শনিবার, আগস্ট ২৩, ২০০৩

আমরা কেবল শুরু করেছি ……

ইরাকে এখন মহিলারা আর একা বাড়ীর বাহির হতে পারেনা। যতবার আমি বাড়ীর বাইরে যাই, আমার ছোট ভাই, বাবা, চাচা অথবা কাজিনদের কেউ একজন আমার সঙ্গে যেতে হয়। আমার মনে হচ্ছে, আমরা ইরাকে পঞ্চাশ বছর পেছনে চলে গিয়েছি। একজন নারী একা বের হতে হলে ঝুকির ধরন টা বেশ বিচিত্র। পথে হেনস্থা থেকে শুরু করে কিডন্যাপ কিম্বা গুম সবকিছু হতে পারে আজকের ইরাকে। বাড়ীর মহিলাদের বাইরে যেতে হলে অন্তত এক ঘন্টা আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। আমার বেলায়, যদি আমি বাইরে যেতে চাই কিছু কেনার জন্যে, অন্তত পক্ষে দুইজন পুরুষ আমার সাথে যেতে চায় আমার নিরাপত্তার জন্যে। কিন্তু তারও আগে

যে প্রশ্নটি বার বার শুনতে হয়, তাহলো আমার কি আসলেই বাইরে যাওয়া দরকার? বিষয়টা কি খুব জরুরী? বাবা কিম্বা চাচা বলবেন – আমরা যাই, কি কিনতে হবে আমাদের বলে দে। কিন্তু আমি বলি, না আমাকেই যেতে হবে, তোমরা ভালো সবজী কিনতে পারোনা। আমি ব্যাখ্যা করি – বেগুন আর অন্যান্য আনাজ গুলো আমাকে হাতে ধরে দেখতে হয়, তোমরা সেটা পারবেনা। আসলে আমার মূল ফন্দী হচ্ছে – বাইরের আলো দেখা। দিনের সূর্যটাকে দেখা। যে সকল নারী কাজ করতেন কিম্বা স্কুল কলেজে জেতেন, তাদের জন্যে এখনকার সময়টা দারুন হতাশার। যেনো আদিম যুগে ফেরত চলে যাওয়া। যুদ্ধের আগে, ইরাকে স্কুল কলেজে প্রায় ৫০% ছিলো ছাত্রী আর কর্মক্ষেত্রে প্রায় ৫০% ছিলো নারী। এখন স্কুল – কলেজে কিম্বা কর্মক্ষেত্রে নারীদের স্থান নেই। আদিম মৌলবাদ আরো বেশি করে জেকে বসেছে এই মার্কিন দখলদারিত্বের আমলে।

উদাহরন হিসাবে বলতে পারি, যুদ্ধপূর্ব ইরাকে, আমার হিসাব মতে প্রায় ৫৫% নারী হয় হিজাব নয় তো মাথায় একটা সাধারণ কাপড় দিয়ে রাখতো এবং বাকী ৪৫% নারী তাদের পছন্দ মাফিক পোশাক পরত।ইরাকে হিজাব ছিলো ট্র্যাডিশনের অংশ, মৌলবাদের প্রতিক নয়। অবশ্য আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন কারণ আমি এসবের কিছুই পরতাম না, কিন্তু আমার আত্মীয় স্বজনদের অনেকেই হিজাব বা মাথায় কাপড় ব্যবহার করতো। মূল প্রশ্ন টা হচ্ছে, ইরাক যুদ্ধের আগে কে কি পরবে এটা কোনও মৌলিক প্রশ্ন ছিলোনা। যুদ্ধের আগে বিশয়টা ছিলো “মাই বিজনেস” বা আমার ব্যক্তিগত বিষয়, আমি কি পরবো না পরবো, এটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়া কোনও মৌলবাদীর বিষয় ছিলোনা। কিন্তু এখন আর বিষয়টা “ব্যক্তিগত” নেই।


(সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসাইন এর সাথে ইরাকী একটি গার্লস স্কুলের মেয়েদের গ্রুপ ছবি)

যারা জানেন না তাদের জন্যে বলছি, দুর্ভাগ্য বশত আমি এইরকমের অনেককেই দেখেছি যারা হিজাব ও বুরকা’র পার্থক্যটা জানেন না। হিজাব একটি আরব অংশের প্রথাগত পোশাকের অংশ। মাথা ও কাধের অংশ ঢেকে রাখে। আমাদের এখানে এওনেক নারীতো গ্রেস কেলী’র স্টাইলেও হিজাব পরে থাকেন, যেখানে এক গোছা চুল হিজাবের বাইরে কপালের উপরে ফেলে রাখা হয় স্টাইল হিসাবে। কিন্তু বুরকা হচ্ছে ইসলামী অনুশাসনের পোশাক, যা আফগানিস্থানের নারীরা পরে থাকে, নারীর সমগ্র দেহ ঢেকে রাখার ব্যবস্থা।

