দিনটি ছিল মঙ্গলবার, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এগারো তারিখ। পরের দিন অর্থাৎ বুধবার ১২ই সেপ্টেম্বর থেকে সারা পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির হাজারো হিসাব-নিকাশ বদলে গিয়েছিল চিরস্থায়ীভাবে। ইসলামি সন্ত্রাসবাদী দল আল-কায়েদার নেতৃত্বে ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ভূতুড়ে ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে চারটি যাত্রীবাহী বিমানকে ছিনতাই করা হয় এবং সেই বিমানগুলো দিয়ে ভয়ঙ্কর হামলা চালানো হয় আমেরিকার স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোতে। দুটি বিমান আঘাত হানে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার দুটি ভবনে, তৃতীয় বিমানটি আঘাত হানে আমেরিকার নিরাপত্তা বিষয়ক সদর দফতর পেন্টাগনের একটি ভবনে আর চতুর্থ বিমানটি আঘাত হানার আগেই আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়। এই ভয়ঙ্কর হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন এবং পঁচিশ হাজারের কাছাকাছি মানুষ মারত্মকভাবে আহত হন। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সুউচ্চ ভবন দুটি মাত্র এক ঘণ্টা বিয়াল্লিশ মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। আমেরিকার ইতিহাসেতো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসে এই মাত্রার সন্ত্রাসবাদী ঘটনার নজির বিরল, সমগ্র বিশ্বজুড়ে এভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও বিরল। এই ঘটনা পশ্চিমের সাথে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক বদলে দেয় স্থায়ীভাবে। পারস্পরিক অবিশ্বাস আর ঘৃণা ভর করে এই দুই বিশ্বের জনগণের মাঝে। একক হামলায় ক্ষয়-ক্ষতির দিক থেকে এই হামলাটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচাইতে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী হামলা।

এই ঘটনার প্রায় পঁচিশদিন পর ২০০১ সালের অক্টোবর মাসের সাত তারিখে আমেরিকা প্রতিশোধ হিসেবে আফগানিস্থান আক্রমণ করে। অবশ্য আক্রমণের আগে আমেরিকা তখনকার তালিবান সরকার যারা কার্যত আফগানিস্তানের শাসনভার চালাচ্ছিল, তাদের কাছে দাবি করে এই হামলার নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সন্দেহভাজন ওসামা বিন লাদেনকে তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য, বিপরীতে তালিবান সরকার মার্কিন এই দাবির স্বপক্ষে সুস্পষ্ট তথ্য প্রমাণ দাবি করে এই হামলার সাথে ওসামা বিন লাদেনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ সেই সম্ভাবনাকে বাতিল করে দেয় এবং জবাবে আক্রমণ করে আফগানিস্তান যা প্রথম পর্যায়ে প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে স্থায়ী হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন সংহারী এক যুদ্ধ হিসেবে। আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর নেতৃত্বে প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধকে অনেক বিশেষজ্ঞ ভাষ্যকারগণ নাম দিয়েছেন ‘আন উইনেবল ওয়ার’ বা ‘জয়ের অসাধ্য যুদ্ধ’ হিসেবে। যে যুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হতে পারে না, কেবল লক্ষ লক্ষ নিরীহ বেসামরিক মানুষের প্রাণ সংহার ঘটে। তাই এই জয়ের অসাধ্য যুদ্ধ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন সারা পৃথিবীর স্বাধীন বুদ্ধিজীবিগণ। অধ্যাপক নোম চমস্কি তাদের অন্যতম। এই বইটি অধ্যাপক নোম চমস্কির কয়েকটি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সংকলিত হয়েছে যেখানে শতাব্দীর এই ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রসঙ্গে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করেছেন।

