন “আন্তর্জাতিক বামাতি” তাঁর মৃত্যুর দুইদিন আগে বিশ্ববাসী ও প্যালেস্টাইনি জনগনকে কি বলে গেছেন।

 

“মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট একই সাথে ভয়ংকর এবং ইঙ্গিতময়। প্রায় বিশ বছর ধরে, ইসরায়েল তাঁর শক্তি অস্ত্র বৃদ্ধি করেছেন। যতবার ইসরায়েল তাঁর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে, তার পর পরই তারা প্রস্তাব করেছে নতুন কোনও চুক্তি মেনে নেয়ার জন্যে। এটাই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর আসল চেহারা, এরা শক্তি দিয়ে, আগ্রাসী আক্রমন দিয়ে কোনও কিছু দখল করে নেবার পরে আহবান জানায় তা মেনে নেবার। প্রতিবার দখলের পরে এরা নতুন প্রস্তাব নিয়ে আসে, যেখানে সুবিচার কে উপেক্ষা করা হয়, উপেক্ষা করা হয় এ যাবতকালের সকল আগ্রাসনকে। ইসরায়েলের এই আগ্রাসনকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে, নিন্দা জানাতে হবে। এটা শুধু ইসরায়েলের দখলদারিত্বের প্রতিবাদ নয়, বরং এই জন্যে যে প্রতিটি দখলদারিত্ব বিশ্ববাসীর জন্যে একধরনের এক্সপেরিমেন্ট, কতটা অবিচার, কতটা আগ্রাসন আমরা সহ্য করে নিতে পারি”।  (লিংক এখানে )

 

এই “আন্তর্জাতিক বামাতি”র নাম ছিলো বারট্রান্ড রাসেল। এই লেখার শুরুতে যে প্রখ্যাত বাঙালী নয়া-নাস্তিক্যবাদীর উদ্ধৃত করেছিলাম, তার সাথে মিলিয়ে দেখুন কেনো জনাব বারট্রান্ড রাসেল এই নয়া-নাস্তিক্যবাদীর মতে একজন “বামাতি”। দেখুন এই “আন্তর্জাতিক বামাতি” বারট্রান্ড রাসেল প্যালেস্টাইন সমস্যার সমাধান হিসাবে কি পরামর্শ দিয়েছিলেন –

 

“যারা মধ্যপ্রাচ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের শেষ দেখতে চান, তাদের খেয়াল রাখতে হবে যেকোনো ধরনের শান্তি প্রচেস্টাতে যেনো কোনও সংঘর্ষের বীজ লুকিয়ে না থাকে। এই সংকটের সত্যিকারের সুবিচার করতে হলে, প্রথম যা করতে হবে তা হলো ১৯৬৭ সালের জুন মাসে ইসরায়েল যে ভুমি দখল করে নিয়েছে প্যালেস্টাইনী জনগনের কাছ থেকে তাঁর পুরোটাই ফিরিয়ে দিতে হবে। প্যালেস্টাইনকে ইসরায়েলী দখল মুক্ত করতে হবে। বিশ্বজনমত গড়ে তোলা দরকার মধ্যপ্রাচ্যের এই জনগোষ্ঠীর উপরে চলমান অত্যাচারের সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্যে”। (লিংক এখানে )

 

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, কেনো আমাদের বাঙালী নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের মতে জনাব বারট্রান্ড রাসেল একজন “আন্তর্জাতিক বামাতি”। কেননা জনাব রাসেল এর সারা জীবনের সংগ্রাম ছিলো অ্যাংলো-আমেরিকান যুদ্ধবাদিতার বিরুদ্ধে। কেননা জনাব রাসেল প্যালেস্টাইনের মানুষের মুক্তির স্বপক্ষে দাড়িয়েছিলেন সারা জীবন, তার কি “বামাতি” না হয়ে কোনও উপায় আছে?

