আমার ব্যক্তিগত লেখালেখির এই ব্লগ-সাইট ভ্রমন করার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আমার নিজের সম্পর্কে বলার মতো খুব আহামরি কিছু নেই। কেবলই খানিকটা ব্যক্তিগত পরিচয় এবং কিছু প্রাসঙ্গিক কৈফিয়ত দেবার জন্যেই এই অংশটুকু।

আমি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে জন্মেছি। আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে আত্রাই নদীর তীরে, নওগাঁ জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। পরে বাবার চাকুরী সূত্রে ঢাকায় পড়াশুনার সুযোগ লাভ। তারও পরে প্রায় দশ বছর কাটিয়েছি সিলেটে, মেডিক্যাল কলেজে পড়াশুনা আর ডাক্তার হিসাবে প্রথমজীবনের পেশা শুরুর সময়টিতে। মার্ক্সবাদী পাঠচক্রের সাথে যুক্ত হই হাইস্কুলে পড়ার সময়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং আরো পরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সাথে উত্তেজনাকর প্রায় বারো বছর কাটানো। মানুষ কে ভালোবাসি, বিশ্বাস করি মানুষের অধিকারের সমতায়। রাজনৈতিক আকাংখার দিক থেকে সমাজতন্ত্রের সমর্থক। আমি মনে করি, শুধু অধিকারের সমতা নয়, সাংস্কৃতিক ভাবে একটি সত্যিকারের সেকুলার সমাজই হতে পারে প্রকৃত মানবিক সমাজ। আমার মাতৃভূমি সেই মানবিক সমাজ অর্জনের পথ থেকে বহুদুরে, বিচ্যুত বহু বছর ধরে। সামান্য কিছু লেখালেখি করি সেই স্বপ্নের কথা জানান দেবার জন্যেই।

প্রথাগত অর্থে আমি লেখক নই। লেখা আমার পেশা নয়, আমার সেই পেশাগত দক্ষতা নেই। শুধুমাত্র লেখালেখি করার জন্যে যে সৃজনশীল দুঃসাহস থাকা দরকার, আমার তা নেই। আমি নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকাতর একজন মধ্যবিত্ত বাঙালী। সবকিছু করে তবেই লিখতে বসি। আপাদমস্তক শৌখিন লেখক। বাংলাদেশের ইন্টারনেট প্রচলনের প্রথম যুগে আমি অনুপস্থিত ছিলাম, কেননা ইন্টারনেট এর সুবিধা লাভ করার মতো সামাজিক অবস্থান আমার ছিলোনা। ইন্টারনেট কে মাধ্যম করে “বাংলা ব্লগ” নামের যে এক বিপ্লব ঘটে গেছে তা জানতে আমার প্রায় দশ বছর লেগে গেছে। তাই বাংলা ব্লগের সাথে আমার পরিচয় অনেক পরে। আমি কিছু লেখালেখি করেছি ব্লগে এবং দুটি খুব পরিচিত  ব্লগে  আমি লেখালেখি করি। বলাই বাহুল্য, দুটি ব্লগেই আমি দারুন স্বাধীন ভাবে লেখালেখি করি, করতে পারি। তাহলে কেনো আমার একটি ব্যক্তিগত ব্লগ-সাইট দরকার? খুব জোরালো কোনও কারণ নেই নিজের একটি ব্লগ সাইট তৈরী করার। কেবল তিনটি কারণ বলা যেতে পারে – এক. নিজের সকল লেখাগুলোকে একটি উৎসে নিয়ে আসা আর দুই. নিজের লেখালেখিকে আরো একটু সংগঠিত করে আনা, আরো একটু গুছিয়ে আনা। ব্যক্তিগত ব্লগে হয়তো লেখালেখিটা আরো একটু জোরেশোরে করা যাবে, এই আশায়।

আরো একটি কথা বলা রাখা ভালো, এই ব্লগ-সাইটের লেখাগুলোর মাঝে খুব গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা প্রত্যাশা করাটা পাঠককে হতাশ করবে। প্রথমত খুব গভীর তাত্ত্বিক রচনা লেখার পাণ্ডিত্য আমার নেই এবং দ্বিতীয়ত আমার লেখালেখি’র বেশীরভাগই পন্ডিত এবং বিদগ্ধ মানুষের জন্যে নয়। এই অর্থে “নয়” বলছি যে এই লেখালেখিগুলোর বেশীরভাগই হয়তো পন্ডিত ও বিদগ্ধ মানুষদের কাছে প্রাথমিক স্তরের মনে হবে। এবং এই মনে হওয়াটা ভুল নয়। তাই বলছি, এখানে প্রকাশিত লেখালেখির মাঝে গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এর প্রত্যাশা আপনাকে হতাশ করবে।

