(পাঠকের জন্যে নোটঃ ব্রেইমার হচ্ছেন ইরাক দখল করে নেবার পরে বুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরাকের মার্কিন প্রশাসনের প্রধান নির্বাহী। আল – সালাবি হচ্ছেন আমেরিকার অনুগত ইরাকী প্রশাসকদের একজন, যার বিরুদ্ধে অতীতে অনেক সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ আছে। ইরাকী ন্যাশনাল কংগ্রেস হচ্ছে আল – সালাবির দল। কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি হচ্ছে মার্কিন উদ্যোগে গঠিত ইরাকী কোয়ালিশন সরকার।)

প্রথম কিস্তির লিংক এখানে

বুধবার, আগস্ট ২০, ২০০৩

জাতিসংঘ কর্মকর্তা সেগেই ডি মেল্লো’র হত্যাকান্ড নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। পুরো ইরাক হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে, যুদ্ধের ইরাকে তিনিই ছিলেন সবচাইতে বড় পাওয়া, ইরাকীদের জন্যে বড় ভরসার যায়গা। যদিও যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কোনও ভুমিকাই পালন করতে পারেনি, তবুও সেরগেই ডি মেল্লোর মতো একজন মানুষ কে অন্তত চোখের সামনে দেখতে পাওয়াটাও এক ধরনের আশা সঞ্চার করে ইরাকীদের মাঝে। অন্তত এটা মনে হয়, আমেরিকানরা বাগদাদে তাঁদের রাজত্ব চালাতে পারতোনা এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাহারাদার চোখ না থাকলে।

ব্রেইমার বার বার চেস্টা করছে এই হামলার সাথে স্থানীয় ইরাকী “প্রতিরোধ” আর আল-কায়েদা কে সংযুক্ত করতে…… ! এটা এক ধরনের নতুন আক্রমন। ব্রেইমার বার বার বুশ প্রশাসন কে বোঝাতে চাইছেন …এটা দখলদার বাহিনীর কোনও গ্রুপের কাজ নয়। “এটা” হচ্ছে “সন্ত্রাসবাদ”। এটা হচ্ছে “প্রতিরোধ” । এখানে “প্রতিরোধ” হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ। মানবতাবাদী সাহায্য সংস্থার দফতর কে রক্ষা করা যায়না এমন ধরনের “সান্ত্রাসবাদী” ঘটনা ইরাকে আগে কখনই ঘটেনি। মার্কিন দখলদারিত্বের আগে ইরাকের অনেক কঠিন সময় গেছে, সেই সকল কঠিন সময় পার করার পরেও ইরাকে কখনও জাতিসংঘ অফিস বা কোনও দুতাবাস আক্রান্ত হয়নি। আমেরিকা এই দেশটি দখল করে নিয়েছে। আমেরিকা এখন দখলদার শক্তি, সেই হিসাবে, ইরাকের সকল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা দেবার দায় কাদের? ইরাকে যে সকল আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে তাদের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব কাদের? ইরাকী জনগনের নিরাপত্তার দায়িত্ব যদিও দখলদার বাহিনী হিসাবে আমেরিকার, কিন্তু তারা সে দায়িত্ব কখনই নেয়নি। অন্তত সেরগেই ডি মেল্লোর মতো একজন জাতিসংঘ কর্মকর্তার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমেরিকা নিতে পারতো।

অবস্থাদৃষ্টে, আমি ভীষণ আতংকিত। যে দেশে জাতিসংঘের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার জীবনের কোনও নিরাপত্তা নেই, সে দেশের সাধারন মানুষের জীবনের অবস্থা কি হবে আমি তা আন্দাজ করতে পারছি। কিছু নিউজ চ্যানেল বলছে – এই সংবাদ টি যখন ব্রেইমার পেয়েছেন, তিনি নাকি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন… … কিন্তু আমি অবাক হয়েছি, কারণ জাতিসংঘের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যু তো উনার বা আমেরিকার কোনও ক্ষতি নয়, ক্ষতি টা ইরাকের সাধারণ জনগনের !