 

 নোম চমস্কি – “রেগ্রেসিভ লেফট’দের গড ফাদার”

নোম চমস্কি জন্মেছিলেন ১৯২৮ সালে অর্থাৎ বারট্রান্ড রাসেলের জন্মের প্রায় ৫৬ বছর পরে। কিন্তু দুজনেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পৃথিবীর দুই প্রান্তে সরব ছিলেন। বুড়ো রাসেল আর যুবক চমস্কি, দুনিয়ার দুই প্রান্তে সরব মার্কিন যুদ্ধবাদীতার বিরুদ্ধে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এমআইটি’র ভাষাতত্ত্ব বিভাগের তরুন অধ্যাপক চমস্কি আমেরিকায় প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন। এর আগে ১৯৬৬ সালে আমেরিকার যুদ্ধবাদী বিদেশনীতির প্রতিবাদ হিসাবে তিনি “ট্যাক্স না দেওয়ার” আন্দোলনে শামিল হন এবং গ্রেফতার হন ও কারাবরণ করেন। সেই সময় থেকে আজ অবধি নোম চমস্কি নিরন্তর ভাবে মার্কিন বিদেশনীতির একজন কঠোর সমালোচক।   তিনি এক অদ্ভুত নির্মোহ ভঙ্গীতে ইতিহাস বলে যান। মানব ইতিহাসের প্রধান ধ্বংসকারী শক্তি পশ্চিমা শক্তির কথা তাই উঠে আসে তাঁর বর্ণনায়। আফ্রিকায় বেলজিয়ান রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড এর গনহত্যা থেকে শুরু করে হাল আমলের ইরাক ও আফগানিস্তানের গনহত্যা কিম্বা প্যালেস্টাইনের উপরে আমেরিকা-ইজরায়েল এর গনহত্যার সমালোচনা করে চলেছেন তিনি।

Image result for noam chomsky

অধ্যাপক নোম চমস্কি, আমেরিকার যুদ্ধবাদীতার বিরোধিতা করার জন্যে, তাকেও পেতে হয়েছে “রিগ্রেসিভ লেফট” বা “বামাতি” তকমা

একথা সত্য যে নোম চমস্কি তাঁর ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সাথে সংযুক্ত ছিলেন। খুব সুনির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন বলে জানা যায়না কিন্তু বামপন্থীদের নেতৃত্বে কর্মসুচী ভিত্তিক বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহন করেছেন। ব্রাট্রান্ড রাসেলের মতো কঠোর সমালোচক না হলেও, নোম চমস্কিও মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এর ধারালো সমালোচনা করেছেন, এক দুইবার নয়, বহুবার। আসুন দুই একটি নমুনা দেখিঃ

 

Leninism was in my view counterrevolutionary. It wasn’t instituting communism. There was a popular revolution, in fact there had been for years, through 1917 it grew very substantially from February on. Lenin basically tried to take control of it. If you take a look at his writings in 1917 they went way to the left. April Thesis, State and Revolution the most radical things he ever wrote, almost anarchist. My view is that it was basically opportunism. I don’t think he believes a word of it. It seems to me that he was trying to associate himself, become the leader of the revolutionary popular forces.

(আমার মতে লেনিনবাদ ছিলো প্রতিবিপ্লবী মতবাদ। এটা আসলে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করেনি। একটা জনপ্রিয় বিপ্লব হয়েছিলো, আসলে বেশ কয়েক বছর ধরেই সংঘটিত হএয়ছিলো তা, কিন্তু ১৯১৭ তে এসে তা উল্লেখযোগ্য ভাবে বড় হয়ে উঠলো, বিশেষত ফেব্রুয়ারীর পরে। আপনি যদি ১৯১৭ সালের দিকের তার লেখালেখি গুলো দেখেন, দেখবেন দারুন বিপ্লবী সব কথা। “এপ্রিল থিসিস”, “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” আরো অনেক র‍্যাডিক্যাল সব লেখা, প্রায় এনারকিস্ট ধরণের লেখালেখি। কিন্তু আমার মতে এসব ছিলো এক ধরণের সুবিধাবাদ, আমি মনে করিনা সে এইসবের কানাকড়িও বিশ্বাস করতো।

লিংক এখানে

 

