এক 

ইসলামের নবী মুহাম্মদ কে ”পেডোফাইল” বলা নিয়ে বছর দুয়েক আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। আমি মূলত লিখেছিলাম মুহাম্মদকে যারা ”পেডফাইল” বলেন, তাঁরা আসলে পেডোফিলিয়া বিষয়টা জানেন না, ভালো করে বোঝেন না। ব্যস, আর যায় কোথায়, আমার নয়া-নাস্তিক্যবাদী বন্ধুরা হামলে পড়েছিলেন আমার উপরে। আমি বলেছিলাম, যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ মানুষ এটা মানবেন যে একজন মানুষকে  ”পেডোফাইল” বলার জন্যে যে পরিমাণে তথ্য থাকা দরকার মুহাম্মদের বিষয়ে আমাদের কাছে সেই পরিমাণে তথ্য নেই। কেবলমাত্র একজনের বালিকা বধূ থাকা মাত্রই তাঁকে ”পেডোফাইল” বলা যায়না। মুহাম্মদের যৌনজীবন নিয়ে আরও নানান রকমের অভিযোগ হয়তো আরও অনেক ভ্যালিড হতে পারে কিন্তু ’পেডোফিলিয়া’র অভিযোগ একেবারেই স্থূল ও প্রমাণের অতীত, অন্তত যে সকল তথ্য আমাদের হাতের কাছে আছে তার ভিত্তিতে। ভবিষ্যতে যদি কোনও গবেষক ইতিহাসের পাতা থেকে এমন সব তথ্য তুলে নিয়ে আসতে পারেন যা অকাট্য ভাবে প্রমাণ করে যে মুহাম্মদ একজন ‘পেডোফাইল’ তাহলে নিশ্চয়ই তাকে পেডোফাইল বলা যেতে পারে।  আর মুহাম্মদের স্ত্রীর বয়স নয় বছর ছিল বলেই ইসলাম পেডোফিলিয়া কে প্রোমোট করে এমনটা বলা যায়না। এই ছিল আমার মূল বক্তব্য। আমার কথাকে খণ্ডন করার বদলে আমাকে ”প্যান ইসলামিস্ট”, ”ছুপা মুমিন”, ”ছাগু” ইত্যাদি নানান কিছু বানানোর ধান্দায় মেতে উঠেছিলেন আমার নয়া-নাস্তিক্যবাদী বন্ধুরা।

এখনও আমাদের আত্মদাবীকৃৎ ’মুক্তচিন্তক’ নয়া-নাস্তিক্যবাদীদের একটা প্রিয় বিষয় হচ্ছে মুহাম্মদের ’পেডোফিলিয়া’। এদের কেউ কেউ হাস্যকর সব রেফারেন্স সহযোগে প্রমাণেরও চেষ্টা করেন যে মুহাম্মদ আসলেই একজন ’পেডোফাইল’ ছিলেন যদিও এরা ’পেডোফিলিয়া’ ডায়াগনোসিস এর প্রাথমিক শর্তগুলোই বোঝেন না।

 

দুই

গত দশ বারো বছরে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তত তিনটি মামলায় তিনজনের শাস্তি হয়েছে মুহাম্মদ কে প্রকাশ্যে  ”পেডোফাইল” বলা এবং সেটা ব্যাখ্যা করতে না পারার ব্যর্থতার কারণে। না, ইউরোপে শাস্তি মানে তো গলা কাটা নয়, এই লোকগুলোকে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে, খুবই স্বল্প মেয়াদে কারাবাস দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচাইতে হাই প্রোফাইল কেইসটি ছিল অস্ট্রিয়ার একজন নারীর সাথে সেদেশের একজন সাংবাদিকের মামলা যা অস্ট্রিয়ার সকল আদালতের রায়ের পরে ইউরোপের সরবোচ্চ আদালতের (European Court of Human Rights বা ECHR) দ্বারস্থ হতে হয়েছিলো।প্রাথমিক ভাবে ২০০৯ সালে শুরু হয়ে এই মামলাটিতে অস্ট্রিয়ার সব কটি আদালতে সেই অভিযুক্ত ভদ্রমহিলাকে সুযোগ দেয়া হয়েছিলো তাঁর বয়ান কে প্রমাণ করার জন্যে কিন্তু কোনও আদালতই যখন তাঁর ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি, তখন ভদ্রমহিলা দাবী করেন যে মুহাম্মদকে ’পেডোফাইল’ বলাতে যদি তাঁর শাস্তি হয় সেটা হবে তাঁর মৌলিক অধিকার বাক-স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন এবং সেই দাবী নিয়ে তিনি ২০১২ সালের জুন মাসের ৬ তারিখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরবোচ্চ আদালতে আপিল করেন। তাঁর মামলাটিতে বিচারক হিসাবে ছিলেন ইউরোপীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের সাতজন বিচারক। জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, আয়ারল্যান্ড,  লাটভিয়া, জর্জিয়া ও আজারবাইজান এর সাতজন বিচারক ভদ্রমহিলার আপিল শুনানি করেন। মুহাম্মদ পেডোফাইল সেটা প্রমাণ করার বদলে তিনি আপিল করেছিলেন অস্ট্রিয়ার আদালত যে রায় দিয়েছেন তাঁর বিরুদ্ধে সেটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার আইনের অধীন ধারা ১০ এর লঙ্ঘন অর্থাৎ নাগরিকের বাক-স্বাধীনতার লঙ্ঘন ঘটেছে এই মর্মে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সরবোচ্চ আদালত তাদের সংক্ষিপ্ত রায়ের কপিতে শুরুতেই সুস্পষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ধর্মের সমালোচনার বিষয়ে এই আদালতের এবং ইউরোপের নর্মস কে। তাঁরা লিখেছেন এভাবে –

