পশ্চিমের সন্ত্রাস – শাক দিয়ে মাছ ঢাকার ইতিহাস

আন্দ্রে ভিচেক

আমার সাথে যে সকল পরিসংখ্যানবিদ কাজ করেন, তাঁরা চেষ্টা করছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপনিবেশিকতা ও নয়া-উপনিবেশিকতার কারণে ঠিক কতজন মানুষ দুনিয়া থেকে উধাও হয়ে গেলো, তাঁর সংখ্যাটা বের করার। আমাদের এই আলোচনার শুরুতে যেভাবে বলছিলাম এটা প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটির মতো হবে। অবশ্য, একদম কড়ায় গন্ডায় সংখ্যাটি নির্ণয় করার হয়ত দরকারও নেই,  তা সে সংখ্যাটি চার কোটি হোক কিম্বা ছয় কোটি হোক। সংখ্যাটি এতো ভয়াবহ ছিলো, যদিও পশ্চিমা বিশ্ব এবং পশ্চিমা সংস্কৃতি কোনও ভাবে তাঁদের সমাজকে জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে এই বিশাল হত্যাকান্ডটির হয়তো কোনও নৈতিক বৈধতা ছিলো। পশ্চিমা বিশ্ব সারা দুনিয়াকে বোঝাতে পেরেছিলো যে এটা তাঁদের অনেকটা অধিকার সারা বিশ্বকে শাসন করা। পশ্চিমা সংগঠন, মিডিয়া দিয়ে এটা তাঁরা প্রচার করে, এঁরা প্রচার করে এঁদের নিজস্ব মূল্যবোধ। এঁরা কেমন করে তা অর্জন করে?

নোম চমস্কি

“কমিউনিজমের কালো অধ্যায়” বলে ফ্রান্সে একটা বই প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৯৭ সালে। বইটা খুব দ্রুত ইংরাজিতে অনুবাদ হয়ে প্রকাশিত হয় যেনো সারা বিশ্বে এর রিভিউ খুব দ্রুত ছড়িয়ে যায়। বইটা প্রচার করেছিলো যে প্রায় দশ কোটি মানুষ কমিউনিজমের নিপীড়নের শিকার হয়েছিলো, কমিউনিজম কত অকল্পনীয় নিষ্ঠুর হতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁদের এই গবেষণার উৎস বা পদ্ধতি নিয়ে না হয় প্রশ্ন না তুললাম, বরং আলোচনার স্বার্থে ধরে নেয়া যাক যে তারা সঠিক। তাদের প্রধান অভিযোগ টি আসলে চীনের উপরে। কারণ চীনের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ মারা যায় এবং এটা প্রায় আলোচনার অযোগ্য ভয়াবহতা। ঠিক একই সময়ে বেশ কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা প্রকাশিত হয় কয়েকজন নামী গবেষকের কাছ থেকে, যেমন তাঁদের একজন হচ্ছে অমর্ত্য সেন, যিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং তিনি একজন দুর্ভিক্ষ বিশেষজ্ঞও বটে। ভারতের আরেকজন অর্থনীতিবিদকে সাথে নিয়ে তিনি একটা আগ্রহউদ্দীপক তুলনামূলক গবেষণা করেছিলেন। তাঁরা দুজনে চীন ও ভারতের মাঝে একটা তুলনামূলক গবেষণা করেছিলেন ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত এই সময়কালকে নিয়ে। গবেষণাটি ১৯৭৯ তে থেমে গিয়েছিলো কারণ ১৯৭৯ থেকেই চীনে তথাকথিত পুঁজিবাদী সংস্কার শুরু হয়েছিলো। তো তাঁরা মাও সেতুং এর এই সময়কে ধরে তুলনা করেছেন ভারত আর চীনের মাঝে। তাঁরা দেখিয়েছেন যে ঠিক এই সময়টিতে গণতান্ত্রিক ভারতে প্রায় দশ কোটি মানুষ মারা গেছে দুর্ভিক্ষে, আর এর কারণ ছিলো শুধুমাত্র স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতে ভারত সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা আর গ্রাম অঞ্চলে যথাযথ সাহায্য ও কল্যাণের ব্যবস্থা করতে না পারা। বাস্তবত, তাঁদের গবেষণা বলছে, মাও সেতুং এর এই চল্লিশ বছরের লজ্জাজনক দুর্ভিক্ষে যত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, ভারতে প্রতি আট বছরে সেই সংখ্যক মানুষ কে হত্যা করা হয়েছে। অধ্যাপক সেন ও তাঁর সহ গবেষক, এই হত্যাকে বলেছেন রাজনৈতিক অপরাধ, কারণ এই হত্যার পেছনে মূল কারণ হিসাবে কাজ করেছে সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা এই দুই সমাজে বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই গবেষণাটি ছিলো একটি দেশ ভারত কে নিয়ে যেখানে এই সময়ের মাঝে প্রায় দশ কোটি মানুষ মারা গেছে, অধ্যাপক সেন যদি এই একই গবেষণা পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো অর্থাৎ ততাকথিত গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী দেশগুলোর উপরে করতেন, সংখ্যাটা একই রকমের ভয়াবহ হতে পারতো।