উপরের এই একই সাক্ষাতকারে, চমস্কি নানান প্রসঙ্গে সমাজতন্ত্র, লেনিনবাদ এমন কি মার্কসবাদেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি সরাসরি বলেছেন, লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবটি মোটেও সমাজতান্ত্রিক ছিলো, বরং এর মধ্যে নানান ধরণের ডানপন্থী উপাদান ছিলো। তিনি উল্লেখ করেছেন, মার্কসবাদ সম্পর্কে তার মতামতের জন্যে কথিত মার্কসবাদীরা তার উপরে চড়াও হয়েছিলো তীব্র সমালোচনা নিয়ে। তিনি উল্লেখ করেছেন, কার্ল মার্কসের বিশ্লেষণ ছিলো দারুন ধ্রুপদী ধরণের, কিন্তু ভবিষ্যৎ সমাজ সম্পর্কে তার কোনও পরিকল্পনা ছিলোনা… ইত্যাদি ইত্যাদি… ! অর্থাৎ, মার্কসবাদ বা কমিউনিজম নিয়ে নোম চমস্কির আশাবাদের চাইতে সমালোচনাই ছিলো বহুগুন বেশী। কিন্তু তারপরেও তাকেও সারাজীবন শুনতে হয়েছে – বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের চর, গড ফাদার ইত্যাদি তকমা। যদিও বামপন্থীদের সাথে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির রয়েছে সুস্পষ্ট তফাৎ এবং বিতর্ক। তাহলে কেনো তাঁকে এই ধরনের তকমা দেয়া হয়?

অধ্যাপক নোম চমস্কি’কে “রিগ্রেসিভ লেফটদের গডফাদার” হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন এই সময়ের নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের একজন প্রধান পুরোহিত জনাব স্যাম হ্যারিস। স্যাম হ্যারিস তাঁর ঘোষণা জানিয়েছেন তাঁর লেখায়, টুইটার বার্তায় এবং ইউটিউবে তাঁর ভিডিওতে (লিংক এখানে )। নোম চমস্কি শুধু স্যাম হ্যারিসের নন, আমেরিকার সকল ডানপন্থীদের চক্ষুশূল হয়ে আছেন গত কয়েক দশক ধরে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমেরিকার যুদ্ধবাদী ভুমিকার বিরোধিতা করা। এর প্রধান কারণ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যকে “নরক-গুলজার” বানিয়ে তোলার জন্যে আমেরিকা-ইজরায়েল এর ভুমিকার কথা সারা বিশ্ববাসীকে জানানো। নোম চমস্কি এই কাজটি করে যাচ্ছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে।    

কিন্তু “রিগ্রেসসিভ লেফট” কথাটির মানে কি? হয়তো নিরেট শাব্দিক অর্থ ধরলে বলা যেতে পারে “প্রতিক্রিয়াশীল বামপন্থী”। আমরা সারা জীবন শুনে আসলাম, বামপন্থীরা প্রগতিশীল কিম্বা প্রগতিশীল মানুষেরাই কম-বেশী বামপন্থী, কিন্তু আজকের যুগে কি এমন হলো যে বামপন্থীদেরকে “প্রতিক্রিয়াশীল” তকমা পেতে হচ্ছে? আসুন আগে “রিগ্রেসিভ লেফট” বিষয়টা বুঝি তারপরে না হয় এরও শুলুক সন্ধান করা যাবে।

সাংবাদিক গ্রীনওয়াল্ড, ব্যক্তিজীবনে নাস্তিক ও একজন সমকামী মানুষ, তাকেও পেতে হয়েছে ইসলামের তোষনকারী’র তকমা