সেপ্টেম্বর এগারোর এই সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রসঙ্গে শুধু আমাদের নয় সারা পৃথিবীর মানুষের একটা বড়সড় অংশের চিন্তা-ভাবনা ও মতামত দারুণভাবে পশ্চিমা প্রোপ্যাগান্ডা বা অপপ্রচারমূলক তথ্যাদি ও বিশ্লেষণের উপরে নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাধারণ জনগণের বোধ, ভাবনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেছে আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলোর শক্তিমান সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রচারণা। সেকারণেই এই পুরো ঘটনাটিকে নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া পশ্চিমা বুলি-বাগিশতার স্থানীয় প্রতিফলন মাত্র। পুরো বিষয়টিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতের ভেতর দিয়ে দেখার মতো বিশ্লেষণ ও মতামতের দারুণ অভাব রয়েছে চিন্তাশীল মহলে। এই ঘটনাটি যেহেতু ইসলামি সন্ত্রাসবাদিদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে সে কারণে নির্বিচারভাবে পৃথিবীর প্রায় একশ পঞ্চাশ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর এক ধরনের দায় চাপানোর সংস্কৃতিরও প্রচলন ঘটেছে। মুসলিম মাত্রই সন্ত্রাসবাদী, মুসলিম মাত্রই পশ্চিমের মূল্যবোধের বিরোধী, পশ্চিমের প্রতি ঘৃণাবাদী এই ধরনের ইমেজ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে ব্যাপকভাবে এবং এসকল প্রচেষ্টা সফলও হয়েছে বহুগুণে। পশ্চিমের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো এই প্রচারণার ক্ষেত্রে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই বিপুল অপপ্রচারমূলক প্রকল্পের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যে গুটিকয়েক বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ এই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী হামলাকে ক্রিটিক্যালি বা নির্মোহ পর্যালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন, অধ্যাপক নোম চমস্কি তাদের অন্যতম। যে সকল পাঠক চমস্কির লেখালেখির সাথে পূর্বপরিচিত নন, তাদেরকে সাহায্য করার জন্যই এই ভূমিকার অবতারণা। এই ভূমিকায় চমস্কির মূল প্রশ্নগুলোর উল্লেখ করবো যেন পাঠক ভেতরের লেখা পাঠ করার সময় বিষয়গুলো মাথায় রাখতে পারেন, নিজেদের যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং সেই সাথে এই অনুবাদ প্রসঙ্গে কিছু স্বীকারোক্তির উল্লেখ করবো।

বাংলাদেশের পাঠকদের মাঝেও ৯-১১’র এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটিকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে রয়েছে নির্মোহ চিন্তাশীলতার অভাব। বাঙালি প্রগতিশীল পাঠকদের একাংশ বিষয়টিকে কেবলই পশ্চিম ও ইসলামের বিরোধ হিসেবে দেখেন, যেখানে ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির তফাৎকেই প্রধান কারণ হিসেবে হাজির করা হয় এবং এই সন্ত্রাসবাদী ঘটনাটিকে কেবলই পশ্চাৎপদ ইসলাম আর উন্নত আধুনিক পশ্চিমের বিরোধ হিসেবে বোঝা হয় যা নিশ্চিতভাবেই পশ্চিমা বুলি-বাগিশতা প্রভাবিত, খণ্ডিত ও উপরভাসা বোঝাপড়া। একইভাবে যারা মনে করেন, এই হামলা আমেরিকারই একটা ‘ইনসাইড জব’ বা নিজস্ব ষড়যন্ত্রের ফসল, অন্তত নোম চমস্কির দৃষ্টিতে এই ধরনের ধারণার বাস্তব যৌক্তিকতা প্রায় অনুপস্থিত। মুসলিম পাঠকদের একটা বড় অংশের বোঝাপড়া আরও বেশি সরলীকৃত। এদের একটা বিরাট অংশ মনে করেন, বিষয়টি কেবলই বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মার্কিন ও পশ্চিমা ইহুদি-খ্রিস্টান শক্তির ষড়যন্ত্রমাত্র। অবশ্য এটাও বলে রাখা ভালো যে, নিশ্চিত ভাবেই বাঙালি পাঠকদের একটি অংশের মাঝে বিষয়টিকে নির্মোহভাবে, বিদ্যায়তনিকভাবে বিশ্লেষণের নজির রয়েছে এবং বলাই বাহুল্য এই অংশটি নানান কারণেই পশ্চিমের বিকল্প ধারার বুদ্ধিবৃত্তির সাথে পরিচিত। তাই উপরে উল্লিখিত চার ধরনের বাঙালি পাঠকদের মাঝে প্রথম তিন ধারার পাঠকদের জন্য এই বইটি অধিক প্রাসঙ্গিক।