“The Court noted that those who choose to exercise the freedom to manifest their religion under Article 9 of the Convention could not expect to be exempt from criticism. They must tolerate and accept the denial by others of their religious beliefs”। 

অর্থাৎ মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা তাঁর ধর্মের সমালোচনাকে কে নাকচ করে দেয়না এবং যেকারো ধর্ম পালনের স্বাধীনতা অন্যদের সেই ধর্মকে অস্বীকারের অধিকারকেও খর্ব করেনা। সুতরাং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কখনওই ধর্ম কে সমালোচনা থেকে মুক্ত থাকার অধিকার দেয়না, বরং সকল ধর্মই সমালোচনার অধীন এবং আরও দশটি বিষয়ের মতই ধর্মও সমালোচনার অধীন। ধর্মকে সমালোচনা করাটা নাগরিকের মৌলিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে।  

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ইউরোপের সরবোচ্চ আদালতের রায় ভদ্রমহিলার বিরুদ্ধে যায়। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত ব্যাখ্যা করেছেন যে যেহেতু তিনি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে মুহাম্মদ একজন পেডোফাইল, সুতরাং এর পরেও সেটা বলাটা তাঁর বাক-স্বাধীনতা নয়, এবং এই ধরনের বক্তব্যের জন্যে তাকে শাস্তি দেয়াটা তাই তাঁর মৌলিক অধিকার হরণ করা নয়। আদালত ব্যাখ্যা করেছেন যে মুহাম্মদকে ’পেডোফাইল’ বলার ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠটার অভাব ছিল এবং অসত্য তথ্যের উপড়ে ভিত্তি করে এমন মতামত দেয়া হয়েছিলো যা কোনও সুস্থ পাবলিক ডিবেইট তৈরি করেনা।

 

তিন 

ইউরোপের এবং সারা দুনিয়ার ইসলামিস্টরা এই রায়কে নানান ভাবে বিকৃত করে ব্যাখ্যা করেছেন, সেসবেরও একটা বড় অংশ মিথ্যা দাবী। বিভিন্ন ইসলামী দেশ ও গোষ্ঠী দাবী করেছেন যে ইউরোপীয় আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে মুহাম্মদের সমালোচনা বেআইনি ঘোষিত হয়েছে ইত্যাদি নানান ধরনের বয়ান। এই সকল দাবীর প্রায় প্রতিটিই মিথ্যা ও অসত্য। বরং ইউরোপীয় আদালত বলেছে ধর্মের সকল ধরনের লেজিটিমেইট সমালোচনা করা যাবে, মুহাম্মদ সহ যেকোনো ধর্মীয় গুরুর সমালোচনা করা যাবে,  বিতর্ক করা যাবে, কিন্তু এই সকল কিছু হতে হবে পাবলিক ইন্টারেস্টকে সারভ করার জন্যে, ঘৃণা ছড়ানোর জন্যে নয়। আরও বলে রাখা ভালো যে ইউরোপের প্রতিটি দেশের আদালত স্বাধীন এবং ইউরোপীয় সরবোচ্চ আদালতের কোনও রায় অন্য কোনও সদস্য দেশে আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করেনা। কেবলমাত্র যদি কোনও নাগরিক তাঁর নিজের দেশের সরবোচ্চ আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট না হন, তাহলেই কেবল তিনি ইউরোপীয় আদালতে আসতে আপ্রেন এবং ইউরোপীয় আদালত কেবল বিচার করেন যে তাঁর দেশের আদালতে তিনি সুবিচার পেয়েছেন কিনা। এই ক্ষেত্রে ইউরোপীয় আদালত ভদ্রমহিলার নিজ দেশ অস্ট্রিয়ার আদালতের দেয়া ৪২০ ইউরো অর্থদণ্ডকে বহাল রাখেন এবং মতামত প্রকাশ করেন যে এই দণ্ডের ফোলের ভদ্রমহিলার বাক-স্বাধীনতা হরণ করা হয়নি।

