(এই সিরিজ টি “রিভারবেন্ড” ছদ্মনামের একজন ব্লগার এর লেখা ব্লগপোস্ট এর বাংলা অনুবাদ। মূল লেখাটি পুস্তকাকারে দুই খন্ডে প্রকাশিত এবং এর ইংরাজী নাম ছিলো – “Baghdad Burning: Girl Blog From Iraq”, নিউ ইয়র্ক সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেমিনিস্ট প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে এই পুস্তক টি। সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিলো এই ব্লগ সিরিজটি। ইরাকযুদ্ধে মার্কিন এবং পশ্চিমা বাহিনীর সীমাহীন ধ্বংসলীলা যা পশ্চিমা মিডিয়ায় আসেনি তার সকরুণ বর্ণনা পাওয়া যাবে এই ব্লগে। পশ্চিমা দেশগুলোর নোংরা রাজনীতি আর নজিরবিহীন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনেরও একটা জীবন্ত দলিল এই ব্লগ সিরিজটি। বাগদাদ সহ সমগ্র ইরাককে কিভাবে জাতিগত ভাবে, অর্থনৈতিক – রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে এই ব্লগে। অনুবাদ টি যতটা সম্ভব মূলানুগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে কিছু টিকা ব্যবহার করা হয়েছে বন্ধনীর ভেতরে।

বোঝার সুবিধার্থে বলে নেয়া ভালো, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের যৌথ বাহিনী ইরাক আক্রমন করে ২০০৩ সালের ১৭ মার্চ তারিখে। প্রায় আড়াই মাসের যুদ্ধের পরে মার্কিন রাস্ট্রপতি জর্জ বুশ ঘোষণা করেন যে যুদ্ধ আপাতত শেষ। কিন্তু সে যুদ্ধ স্থায়ী হয় প্রায় নয় বছর। পশ্চিমা বিশ্ব আজ স্বীকার করে নিয়েছে, এ এক অনৈতিক যুদ্ধ, যে যুদ্ধে কোনও পক্ষই জয়ী হয়না। কেবল মানুষ খুন হয় লাখ লাখ, জনপদ ধ্বংস হয় আর ছড়িয়ে পড়ে এক চিরস্থায়ী ঘৃণা, মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের।

এই লেখাটি ইরাক যুদ্ধের কোনও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, এটা নিরেট একজন মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যিনি যুদ্ধের মাঝে বেঁচে ছিলেন। সুতরাং যারা ইরাক বিষয়ে গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রত্যাশী, এই লেখাটি তাঁদের প্রত্যাশা পুরন করবেনা। কিন্তু বলাই বাহুল্য, বিভিন্ন রিভিউ অনুযায়ী – ইরাক যুদ্ধের উপর এই পুস্তক টি একটি অবশ্য-পাঠ্য পুস্তক।

অনুবাদ বিষয়ে যেকোনো উপদেশ, মন্তব্য স্বাগত জানাই। যেহেতু এটা ভিন্ন একজন লেখকের আত্মজৈবনিক লেখা, তাই মূল লেখার বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোনও আলোচনা, মন্তব্যের জবাব দেয়ার সুযোগ নেই।)

রবিবার, আগস্ট ১৭, ২০০৩

গোড়ার কথা

আমার ধারণা, এটাই হলো আমার জন্যে শুরুর কথা। আমি কখনই ভাবিনি আমি নিজে একদিন আমার ব্লগ শুরু করবো। মোটের উপরে আমার মনে আছে – আমি সব সময়ই ভেবেছি শুরু করবো আবার চিন্তা করেছি – শুরু না হয় করা যাবে কিন্তু কে পড়বে? আমার মনে হয়েছিলো আমার হারাবার কিছু নেই, কিন্তু আমি পাঠক কে সাবধান করছি, অনেক অভিযোগ শুনতে হবে, পড়তে হলে অনেকের অনেক ধরনের কথা শুনতে হবে।

খানিকটা আমার সম্পর্কে – আমি একজন ইরাকী নারী, বয়স ২৪ বছর। আমি ইরাক যুদ্ধে এখনও বেঁচে যাওয়া একজন। ব্যস আপাতত এটাই আমার সম্পর্কে, এই যুদ্ধের বাজারে, এর চাইতে বেশি জেনেই বা কি হবে?