বড় কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা। আমাদের চোখের সামনে দিয়েই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ – উদার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে একটি অসহিষ্ণু ইসলামী ভূমিতে পরিনত হয়েছে। মানুষের মত প্রকাশের সকল অধিকার শুধু ইসলামী সংস্কৃতির নিপীড়নেই ভূলুণ্ঠিত নয়, বরং যাদের কথা ছিলো ধর্মনিরপেক্ষতার ঝান্ডাকে এগিয়ে নেয়ার, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার, তারাই এখন আরব্য ইসলামী দর্শনের ধামাধরা হয়ে টুঁটি চিপে ধরেছে গনতন্ত্রকামী মানুষের। গনতন্ত্রকামী – মুক্তিকামী মানুষেরা এখন আর ঐক্যবদ্ধ নন। তাঁরা হাজারো ভাগে বিভক্ত। অরাজনৈতিক মানুষেরা এখন গর্বিত একাকী মানুষ, অভিজাত নাগরিক। অরাজনৈতিক মানুষই এখন সবচাইতে কৃতি-মেধাবি মানুষ, গন্যমান্য মানুষ হিসাবে পরিচিত। তাই ছাত্রদের মাঝে মেধাবী মানুষেরা গড়ে উঠছেন “আই হেইট পলিটিক্স” এর দর্শন নিয়ে। আমাদের সমাজ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি আমাদেরকে বিভক্ত করে দিয়েছে। কেননা বিভক্ত মানুষের সমাজেই তো স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ নিরাপদে শাসন করতে পারে।অথচ এই আমাদেরই পূর্ব পুরুষ ছিলেন মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতা আর ইলা মিত্র’র মতো সংগ্রামী মানুষেরা। খুব বেশীদিন আগের কথা নয়, আমাদের তারুন্যেই আমরা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেরণা হিসাবে পেয়েছিলাম সরদার ফজলুল করিম কিম্বা আহমদ শরীফের মতো মনস্বী বনস্পতি মানুষদের কে। রাজনীতিতে আমাদের অনুপ্রেরনা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পাস দেয়া শ্রমিক নেতা তাজুল ইসলাম কিম্বা কয়লায় চালিত রেলের ইঞ্জিন বগিতে কাজ করা জসিম উদ্দিন মন্ডল। মানুষের অধিকার আদায়ের সবচাইতে সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিলো আমাদের তরুন সমাজ। এই সবই এখন বিবর্ণ স্মৃতির মতো মনে হয় মাঝে মাঝে। কিন্তু আমি এবং আমরা জানি, সমাজ বিকাশের গতিমুখ সবসময়ই ধনাত্মক। তাতে চড়াই-উতরাই থাকে বটে, কালো অন্ধকার গ্রাস করে আমাদের, মাঝে মাঝে, কিন্তু সেটাই সমাজের লব্ধিমুখ নয়। সেজন্যেই বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামটিকে, মাঠের সংগ্রামটিকে জারি রাখতে হয়। আর সেই বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামটি জারি রাখার একটা খুব ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আমার এই ব্লগ সাইট টি। আমি মনে করি, আমার মতামত – লেখালেখি – বিশ্লেষণ প্রগতিশীল আন্দোলনে, সংগ্রামের হাজারো কণ্ঠস্বরের একটি হয়ে থাকবে এই ব্লগ সাইটটির মধ্য দিয়ে। তাতে এমন আহামরি কিছু পরিবর্তন হয়তো হয়ে উঠবেনা, কিন্তু আমি জানবো, আমি রয়েছি আমার সহযোদ্ধাদের সাথেই। সহযোদ্ধাদের সাথে আমার কন্ঠটিকে যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে আমার পক্ষ থেকে তৃতীয় কারণ এই ব্লগ সাইটি গড়ে তোলার।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি অবিশ্বাসী মানুষ। ঈশ্বর অবিশ্বাসী নাস্তিক এবং প্রবল ভাবে চেষ্টা করি আমার অবিশ্বাসের কথা বলার, প্রকাশ করার। মুসলিম পরিবারে জন্মেছি আমি, সাংস্কৃতিক ভাবে বাংলাদেশের আশির দশকের উদারনীতিক মুসলিম সংস্কৃতি আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিলো বহুদিন। হাই স্কুল থেকেই আমি বিশ্বাস হারাতে থাকি। আল্লাহ্‌ আর মুহাম্মদের যাবতীয় বুজরুকী ও রুপকথার গল্প গুলো আমার কাছে ক্রমশই স্থুল ও অর্থহীন হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু  আমি দীর্ঘদিন আমার অবিশ্বাসের কথা প্রকাশ্যভাবে বলিনি, আমি ভেবেছি, তারচাইতে অনেক জরুরী কাজ হচ্ছে মানুষের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা। কিন্তু প্রকৃত অর্থে একটি জরুরী কাজ আরেকটি জরুরী কাজের গুরুত্বকে লঘু করে দেয়না। আমার কিম্বা আমার মতো আরো হাজার অবিশ্বাসী মানুষের নীরবতার সুযোগে আমাদের দেশে দানবীয় কায়দায় থাবা বিস্তার করেছে ইসলামী মৌলবাদ। বাঙালী থেকে মানুষের পরিচয় হয়ে উঠেছে মুসলমান আর মুসলমান থেকে হয়ে উঠেছে সুন্নী মুসলমান। এই সুন্নী মুসলমানেরা এখন লাখে লাখে জড়ো হয় অবিশ্বাসী সহ-নাগরিকের ফাঁসীর দাবী নিয়ে। এই সুন্নী মুসলমানেরা এখন জড়ো হয় নারীমুক্তির সনদ জাতীয় নারীনীতির বিরুদ্ধে। ইসলামী মৌলবাদের এই উত্থানে প্রগতিশীল ও অবিশ্বাসী মানুষদের বিনয় ও নীরবতা ঋণাত্মক অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে বলে আমি মনে করি। তাই দেরীতে হলেও আমার সিদ্ধান্ত ঈশ্বর-আল্লাহ-ভগবানের এই মিথ্যে দুনিয়া নিয়ে আমার প্রকাশ্য অবস্থানের কথা বলা।আমি চেষ্টা করি যেনো ঈশ্বর -আল্লাহ-ভগবান নিয়ে আমার সমালোচনা গুলো ব্যক্তিঘৃণায় পরিনত না হয়। এটাও কঠিন কাজ। সবসময়েই পেরে উঠি এমন দাবী করিনা, কিন্তু সচেতন প্রচেষ্টাটা জারি রাখি। লালন ফকিরের কাছ থেকে আমি জানি –