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২১, ২০০৩

আমার ইমেইল গুলো:

ওয়াও … ! প্রায় ডজন খানেক ইমেইল পেয়েছি … ! আমি ভাবতেই পারিনি লোকে শেষমেষ আমার ব্লগ পড়ে উঠবে। আমি দারুন উত্তেজিত – উতসাহিত এবং নারভাস ও বটে।

বেশীরভাগ ইমেইলই আমাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে লেখা। আর বাকী ইমেইল গুলো সমালোচনা, ক্রোধ ও গালাগালিতে ভরা। যারা গালাগালি করে আমাকে ইমেইল করেছেন, তাঁদের বিনয়ের সাথে বলি, আমার ব্লগ পড়ার দরকার নেই। আপনারা কেনই বা আমার ব্লগ পড়ছেন আর কেনইবা আমাকে গালাগাল করছেন, ঘৃণা জানাচ্ছে? বরং আমি যে প্রশ্নগুলো তুলছি সেই সকল প্রশ্নে আপনাদের মতামত – বিরুদ্ধ মতা জানানোটাই অনেক কাজের নয়? আমি যদি জানতে চাই ফক্স চ্যানেল কি বলছে, তাহলে ফক্স চ্যানেল দেখা ছাড়া তো সেটা জানা যাবেনা, তাই না? বন্ধুরা মনে রাখবেন, ট্যাঙ্ক দিয়ে আপনারা হয়তো আমার দেহের সবকটা হাড্ডি গুড়ো করে দিতে পারবেন, কিন্তু আপনাদের গালাগালি দেয়া ইমেইল গুলোও কিন্তু আমি ডিলিট করে দিতে পারি। সুতরাং ইমেইলে গালাগাল করে কোনও লাভ নেই।

আমার নতুন প্রতিভা
পুরো একরাত নির্ঘুম কাটানোর পর শেষমেষ এখন টিভি চ্যানেল সারফিং করছি। টিভিতে চ্যানেল ঘোরাচ্ছিলাম কেবল কিছু ইন্টারেস্টিং খবর দেখার জন্যে, অন্তত একজন কথিত ইরাকী প্রশাসকের সাক্ষাৎকার কিম্বা নিদেনপক্ষে কোনও অলৌকিক কোনও ঘটনার সংবাদ … কিন্তু কোনও কিছু দেখার আগেই বিদ্যুৎ চলে গেলো। রাত দুইটায় চলে গেলো, ঘরের ভেতরেও নিকষ কালো অন্ধকার, ঠিক সারা ইরাক যেমন অন্ধকারে ডুবে আছে এখন। হয়তো ভালো করে বলা যেতে পারে – “বিদ্যুৎ বিহীন আগস্টের রাত্রী”। অন্ধকারে বসে বসে ভাবছি কোথায় মোমবাতি আর ম্যাচ রেখেছিলাম। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে মোমবাতি ও ম্যাচ খোঁজার পরে আমার মন বদলে গেলো। ঘরে আলো জালাবার চাইতে আমি বরং অন্ধকারটিকেই উপভোগ করতে চাইলাম। বরং মনে হলো ছাদে গিয়ে সারা ইরাকের অন্ধকার উপভোগ করি। অন্ধকারে ধরে ধরে, আন্দাজমতো উঠে গেলাম ছাদে, শেষ ধাপে গিয়ে মনে হয়েছিলো সিঁড়ি টা আছে তো ওখানে?

যারা জানেন না তাঁদের জন্যে বলে রাখি, ইরাকে এখনও কোনও কোনও নিরাপদ এলাকায় মানুষ বাড়ীর ছাদে ঘুমিয়ে থাকে। বিশেষত যে রাত গুলোতে ইরাক অন্ধকারে ডুবে যায়, তখন ঘরের ভেতরে শুয়ে থাকা মানে ওভেনের ভেতরে রান্না হবার মতো অবস্থা। ছাদেও প্রচন্ড গরম, কিন্তু অন্তত খানিকটা বাতাস থাকে সেখানে, তাই রক্ষা।

ছাদে বাতাসের ঢেউ টের পেলাম। ছাদের মাঝখানে দাঁড়ালে মনে হয় চারদিকের বাতাস যেনো আমার দিকেই ছুটে আসছে। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে বোঝার চেস্টা করি, শুধু আমিই কি অন্ধকারে ডুবে আছি? নাকি সারা শহর?