আমার মনে আছে যখন অমর্ত্য সেন নোবেল পুরষ্কার লাভ করলেন তখন অনেকেই আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এবং আমি প্রায় সবাইকেই এই বিষয়টা মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমার মনে আছে একজন ভারতীয় সাংবাদিক এই কথাটি উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কমিউনিজমের যে অপরাধ, নিপীড়ন সে বিষয়ে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অনুশোচনা যথেষ্ট নয়, কিভাবে মানুষ এই রকমের ভয়াবহতা চালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু এটাও বাস্তব সত্য যে আমরা জানিনা আমাদের চোখের আড়ালে পৃথিবীর ইতিহাসে এই রকমের আরো কতটি ঘটনা ঘটে গেছে। আমরা কেবল সবাই চীনের দুর্ভিক্ষের এই ভয়াবহতা দেখতে পারি । এটা আমাদের আশে পাশের মানুষের এক দারুন স্বেচ্ছা অন্ধত্ব বা সিলেক্টিভ ব্লাইন্ডনেস। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকের কথা বলুন আর সাংবাদিক বা সম্পাদকদের কথা বলুন, এঁরা এসব দেখতে পারেন না। এঁরা দেখতে পান যখন “নিউ ইয়র্ক রিভিউ অফ বুকস” কিম্বা অন্য বামপন্থী – উদারনীতিক পত্রিকা যখন ইঙ্গিত করেন এই গোলার্ধে যখন কলম্বাস এসেছিলেন তখন কতজন মানুষ এখানে ছিলো আর সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো সেই প্রশ্ন নিয়ে। কলম্বাস যখন এই ভূমিতে পা রেখেছিলেন তখনও এই ভূমিতে কোটি খানেক মানুষ এখানে শিকার করছে, জীবন নিয়ে সংগ্রাম করে বেড়াচ্ছে, সেই কোটি খানেক মানুষ শুধুমাত্র উধাওই হয়ে যান নি … মানে আপনি জানেন এই সব, এসব নিয়ে কোনও কথা নেই আমাদের মাঝে।

আন্দ্রে ভিচেক

আমার এক বন্ধু জিওফ্রি গুণ, তিনি জাপানের নাগাসাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক, তিনি একটা আগ্রহউদ্দীপক গবেষণা করেছেন। তিনি আসলে একটা আস্ত বই লিখছেন চীনের সেই মহামারী ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে এবং তাঁর উপর জাপানের উপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী ভুমিকার কথা নিয়ে। এটা এমন নয় যে জাপানিজরাই উদ্দেশ্যমূলক ভাবে চীনের এই দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছিলো, কিন্তু সেই সময়টায় মানে চীন – জাপান যুদ্ধের শেষ দিক্টায়, জাপানিজরা চীন থেকে ব্যাপক সম্পদ সরিয়ে নিচ্ছিলো এবং চীনের খাদ্য সরবরাহের পুরো কাঠামোটাই বদলে দিয়েছিলো। তিনি এই বইটিতে বিতর্ক করেছেন যে চীনের এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পেছনে কমিউনিজমের কোনও সম্পর্কই নেই বরং এর পেছনের মূল কারণটি ছিলো জাপানী সাম্রাজ্যবাদ।

