এক.

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ ও পোর্টাল গুলোতে গত দুদিনের একটি উল্লেখযোগ্য আলোচ্য বিষয় ছিলো কোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি’র প্রতি অভব্য শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন তত্তাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনাব মইনুল হোসেনের ভূমিকা সম্পর্কে যারা অবগত, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন জনাব মইনুল হোসেন একজন ডানপন্থী মানুষ এবং তিনি সক্রিয় রাজনীতিবিদ নন। সক্রিয় রাজনীতিবিদ না হয়েও তিনি সবসময়ই ক্ষমতাকাঠামোর খুব কাছের মানুষ, মূলত ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, সামরিক বাহিনী এবং মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণকারী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী ও মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণকারী যেকোনো মানুষই ক্ষমতাবান।

সংবাদপত্রগুলো থেকে যা জানা গেলো তা হচ্ছে ওই টেলিভিশন চ্যানেলটির একটি টক-শো অনুষ্ঠানে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি জনাব মইনুল হোসেন যিনি ভিন্ন একটি যায়গা থেকে অনলাইনে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে – তিনি জামাতে ইসলামীর প্রতিনিধি হিসাবে সদ্য গঠিত ঐক্য প্রক্রিয়ায় যোগদান করেন কিনা। মাসুদা ভাট্টি প্রশ্নটি নিজের হয়ে করেন নি, বরং সাংবাদিকদের প্রথাগত কায়দায় করেছেন এভাবে –

 

‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলা হচ্ছে, আপনি জামায়াতের প্রতিনিধি হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে উপস্থিত থাকেন? আপনি কি আসলেই জামায়াতের প্রতিনিধি?

 

জবাবে জনাব মইনুল হোসেন বলেন –

 

”আপনার দু:সাহসের জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছি। আপনি চরিত্রহীন বলে মনে করতে চাই। আপনি যে প্রশ্ন করেছেন তা আমার জন্য বিব্রতকর। শিক্ষিত ও ভদ্র মহিলা হিসেবে অন্য প্রশ্ন করেন”।

 

 

সারা পৃথিবীতেই সাংবাদিকেরা রাজনীতিবিদ কিম্বা রাজনীতি ভাষ্যকারদেরকে নানান ধরনের প্রোভোকেটিভ প্রশ্ন করে থাকেন। যদিও পরিনত সাংবাদিকেরা এর একটা পেশাদার সীমা বজায় রাখেন সবসময়ই।  এই বিব্রতকর প্রশ্ন গুলোর উত্তর না দেয়ার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু এভাবে ব্যক্তি আক্রমনের কোনও সুযোগ নেই। এটা নিঃসন্দেহে অভব্যতা এবং এটা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যে সংস্কৃতি তারও একটা প্রমান। কোনও প্রশ্ন বিব্রতকর হলেই প্রশ্নকর্তাকে চরিত্রহীন মনে করার কোনও যৌক্তিকতা নেই।

এই চরিত্রহীন শব্দটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়ে ওঠে। নারীবাদী পোর্টালগুলো এটাকে ”নারীর প্রতি অবমাননা” হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। প্রথাগত ভাবে একশো এক জন লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীর বিবৃতি প্রকাশিত হয়। বিবৃতিতে বলা হয় এভাবে –

 

“আমরা মনে করি তাঁর এই বক্তব্য নারীর জন্যে অবমাননাকর, আপত্তিকর, চরম অসহ্নশীলতার পরিচায়ক। ব্যারিস্টার ময়নুল হোসেনের মতো যারা রাজনৈতিক সহনশীলতার কথা বলেন, তাদের কাছ থেকে এ ধরনের শব্দ চয়ন উদ্বেগজনক বলে আমরা মনে করি”।

 

বিবৃতিতে তাঁরা মাসুদা ভাট্টি তথা নারীর জন্যে মানহানিকর এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে অবিলম্বে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জানা যায় দেশের  অনেক বরেন্য মানুষ এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন এবং বলাই বাহুল্য যে এই স্বাক্ষরকারীদের একটা বড় অংশ হচ্ছেন নারী। স্বাক্ষরকারীদের মাঝে উল্লেখযোগ হিসাবে রয়েছেন –

 