কিছুখন পর আমার ছোট ভাই উপরে উঠে এলো। ধরুন ওকে আমি এখানে “এক্স” বলেই লিখবো। ভীষণ আলুথালু – বিষন্ন – বিরক্ত এবং আধোঘুম নিয়ে সে উঠে এসেছে ছাদে। নিতান্তই না পেরেই উঠে এসেছে। ছাদের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আমরা সাম্নের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পাশের বাড়ীর আবু – মান কে দেখতে পাচ্ছি সিগারেট ধরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম – “আবু – মান ও সম্ভবত ঘুমুতে পারছেনা”। এক্স বলল – “এটা সম্ভবত আবু মান নয়, অর ছেলে মান”। আমি একটু বিরক্ত হলাম, ওকে জিজ্ঞাসা করলাম আবু মানের ছেলে তো মাত্র তেরো বছর বয়স, ওকি সিগারেট খেতে পারে? এক্স আমাকে পালটা প্রশ্ন করলো – “ইরাকে কি কারো বয়সই এখন ‘মাত্র’ বলা যায়”? “মাত্র তেরো বছর বলে কিছু নেই এখন আর ইরাকে”।

আমি বুঝতে পারলাম এবং এক রকম একমত ও হলাম। যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, ইরাকে এখন মাত্র তেরো বছর বা মাত্র চব্বিশ বছর বলে কিছু নেই। আমাদের সকলেরই বয়স এখন ৮৫ বছর। আর ব্যক্তিগত ভাবে আমি যে সকল অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছি – আমার মনে হয় আমার বয়স ১০৫ বছর। যদিও এক্স এর চোখ খোলা ছিলো, তবুও আমার মনে হচ্ছিলো সে মনে হয় দাঁড়িয়েই ঘুমুচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে অদূরে একটা বুলেটের শব্দ আমাদের দুজনেরই নিরবতা ভেঙ্গে দিলো। বুলেটের শব্দটা একটা নিরাপদ দূরত্ব থেকেই আসলো, তাই দুসচিন্তার কিছু নেই। আমি বোঝার চেস্টা করলাম কতদুরে ঘটনাটা হতে পারে –

এক্সঃ তোর কি মনে হয় কতদুরে ঘটনাটা?

আমিঃ এই ধর এক কিলোমিটার এর মতো দূর …

এক্সঃ হুম … হয়তো !

আমিঃ সম্ভবত আমেরিকান বুলেট নয় এটা …

এক্সঃ হুম… বোধহয় একটা……

আমিঃ কালাশনিকভের গুলি…

এক্সঃ ওয়াও … তুই তো দেখি এখন দারুন এক্সপারট … এই সকল বিষয়ে…

না – আমি শুধু এখন এক্সপার্টই নই, আমি এখন দারুন এক্সপার্ট। গুলির শব্দ শুনে আমি এখন বলে দিতে পারি এটা কাদের গুলি। আমি বলে দিতে পারি – কতদুরের ঘটনা। আমি বলে দিতে পারি এটা কি পিস্তল নাকি মেশিনগান, ট্যাংক নাকি একটা গোটা যুদ্ধ বহর। এমন কি কি ধরনের টার্গেটের উপরে আক্রমন হলো সেটাও বলে দিতে পারি … ! আজকের ইরাক আমাকে এই প্রতিভাটি দিয়েছে জীবনের মধ্যে দিয়ে। আমি এই বিশ্লেষণ গুলোতে এতোটাই ভালো হয়ে উঠেছি যে মাঝে মাঝে নিজেই আতংকিত হয়ে পড়ি। এই প্রতিভা শুধু যে আমার একার তা নয়। শিশু – যুবক কিম্বা বৃদ্ধ প্রায় সকলেই এই ধরনের প্রতিভাধর হয়ে উঠেছেন আজকের ইরাকে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে – আমাদের এই প্রতিভার কথা আমরা আমাদের সিভি বা জীবনবৃত্তান্তে লিখতে পারবোনা।

মাঝে মাঝে আমি অবাক হই, একটি যুদ্ধ বিমান কি দ্বিতীয়বার আক্রমনের সময়েও একই রকমের শব্দ করে উড়ে আসে?