জেগে ওঠা
ইদানিং কালের ইরাকী সমাজে, ঘুম থেকে জেগে ওঠাটা এক ধরনের অত্যাচার কিম্বা হয়তো কোনও বিরাট অপরাধের জন্যে বিচারের মুখোমুখি হওয়া। এধরনের হচ্ছে প্রায় দুই এক দিন অন্তর, কখনও খুব ধীরে আবার কখনও বা খুব আকস্মিক বিরাট ঝাকুনি দিয়ে। ধরুন এই খুব ধীর প্রক্রিয়াটা এই রকমের – আপনি হয়তো প্রায় ঝুলে আছেন কোনও এক ধার থেকে, প্রায় অবচেতন মনের ভিতর থেকে মানসিক ভাবে হয়ত প্রায় অস্পস্ট হয়ে যাওয়া একটা স্বপ্ন কে ধরার চেষ্টা করছেন, কখনও বা স্বপ্নটির খানিকটা অংশ কে… কখনও কখনও স্বপ্নের অংশ গুলো চারপাশে লাফ দিয়ে বেরিয়ে যায় কুয়াশার মতো। এখন সবচেয়ে ঠান্ডা রাত গুলোতেও প্রায় ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা থাকে। এরকমের সময়ে মানুষের চোখ খোলাই থাকে তবুও চোখে অন্ধকার দেখি আমরা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যায়। সিলিং পাখাটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায় এবং যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন আমরাও সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে যাই। চেস্টা করি ঘুমানোর জন্যে এবং আশা করি যে সিলিং ফ্যানটা বন্ধ হবেনা, আমাদের মস্তিস্কের মতোই চালু থাকবে।

জেগে ওঠার আরেকটি ধরন হচ্ছে হঠাত করে বাস্তবতার মধ্যে পড়ে যাওয়া। আমাদের বাস্তবতা মানে হচ্ছে গোলাগুলি, বোমার তীব্র শব্দ অথবা মানুষের চিৎকার। প্রথমে উঠে বসা, ভয়ার্ত হয়ে, প্যানিকড হয়ে তারপর কোনও দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে ভেঙ্গে পড়া। কি হতে পারে? কোনও একজন ছিচকে চোর বাড়ীতে ঢুকেছে? কিম্বা ডাকাত দল? কিম্বা পুরো বাড়ীতেই কোনও আক্রমন? হয়তোবা বোমা বিস্ফোরন অথবা নিয়ম মাফিক কোনও একটি আমেরিকান বাহিনীর তল্লাশী অভিযান বা “রেইড” !

সোমবার, আগস্ট ১৮, ২০০৩

আরেকটা দিন …
আজকের দিনটা একটা স্বাভাবিক দিন। সকালে উঠে অন্যান্য দিনের মতোই কিছু দৈনিক “স্বাভাবিক” কাজ করা। স্বাভাবিক কাজ মানে হচ্ছে – প্রথমে চেক করা পানির ট্যাংকে পানি আছে কিনা, খোঁজ খবর করে বোঝার চেস্টা করা, কখন বিদ্যুৎ যাবে আর কখন থাকবে, রান্না ঘরে যথেষ্ট গ্যাস আছে কিনা সেটাও দেখে নিতে হয় প্রতিদিন। দিনের শুরুতে এই হচ্ছে আমাদের রুটিন কাজ।