নয়া-নাস্তিক্যবাদী ব্লগ, উইকিপেডিয়া ও অন্যান্য লেখালেখির সূত্রে জানা যায়, “রিগ্রেসসিভ লেফট” শব্দটি প্রথম চালু করে সাবেক ইসলামী জঙ্গী কর্মী ও বর্তমানে ইসলামিক লিবারাল হিসাবে দাবীদার জনাব মাজিদ নাওয়াজ। আর এই শব্দটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন জনাব স্যাম হ্যারিস বা বিল মাহের বা ডেইভ রুবিনের মতো নয়া-নাস্তিক্যবাদীরা। এদের বক্তব্য অনুযায়ী, “রিগ্রেসিভ লেফট” হচ্ছে তারা, যারা বহুত্ববাদের নামে ইসলামের সমালোচনা কে বাধা দেন কিম্বা রাজনৈতিক ভাবে সঠিক থাকার জন্যে ইসলামের সমালোচনাকে বাধা দিয়ে থাকেন বা ইসলামের মন্দ দিকগুলোকে গোপন করেন। উদাহরণ হিসাবে এঁরা ব্রিটিশ লেবার পার্টির প্রধান জেরেমি করবিন কিম্বা অধ্যাপক নোম চমস্কির নাম উল্লেখ করেন। শুধু তাই নয়, এদের এই তালিকায় রয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক আলী, ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায়, অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক জন পিলজার কিম্বা মার্কিন সাংবাদিক গ্লেন গ্রীনওয়ার্ল্ড। একটা বিষয় খেয়াল করে দেখুন যে, এই নামগুলোর মাঝে একমাত্র তারিক আলী হচ্ছে মসুলিম সমাজ থেকে উঠে আসা (যদিও আজীবন নাস্তিক), বাকী সবাই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান ও সমাজ থেকে উঠে আসা মানুষ। এঁরা সবাই নাস্তিক ও ধর্মের ও ধর্মীয় মৌলবাদের কঠোর সমালোচক।  কিন্তু এদের সবারই একটা বিষয়ে দারুন মিল, তা হচ্ছে এঁরা সবাই প্রচন্ড ভাবে মার্কিন যুদ্ধবাদিতার বিরুদ্ধে। এঁরা সবাই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইজরায়েল দোস্তালির বিরুদ্ধে। এঁরা সবাই নাস্তিক হবার পরেও নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের মতে এঁরা নাকি ইসলামের সমর্থক। কিন্তু এই নাস্তিকেরা কেনো ইসলাম কে সমর্থন করবেন? এঁরা সকলেই সৌদী আরব, কাতার, পাকিস্তানের উচ্চকন্ঠ সমালোচক। এঁরা যদি ইসলামের সমর্থকই হতো, তাহলে কি সৌদী আরব, কাতার কিম্বা পাকিস্তানের সমালোচনা করতেন? এমন কি সাংবাদিক গ্লেন গ্রীনওয়ার্ল্ড প্রশ্ন করেছেন, তিনি নিজে একজন সমকামী মানুষ, তিনি জানেন, ইসলামে সমকামীতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, এটা জানার পরে তার কি ইসলামের সমর্থক হওয়ার কথা? নাকি ইসলাম থেকে হাজার মাইল দূরে দূরে থাকার কথা?

মূলত এখানেও হিসাবটি একই, দানবীকরন বা “ডেমোনাইজেশন”। আসুন আরেকটু ইতিহাসের দিকে তাকাই, দেখা যাক কে বা কারা ইসলামের তোষনকারী, প্রতিপালক আর কি ছিলো সেসবের উদ্দেশ্য।  পঞ্চাশের দশকে প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার একটি চিঠিতে লিখছেন –

 

”we wanted to explore the possibilities of building up King Saud as a counterweight to Nasser. The king was a logical choice in this regard; he at least professed anti-communism and he enjoyed, on religious ground, a high standing among all Arab nations”

(“আমরা দেখতে চেয়েছিলাম বাদশাহ সৌদ কে নাসেরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যায় কিনা। এই বিষয়ে, বাদশাহ সৌদ ছিলেন যৌক্তিক নির্বাচ্‌ তিনি অন্তত কমিউনিজম বিরোধী ছিলেন এবং আরব জাতিগুলোর মাঝে তার একটা ভালো গ্রহণযোগ্যতা ছিলো”)

সূত্রঃ  Devil’s Game: How the united States Helped Unleash Fundamentalist Islam (New York: Henry Holt, 2005, 121)

 