আল – সালাবি … সম্পূর্ণ তার ছেঁড়া এক মানুষ !
এইমাত্র আল – সালাবি কে দেখলাম টিভিতে। আল – আরাবিয়া টিভির একজন সিনিয়র রিপোর্টার তাঁর সাক্ষাৎকার নিলেন। গতকাল রাতে এবং আজকে সকালের পুনঃপ্রচার দুটোই আমি মিস করেছিলাম। কিন্তু আমার এক কাজিন, যার বাড়ীতে জেনারেটর আছে, বেচা্রি আমার জন্যে রেকর্ড করে রেখেছে। ও জানে … খুব সামান্য কয়েকজন ইরাকী রাজনীতিবিদ যারা আমাকে বিমল কৌতুক উপহার দেয়, আল – সালাবি তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কমেডিয়ান। যথারীতি ইন্টারভিউটা ছিলো দারুন… কি বলা যেতে পারে ভাবছি … আল – সালাবি এতো ভালো অভিনয় করেছেন যে তিনি প্রায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিলেন। পেন্টাগন তাঁকে দত্তক নিতে পারে কিম্বা বাড়ীর পোষা প্রানী হিসাবেও নিতে পারে … বাড়ীতে একটা পোষা বানর কে ট্রেইনিং করানোর মধ্যেও তো দারুন আনন্দ আছে তাইনা? আল – সালাবি কি দিয়ে বুশ প্রশাসন সেই বিমল আনন্দটা উপভোগ করছে।

যাইহোক, ইন্টারভিউটা শুরু হয়েছিলো ভালোই, আল – সালাবিকে খুব ঝকঝকে – তকতকে দেখাচ্ছিলো। বিশ্বাস করুন, বেচারার ঠোট ও চকচক করছিলো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে – লোকটা জানেনা, কিভাবে কথা বলতে হয়। ব্রেইমার এর উচিত হবে, এই লোকটাকে মিডিয়াতে কথা বলতে না দেয়া, অন্তত আগামী নির্বাচন পর্যন্ত। আর নির্বাচনে আমেরিকানরা যদি একেই প্রেসিডেন্ট বানায়, তাহলে অন্তত তাঁর বক্তৃতা গুলো একটু ভালো করে লিখে দেয়া দরকার। ভদ্রলোক সি আই এ র জন্যে সত্যিই অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরী করছে।

সাক্ষাৎকার এর সবচাইতে মজাদার অংশ ছিলো – যখন টিভিটি সালাবির একজন সাবেক দেহরক্ষীর কথা বলছিলেন এবং তাঁকে দেখাচ্ছিলো, তখন সালাবি প্রায় অস্কার পাবার মতো দক্ষতায় অভিনয় করছিলেন যে তিনি তাঁর এই দেহরক্ষীকে চেনেন না। কেননা এই দেহরক্ষীটি অভিযোগ করছিলেন কিভাবে এবং কখন সালাবির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ইরাকী ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রথম বাগদাদে এলো এবং এদের রিক্রুটমেন্ট শুরু করলো। এ পর্যন্ত বিষয়টা খুব স্বাভাবিকই ছিলো। কিন্তু হঠাত করেই তারা বাগদাদের একটি এলিট ক্লাব দখল করে দিলো এবং আই এন সি কে একটা মিলিশিয়া বাহিনীতে পরিনত করলো। এরা এপ্রিল – মে – জুন মাস ধরে বাগদাদ শহরে গাড়ী হাইজ্যাক করেছে। হাইজ্যাক করা গাড়ীগুলো কে এরা বলেছে এই গাড়ীগুলো আসলে লুট হয়ে যাওয়া গাড়ী। কিন্তু বাগদাদে কোনও গাড়ী লুট হয়ে গেলেই কি সেটা সালাবির সম্পত্তি হয়ে যায়? আসলে গাড়ীগুলো প্রথমে আই এন সি’র সদর দফতরে জমা করা হয়, তারপরে ইরাকের বাইরে কুরদিশ অঞ্চলে পাচার করা হয়। যে গাড়ীগুলোর অবস্থা মোটামুটি ভালো, চলন সই সে গাড়ীগুলো সালাবির দলের লোকেরা ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। গাড়ী ভাগাভাগির এই সকল বন্টনে যারা সুখী নয় তারা অভিযোগ করেন ইরাকের মার্কিন প্রশাসনের কাছে কিম্বা সালাবির দলের কাছে। যদিও দুই পক্ষের কাছ থেকেই তারা চড় খেয়ে থাকেন, এই ধরনের অভিযোগের জন্যে।