ইন্টারনেটে কোনও কিছু পোস্ট করার সবচাইতে বড় যন্ত্রনা কি জানেন? বিশেষ করে কোনও চ্যাট রুম বা চ্যাট সাইটে কিছু পোস্ট করতে গেলে? প্রথম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে (সাধারণত আমেরিকানদের কাছ থেকে আসে) – “তুমি মিথ্যা কথা বলছো, তুমি আসলে ইরাকী না”। অর্থাৎ তাঁদের ধারণা হচ্ছে, আমি আসলে ইরাকী নই। কেনও আমি ইরাকী নই? কারণ আমার ইন্টারনেট সংযোগ আছে। কেনও আমি ইরাকী নই? কারণ আমি জানি কিভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়, কারণ আমি ইংরেজিতে লিখতে পারি। অর্থাৎ এরা মনে করে – ইরাকীদের ইন্টারনেট সংযোগ ছিলোনা, ইরাকীরা ইন্টারনেট বা কম্পিউটার ব্যবহার করতে জানেনা কিম্বা ইরাকীরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারেনা। সুতরাং এদের ধারণা আমি ইরাকী নই বরং আমি হয়তো একজন আমেরিকান লিবারেল ! আমার বা আমাদের প্রতি এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি্র কারণে হয়তো আমার বিরক্ত হওয়া উচিত নয়, কিন্তু কেনও জানিনা আমি বিরক্ত হই, এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে বিরক্ত করে। মাঝে মাঝে আমি যখন রাস্তায় তাকাই, দেখি আমেরিকান সৈন্যরা হাটাহাটি করছে, ওদের দেখি আর ভাবি – “ ও আচ্ছা, ইরাক দখলের আগে তাহলে আমাদের সম্পর্কে এই ধরনের আইডিয়া বা ধারনাই ছিলো তোমাদের? অথবা এই ধরনের ধারণা করছে এখন আমাদের নিয়ে? এরা কি আমাদের আরেকটা আফগানিস্থান ভাবে?

গত দুইদিনের সবচাইতে ভালো সময় হচ্ছে আমরা গতকাল টিভি দেখতে পেরেছি। আমাদের চক্রক্রমিক প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল এর সর্বশেষ খবর দেখেছি আমরা। জর্ডান চেষ্টা করছে ওয়াশিংটনের কাছে দেন দরবার করার যেনো তারা ইরাকের কয়েকজন রাস্ট্রপতির একজন আহমাদ সালাবী কে তাঁদের হাতে তুলে দেয়। এটা একটা দারুন ঘটনা ছিলো টিভিতে দেখার মতো। ব্রেমার (অন্তর্বর্তী কালের জন্যে বুশ প্রশাসন মনোনীত ইরাকের প্রধান প্রশাসক) এর হাতে নির্বাচন করা ইরাকের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে সালাবী ছিলো আমার সবচেয়ে পছন্দের (কৌতুকার্থে) ! এই কয়েকমাসের শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে, ব্রেইমার যদি সত্যিই ইরাকীদের কাছ থেকে কিছু শিখে বা বুঝে থাকে, তাহলে সে আহমেদ সালাবী কে গলায় একটা লাল ফিতা বেঁধে (শুভকামনার চিহ্ন হিসাবে) জর্ডান প্রশাসনের কাছে তুলে দিতো। আমি আজ পর্যন্ত কাউকে দেখিনি এই ইঁদুরটিকে পছন্দ করতে আর তার সঙ্গী কামবার আরো অধপতিত।

যারা ইরাকের এই অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে জানেন না তাঁদের জন্যে একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। ইরাকের এই অন্তর্বর্তী সরকার (গভর্নিং কাউনসিল)। যেহেতু ইরাকী জনগন এখন আর নির্বাচন করতে পারেনা, কোন কোন ক্ষমতালোভী মানুষেরা ইরাকের প্রশাসক হতে পারে তাই বুশ প্রশাসনের প্রতিনিধি ব্রেইমার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আপাতত তিনজন ইরাকী পালা করে ইরাক কে শাসন করবেন। যতদিন মার্কিন প্রশাসন ইরাকের জন্যে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে না পারছে, ততদিন এরা অস্থায়ী রাস্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথমদিকের এই তিন জন অস্থায়ী রাস্ট্রপতি হচ্ছেন – ইসলামী বিপ্লবের মজলিশ এ সুরার আল হাকিম, আরেকজন শিয়া মোল্লা বাহর আল উলুম, এবং আদনান আল পাসিসি। স্বাভাবিক ভাবেই ইরাকী প্রশাসনের অন্য সদস্যরা অভিযোগ করেছে – কেনও ইরাকীদের মাত্র তিনজন রাস্ট্রপতি থাকবেন? কেনও আরো বেশি নয়? ফলে এই সংখ্যাটি তিন থেকে বেরে হয়ে গেলো নয়জনে। এই নয়জন মিলে। এই নয়জনের প্রত্যেকে (আদনান আল পাসিসি, আহমেদ আল ছালাবি, আল হাকিম সহ অন্যান্যরা) এক মাস করে ইরাকের প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব পালন করবে। এসবের অর্থ হচ্ছে – ইরাক আসলে আরো বেশি অস্থিতিশীলতা চায়, এই যেমন প্রতি মাসেই একজন করে নতুন রাস্ট্রপতি পাওয়ার মতো ঘটনা। যাইহোক, আমাদের বর্তমান মাসের “সুগন্ধী” হিসাবে এসেছেন ইব্রাহিম আল জাফফারী, যিনি সাদ্দাম আমলে সারা ইরাকে বোমাবাজির জন্যে কুখ্যাত । তাঁর সম্পর্কে পরে আরো লিখবো।