নোম চমস্কি

জাপানে এখন অনেক বই আছে যেখানে নানকিং হত্যাকান্ডকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং বাস্তবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সকল ভয়াবহ হত্যাকান্ডের ঘটনাকে ভুলে যেতে সাহায্য করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে আমেরিকা আসলে জাপান সহ দক্ষিন এশিয়ার বেশীরভাগ অঞ্চলই শাসন করেছে। তারা জাপান দখল করলো এবং মূলত তারা পুরো এশিয়ায় শাসন করছিলো, তারা একটা শান্তি চুক্তিও করেছিলো, হ্যাঁ সানফ্রানসিস্কো শান্তি চুক্তি এবং সেই শান্তি চুক্তিতে আমেরিকা বাধ্য করেছিলো যেনো জাপানের যাবতীয় অপরাধ গন্য করা হয় কেবল ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসের সাত তারিখের পর থেকে। অর্থাৎ তারা আগে করা জাপানী সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতাগুলোকে অপরাধ হিসাবে কোনও আলোচনা না হয়। ফলে এশিয়ান দেশগুলোর মাঝে যে সকল দেশ আপাত ভাবে স্বাধীন ছিলো তারা কেউই এগিয়ে আসেনি, শুধুমাত্র ফিলিপাইন ও সিলোন ছাড়া, যে দুটি দেশ তখনও উপনিবেশ। ভারত বা ইন্দোনেশিয়া এগিয়ে আসেনি কারণ আমেরিকা তখন জাপানের অপরাধগুলোকে সাফাই করছে। কিন্তু আমার জানামতে আমেরিকা সেই সকল অত্যাচার নিপীড়নের ভুক্তোভোগী ছিলোনা, এটা তাঁদের কোনও ক্ষতি করেনি, এটা ক্ষতি করেছে সেই সকল “উন-মানুষ”দের যারা শারীরিক ভাবে দুনিয়াতে বর্তমান থাকলেও সমাজ বা রাষ্ট্রের চোখে তারা অস্তিত্বহীন মানুষ। হ্যাঁ জাপানের এই সকল অপরাধের দিকার হয়েছিলো এই সকল “অস্তিত্বহীন মানুষেরা”।

আন্দ্রে ভিচেক

আর এখন আমাদের রোয়ান্ডাতে একই অবস্থা চলছে। একই কাঠামোতে চলছে আরুশা-ভিত্তিক ট্রাইবুন্যাল। একই নীতিতে অর্থাৎ একটা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে এর আগের কোনও অপরাধের বিচার হবেনা। অর্থাৎ যাদের কে আমরা সমর্থন করি যেমন আরপিএফ কিম্বা পল কাগামে, এঁরা সবাই বিচারের আওতা থেকে বাদ পড়েছেন।

নোম চমস্কি

আমরা যদি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইবুন্যাল গুলোর দিকে দেখি, তাহলে দেখবো এখানে অভিযুক্ত বেশীর ভাগ মানুষই হচ্ছেন আফ্রিকান আর দুই একজন আছেন যারা আসলে কোনও না কোনও ভাবে আমেরিকার শত্রু, যেমন মিলোসেভিচ। আবার আফ্রিকান শাস্তি প্রাপ্তদের মধ্যে তারাই বেশী যাদেরকে আমরা পছন্দ করিনা। কিন্তু গত কয়েক বছরে কি কোনও অপরাধ হয়নি দুনিয়াতে?