এই প্রসঙ্গ গুলো যখন এসেছে সাক্ষাতকারের এক অংশে, তখন সালাবী চিৎকার করে বলতে শুরু করেছেন – সব মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা কথা। এরপর তিনি সেই রিপোর্টার কে গালিগালাজ করতে শুরু করেন। তিনি বলেন টাকা খেয়ে এইসব সাক্ষী হাজির করা হচ্ছে। রিপোর্টার তাঁকে জিজ্ঞাসা করছিলেন – জর্ডান পার্লামেন্ট প্রসঙ্গে। জর্ডান পার্লামেন্ট সালাবিকে তাঁর কৃতকর্মের জন্যে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় … কিন্তু সালাবি সেই একই রকমের চিৎকার করে বলতে লাগলেন – সব মিথ্যা… ডাহা মিথ্যা কথা। সালাবি চিৎকার করে বলছিলেন তিনি কোনও অপরাধি নন, চোর নন, ডাকাত নন। তিনি আমেরিকার পুতুল নন। ইরাকীরা এবং জর্ডানিরা মিলে এই ধরনের মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।

আমার মতে উপস্থাপক আল-সালাবি কে ভুল প্রশ্ন করেছে। তাঁর প্রশ্ন করা উচিত ছিলো, ইরাক কে অস্থিতিশীল করে তুলবার জন্যে, সি আই এ অর্থাৎ আমেরিকা সালাবি কে যে বিপুল পরিমান টাকা দিয়েছিলো, সেগুলো সে ঠিক কোন কোন খাতে খরচ করেছে? এই পুরো সাক্ষাতকারটি আমাকে আগস্ট মাসের ১১ তারিখে প্রকাশিত এসোসিয়েটেড প্রেস এর একটি রিপোর্ট এর কথা মনে করিয়ে দিলোঃ

“সমগ্র ইরাক তেলের সাগরে সাঁতার কাটছে, কিন্তু কেউ যদি মনে করে এই প্রাকৃতিক সম্পদের কারনেই ইরাক একটা সুখী – সমৃদ্ধ জীবন পাবে, সেটা একটা ভুল স্বপ্ন।

স্বাভাবিক ভাবেই, আমাদের তেল থেকে আয় করা টাকায় প্রথমে আমাদের ঋণ শোধ করতে হবে। আমেরিকার কাছ থেকে সালাবির মতো মানুষেরা যে টাকা নিয়ে রেখেছেন, সেই ঋণ শোধ করতে হবে প্রথমে। কিন্তু এই ঋণ শোধ করার পরে ইরাকীদের জন্যে কি কিছু বাকী থকবে?

শুক্রবার, আগস্ট ২২, ২০০৩

কিছু সরাসরি কথা …
আজকে কিছু সরাসরি কথা দিয়ে শুরু করতে চাই। এই একবারই বলবো এবং সবার জন্যে।

আমি আমেরিকানদের কে ঘৃণা করিনা। যদিও অনেকেই তা মনে করেন। এমনটা নয় যে আমি আমেরিকাদের ভালোবাসি, তা নয়, কিন্তু আমি আমেরিকানদের ঘৃণা করিনা, এটাই সত্যি। ঠিক যেমন টা আমি ফরাসী, ব্রিটিশ, ক্যানাডিয়ান কিম্বা সৌদীদের ঘৃণা করিনা। ব্যস সিম্পল।

আরো লক্ষ সাধারণ ইরাকীর মতোই আমিও বড় হয়ে উঠেছিলাম আমার নিজের জাতি ও সংস্কৃতি কে ভালোবেসে। আমিও শিখেছিলাম আমার জাতি ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত হতে। আমার বড় হয়ে ওঠা যেমন আমাকে নিজের সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত হতে শিখিয়েছে, তেমনি অন্যের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করতেও শিখিয়েছে। ইরাকীরা হয়তো মাত্রাতিরিক্ত কৌতুহলী, কিন্তু প্রাকৃতিক ভাবেই ইরাকীরা অন্যের মুল্যবোধের অস্তিত্ব কে স্বীকার করে, অন্তত পক্ষে যতক্ষণ না সেই ভিন্ন মুল্যবোধ আমাদের উপরে চাপিয়ে দেয়ার চেস্টা না করা হচ্ছে।