ব্যক্তিগত পরিচয়ের দিক থেকে, আমি একজন মুসলিম নারী। মার্কিনী দখলদারিত্বের আগে, আমি মোটামুটি ভাবে আমার নিজের পছন্দ ও ইচ্ছা অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করতে পারতাম। আমি বহুদিন জিনস কিম্বা কটনের প্যান্ট আর সুবিধাজনক শার্ট পরে কাটিয়েছি। এখন আমি ঘরেও প্যান্ট বা ট্রাউজার পরার সাহস করতে পারিনা। আমাকে পরতে হয় লম্বা স্কারট ধরনের একটি পোশাক এবং সাথে লম্বা হাতার ঢিলে ঢালা জামা। যেকোনো তরুণীর জন্যে জিনস পরাটা একটা বিরাট ঝুকির বিষয়। জিনস পরিহিত কোনও তরুনী এখন আক্রান্ত হতে পারে, হেনস্থা হতে পারে এমন কি কিডন্যাপ ও হতে পারে মৌলবাদীদের দ্বারা। এই মৌলবাদীরা হচ্ছে দখলকৃত ইরাকে মুক্তি পাওয়া মৌলবাদীরা।

মেয়ে শিশুর বাবা-মায়ের একটা প্রধান কাজ হচ্ছে এখন তাদের কন্যাকে যেকোনো উপায়ে হোক বাড়ীতে আটকে রাখা। সেজন্যেই এখন সড়কে খুব নগন্য সংখ্যক নারী দেখা যায়, তাও বিকাল চারটার পরে। অন্যরা তাদের স্ত্রী, কন্যা, ভগ্নীদের বাধ্য করছেন হিজাব পরাতে অন্তত মৌলবাদীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে।

আমি আমার চাকুরিটা হারালাম প্রায় একই কারণে। পরে ভিন্ন কোনও একদিন এই বিষন্ন বিষয়ে লিখবো। মেয়েদেরকে স্কুল কলেজ থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। আমার ১৪ বছর বয়সী কাজিনকে তাঁর বাবা মা সম্পূর্ণ ঘরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই তাঁকে হয়তো এই ক্লাস টা আবার নিতে হবে, যখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসবে। কেনও? কারণ ইরাকের সুপ্রিম কাউন্সিল তাঁর স্কুলের পাশেই একটা ভবনে অফিস নিয়েছে। সুতরাং তাঁর বাবা-মা মনে করছেন, তাঁর স্কুলে যাওয়াটা নিরাপদ নয়। মাথায় বিশাল পাগড়ী বাধা, কালো পোশাকের পাহারাদার রা সেই অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে স্কুলে আসা মেয়ে ও শিক্ষকদের কে পরীক্ষা করতে থাকেন। কে কোন পোশাক পরলো, কার হিজাব টা কত বড়, কার স্কারট টা কত লম্বা, কার আচরণ কি রকমের, কার হাটা-চলা কেমন এইসব নিয়ে পুলিশি কায়দায় মাপজোখ করতে থাকেন সারাক্ষণ। মেয়েদের নানান রকমের হেনস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের পোশাক নিয়ে, পোশাক যথাযথ হচ্ছে কিনা এই নিয়ে। কোনও কোনও এলাকায় মেয়েদের উপরে এসিড ছুড়ে মারার মতো ঘটনাও ঘটেছে, পোশাক যথাযথ হয়নি বলে।

সুপ্রিম কাউন্সিল অফ ইরাক ফর ইসলামিক রেভলিউশন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮২ সালে, তেহরানে। এদের মূল লক্ষ্য ছিলো ইসলামী বিপ্লবের ধারণা ইরান থেকে ইরাকে আমদানী করা। অন্যভাবে বলা যায়, ইরাক কে একটি শিয়া মোল্লাতান্ত্রিক দেশে পরিনত করা। আব্দুল আজিজ আল হাকিম হচ্ছেন এই ইসলামী বিপ্লবী কাউন্সিলের একজন নেতা যিনি নয়জন অস্থায়ী প্রশাসকের একজন এবং খুব শিগগির ইরাকের শাসন ক্ষমতা পাবেন হাতে।