ইরাক আক্রমনের কথাই ধরুন, এর মতো অপরাধের কিছুই হতে পারেনা এই সময়ে। নুরেমবারগ আইন কিম্বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক আধুনিক আইনের কথা না হয় বাদই দিলাম। আসলে এখানে আরেকটা আইনী দিক আছে যা অনেকেরই অজানা। আমেরিকা হচ্ছে এক রকমের সকল বিচার প্রক্রিয়ার উপরের শক্তি। আমেরিকা যখন ১৯৪৬ সালে বিশ্ব আদালতে যোগদান করলো, মূলত তারাই এই আধুনিক আন্তর্জাতিক আদালত টি চালু করলো ও নিজেরা যোগদান করলো এই শর্তে যে আমেরিকার বিচার করা যাবেনা কখনও কিম্বা কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি যেমন জাতিসংঘ সনদ, আমেরিকার রাজ্যগুলোর সনদসমুহ কিম্বা জেনেভা কনভেনশন, আমেরিকা এই সকল ইস্যু থেকে সুরক্ষিত থাকবে। এই আদালত তা মেনেও নিলো। ধরুন নিকারাগুয়ার কথা। নিকারাগুয়া যখন বিশ্ব আদালতে আমেরিকার বিরুদ্ধে মামলা করলো তাঁদের দেশে সন্ত্রাসবাদী হামলা করার জন্যে, কিন্তু এই সকল অভিযোগকে খারিজ করে দেয়া হয়েছিলো আমেরিকার রাজ্যগুলোর সনদ অনুযায়ী, কারণ এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আমেরিকাকে কখনই এই ধরণের বিচারের মুখোমুখি হতে হবেনা। আদালত এই খারিজ করে দেয়াকে মেনে নিয়েছে।

আগ্রহউদ্দীপক ভাবে, একই ধরণের ঘটনা ঘটেছে যখন যুগোশ্লাভিয়া সেদেশে বোমা হামলার অপরাধে আমেরিকার নেতৃত্বের সামরিক জোট ন্যাটোর বিরুদ্ধে মামলা করলো আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিরোধী আদালতে, তখন এই মামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্র কে বাদ দেয়া হয়েছিলো এবং আদালত তা মেনে নিয়েছিলো। কেননা এই অভিযোগনামার কোনও এক যায়গায় লেখা হয়েছিলো এই অপরাধ টি ছিলো একটি “গনহত্যা” বা “জেনোসাইড” আর আমেরিকা যখন গনহত্যা বিষয়ক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলো, তখন তারা এটা নিশ্চিত করেছিলো যে এই চুক্তির শর্তগুলো আমেরিকার উপর প্রযোজ্য হবেনা। ফলে যুগোশ্লাভিয়ার অভিযোগ থেকে আমেরিকাকে রেহাই দেয়া হয় এই গনহত্যা চুক্তি বা জেনোসাইড কনভেনশন এর উপর ভিত্তি করে। আক্ষরিক অর্থেই অনেক প্রতিষ্ঠিত আইনী বাধা আছে যদি কেউ চায় কোনও শক্তিমানের অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে। আমি নিশ্চিত, আপনার হয়তো মন্ব আছে যখন রোম চুক্তি স্বাক্ষর হলো কিম্বা যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ বিষয়ক আদালত স্থাপিত হলো, আমেরিকা এসবে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো। তারপরে নানা বিচিত্র সব ঘটনা ঘটেছে। আমেরিকান সংসদ যখন আইন পাস করলো যাতে বুশ প্রশাসন সানন্দেই স্বাক্ষর করেছিলো। আইনটি ছিলো, আমেরিকা চাইলে নেদারল্যান্ড এর হেগ আন্তর্জাতিক আদালতেও হামলা করতে পারবে যদি সেখানে কোনও আমেরিকানকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ইউরোপে এই আইন কে “নেদারল্যান্ড ইনভেসন অ্যাক্ট” বা “নেদারল্যান্ড আক্রমন আইন” বলা হয়ে থাকে। এই আইন এখানে পাস করা হয়েছিলো বেশ উতসাহের সাথে যেনো আমেরিকাকে সুরক্ষা করা যায় সকল দিক থেকেই। এটা সত্যিই আশ্চর্যজনক যে, এই আমেরিকাতেই কি নির্মম ভাবে অস্বীকার করা হয়েছে এখানকার আদিবাসীদের উপরে ভয়াবহ গনহত্যা, এমন কি এটা আপনার চোখের সামনে ঘটলেও অস্বীকার করা হচ্ছে। বরং এই সকল হত্যাকান্ডকেও আইন দিয়ে জায়েজ করে নেয়া হয়েছে।