আমি আমেরিকার জনগন কে ঘৃণা করিনা, কিন্তু আমেরিকার যে দখলদারি রাজনীতি, আচরণ তাঁকে ঘৃণা করি। অন্ততপক্ষে যেভাবে আমেরিকা ইরাক কে দখল করে নিলো, আমি তা ঘৃণা করি। এমন কি আমি আমেরিকান সৈন্যদেরও ঘৃণা করিনা … হুমম … না, দাঁড়ান, আমি হয়তো আমেরিকান সৈনিকদের কখনও কখনও ঘৃণা করি বা করেছি।

  • আমি ওদের কে ঘৃণা করেছি, যখন ওরা আমাদের উপরে বৃষ্টির মতো বোমা ফেলেছে। প্রতিটি দিন আমাদের কে বোমা বিস্ফোরণের মধ্যে বসবাস করতে হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্যবার আমরা কাউন্ট করতাম বোমারু বিমানের সংখ্যা। একটা বিমান বোমা ফেলে চলে যাবার পর, আমরা হিসাব করতাম পরের বিমান টি কতখন পরে আসবে বোমা ফেলতে। আমি তাঁদের কে ঘৃণা করেছি, যখন প্রবল বোমাবাজির মধ্যে জীবত বসে থেকে আমার মনে পড়েছে আমাদের নিহত আত্মীয় স্বজনদের কথা।
  • এপ্রিল মাসের ১১ তারিখ, একটা ধূসর দিন আমাদের জন্যে, আমাদের একজন আত্মীয় সপরিবারে নিহত হয় আমেরিকার ট্যাংকের আঘাতে। এমন নয় যে তারা কোনও সন্ত্রাসী বা শত্রুপক্ষ। তাঁরা প্রানভয়ে পালাচ্ছিলেন। এই পলায়নপর সাধারণ পরিবারটির গাড়ির উপর একটি মার্কিন ট্যাংক সোজা তুলে দেয়া হয়। বাড়ীর গৃহকর্তা, মা, এক ছেলে এবং একটি কেবল হাঁটতে শেখা কন্যা, সবাই নিহত হয়। হ্যাঁ, এই খবর শুনে আমেরিকান ট্যাংক – আমেরিকান সৈন্যদের প্রতি আমার ঘৃণা তৈরী হয়েছিলো।
  • জুন মাসের তিন তারিখে বাগদাদে, কোনও কারণ ছাড়াই আমাদের গাড়ীটিকে আটকানো হয়। গাড়ীতে তিন জন নারী, একটি শিশু ও একজন পুরুষ ছিলেন। আমাদের সবাইকে গাড়ীতে থেকে নামিয়ে সড়কের উপরে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। গাড়ীটা তল্লাশী করা হলো। শুধু তাইই নয়, আমাদের সাথে থাকা ছোট হ্যান্ডব্যাগ গুলো তল্লাশী করা হলো প্রায় ছিড়ে ফেলার মতো করেই। ভীষণ বিরক্ত আমেরিকান সৈন্যগুলো গজগজ করছিলো আমাদের দিকে তাকিয়ে। নিজ দেশে ভিনদেশী মানুষের হাতে এই ধরনের হেনস্থা, অপমান প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। হ্যাঁ, সেদিনও আমার ঘৃণা জেগে উঠেছিলো ওদের প্রতি।
  • এমন কি আমেরিকান সৈন্যদের প্রতি আমার একদিন ঘন্টা দুয়েকের জন্যে ঘৃণা তৈরী হয়েছিলো। সেদিন আমরা বাগদাদ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলাম, একটা চেকপোস্টে আরো অনেক গাড়ীর সাথে আমাদেরকেও আটকে রাখা হয়েছিলো প্রায় দুঘণ্টার জন্যে।
  • যেদিন আমার কাজিনের বাড়ীতে রেইড করলো আমেরিকান সৈনিকেরা, সে এক ভয়াবহ দিন। বাড়ীতে একজন পুরুষ আর তিন জন নারী। মা এবং তাঁর দুই তরুনী কন্যা। এই তিন নারীর সামনে দিয়ে যখন তাঁদের স্বামী বা পিতাকে হাতকড়া পরিয়ে মাথার চুলের মুঠি ধরে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তাঁদের মানসিক অবস্থা কি হয় ভাবা যায়? রান্না ঘরে বাকি তিন নারীকে বন্দী করে, বিশ জন সৈনিক সারা বাড়ীর তল্লাশীর নামে তছনছ করে ফেলে। ওয়ারড্রবের কাপড় থেকে শুরু করে বাক্সো প্যাট্রা, শেলভ এমন কি খালি প্যাকেট ও রক্ষা পায়নি তাদের হাত থেকে। হ্যাঁ সেদিনও আমি তাদের ঘৃণা করেছি।
    • এপ্রিল মাসের ২৮ তারিখে, পশ্চিম বাগদাদের ফাল্লুজা তে ডজন খানেক শিশু ও টিনেজারকে যখন গুলি করে হত্যা করা হয়, তখনও আমি তাদের ঘৃণা করেছি। সেই এলাকার একমাত্র স্কুলটি দখল করে নিয়েছিলো আমেরিকান বাহিনী, তাঁর প্রতিবাদে স্কুল্টির ছাত্রদের পিতা-মাতারা দাড়িয়েছিলেন রাস্তায় প্রতিবাদ করতে। আর তাদের শিশুরা আমেরিকান সৈনিকদের দিকে ঢিল ছুড়েছিলো। ব্যস … গুলি করা শুরু করলো মার্কিন বাহিনী। ঢিল এর জবাব আসলো গুলি দিয়ে, প্রায় ডজনখানেক শিশু লুটিয়ে পড়লো মৃত্যুর কোলে। ফাল্লুজাতে হত্যার শুরু সেদিন থেকেই।