দেখুন, কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদী আরবের বাদশাহ সৌদ কে সমর্থন করেছেন, গড়ে তুলেছে মিশরের রাষ্ট্রপতি নাসের যিনি কট্টর ইসলামী মৌলবাদী “মুসলিম ব্রাদারহুড” কে বহিস্কার করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে। সৌদী বাদশাহ কে দিয়ে আমেরিকার দুইটি কাজ সাধিত হয়েছিলো, এক – আরবের সেকুলার নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দেয়া আর দুই – সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ও মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে “কমিউনিস্ট” আতংক ছড়িয়ে দেয়া। 

 

যে বছর রাষ্ট্রপতি আইজেন হাওয়ার তার এই গোপন চিঠিতে সৌদী বাদশাহকে নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা জানান, তারপরের বছরেই তিনি হোয়াইট হাউসে, অতিথি হিসাবে স্বাগত জানান, “মুসলিম ব্রাদারহুড” প্রধান হাসান আল বান্না’র জামাই সাইদ রামাদান কে, এই সাইদ রামাদানের নেতৃত্বে পরে জার্মানিতে এবং ইউরোপের নানান স্থানে মুসলিম ব্রাদারহুড গঠিত হয়, আর তার অর্থায়ন আসে সৌদী আরব আর সিআইএর’র পকেট থেকে।

সূত্রঃ

Islamophobia and the Politics of Empire, Deepa Kumar, Published August 7th 2012 by Haymarket Books (first published July 17th 2012)

Introduction to Secret Affairs: Britain’s Collusion with Radical Islam, Mark Curtis, Published March 2012

 

সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদী আরবের নেতৃত্বে ইসলামী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়নের ইতিহাস আজ আর কারো অজানা নয়। কমিউনিজম কে একটা দানবীয় রুপ দেবার জন্যে ইসলামী শক্তিকে টাকা দিয়ে সাহায্য দিয়ে পেলে পুষে বড় করেছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই।  কিন্তু ইজরায়েল আসলো কবে থেকে এই দোস্তালীর মধ্যে? আসুন দেখি কিভাবে হলো তা –

দীপা কুমার লিখছেন (উপরে উল্লেখিত সূত্র), সত্তুরের দশকের শেষ দিক থেকেই আমেরিকা ও আমেরিকান ওরিয়েন্টালিস্ট এবং ইজরায়েল মিলে একটি নতুন ধারণা তৈরী করার চেষ্টা করতে লাগলো, তা হচ্ছে “সন্ত্রাসবাদী”। তখনও ঠিক হয়ে ওঠেনি আসলে কাদের প্রতি ব্যবহৃত হবে এই শব্দটি। কিন্তু খুব অচিরেই ঠিক হয়ে যায়, কাদের প্রতি ব্যবহৃত হবে এই শব্দটি। ইজরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু দুটি বেশ বড়ো সড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন আশির দশকে। একটি ১৯৭৯ সালে আরেকটি ১৯৮৪ সালে। এই প্রথম সম্মেলনটি হয় জেরুজালেমে এবং আমেরিকা ও ইজরায়েল সমর্থক বিশ্বনেতারা একমত হন যে “সন্ত্রাসবাদ” হচ্ছে আজকের দুনিয়ার সবচাইতে বড় হুমকি।