আন্দ্রে ভিচেক

চীনের বিরুদ্ধে আক্রমনগুলোর কথাই ধরুন। যখনই চীন কোনও ভুল করেছে, খুব ন্যূনতম ভুল, যেমন জাম্বিয়া তে খনি দুর্ঘটনার মতো ঘটনা, যেখানে চীনের কোমপানিগুলো জড়িত ছিলো এবং কিছু মানুষ নিহত হয়েছিলো, শব্দটা বলেছি “কিছু” কয়েক লাখ নয়, কিন্তু এই দুর্ঘটনাকেই টার্গেট করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া। মিডিয়ার কল্যানে খনি দুর্ঘটনায় এই কয়েকজন মানুষ মৃত্যুর বিষয়টি হয়ে যায় একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু যার গুরুত্ব উঠে আসে কলোনিয়াল শাসকগোষ্ঠীর হাতে নিহত হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের নিহত হবার সমান।

নোম চমস্কি

গত একশো বছরে প্রোপাগ্যান্ডা বা প্রচারনার অত্যন্ত সুচতুর কৌশল আবিষ্কার হয়েছে আমাদের মস্তিষ্কে এমন কি আক্রমণকারীর মস্তিস্কেও উপনিবেশ তৈরী করার মতো । সেইজন্যেই পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষেরা এই সকল নিপীড়নগুলো দেখতে পাননা। একটা আগ্রহ উদ্দীপক উদাহরণ যা আমাকে অনেক বছর ধরে দারুন ভাবে ভাবতে বাধ্য করে তা হচ্ছে পূর্ব ইউরোপ এবং পূর্ব ইউরোপের ভিন্নমতাবলম্বি মানুষেরা। ধরুন পূর্ব ইউরোপের একজন ভিন্ন মতাবলম্বী ভাকলাভ হভেল, পশ্চিমে তিনি খুবই বিখ্যাত ও সম্মানিত এবং এটা সত্য যে তাঁরা পূর্ব ইউরোপে অনেক অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছেন, কারো কারো জেল জরিমানাও হয়েছিলো। কিন্তু এতাও সত্যি যে এঁরা দুনিয়ার সবচাইতে সুবিধাভোগী ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ কেননা সমগ্র পশ্চিমা মিডিয়ার কাছে তাঁরা নমস্য মানুষ। পৃথিবীর আর কোথাও ভিন্নমতাবলম্বীরা এতো বিখ্যাত নন। বার্লিন দেয়ালের পতনের পর পরই কিছু কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, লাতিন আমেরিকার ছয়জন নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবি নিহত হন সান সালভাদোরে, দেশটির সেনাবাহিনীর একটি এলিট গ্রুপ আটলাক্যাটল ব্যাটালিয়ান এর হাতে। শুধু তাঁরা নয়, আরো কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে জানিনা।

দলটি কেবল ফিরেছে নর্থ ক্যারোলাইনার জন এফ কেনেডি বিশেষ যুদ্ধকৌশল প্রশিক্ষন কেন্দ্র থেকে তাজা প্রশিক্ষন নিয়ে। তারা ফিরে আসলো এবং সামরিক হাই কমান্ড যারা আমেরিকান দুতাবাসের খুবই ঘনিষ্ঠ সহযোগী, তাঁদের নির্দেশে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকান্ডটি চালায়। তাঁরা খুন করে এই শিক্ষক ও পাদ্রীদের, তারা খুন করে আশেপাশে যারা ছিলো সবাইকে, যেনো সাক্ষী দেবার মতোও কেউ না থাকে। ঠিক এই হত্যাকান্ডের পরেই ভাকলাভ হভেল আসেন আমেরিকাতে এবং তিনি বক্তৃতা করেন আমেরিকার কংগ্রেস এর যৌথ অধিবেশনে, তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর বক্তৃতা করেন। বিশেষত তিনি যখন আমেরিকাকে উল্লেখ করছিলেন “স্বাধীনতার রক্ষক” হিসাবে, যারা এই কয়েকদিন আগেও ভিন্ন একটি দেশে প্রায় আধা ডজন মানুষকে নৃশংস ভাবে খুন করেছে। এই খুন হয়ে যাওয়া মানুষেরা হচ্ছে “ন-মানুষ” বা আন-পিপল, যারা আমাদের গননার বাইরের মানুষ। কেউ কোনও কথা বলেনি, মন্তব্য করেনি। যারাই এই ঘটনার কথা বলতে গেছে তাদেরকেই থামিয়ে দেয়া হয়েছে।