ইসলামী বিপ্লবের সুপ্রিম কাউন্সিল সবাই কে বোঝাতে চাচ্ছে যে, ইরাকের সকল শিয়া মুস্লিমের সমর্থন তাদের কাছে আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে শিয়া মুসলিমদের একটা বিরাট অংশ বরং তাদের বিষয়ে দারুন আতংকিত। শিয়া মুসলিম সম্প্রদায় এই সুপ্রিম কাউন্সিল এর ক্ষমতায় আসার ব্যাপারেও দারুন আতংকিত। ইরাক – ইরান যুদ্ধের সময় ইরাকী বন্দীদের উপরে চরম অত্যাচারের নায়ক ছিলো আজকের এই আল-হাকিম। এই আল – হাকিমের নেতৃত্বে সুপ্রিম কাউন্সিল এর কি ইরাক শাসন ক্ষমতা পাওয়া উচিৎ? আমি জানি তাহলে হয়তো এরা প্রথম ধাপে ইরান আর ইরাকের বর্ডার খুলে দেবে এবং দুই দেশ কে এক দেশে পরিনত করবে। তাহলে অন্তত প্রেসিডেন্ট বুশের পরিশ্রম খানিকটা কমে যাবে, কেননা ইরাক ও ইরান কে এখন বুশ কে বলতে হয় “দুই শয়তান” আর যদি ইরাক ও ইরান এক হয়ে যায় তাহলে সেই পরিশ্রম টা কমে যাবে। সারা দুনিয়াতে তখন মাত্র দুইটি “শয়তান” থাকবে – বড় শয়তান (এক হয়ে যাওয়া ইরাক – ইরান) আর উত্তর কোরিয়া।

ইরাকে আসার পর থেকে, আল-হাকিম অন্তর্বর্তী সরকার কে ব্ল্যাকমেইল করে যাচ্ছে এই বলে যে তাঁর সাথে রয়েছে ইরাকের বেশীরভাগ শিয়া সমর্থন। আল – হাকিম ডুকেছিলো “জয়শে বাদির” বা বদির এর সৈন্যবাহিনির সাহায্য নিয়ে। এই বদির বাহিনী গড়ে উঠেছিলো কয়েক হাজার চরমপন্থি ইসলামী জঙ্গীদের দ্বারা, যাদের বেশীরভাগই ট্রেইনিং পেয়েছে ইরানের প্রত্যক্ষ তদারকিতে। যুদ্ধ যখন প্রায় আসন্ন, এই বাহিনী তখন সীমান্তে অপেক্ষা করছিলো, কখনও দেশের ভেতরে ঢুকতে পারবে। বাগদাদের ভিতরে এবং ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে তখন এই বাহিনীর ভয়ে আতংকিত দিন কাটাচ্ছিলো প্রায় সকল ইরাকী, তা সে শিয়া, সুন্নী বা ইরাকী খ্রিষ্টান হোক না কেনও। মুলত এই বাহিনীর নেতৃত্বেই ইরাকে ব্যাপক ভাংচুর, ধ্বংস, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। কেননা, এরা আশা করেছিলো, এই অস্থিতিশীলতা তৈরীর পুরস্কার হিসাবে এরা ইরাকের পুনর্গঠনের ঠিকাদারী কাজের কিছু অংশ পাবে। ইরাকের ভেতরে সামাজিক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরীর জন্যে, এই বাহিনীই হাজার হাজার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাকে অপহরন ও হত্যা করেছে।

(পাঠকের জন্যে নোটঃ বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরন সম্পর্কে যারা জানেন, তাঁরা সবাই জানেন, ইরান আমেরিকার একটি ঘোষিত শত্রু দেশ, কিন্তু ইরাক আক্রমনের সময়ে, আমেরিকা সেই সকল শক্তিগুলোকেই মিত্র হিসাবে পেয়েছে, যারা ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে সংযুক্ত। সাদ্দাম বিরোধিদেরকে ইরান সব সময়েই সহযোগিতা করে এসেছে, আর এই যুদ্ধে, আমেরিকা, “শত্রুর শত্রু – আমার বন্ধু” এই নীতি কাজে লাগিয়ে, সাদ্দাম বিরোধীদের সাথে হাত মেলায়, যদিও তাঁরা আমেরিকার আরেক শত্রু ইরানের ঘনিষ্ঠ)