সুলতানা কামাল, খুশী কবির, ব্যারিস্টার তানিয়া আমির, নাসিমুন আরা মিনু, মুন্নী সাহা, সুপ্রিতি ধর, ফরিদা ইয়াসমিন, মিথিলা ফারজানা, নাসিমা খান মন্টি, নবনীতা চৌধুরী, শাহনাজ মুন্নী, ফারজানা রুপা, রোজিনা ইসলাম, এলিটা কবির, উদিসা ইমন, আঙ্গুর নাহার মন্টি, ফাতেমা আবদিন নাজলা, শারমিন রিনভি, নাদিরা কিরন, ইশরাত জাহান ঊর্মি সহ আরও অনেকেই।

সূত্র 

 

কোনও সন্দেহ নেই বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী মানুষেরা আমাদের সমাজের গুনী মানুষ, আমাদের দেশের নানান রাজনৈতিক, সামাজিক সংকটে এরা ভূমিকা রাখেন। বিশেষত নারীর প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে এবং নানান ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে এঁদের সক্রিয় ও সংগ্রামী ভূমিকা আমরা দেখছি। এধরনের একটি ঘটনায় এরা প্রতিবাদ করবেন এটা খুব স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তাঁরা প্রতিবাদ করেছেন।

এই লেখটি যখন লিখছি, তাঁর আগেই মইনুল হোসেন ফোন করে মাসুদা ভাট্টির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা খুবই অন্যায় একটা কাজ হয়েছে, অসভ্য একটা কাজ হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যাও করেছেন, যখন তাঁকে জামাতের প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছিলো, তখন তিনি মেজাজ হারিয়েছেন এবং এই রকমের একটি “আনসিভিলাইজড” শব্দ ব্যবহার করেছেন। শুধু ফোন করে নয়, তার পত্রিকা দি নিউ নেশন এর দাপ্তরিক প্যাডে স্বাক্ষর করা বিবৃতি পাঠিয়েছেন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এবং এই অনভিপ্রেত ঘটনার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন। মইনুল হোসেন কৌশলী মানুষ। তিনি এই স্বীকারোক্তি ও ক্ষমা প্রার্থনা কি তাঁর বিবেচনাবোধ থেকে করেছেন নাকি একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে করেছেন আমরা জানিনা। কিন্তু ইতিহাসে লেখা থাকবে যে এই রকমের একটি ঘটনায়, তিনি নিজেই মাসুদা ভাট্টির কাছে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফোন করেছিলেন এবং ক্ষমা চেয়েছিলেন।

 

দুই.

একটা বিষয় আগ্রহউদ্দীপক সেটা হচ্ছে, আমাদের লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীরা সবাই এই বিষয়টিতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির লৈঙ্গিক পরিচয়টিকে বারবার উপরে তুলে ধরছেন। কিন্তু কেনো? তাঁরা কি মনে করছেন মাসুদা ভাট্টি যেহেতু একজন নারী তাই তার প্রতি এই শব্দটি “অবমাননাকর”। তাঁরা মনে করছেন এভাবে – “আমরা মনে করি তাঁর এই বক্তব্য নারীর জন্যে অবমাননাকর”। তাঁরা আরও বলছেন এভাবে –  “মাসুদা ভাট্টি তথা নারীর জন্যে মানহানিকর এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে অবিলম্বে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান”। এটা খুব শক্ত ভাবে এসেছে যে মাসুদা ভাট্টি একজন নারী, তার প্রতি এই রকমের শব্দ ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। এবং যেহেতু মাসুদা ভাট্টি একজন নারী, তাই তার জন্যে যা অবমাননাকর, তা সমগ্র নারীকূলের জন্যে অবমাননাকর। যুক্তি হিসাবে কেমন?

এমন কি প্রতিবাদকারীদের মাঝেও একটা বিরাট অংশ হচ্ছেন নারী। শুধু তাই নয়, বিবৃতি প্রদানকারীগণ তাদের মাঝে শুধু নারীদেরকেই শামিল করেছেন। বিবৃতিটিকে প্রচার করা হয়েছে “১০১ জন নারী”র প্রতিবাদ হিসাবে। কিন্তু  বিষয়টি কি আসলেই নারীর প্রতিবাদের বিষয়? নাকি মানুষ হিসাবে যেকোনো সভ্য – বিবেচনাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিই এর প্রতিবাদ করবেন? এই ধরনের একটি বিষয়কে কেনো “নারী”র প্রতি আক্রমন হয়ে উঠতে হবে? কেনো একজন সাংবাদিকের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমন নয়?