নোম চমস্কি মূলত চারটি প্রসঙ্গকে এই বইটিতে বিস্তৃত করেছেন। প্রথমত, সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা কী? তিনি এই প্রসঙ্গে বারবার উল্লেখ করেছেন যে তিনি সন্ত্রাসবাদ বলতে যা বোঝেন তা মূলত আমেরিকার সরকারি প্রশাসন, সামরিক ম্যানুয়ালগুলোতে যে সংজ্ঞাটি ব্যবহার করা হয় তারই অনুরূপ। দ্বিতীয়ত, তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সন্ত্রাসবাদের যে সংজ্ঞাটি আমেরিকা ব্যবহার করে অন্যদের বেলায়, সেই একই সংজ্ঞায় কি আমেরিকা ও তার মিত্রদের করা নানান সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মকে বিবেচনা করা যেতে পারে? তৃতীয়ত, তিনি প্রশ্ন তুলেছেন আরব ও মুসলিম জনগোষ্ঠী কি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকভাবেই পশ্চিমের প্রতি ঘৃণাপ্রবণ নাকি তা ইতিহাসের নানান চড়াই উৎরাই এর মধ্যে গড়ে ওঠা একটা অবস্থান? এবং সবশেষে তিনি প্রধান প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন যা এই বইটির উপশিরোনামে স্থান পেয়েছে– ‘কোনো বিকল্প ছিল কি?’ অর্থাৎ আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলো এই সন্ত্রাসবাদী হামলার জবাব দেওয়ার জন্য যে পথ বেছে নিয়েছিল, তার চাইতে ভিন্ন কোনো বিকল্প ছিল কি? অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদের জবাব পাল্টা সন্ত্রাসবাদ নাকি এর কোনো বৈধ আইনি পথ খোলা ছিল? তিনি ইতিহাসের নানান নজির উল্লেখ করেছেন কীভাবে সুদান কিংবা নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব আদালতে আইনি লড়াই করেছিল এবং কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো সেই পথে হাঁটল না। মূলত এই চারটি প্রশ্ন নিয়ে এই বইটির আলোচনা গড়ে উঠেছে। অধ্যাপক চমস্কির প্রধান যুক্তি হচ্ছে– যেকোনো সন্ত্রাসবাদের প্রধান ভিকটিম বা শিকার হচ্ছে নিরীহ সাধারণ জনগণ, তাই সন্ত্রাসবাদের কারণ ও অভিযুক্তদের চিহ্নিত না করে এবং তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি না করে যদি পাল্টা সন্ত্রাসবাদের দ্বারা তার জবাব দেয়া হয়, তাহলে দিন শেষে এই নতুন সন্ত্রাসবাদের ভিকটিমও হয় নিরীহ বেসামরিক জনগণ। শুধু যে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি এক বিরাট উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী তৈরি হয় যা শুধু সেই দেশটির জন্য বোঝা নয় বরং আশেপাশের দেশগুলোর জন্যও এক বিরাট বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হয়। যেমনটা দেখা গিয়েছিল আফগানিস্তান হামলার ঘোষণার সাথে সাথে পাকিস্তান সীমান্তে লক্ষ লক্ষ নিরীহ আফগান শরণার্থীর মিছিলে।