সমগ্র পরিস্থিতিই বর্ণনার অতীত ভয়াবহ হয়ে উঠছিলো। খ্রিষ্টানরাও ইসলামী মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছিলো বারবার। জুন মাসের দিকে, কিছু ইসলামী মোল্লা একটা ফতোয়া জারী করলো যে, ধর্ম নির্বিশেষে সকল নারীকে হিজাব পরতে হবে, হিজাব বিহীন নারীকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেয়া হবে। “হাওজা আল ইলমিয়া” বলে আরেকটি ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠী ফতোয়া জারী করলো যে, চৌদ্দ বছরের বেশি বয়স এমন কোনও মেয়ে অবিবাহিত থাকতে পারবেনা। প্রয়জনে “হাওজা আল ইলমিয়া” গ্রুপের সদস্যরা নিজেরা চারটি পর্যন্ত বিয়ে করে অবিবাহিত মেয়েদের সংখ্যা কমিয়ে আনবে। অমুসলিম মেয়েরাও এই ফতোয়ার অধীনে অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে, জাতিসংঘ ও রেডক্রস সহ আন্তর্জাতিক সংস্থার নারী কর্মীদের কে হুমকি দেয়া হচ্ছে, হিজাব পরার জন্যে। (পাঠকের জন্যে নোটঃ খানিকটা আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি বাস্তবতা ছিলো, ইরাকের খ্রিস্টান সম্প্রদায়, তুলনামুলক ভাবে, স্বৈর শাসক সাদ্দামের আমলে যথেষ্ট নিরাপদ ছিলো, অন্তত সামাজিক ভাবে।)।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই সকলল ফতোয়া জারী করা হচ্ছিলো না, বরং শুধুমাত্র শক্তি প্রদর্শনের জন্যেই এই সকল ফতোয়া গুলো জারী করা হচ্ছিলো। আর এই শক্তির উৎস হচ্ছে – দখলদার বাহিনীকে দেখানো, সারা বিশ্বকে দেখানো, দেখো আমাদের শক্তি আছে, আমরা জনগন কে শাসন ও প্রভাবিত করতে পারি।

এলকোহল এর দোকান গুলোতে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। সাধারণত, এদেরকে প্রথমে চিঠি দিয়ে জানানো হচ্ছে, দোকান বন্ধ না করা হলে, এর পরিনতি ভয়াবহ হবে, এর পরপরই হয়তো কোনও একদিন দোকানটিতে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। হয় বোমা হামলা নয়তো আগুন ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। একই ধরনের হুমকি দেয়া হচ্ছে হেয়ার ড্রেসারস এবং পারলার গুলোকে। এই সবকিছুই ভয়াবহ এবং আতংকিত হবার মতো, এবং এটাই এখনকার প্রতিদিনের বাস্তবতা।

মনে রাখা দরকার এই প্রবনতা গুলো যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইরাকে ছিলোনা। এই হট্টগোলের সময় গুলোতে এই ধরনের উগ্রবাদী জঙ্গীরা বেরে উঠছে। এসবের জন্যে ইসলাম কে দোষ দেয়া যাবেনা। কেননা, সব ধর্মেই কম বেশি উগ্রপন্থা আছে। যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইরাকে সুন্নী – শিয়া – খ্রিষ্টান – সাবিয়া ধর্মের মানুষ এক সাথে বসবাস করেছে। সামাজিক সম্পর্ক ছিলো এমন কি এই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়ে শাদির ব্যাপার গুলোও খুব সাধারণ ছিলো। ইরাকে পাশাপাশি মসজিদ এবং চার্চের অবস্থানের অনেক নজির আছে। স্কুল গুলোতে ধর্মভিত্তিক কোনও বিভাজন ছিলোনা, অর্থাৎ সব ধর্মের ছাত্ররা একই স্কুলে যেতে পারতো। মানুষের ধর্ম আলাদা ছিলো, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে তা কখনও বিরাট ইস্যু হয়ে ওঠেনি।

কেউ কেউ আমাকে বলছেন, ইরাকী জনগন হয়তো আগামী নির্বাচনে একটি “ইসলামী রাস্ট্র”র জন্যে ভোট দেবে। ছয় মাস আগেও আমি হয়তো খুব কড়া ভাবে “না” বলতাম, কিন্তু এখন আমি সন্দিহান। ইরাকের কট্টর মৌলবাদী রাস্ট্র হয়ে ওঠার অনেকগুলো কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি এখন। সাধারণ ধর্ম প্রান মানুষের মৌলবাদী হয়ে ওঠার অনেকগুলো কারণ হতে পারে।