সবচাইতে হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, এই নয়জন ইরাক কে শাসন করার সুযোগ পান তাঁদের নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী, তাও আবার আরবী বর্ণমালার ক্রম অনুযায়ী। এই নামের আদ্যক্ষর দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একমাত্র কারণ হচ্ছে – এদের প্রত্যেকেই একই রকমের দালাল, অসৎ এবং অপদার্থ, তাই তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে কাকে কখন রাস্ট্রপতির ভার দেবেন সেটা নিয়ে। এই ঘুরে ফিরে রাস্ত্রপতি হবার বিষয়টা যেভাবে কাজ করে তাহলো, এরা প্রত্যেকেই একবার করে রাস্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করার পরে, ব্রেইমার ঠিক করবেন কে হবে পরবর্তী পছন্দ। এক্ষেত্রে ব্রেইমার বিবেচনায় নিতেন এই অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় কে বেশি বিশ্বস্ত সেই হবে তথাকথিত “নির্বাচিত প্রতিনিধি”। এই পর্ব শেষে আমেরিকান রা আয়োজন করবে একটি “ভুয়া নির্বাচনের” আর সেই নির্বাচনের মাধ্যমে একজন প্রভু ভক্ত মানুষের হাতে তুলে দেয়া হবে ইরাক কে। আমি আশা করি, আদনান পাসিসি এই সুযোগ টা নিতে পারবে, তাঁকে তো মনে হয়ে যেকোনো সময় শারীরিক ভাবে ভেঙ্গে পড়বে।

মঙ্গলবার, আগস্ট ১৯, ২০০৩

ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো  …
ঘুম থেকে ক্লান্তি নিয়ে জেগে ওঠা কি সম্ভব? ব্যাপারটা হয়তো এরকমের – ঘুমের মধ্যেই আমি যেনো যুদ্ধ করছি। ঘুমের মধ্যেই দুঃস্বপ্নের সাথে যুদ্ধ করছি, আতংকের সাথে যুদ্ধ করছি, ভয়ের সাথে যুদ্ধ করছি। ঘুমের মধ্যে কামানের সাথে কিম্বা গোলাগুলির শব্দের সাথে যুদ্ধ করছি। মোটের উপরে আমি ভীষণ ক্লান্ত আজ। এই ক্লান্তিটা এমন নয় যখন ক্লান্তি আমায় ঘুমের দেশে নিয়ে যায়। এই ক্লান্তিতে আমি ভেঙ্গে পড়তে চাই, তবুও দাঁড়িয়ে থাকি। আমার মনে হয় একটা সময় সকলেই এমনটা অনুভব করে থাকেন।