এই বইটির সর্বশেষ প্রবন্ধে সুইডিশ দৈনিক পত্রিকা আফতন ব্লদেতকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নোম চমস্কি চারটি প্রশ্নের উত্তর ব্যাখ্যা করেছেন। মূলত ৯-১১’র এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এই চারটি প্রশ্নই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথমত, এই ঘটনার জন্য দায়ী কে? দ্বিতীয়ত, এই সন্ত্রাসী হামলার পেছনে কারণগুলো কী হতে পারে? তৃতীয়ত, এই ধরনের ভয়ঙ্কর ঘটনার প্রেক্ষিতে চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে আমাদের যথাযথ প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিৎ? আর সবশেষ প্রশ্নটি ছিল এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বা পরিণতি কী? এই প্রশ্নগুলো খুবই সহজ কিন্তু তার উত্তর খুব সহজ-সরল নয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের মাঝে রয়েছে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির নানান সমীকরণ, যা খুব নিবিড় পাঠ ও পর্যবেক্ষণ দাবি করে। নোম চমস্কি গত পঞ্চাশ বছর ধরে ইতিহাসের এক নিবিড় পাঠক ও মনোযোগী পর্যবেক্ষক। তাই নোম চমস্কির পাঠ ও পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে সাহায্য করে ৯-১১’র মতো ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বোঝার ক্ষেত্রে।

সচেতন পাঠকেরা জানেন এর মধ্যে বিশ্ব-রাজনীতিতে আমেরিকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদী ভূমিকাকে দেশে দেশে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। শুধু সক্রিয়তাবাদী কর্মী বা এক্টিভিস্টরাই যে আমেরিকার এই সন্ত্রাসবাদী ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন তা নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খোদ রাষ্ট্রই উদ্যোগ নিয়েছে আমেরিকা ও তার মিত্রদের নানান সিদ্ধান্তকে তদন্ত করে দেখার জন্য। এরকমের একটি উল্লেখযোগ্য তদন্ত সাম্প্রতিক সময়ে তাদের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। আমেরিকার সাথে তল্পিবাহক হয়ে ইরাক আক্রমণে সঙ্গী হয়েছিল যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেন। ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ব্রিটেনের অভিযোগ ছিল যে ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসাইনের কাছে রয়েছে এমন এক মারণাস্ত্র যা দিয়ে শুধু পশ্চিমেরই নয় সারা পৃথিবীতেই এক প্রলয়কাণ্ড ঘটিয়ে দেয়া সম্ভব আর এই ভয়ঙ্কর অস্ত্র কার্যকর করতে সাদ্দাম হোসাইনের সময় লাগবে এক ঘণ্টারও কম। এই অস্ত্রটির নাম দেয়া হয়েছিল ‘ওয়েপন অফ ম্যাস ডেস্ট্রাকশন।’ এই অস্ত্র কতটা ভয়াবহ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভরা মজলিশে তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন খোদ আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রাক্তন সামরিককর্তা কলিন পাওয়েল। আর ব্রিটেনের সংসদে ভুল গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে সংসদ সদস্য এমনকি জনগণের সমর্থন আদায় করেন ব্রিটেনের সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। পরবর্তীতে একথা প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে ইরাকের কাছে কস্মিনকালেও এই ধরনের কোনো অস্ত্র ছিল না। ইরাকের সামরিক সক্ষমতা ছিল অনেকটা কাগুজে বাঘের মতোই। আমেরিকা কিংবা তার পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলার কোনো সক্ষমতাই ছিল না ইরাকের কিংবা সাদ্দাম হোসাইনের। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ২০০৯ সালে ঘোষণা করে ইরাকযুদ্ধে ব্রিটেনের যুক্ত হওয়ার কারণগুলো তদন্ত করার এবং ব্রিটেনের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা স্যার জন চিলকোটকে নিয়ে গঠন করা হয় ‘ইরাক যুদ্ধ তদন্ত কমিটি’ যা সংক্ষেপে পরিচিত হয়ে উঠেছিল ‘চিলকোট কমিশন’ নামে। চিলকোট কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০১৬ সালে। মোট বারো খণ্ডের বিশাল এই প্রতিবেদনে স্পষ্ট উঠে এসেছে ইরাক আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে কী ভয়ঙ্কর ত্রুটিযুক্ত গোয়েন্দা তথ্যকে ব্যবহার করা হয়েছিল, এই তদন্তে উঠে এসেছে আমেরিকা ও ব্রিটেন উভয়ই সচেতনভাবেই জনগণকে সঠিক তথ্য থেকে বিরত রেখে একতরফাভাবে ইরাক আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। আর এই আক্রমণের ফলে ইরাকের মতো একটি সমৃদ্ধ জনপদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়, লক্ষ লক্ষ শিশু পিতামাতাকে হারিয়ে হয় এতিম এবং প্রায় একই সংখ্যক মানুষ হয় উদ্বাস্তু। সময়ের কারণেই ইরাক প্রসঙ্গটি এই বইয়ে উঠে আসেনি, কিন্তু পাঠককে এই বইটি পড়ার সময় ইরাক আক্রমণ ও ইরাককে ধ্বংস করে দেওয়ার ইতিহাসটিও বিবেচনায় রাখাটা জরুরি বলে মনে করি।