ব্যক্তিগত ভাবে আমার কাছে এই ধরনের বক্তব্য খুব অগ্রহনযোগ্য  মনে হয়। অনেকটা বাজার কাটতি মিডিয়াগুলো সংবাদ কে সেনসেশনালাইজ করার জন্যে যেভাবে বাড়তি তকমা দিয়ে থাকে সেই রকম টা। মইনুল হোসেন কোনও বিব্রতকর প্রশ্নে কারো প্রতিই এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে পারেন না। তা সে মাসুদা ভাট্টি হোন কিম্বা শ্যামল ভট্টাচার্য হোন। এখানে বারবার মাসুদা ভাট্টিকে “নারী” হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেয়াটা কি মাসুদা ভাট্টি’র জন্যেও খুব কাংখিত? মাসুদা ভাট্টি কি নারী সাংবাদিক?

 

তিন.

এবার আসুন নারীর প্রতি আরেকটি বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেই আপনাদের।

২০১৫ সালের ০৪ অক্টোবর রোববার, গনভবনে সংবাদ সম্মেলন ছিলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। তিনি সদ্য জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বক্তৃতা করে ফিরে এসেছেন। (আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন “ম্যাজিক্যাল লেডি” তিনি বিশ্রাম নেন না, বিদেশ থেকে ফিরে এসেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে থাকেন, এটা আমরা সাম্প্রতিক সময়ে জেনেছি)। সাংবাদিক সম্মেলনে নানান সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করেন প্রথাগত ভাবেই। প্রেসক্লাব সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে একটি প্রশ্ন করেন এভাবে – “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি যখন নিউ ইয়র্কে ঠিক একই সময়ে বিএনপি চেয়ার পারসন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডনে। সেখানে তিনি একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন “আগামীতে তিনি সরকার গঠন করবেন এবং আওয়ামী লীগের সাথে মিলেমিশে সরকার চালাবেন। আওয়ামী লীগে অনেক যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতা রয়েছেন, তাদের নিয়ে সরকার চালাবেন”। এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

 

এই প্রশ্নটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসতে হাসতে বলেন – ”আওয়ামীলীগের মধ্যে যদি খালেদা জিয়া প্রেমিক খুঁজে পান তাহলে ফালুর কি হবে”?

 

খালেদা জিয়া বলেছেন আওয়ামীলীগে অনেক মেধাবী ও দেশপ্রেমিক মানুষ আছেন। তিনি ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেও তিনি দেশ চালানোর কাজে শামিল করবেন। এটা কি আমাদের রাজনীতির পরিবেশে একটা সভ্য ও সহনশীল ইচ্ছার প্রকাশ ছিলো? যেখানে আমাদের প্রধান দুটি দল সারা বছর একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা, আক্রমন, হানাহানি – কাটাকাটি করতেই ব্যস্ত, সেখানে খালেদা জিয়ার এই মন্তব্যটি কি সুশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রকাশ ছিলো? আর উত্তরে,  এই প্রসঙ্গে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উত্তর টা কি সভ্য? এই উত্তর টা কি নারীর জন্যে অবমাননাকর? অমর্যাদাকর কিছু? একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কি একজন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ভাষা এমনটা হবার কথা? হওয়া উচিৎ? কিম্বা যদি আমরা প্রধানমন্ত্রিত্বের কথা বাদই দেই, কেবলমাত্র একজন নারীর প্রতি কি এই ধরনের মন্তব্য শোভন? রুচিকর?

আমি সার্চ এঞ্জিন খুঁজেছি তন্ন তন্ন করে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের জের ধরে আমাদের নারীবাদী মানুষেরা, লেখকেরা, মানবাধিকার কর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ভূমিকাটি কেমন ছিলো। কিছু পাইনি। মূলধারার পত্রিকাগুলো কিছু লেখেনি। নানান জেলা থেকে প্রকাশিত অনলাইন কাগজগুলো লিখেছিলো, কেউ লিখেছিলো কেবলই হাস্য-রস হিসাবে আবার কেউ লিখেছিলো সিরিয়াস প্রতিবেদন হিসাবে। যেমন সিলেটে থেকে প্রকাশিত অনলাইন পত্রিকা সিলেটটুডে২৪ডটকম একটি প্রতিবেদন করেছিলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। সিলেট টুডে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া হিসাবে উদ্ধৃত করেছেন চারজন মানুষের পোষ্ট কে, এরা হচ্ছেন – ভাস্কর আবেদীন, রায়হান শামীম, কাজল দাস, ইব্রাহিম খলিল সবাক এবং শাকিল জামান। অনলাইন এক্টিভিস্ট ও সাবেক ছাত্রনেতা কাজল দাস লিখেছিলেন এভাবে –