(ফাল্লুজায় নিহত সেই অভাগা শিশুদের কয়েকজন)

মার্কিন সৈনিকদের প্রতি আমার শুধু ঘৃণাই নয়, করুনাও তৈরী হয়েছে প্রায়শইঃ

    • আমার সত্যিই খুব খারাপ লাগতো, যখন দেখি, আরবের এই প্রখর নির্দয় রোদের মধ্যে ভারী পোশাক পরিহিত, ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে আছে এই সৈনিকেরা। রাস্তায় এয়ার কন্ডিশন্ড গাড়ীর দিকে কঠোর ভাবে তাকানো এই মানব সন্তানদের দেখে সত্যিই আমার খারাপ লাগতো। কেননা, দিনের শেষে, আমরা ইরাকী, এই বাগদাদ আমাদের শহর, আমরা এই নির্দয় রোদ কে চিনি।
    • আমার সত্যি করুনা হয় এদের প্রতি, ঘন্টার পর ঘন্টা রোদে দাঁড়িয়ে থেকে তৃষ্ণা মেটানোর জন্যে ব্যাগ থেকে যে বোতলের পানি বের করে, সেটাও ঠান্ডা নয়। এমন কি কোনও ইরাকীর কাছ থেকে ঠান্ডা বরফ শীতল পানি পান করার অনুমতিও নেই এদের। কোনও একজন ইরাকী বরফ মেশানো পানি এগিয়ে দিলেও, ভয় এবং অবিশ্বাস তাদের কে বাধা দেয়, তা গ্রহন করার জন্যে।
    • আমার করুনা হয় – যখন হয়তো পরিবার হারানো কিম্বা চাকুরী হারানো পাঁচ সন্তানের জনক, রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে গালিগালাজ করছে এই সৈনিকদের, এরা নির্বিকার হয়ে সেই আজব ভাষার গালিগালাজ শুনে যাচ্ছে।
    • আমি খুবই অবাক হই, যখন দেখি, এদের বন্দুকের নল কিম্বা কামানের চোখ প্রতিটি ইরাকীর দিকে তাক করা। এরা বিশ্বাস করে যেকোনো ইরাকী কিম্বা প্রতিটি ইরাকীই হয়তো “টেররিস্ট” হতে পারে।
    • আমি খুব হতাশ হই, যখন দেখি দিনের পর দিন এই সৈনিকেরা প্রায় বেকার ট্যাংকের উপরে বা তাদের গাড়ীর ছাদে বসে আছে, কোনও কিছু করার নেই, তারপরেও।