যেহেতু বইটি গড়ে উঠেছে সেপ্টেম্বর এগারোর ঘটনার পরপরই দেয়া সাক্ষাৎকারগুলোর উপর ভিত্তি করে, তাই এর সময়কাল হচ্ছে ২০০১ সাল ও তার কিছুদিন পর পর্যন্ত। বইটি পাঠের সময় এই সময়কাল ও তার প্রেক্ষিত মনে রাখা দরকার কেননা সময়কালটি আজ থেকে প্রায় বিশ বছর পূর্বের এবং এর মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে গেছে এবং অনেক বিষয়ের তিক্ত ফয়সালা হয়েছে, অনেক বিষয়ের নাটকীয় পরিবর্তনও হয়েছে। তাই বইটি পাঠ করার সময় পাঠকের জন্য সেই সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষিতকে মনে রাখতে হবে। প্রতিটি প্রবন্ধের শুরুতে সাক্ষাৎকারের সময় ও উৎস উল্লেখ করা হয়েছে, পাঠক সেই সূত্রকে মনে রেখে পাঠ করলে সুবিধা হবে। মূল বইটির সম্পাদক কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু বর্ণনা বাদ দিয়েছেন পৌনঃপুনিকতা এড়ানোর জন্য এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলাদা নোট সংযুক্ত করেছেন পাঠকের সুবিধার জন্য। অনুবাদকের পক্ষ থেকেও কিছু নোট ও টীকা সংযুক্ত করা হয়েছে বিশেষত নবীন পাঠকদের সাহায্য করার জন্য। অধ্যাপক চমস্কির উত্তরগুলো প্রায়শই বর্ণনামূলক, তিনি যেহেতু যেকোনো প্রশ্নকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে চান তাই অনেক প্রশ্নের উত্তর খুব সাদামাটা ‘হ্যাঁ/না’ এভাবে পাওয়া যায় না তার উত্তরের মাঝে। অনেক ক্ষেত্রে তিনি বরং উত্তর দিয়েছেন পাল্টা প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে যে সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। শুধু এই বইয়েই নয়, আরও অনেক লেখায় চমস্কি প্রায়শই ‘আমরা’ বা ‘আমাদের’ এই শব্দগুলো দিয়ে পশ্চিমা বা পশ্চিমাদের বুঝিয়ে থাকেন, কখনো কখনো একই শব্দ দিয়ে তিনি আমেরিকাকে বুঝিয়ে থাকেন, বেশকিছু বিশ্লেষণমূলক উত্তরে পাঠককে এই বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে, তিনি ‘আমরা’ বা ‘আমাদের’ দিয়ে কেবল কোনো ছোট দল বা জনগোষ্ঠীকে বোঝাননি, তিনি বরং আমেরিকা ও তার  মিত্র পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কথা বোঝাতে চেয়েছেন। ‘প্রশাসন’ বা Administration শব্দটিকে রাষ্ট্র বা সরকার হিসেবে নেয়া যেতে পারে, কেননা মার্কিন সরকারকে প্রায়শই মার্কিন প্রশাসন হিসেবেই উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