আজকে আনবার অঞ্চলে একটি শিশু মারা গেছে। এলাকাটি বাগদাদের উত্তরপশ্চিমে। শিশুটির বয়স কতই বা হবে? দশ বা এগারো বছর খুব বেশি হলে। বাচ্চাটির নাম ওমর জসিম। কেউ কি শুনেছেন এই খবরটি? কিম্বা এই শিশুটির নিহত হবার খবরে কারো কিছু আসে যায়? এই খবর কি ফক্স নিউজ কিম্বা সিএনএন এ দেখানো হয়েছে? কেউ জানেনা কেনও শিশুটিকে হত্যা করা হলো। শিশুটি খুন হয়েছে যখন আমেরিকান বাহিনী তাদের বাসায় অভিযান চালায়। যাকে এরা খুব স্বাভাবিক ভাষায় বলে “রেগুলার রেইড” বা নিয়মিত অভিজানের অংশ। শিশুটির বাড়ীতে এই “রেগুলার রেইড” বা নিয়মিত অভিজানের উদ্দেশ্য ছিলো “কিছু একটা” খুঁজে পাওয়া। লুটতরাজের মতো করে সমস্ত বাড়ীটি তছনছ করার পরেও সেই “কিছু একটা” পাওয়া যায়নি। পরিবার টি ধ্বংস হয়ে গেছে এই অভিযানে, যদিও আমেরিকান বাহিনী কিছুই নিয়ে যায়নি বাড়ীটি থেকে, কিন্তু ভাবা যায়, কত বড় ধ্বংসটি হয়ে গেলো এই পরিবার টির? মানুষ ক্রমশ ভয়ার্ত হয়ে উঠছে এই সকল অভিজানের কারণে। কেউ জানেনা কে কখন আক্রান্ত হবে এই ধরনের ভয়াবহ অভিযানে আর কিই বা হতে পারে আক্রান্ত পরিবারগুলোতে। কেউ জানেনা কখন কার পরিনতি কি হবে। মানুষ এই ধরনের অভিযানের ভয়ে আতংকিত হয়ে থাকে, এই সকল “রেইড” বা তল্লাশী অভিযানে কখনও বা নিজের বাসাতেই কেউ গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, কখনও বা মারা যাচ্ছে, বিশেষত যারা এই সকল “রেইড” এর বিরুদ্ধে কোনও রকমের প্রতিক্রিয়া বা “ভুল প্রতিক্রিয়া” দেখাচ্ছেন তারাই মারা পড়ছেন। কি করে জানবে সবাই কোন টা ভুল প্রতিক্রিয়া আর কোনটা সঠিক প্রতিক্রিয়া? বলা নেই কওয়া নেই একদল সৈনিক এসে আপনার বাড়ী ঘর তল্লাশী করার নামে তছনছ করে দিচ্ছে, কখনও কখনও বা লুট করে নিচ্ছে ঘড়ি, স্বর্ণালংকার এমন কি নগদ টাকা। এ ধরনের পরিস্থিতে কোন প্রতিক্রিয়া কে সঠিক প্রতিক্রিয়া বলা যাবে? হ্যাঁ বাসা – বাড়ীতে এই ধরনের অভিযানে লুটতরাজ ও হচ্ছে। অবশ্য এমন নয় যে সকল সৈনিকই তা করে, সেটা বলা অন্যায় হবে। আসলে ইরাকের প্রায় সকলেই এই লুটতরাজে নেমেছে। ব্যাপারটা এমন যেনো সারা ইরাকই হাজির হয়েছে লুট হয়ে যাবার জন্যে। কিন্তু ইদানিং দুশ্চিন্তা করাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। খুনী, ডাকাত, মাস্তান দল, ইরাকী গেরিলা আর শেষমেশ আমেরিকান সৈনিকেরা। আমি জানি, আমি ভালো করেই জানি, আমার এই লেখা পড়ে অনেকেই বলবেন – “তোমরা হচ্ছ অকৃতজ্ঞ ইরাকী, মার্কিনীরা এখানে যা কিছু করছে, তার সবই করছে তোমাদের জন্যে … এমন কি এই সকল তল্লাশী অভিযান ও তোমাদেরই জন্যে” ! কিন্তু কঠিন সত্য হচ্ছে, এই সকল তল্লাশী অভিযানের এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে – আমাদের কে প্রতিমুহূর্তে মনে করিয়ে দেয়া যে আমরা স্বাধীন নয়, মুক্ত নই, ইরাক দখল হয়ে গেছে, ইরাক আর আমাদের দেশ নয়। আমাদের জীবন – নিরাপত্তা এখন অন্যের হাতে। আমরা আমাদের দেশে নিরাপদ নই, বাড়ীতেও নিরাপদ নই। আমাদের জীবন এখন অন্যের হাতে।

এখানে দাঁড়িয়ে আমি ভবিষ্যতের কিছুই দেখতে পারিনা, অথবা আমি হয়তো দেখতে চাইও না। হয়তো আমরা এই ভবিষ্যৎ চিন্তাকে আটকে রেখেছি আমাদের বিধ্বস্ত স্মৃতি কিম্বা সতর্ক মস্তিষ্কের কারণে। যদিও শেষ পর্যন্ত এটা তোমার কাছে আসবেই। আমরা অন্তত বেঁচে আছি, ছয়মাস আগে আমরা সেটাও চিন্তা করতে পারতাম না। এটা হচ্ছে দুঃস্বপ্নের ভেতর থেকে জীবন কে খুঁজে নেয়ার একটা চেস্টা। আহা যদি এমন হতো, আমেরিকানরা আমাদের তেলগুলো নিয়ে নিতো এবং আমাদের দেশটা ছেড়ে চলে যেতো !