এটা শ্রেফ অকল্পনীয়, যদি এই ঘটনাটি এর উল্টো ভাবে ঘটতো। যদি হভেল এবং তাঁর ছয়জন সহকর্মীকে যদি নৃশংস ভাবে খুন করা হতো এমন একটি দলের মাধ্যমে যারা প্রশিক্ষন নিয়েছে, অস্ত্র পেয়েছে রাশিয়া থেকে এবং ফাদার এল্লাকুরিয়া, নিহত হওয়া সেই ছয়জন পাদ্রীর একজন, তিনি যদি রাশিয়াতে গিয়ে রাশিয়ার সংসদের যৌথ অধিবেশনে বক্তৃতা করে যদি রাশিয়াকে ঘোষণা করতেন দুনিয়ার স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের রক্ষক হিসাবে, তাহলে সারা পৃথিবী প্রতিবাদে ফেটে পড়তো। কিন্তু সান সালভাদোর এর এই হত্যাকান্ড পৃথিবীর ইতিহাসে অদৃশ্য হয়ে গেছে, কিছুই যায় আসেনা যদি কেউ বহুবার এই প্রসঙ্গটি তুলে আনে।

আমার মনে হয় এটা একটা দুর্ভাগ্যজনক পার্থক্য পূর্ব-ইউরোপের আর লাতিন আমেরিকার বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। পূর্ব ইউরোপিয়ানরা তাঁদের নিজেদের নিয়েই চিন্তিত, তাঁরা বলে “আমরা ভুক্তভোগী”। লাতিন আমেরিকানরা সেই তুলনায় অনেক বেশী মানবিক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী। এটা প্রায় অকল্পনীয় যে ফাদার এল্লাকুরিয়া একই কাজ করতে পারতেন যা হভেল করেছিলো। আমি মনে করি, বাস্তবত যখন কেউ নির্যাতিত হয়, তখন তিনি মানুষের আরো বেশী পূজনীয় ও সম্মানিত হয়ে ওঠেন। এটা পশ্চিমাদের জন্যে বরং পরম সম্মানের হতো যদি তাঁরা পূর্ব-ইউরোপে ভ্রমন করে এই সকল নির্যাতিত মানুষদের সাথে সাক্ষাত করতে পারতো। আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি কারণ তাঁরা আমার ভিসার আবেদন গ্রহন করেনি। অন্যদিকে যারা যারা মধ্য আমেরিকায় গিয়েছিলো যখন আমরা সেখানে নৃশংস হত্যাকান্ড চালাচ্ছিলাম বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য মানুষের উপরে, সেই আত্মত্যাগ কে কেউ মহান বলে প্রচার করেনি, বরং সেই ঘটনাগুলোকে “স্যান্ডানিস্টা” বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হয়েছে।

এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে। ধরুন, গুয়াতেমালা থেকে অর্থাৎ এখান থেকে কিছু  মাইল দূরের (কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস), মায়ান সম্প্রদায়ের একদল শরণার্থী আছে। আজকের এই সময়ে, এই শরণার্থীরা সেখান থেকে পালাচ্ছে প্রায় তিরিশ বছর আগের রিগ্যান প্রশাসনের করা ভয়াবহ গনহত্যার ফলে। সেই গনহত্যার নায়ক সামরিক বাহিনীর জেনারেল, তাঁর আসলে শাস্তি হয়েছে, কিন্তু কোথাও রিগ্যানের নাম নেই, অথচ এই লোকই সেই জেনারেলের এই কর্মকাণ্ডকে প্রশংসা করে বলেছিলেন যে তিনি গনতন্ত্রের এক অবিচল রক্ষক। কেবল এই সেনাপতি একটা মানবতাবাদী গোষ্ঠীর চাপে পড়ে শাস্তি পেলেন, যে গোষ্ঠীটি মূলত বামপন্থীদের দ্বারা চালিত। অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে অনেক ক্ষোভ আছে কিন্তু এই মানুষগুলো কেনো পালিয়ে যাচ্ছে? আমরা আলোচনা করতে পারিনা কেননা এতো রক্ত লেগে আছে আমাদের হাতে, তাই এসব ভুলে গেছি আমরা, লাওস, কম্বোডিয়া এরকমের হাজারো উদাহরণ নেয়া যেতে পারে।

 

(চলবে)

Spread the love