এই হচ্ছে আমেরিকান সৈনিকদের প্রতি আমার মিশ্র অনুভুতি। আমি বারবার আমেরিকান সৈনিকদের কথা বলছি, কারণ আমি এখনও ব্রিটিশ বা অন্যকোনও দেশের সৈনিক দেখিনি। একজন আমাকে লিখেছে, আমি খুবই বোকা এবং অসৎ, কেননা – “একজন আমেরিকান সৈনিকেরও মরা উচিত নয় কোনও একজন ইরাকীর জন্যে”। আমি একমত এই যুক্তির সাথে। আমিও মনে করি, আমার জন্যে কোনও আমেরিকান সৈনিকের জীবন হাতে নেয়ার কোনও দরকার নেই।

এই যুদ্ধটা শুরু হয়েছিলো “War against Weapon of Mass Destruction (WMD)” বা ওয়েপন অফ ম্যাস ডেস্টারকশন এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসাবে। কিন্তু যখন ইরাকে সেই রকমের কোনও অস্ত্রের খোঁজ পাওয়া গেলোনা, কয়েকবারের চেস্টায় যখন এই ধরনের কোনও অস্ত্রের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেলোনা, তখন যুদ্ধটাকে বানিয়ে দেয়া হলো – “War against Terrorism” সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসাবে । যখন আমেরিকার ফক্স চ্যানেল আর বুশের পরিকল্পনা অনুযায়ী – কনভাবেই ইরাক কে ওসামা বিন লাদেন আর আল-কায়েদার সাথে যুক্ত করা গেলোনা, তখন তাঁরা এলেন – ইরাকী জনগনকে সাদ্দামের হাত থেকে মুক্ত করতে।

যে যাই বলুন, আমার কাছে এটা হচ্ছে – দখল। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ দখল করে নেয়া।

তাহলে কি করা উচিত? আমার পরামর্শ? ডাকুন জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা বাহিনীকে, আমেরিকান বাহিনীকে ফিরিয়ে নিন। ইরাকী জনগনকে তাদের নেতা নির্বাচনের সুযোগ দিন। ইরাকের অন্তর্বর্তী প্রশাসনে তাদেরকেই নিন যারা ইরাকের অভ্যন্তরে আছে এবং এই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ। ইরাকী জনগন ফুঁসে উঠছে, এর দায় আমেরিকান প্রশাসনের, কারণ যুদ্ধ – যুদ্ধ এই নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছে আমেরিকান প্রশাসনের নিরদেশনায়। সুতরাং আমেরিকান সৈনিকের সকল নিরমমতার দায়, ভুলের দায় তো তাদেরকেই নিতে হবে, তাই না?

আমার সবচাইতে কষ্ট হয়, যখন দেখি, আমেরিকান সৈনিকদের একটা বিরাট অংশ অত্যন্ত তরুন, উনিশ – বিশ বছরের তরুনেরা। এটা যেমন খুবই অন্যায় আমার ২৪ বছর বয়সে আমাকে এই ধরনের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে, ঠিক একই রকমের অন্যায় হচ্ছে এই সকল তরুন – তরুনীরা তাদের উনিশ – বিশ বছর বয়সের সময়টা এই ধরনের ভয়াবহ পরিবেশে কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

এক অর্থে আমি আর এই মার্কিন সৈনিকেরা একই রকমের দুর্ভাগা। আমরা সবাই হচ্ছি হাজার মেইল দুরের “বুশ প্রশাসনের” সিদ্ধান্তের শিকার।

আবার অন্যভাবে, এরা হয়তো আমার মতো দুর্ভাগা নয়, কারণ এদের অনেকেই দুয়েক মাসের মধ্যেই বাড়ী ফিরে যাবে, নিরাপদে, সগৌরবে। কিন্তু আমি বা আমরা এই যুদ্ধ নিয়ে আমাদের নিজ মাতৃভূমিতে পরাধীন, নিগৃহীত জীবন কাটাবো বছরের পর বছর।

(চলবে)

Spread the love