দুপুর ৩ টা পঞ্চাশ মিনিট

অবিশ্বাস্য ..
জাতিসংঘ ভবনে এক ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরন হয়েছে। ভয়াহব, আতংকজনক এবং একই সাথে গভীর দুঃখেরও বটে। কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না এরকম টা হয়েছে, কেউ বুঝতে পারছেনা, কেনও এমন টা হবে? স্বয়ং আল্লাহও জানেন, জাতিসংঘের এই লোকগুলো এখানে এসেছিলেন আমাদেরই জন্যে, আমাদেরকেই সাহায্য করার জন্যে।

রাগে আমার গা জ্বলে যাবার মতো অবস্থা, একই সাথে আমি দারুন হতাশ এই ধরনের ঘটনায়। আমাদের জীবনের কোনও পরিবর্তন নেই, আমাদের জীবনের কিছুই এগুচ্ছেনা সামনের দিকে। আমাদের জীবনের কোনও পরিবরতনের সম্ভাবনা নেই, এই ধরনের আক্রমন তাইই প্রমান করে। মিডিয়া দাবী করছে এই আক্রমনের কারণ হচ্ছে “আল-কায়েদা”, অথচ আমরা জানি, মিডিয়াও জানে, এই অঞ্চলে কোনদিনও আল-কায়েদার কোনও উতপাত ছিলোনা। বাস্তবত এই অঞ্চলে কোনদিনও আল-কায়েদার জন্মও হয়নি। আমেরিকার হাতে দখল হয়ে যাবার আগে, এই অঞ্চলে আমরা আল-কায়েদার নামও শুনিনি প্রায়। সাদ্দামের আমলে যে সকল মৌলবাদীরা মাটির দিকে মাথা নত করে থাকতো, আজকের বুশের প্রতিনিধি ব্রেইমারের শাসক সভায়, তারাই হচ্ছে ইরাকীদের শাসনকর্তা। ব্রেইমারের পুতুল সরকারে এরাই নাকি ইরাকীদের “প্রতিনিধি”।

আচ্ছা আপনারাই বলুন তো, ইরাকের তেল মন্ত্রনালয়ের ভবনটিতে কি কখনও এই ধরনের বোমাবাজি হবে? কে না জানে, ইরাকের তেল মন্ত্রনালয়ে এই ধরনের বোমাবাজির ঘটনা কখনই হবেনা । তেল মন্ত্রনালয় দিন রাত ২৪ ঘন্টা, সারা বছর ধরে পাহারা দেয়া থাকে বেশ কিছু ট্যাঙ্ক এবং ভারী অস্ত্র সজ্জিত সেনা বহর দ্বারা। বাগদাদের পতনের পর থেকে সবচাইতে কঠোর পাহারার মধ্যে থাকা একটি ভবন হচ্ছে ইরাকের তেল মন্ত্রনালয়ের ভবনটি। এই ভবনটি ইরাকে বুশ প্রতিনিধি ব্রেইমারের চোখের মনির মতো, সবচাইতে মুল্যবান। শেষ বিন্দু তেল থাকা পর্যন্ত আমেরিকানরা এটাকে পাহারা দিয়ে রাখবে। কেনও তাহলে জাতিসংঘ ভবনের সামনে একটা ট্যাংক রাখা গেলোনা? কেনও? কেনও?

ইরাক কে নিয়ে পেন্টাগনের জঘন্য সব পরিকল্পনা আমরা দেখেছি, তারা কি এই হামলাকারীদের দেখেনি? নিশ্চয়ই দেখেছে।

রাতঃ ৯ঃ২৫

(চলবে)

Spread the love