এই রায়ের ফলে কি মুহাম্মদ সমালোচনার উপড়ে উঠে গেছেন? মোটে তা নয়, বরং মুহাম্মদ ও তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইসলাম সহ যেকোনো ধর্ম ও ধর্মীয় গুরু, ধর্মগ্রন্থ সবসময়ই সমালোচনার অধীন। ধর্মের সমালোচনা করা যেমন নাগরিক অধিকার তেমনি এর সমর্থকদের পক্ষে ধর্মের প্রশংসাও নাগরিক অধিকার। কিন্তু ইউরোপীয় নর্মস বা মূল্যবোধ হচ্ছে এই সকল সমালোচনার উদ্দেশ্য হতে হবে মানুষের কল্যাণ, মানুষের সৃজনশীল চিন্তাকে উস্কে দেয়াড় উদ্দেশ্যে, ঘৃণা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়।

 

চার 

আমাদের স্বদাবীকৃৎ বাঙ্গালী ‘মুক্তচিন্তক’দের প্রধান সমস্যা হচ্ছে এদের চিন্তার জগত হচ্ছে একেকটা ফ্যান্টাসি সিনেমার জগত। এদের আদর্শ হচ্ছে ইউরোপ, কিন্তু এরা ইউরোপ কে জানেন না। এরা ইউরোপের ইতিহাস জানেন না, ইউরোপের মূল্যবোধ কে জানেন না, ইরোপের জনগণকে জানেন না।  এমন কি এদের মাঝে যারা বাঙ্গালী বাবার হোটেল থেকে ইউরোপের সামাজিক দায়িত্বের হাওলায় এসে পড়েছেন, তাঁরাও ইউরোপ কে জানেন না, বোঝেন না, কেননা নিজের ঘরের বাইরে গিয়ে ইউরোপের মূলধারায় মেশার যে প্রাথমিক যোগ্যতা, দক্ষতা অর্থাৎ স্থানীয় ভাষা, সেটাও তাঁরা জানেন না। এরা নিজেদেরকে দাবী করেন “মুক্তমনা” হিসাবে কিন্তু কোনও কিছু মুক্ত মন নিয়ে পাঠ করার মত সংস্কৃতিও এরা অর্জন করতে পারেন নি। যদি পারতেন, তাহলে ইউরোপের এই রকমের উদাহরণগুলো থেকে এরা ইউরোপ কে বোঝার চেষ্টা করতেন। 

ইউরোপের বাক স্বাধীনতা হচ্ছে ‘দায়িত্ববান’ মানুষের স্বাধীনতা। ইউরোপের ব্যক্তি স্বাধীনতা হচ্ছে ‘দায়িত্ববান’ মানুষের স্বাধীনতা। ইউরোপের মানবকল্যাণ হচ্ছে, পারস্পরিক মানবিক শ্রদ্ধার উপরে নির্মিত, ঘৃণার উপরে নয়, ফ্যান্টাসির উপরে নয়। ইউরোপে স্বাধীনতা শব্দটি কখনওই একা একা আসেনা, এখানে স্বাধীনতার সাথে সবসময়ই যুক্ত থাকে দায়িত্ব। এখানে ফ্রিডম ও লিবার্টি বললে সকলেই বুঝে নেন এর সাথে ব্যক্তি মানুষের দায়িত্ববোধের বা রেসপন্সিবিলিটির কথাটিও।  তাই যে মানুষ নিজে ব্যক্তিগত ভাবে দায়িত্ববান নাগরিক নন, তাঁর হাতে ইউরোপের বাক স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা হচ্ছে উন্মাদের হাতে ম্যাচ লাইটারের মতই বিপদজনক।

 

পাঁচ 

ইউরোপ কে বন্দনা করার আগে ইউরোপ কে বোঝা দরকার, ইউরোপের নামে মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর বদলে ইউরোপ বহু বছরের সংগ্রামে যে মূল্যবোধটি অর্জন করেছে তাকে আত্মস্থ করা দরকার। ধর্মের সমালোচনা ইউরোপে অবাধ, কিন্তু সেটাকে মানুষের কল্যাণের সাথে যুক্ত হতে হবে, সভ্যতার অগ্রসরমানতার সাথে যুক্ত করতে হবে, সেটাই ইউরোপীয় মূল্যবোধ। 

 

সূত্র 

ইউরোপীয় আদালতের সংক্ষিপ্ত রায়ের ইংরাজি ভার্শন 

Spread the love