 

‘পুরুষতন্ত্র এক কথায় ভয়াবহ রকমের খারাপ, পুরুষতান্ত্রিক নারী আরো খারাপ। নিচের ভিডিওতে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন , খালেদা জিয়া যদি আওয়ামিলীগে নতুন প্রেমিক খুঁজে পান, তাহলে ফালুর কি হবে। কি পরিমান অরুচিপূর্ণ বক্তব্য। ভিডিওটা আপনারা শুনেন। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী এতটা স্থূলভাবে কাউকে উপস্থাপন করতে পারেন, সেটা বোধগম্য ছিল না।

সূত্র

 

কাজল দাস প্রধানমন্ত্রীকে “পুরুষতান্ত্রিক নারী” বলে উল্লেখ করেছেন।  অন্যরাও এই বিষয়টির সমালোচনা করেছেন। কাকতালীয় কিনা জানিনা, লিঙ্গগত পরিচয়ে এরা সবাই পুরুষ। সিলেট টুডে কি একজন নারীর একটি প্রতিবাদও খুঁজে পান নি? আমরা জানিনা। আমি নারীবাদীদের কোনও বিবৃতি খুঁজে পাইনি। লেখক – সাংবাদিক- মানবাধিকার কর্মীদের একশো এক জন তো দূরের কথা জনা কয়েক মানুষও এর প্রতিবাদ করেন নি। আজকে যাদের নাম আমরা দেখছি বিবৃতিতে তাঁরাও কেউ কোনও বিবৃতি দিয়েছিলেন কিনা আমরা জানিনা, অন্তত পাবলিক ডোমেইন এ তার কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু কেনো মাসুদা ভাট্টির প্রতি ময়নুলের ভাষা নিয়ে যে প্রতিবাদ হয় খালেদার প্রতি হাসিনার তার চাইতেও কুৎসিত ভাষা নিয়ে কোনও প্রতিবাদ হয়না? এটা কি খালেদা জিয়া তথা নারীর প্রতি অভব্য, অবমাননাকর ভাষা নয়? আজকের এই একশো এক জন প্রতিবাদকারীর কেউ কি একই প্রতিবাদ টি করেছিলেন এই ঘটনাটির? কেউ কি দাবী করেছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে অবিলম্বে ক্ষমা চাইতে হবে বলে? আমি জানিনা।

ক্ষমা চাওয়া বলে কিছু নেই আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অভিধানে। দুঃখ প্রকাশ করার কোনও সংস্কৃতি নেই আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অভিধানে। যেটা আছে তা হচ্ছে ফ্যাসিবাদী কায়দায় সত্যকে ধ্বংস করা, মানুষের কণ্ঠরোধ করা। এবং সেকারনেই – প্রধানমন্ত্রীর এই অশ্লীল বক্তব্যটি নিয়ে মূলধারার কোনও পত্রিকা টু শব্দটি করেন নি। আজকের যে শতাধিক নারী সাংবাদিক তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন, তাঁরাও লড়াইয়ে পথে নামেন নি। দাবী জানাননি যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজ আসনে বসে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে আরও একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যিনি একজন বয়স্ক নারী তাঁর সম্পর্কে এভাবে বলতে পারেন না। শেখ হাসিনার এই অভব্য আদিম রসিকতার বয়ানটি মুছে দেয়ার জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে সকল কিছু করা হয়েছে, সব কয়টি মূলধারার পত্রিকা থেকে এই সংক্রান্ত সংবাদটি ব্ল্যাক আউট করা হয়েছে, এমন কি যে ভিডিওটি ইউটিউবে আপলোড করা হয়েছিলো সেটিকেও ডিলিট করে দিতে বাধ্য করা হয়েছে (এখানে দেখতে পারেন যে ভিডিও টি ডিলিট করে দেয়া হয়েছে)।

আমি বলছিনা, কেউ খালেদা জিয়ার প্রতি শেখ হাসিনার অভব্য আচরণের প্রতিবাদ না করে থাকলে আজকেও নিশ্চুপ থাকবেন। মোটেও তা নয়। বরং আগে প্রতিবাদ না করে থাকলেও আজ থেকে করুন। আমার প্রশ্নটি হচ্ছে – আমাদের বিবেচনাবোধের ঘুমিয়ে থাকা আর তার জেগে ওঠা প্রসঙ্গে। আমাদের নারীবাদের ঘুমিয়ে থাকা আর জেগে ওঠার সময় আর প্রেক্ষিত নিয়ে আমার প্রশ্ন।