প্রথম এবং সবচাইতে বড় কারণটি হচ্ছে – ভয়। এই ভয়, মৃত্যুভয় হতে পারে, কিম্বা যুদ্ধের ভয় কিম্বা ভয়ঙ্কর কোনও পরিনতির মুখোমুখি হবার ভয় হতে পারে। হ্যাঁ, আমাদের এখানে এমন অনেক কিছুই হতে পারে এখন যা মৃত্যুর চাইতেও ভয়াবহ। এই যুদ্ধের যে ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে আমরা গেছি, ঈশ্বর বলে যদি কোনও সত্ত্বা আমাদের মাঝে না থাকতো, তাহলে আমরা এই যুদ্ধের ভার বহন করতে পারতাম না। কারণ এই যুদ্ধের কবল থেকে মুক্তি পাবার জন্যে আমরা দিনরাত প্রার্থনা করেছি, দোয়া – দরুদ পড়েছি, মানত করেছি আর ভেবেছি একদিন শেষ হবে এসব।

দ্বিতীয়ত – পশ্চিমা মুল্যবোধের যে আগ্রাসী রুপ আমরা দেখেছি এই যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে, সেটা আমাদের কে আরো বেশি করে আমাদের ধর্ম কে আকড়ে ধরার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে যেমন অশিক্ষিত লোকজন আছে (নিশ্চিত ভাবেই আছে, আমার কাছে অসংখ্য ইমেইল আছে পশ্চিমাদের, যা প্রমান করে, পশ্চিমাদের একটা অংশ কতটা অশিক্ষিত হতে পারে, আমি সেসব ফাঁস করে, বিব্রত করতে চাইনা তাদের), ঠিক তেমনি, মধ্যপ্রাচ্যেও অশিক্ষিত মানুষের ছড়াছড়ি আছে। পশ্চিমারা যেমন মুসলমান এবং আরব মানেই বোঝে সুইসাইড বোমাবাজ, ইসলামী জঙ্গী, কুশিক্ষা আর মরুভুমির ঊট, ঠিক তেমনি – কিছু ইরাকীর কাছে আমেরিকান আর ব্রিটিশ মানেই লাম্পট্য, পতিতাবৃত্তি, মাতাল জীবন, দখলদারিত্ব, আর সীমাহীন নিষ্ঠুরতা। দখলদার শক্তির নানান আগ্রাসী রূপের বিরুদ্ধে মানুষের শেষ আশ্রয় হয় ধর্মের কাছে আত্মসমর্পণ করা।

আর সবশেষ কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ কারনটি হচ্ছে – ৬৫% ইরাকী এখন বেকার। মানুষকে তাঁর পরিবারকে অন্তত মুখে দুবেলা খাবার তো তুলে দিতে হয়। আর যখন আমি ইরাকী পরিবারের কথা বলি, সেখানে শুধু মা-বাবা আর এক বাচ্চা আছে তা নয়, কোনও কোনও পরিবারে আত্মীয় স্বজন মিলে ১৬ – ১৭ জনের পরিবার। মৌলবাদী ইসলামী সংগঠনের বেশ কয়েকটি যারা ইরানের অর্থনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট, যেমন আল-দাওয়া ইদানিং টাকার বিনিময়ে বেকার পুরুষ মানুষদেরকে দলে ভেড়াচ্ছে, বিশেষ করে সেই সকল বেকার যাদের সেনাবাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। এই সদস্যদের কে দলের পক্ষ থেকে টাকা দেয়া হচ্ছে দলের প্রতি তাদের সমর্থনের সুবাদে। এই “সমর্থন” এর অর্থ অনেক কিছু – কখনও তা ভবিষ্যত ভোটের প্রতিশ্রুতি, কখনও বা পাড়ার কোনও একটি দোকানে বা প্রতিষ্ঠানে বোমা হামলা করা, কখনও বা মানুষ অপহরন কিম্বা গাড়ী হাইজ্যাক করা (বিশেষ করে আল সালাবির দলের লোকজন, গাড়ী হাইজ্যাক করায় খুবই এক্সপার্ট)।

তাই, আতংক – সন্ত্রাস আর মৌলবাদ নিয়ে কেউ আমার কাছ থেকে জানতে চাইলে – আমি তাদের কে কারপেন্টারস ব্যান্ডের সেই বিখ্যাত গান টা শুনিয়ে দেই – ”we’v only just begun …. We’ve only just begun …” ( এটা কেবল শুরু, আমরা কেবল শুরু করলাম…)। ইরাকে আতংক – সন্ত্রাস আর মৌলবাদের এটা শুরু মাত্র, আরো অনেক কিছু হবে এখানে।

(চলবে )

Spread the love