 

“সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার, মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার,

ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার”।

 

আমি নিজেকে “মুক্তমনা” বা “মুক্তচিন্তক” দাবী করিনা। এই দাবী না করার মূল কারণ হচ্ছে, আমি জানি এই ধরণের দাবী করাটা খুব কঠিন একটি দাবী এবং খানিকটা নিরর্থকও বটে। নিরর্থক এই অর্থে যে মানুষের চিন্তা হচ্ছে সবচাইতে পরিবর্তনশীল – বিবর্তনের এক ক্ষেত্র, এই রকমের দু-তিনটি শব্দে তাকে চরিত্রায়ন করাটা সঠিক নয় বলেই আমি মনে করি। দুনিয়া এগিয়ে যায় সকল মানুষের সংগ্রামে। আমি সেই “সকল মানুষের” একজন।

আধুনিক মানুষের একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, তাকে ভিন্নমতের মানুষদের সাথে বসবাস করতে হয়, ভিন্নমত শুনতে হয়, প্রায়শই ভিন্নমতের জবাব দিতে হয় এবং ভিন্নমতের প্রেক্ষিত নিজের ভুল শুধরে নিতে হয়। এমন কি ভিন্নমতের সাথে একমত না হলে সেই মতের ভিন্নতাকে গ্রহন করে নিতে হয়। ভিন্নতা নিয়েও সহ-নাগরিকদের সাথে বেঁচে থাকতে হয়। সামন্ত সমাজের মানুষের এই সমস্যা ছিলোনা। সেখানে একদল ছিলেন সকল প্রসংশার দাবীদার আর আরেকদল হচ্ছেন স্তবকারী। আমি আধুনিক সমাজের এই গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধারন করি, খুব পেরে উঠি তা নয় সব সময়। তবুও এই ব্লগ সাইটের যেকোনো লেখার সাথে দ্বিমত – ভিন্নমত কে স্বাগত জানাই।

 

“জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়

এই সব ছুঁয়ে ছেনে; – সে এক বিস্ময়

পৃথিবীতে নাই তাহা – আকাশেও নাই তার স্থল

চেনে নাই তারে ওই সমুদ্রের জল;

রাতে-রাতে হেঁটে-হেঁটে নক্ষত্রের সনে

তারে আমি পাই নাই;”

জীবনানন্দ দাশ, নির্জন স্বাক্ষর।

 

কে না জানে, জীবনের সব রং ফলানো যায়না। অতিমানবীয় মেধা ও শক্তির মানুষেরাও পারেন না তাঁদের স্বপ্নের সকল কিছু দেখে যেতে। আমিও জানি, আমার কিম্বা আমাদের জীবদ্দশায় হয়তো স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখে যাওয়া হবেনা। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, স্বপ্নের কথাটি বলে যেতে হবে শেষ দিন পর্যন্ত। আমার স্বপ্ন, মহান মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র যে বাংলাদেশের অন্যতম আকাংখা ছিলো।

লেখা দিয়ে সমাজ বদল হয়না। সমাজ বদলের জন্যে ভাংচুর দরকার হয় আর ভাংচুর এর জন্যে দরকার বল প্রয়োগ। তাই মাঠে ময়দানে রাজনৈতিক সংগ্রাম সবসময়ই পরিবর্তনের প্রধান পথ। লেখা দিয়ে চেতনাগত ভাবে সেই সংগ্রামের সাথে থাকা যায়। আমি আমার সময়কে বদলে দেয়ার সংগ্রামে থাকতে চাই। সেই সংগ্রামে থাকার একটি ছোট প্রচেষ্টা এই ব্যক্তিগত ব্লগ সাইট।

বন্ধু – সহযোদ্ধা – কমরেড – সমালোচক – বিরুদ্ধ মতবাদের মানুষ, আপনাদের সবার জন্যে অনেক শুভকামনা।

 

ধন্যবাদ।

মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার

 

 

আর্কাইভ