শেষ কথা

“কল অফ কনসেইন্স” বা বিবেকের ডাক বিষয়টা খুব জটিল। বিবেকের ডাকে সাড়া দেবার জন্যে নিজের মাথা থেকে বহু কিছু সরিয়ে দিতে হয়। গোষ্ঠীতন্ত্র, নিজের দল, সংবাদপত্রের পারমিট, টিভির লাইসেন্স, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়া, নিজের ভালো বেতনের চাকুরী, পুরবাচলে প্লট, শান্তিনগরে ফ্ল্যাট, গনভবন – বঙ্গভবনের দাওয়াত, প্রধান মন্ত্রীর সফরসঙ্গী হওয়া, স্বামীর আমলা হিসাবে পদোন্নতি, ছাত্রলীগ – যুবলীগ করা ছোট ভাইয়ের সরকারী কন্ট্রাক্ট পাওয়া, নিজের সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি, প্রেসক্লাবের নেতা হওয়া, জাতীয় চ্যানেল গুলোতে নিয়মিত ডাক পাওয়া এই সকল কিছুর বাইরে এসে ভাবতে পারাটা জরুরী। এটা সহজ নয়, এটা প্রায় অসম্ভব। আজকের শহুরে বাঙালী, তা সে নারীবাদী – লেখক বা মানবাধিকার কর্মী যেইই হোন না কেনো, এদের একটা বিরাট অংশের প্রতিবাদ এই সকল চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনা। বরং এটা যারা করতে পারেন, তাঁরা আজকের যুগে  প্রায় মহামানবের পর্যায়ের। তাই খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে যখন শেখ হাসিনা অশ্লীল, অভব্য রসিকতা করেন তখন আমরা কোনও প্রতিবাদ দেখিনা। কোনও নিন্দাবাদের ঝড় দেখিনা। নারীবাদী বন্ধুরা তখন নীরব দর্শক হয়ে পড়েন।

আগেই উল্লেখ করেছি যে, এই লেখটি যখন লিখছি, তাঁর আগেই মইনুল হোসেন ফোন করে মাসুদা ভাট্টির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা খুবই অন্যায় একটা কাজ হয়েছে, অসভ্য একটা কাজ হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যাও করেছেন, যখন তাঁকে জামাতের প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছিলো, তখন তিনি মেজাজ হারিয়েছেন এবং এই রকমের একটি “আনসিভিলাইজড” শব্দ ব্যবহার করেছেন।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি কখনও তাঁর এই অভব্য বক্তব্যের জন্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন? দুঃখ প্রকাশ করেছেন? করবেন কি? আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি কখনও স্বীকার করবেন যে তারই আরেকজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে তিনি “আনসিভিলাইজড” বক্তব্য রেখেছিলেন? আমি জানিনা।

খুশী কবির, সুলতানা কামালা, নবনীতা চৌধুরী, মূন্নি সাহা, ফারজানা রুপা, সুপ্রিতি ধর এমন কি মাসুদা ভাট্টি, আপনারা কি প্রমান করবেন যে আপনাদের বিবেচনাবোধ মইনুল হোসেনের চাইতে উন্নত? অন্তত তার সমান স্তরের? আপনারা কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই অভব্য কথার জন্যে প্রতিবাদ করেছিলেন? করবেন? আমরা বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে ফারজানা রুপা ও মাসুদা ভাট্টিকে দেখেছি প্রধানমন্ত্রীকে অস্বাভাবিক রকমের তোয়াজ – তাজিম করে প্রশ্ন করতে, প্রধানমন্ত্রী শুনতে চান এমন সব মধুর প্রশংসা বাচক শব্দ মিশিয়ে আপনারা প্রশ্ন করেন, আপনারা কি আগামী কোনও একটি সাংবাদিক সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করবেন, তিনি কেনো এমন একটি অভব্য ভাষা ব্যবহার করেছিলেন একজন নারীর প্রতি? আপনারা কি প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানাবেন তাঁর ওই বক্তব্যের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্যে? দেরীতে হলেও?

তাহলে বোঝা যাবে আপনারা কখন মানুষ, কখন নারী আর কখন নীরব দর্শক।

 

Spread the love