দ্বিতীয় সম্মেলনটি হয় ১৯৮৪ সালে, ওয়াশিংটন শহরে। এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকে প্রখ্যাত অরিয়েন্টালিস্ট বারনারড লুইস, এলি কিদৌরী এবং আরো অনেকে। এখান থেকে আগের সম্মেলনের “সন্ত্রাসবাদ” শব্দটিকে আরো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয় “ইসলামী সন্ত্রাসবাদ”। এই সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় ইজরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু ব্যাখ্যা করেন, পশ্চিমের জন্যে সবচাইতে বড় দুটো শত্রু’র একটি হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে “ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ”। আমেরিকার দক্ষিনপন্থী রাজনীতি আর ইজরায়েল এর স্বার্থ এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। যেহেতু ততদিনে কমিউনিজমের পতনের ঘন্টা বেজে গেছে, তাই আমেরিকার তৈরী “ইসলামী শক্তি”কে আর দরকার নেই। তাই তখন শুরু হলো ইজরায়েল এর স্বার্থে তার দানবায়নের পালা। যে আমেরিকার কাছে ইসলাম ছিলো সহযোগী শক্তি কমিউনিজম নামের ভুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, আশির দশকে এসে সেই ইসলাম হয়ে উঠলো নতুন হুমকি। তাই নব্বুই এর দশকের শেষ দিকে কমিউনিজমের পতনের মধ্যে দিয়ে বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে ভিলেইন হিসাবে বেঁচে রইলো কেবল “ইসলামী সন্ত্রাসবাদ”। সুতরাং কাউকে দানবীকরন বা “ডেমোনাইজ” করার জন্যে এখন আর কমিউনিস্ট বলাটা খুব আবেদনময় রইলোনা। তাই পশ্চিমা ডানপন্থী ও যুদ্ধবাদীদের হাতে একটাই অস্ত্র রইলো, ভিন্নমতের মানুষদের দানবীকরনের জন্যে, আর তা হচ্ছে কোনও ভাবে ইসলামের সাথে বা ইসলামী সন্ত্রাসবাদের সাথে সেই ব্যক্তিকে যুক্ত করে দেয়া। নইলে অরুন্ধতী রায় কিম্বা নোম চমস্কি’র তো ইসলামী তোষক হবার কথা নয়।  

তাই ধারণাগত দিক থেকে, পশ্চিমের “রিগ্রেসিভ লেফট” আর বাংলাদেশের “বামাতি” হচ্ছে একই মায়ের পেটের দুই ভাই। একজনের জন্ম পশ্চিমের ডানপন্থীদের হাতে আর আরেকজনের জন্ম পুবের ডানপন্থীদের হাতে। দুটোরই উদ্দেশ্য এক, ভিন্নমতের মানুষদের দানবীকরন নিশ্চিত করা। আর এই কাজে তাঁদের সাথে আছে একটা বিরাট পান্ডা বাহিনী এবং পোষ্য মিডিয়া। তাই এর বিপরীতে প্রগতিশীল, বামপন্থী মানুষদের করনীয় কি? বলছি –

 

“বামাতি” প্রসঙ্গে বামপন্থী, প্রগতিশীল ও উদারনীতিবাদী মানুষদের করনীয়

এই দীর্ঘ লেখাটি লেখার উদ্দেশ্যটি হচ্ছে – এটা প্রমান করে দেয়া যে আওয়ামীলীগের অনলাইন ষন্ডাদের আবিষ্কৃত ও কোনও কোনও নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের ব্যবহার করা “বামাতি” শব্দটি আসলে আমাদের দেশে চলমান ও ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির একটা প্রকাশ মাত্র। আন্তর্জাতিক ভাবেও এই প্রবণতাটি বিদ্যমান, আমেরিকান ডানপন্থী ও তাঁদের মিত্রদের দ্বারা ব্যবহৃত “রিগ্রেসিভ লেফট” হচ্ছে বাঙালী “বামাতি”র আরেক সংস্করণ।   ভিন্ন মতের মানুষের মত প্রকাশ কে থামিয়ে দেয়ার একটা ওজর, ভিন্নমতের মানুষদেরকে দানবীকরনের একটা স্থুল পদ্ধতি। এটা বোঝা দরকার এবং এর বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম জারি রাখা দরকার। যেখানে যেই এই শব্দটির ব্যবহার করবে, বুঝতে হবে, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে ফ্যাসিবাদী। আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যেকোনো মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম জারি রাখাটাই জরুরী, তা সে আওয়ামী পান্ডাদের কাছ থেকেই আসুক কিম্বা অবিকশিত নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের কাছ থেকেই আসুক।

চ্যালেঞ্জ করুন, সবাই কে চ্যালেঞ্জ করুন, যখনই কেউ “বামাতি” বলে উল্লেখ করবে, তাকে – তাঁদেরকে চ্যালেঞ্জ করুন। 

 

(প্রথম পর্বের লেখাটি এখান থেকে পড়তে পারেন।)

 

Spread the love