এই বইয়ে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারগুলো বিভিন্ন সময়ে এবং প্রায়শই বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের কাছে দেয়া, তাই কিছু প্রসঙ্গের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যদিও সে প্রসঙ্গগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পশ্চিমের করা নানান সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার উদাহরণ প্রসঙ্গে এসেছে যা চমস্কির মূল যুক্তি বুঝতে বরং সাহায্য করবে। চমস্কির মূল যুক্তিটা হচ্ছে, পশ্চিম অন্যদের প্রসঙ্গে যে সকল তৎপরতাকে সন্ত্রাসবাদ নামে সংজ্ঞায়িত করে, সেই একই ধরনের আচরণ ও তৎপরতা যখন তারা নিজেরা করে থাকে, তাকে সন্ত্রাসবাদ বলতে রাজি থাকে না, এই বিষয়টি বোঝানোর জন্যই চমস্কি বারবার সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে বিভিন্ন উদাহরণের পুনরাবৃত্তি করেছেন বিভিন্ন প্রসঙ্গে।

বইটির অনুবাদ মূলানুগ, এটা ভাবানুবাদ বা মূল ভাষ্যের অনুবাদ নয়। অনুবাদে মূল টেক্সট ও মূল ভাবের প্রতি সমানভাবে অনুগত থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। যেহেতু সাক্ষাৎকারগুলো অনেকটাই কথ্য ঢঙে উপস্থাপিত, বাংলা অনুবাদে সেই ভাবটি রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার যে টুইন টাওয়ার হামলার উপর লক্ষ লক্ষ বিশ্লেষণ রয়েছে যা অত্যন্ত স্থূল ও জনপ্রিয় ধরনের, যেখানে আমেরিকান ও পশ্চিমা বুলিবাগিশতা দিয়ে সস্তা আবেগকে চালিত করা হয়েছে, এই বইয়ের আলোচনায় সেসবের নিরঙ্কুশ অনুপস্থিতি রয়েছে। এই বইটিতে কোনো পপুলার বা জনপ্রিয় আলোচনা পাওয়া যাবে না, বরং বইটির আলোচনা পাঠকের চিন্তাকে উস্কে দেবে, এই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী ঘটনাটি নিয়ে পশ্চিমের বুলিবাগিশতার রাজনীতির বিষয়ে, পাঠকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হবে এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটির জবাব হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলো যা করেছে তার ফলাফল কতটা মানবিক ছিল মানব সভ্যতার জন্য।

বইটি পাঠ করে যদি পাঠক প্রোপ্যাগান্ডা বা অপপ্রচারমূলক তথ্যের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের তফাৎ খানিকটা হলেও করতে পারেন, তাহলেই এই পরিশ্রম সার্থক হবে বলে মনে করি। 

(এই ব্লগ পোস্ট টি পড়ে যারা সিদ্ধান্ত নেবেন বইটি কেনার, তারা চৈতন্য প্রকাশনীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ৮% অধিক কমিশন দাবী করতে পারেন। আপনার নাম ও ইমেইল আইডি দিয়ে এই সাইটে সাবস্ক্রাইব করুন অথবা এই ব্লগ পোস্ট এর নীচে কমেন্ট করুন আপনার আগ্রহের কথা জানিয়ে কিংবা এই  অনুবাদকের কাছে সরাসরি ইমেইল (golamsarowar6@gmail.com) করুন অতিরিক্ত ছাড় এর কোডটি পাবার জন্যে এবং তারপর বইমেলায় পাঠকের ন্যায্য ছাড় টী দাবী করুন।আপনার মোবাইল ফোনে প্রাপ্ত ইমেইল অথবা কোডটি প্রদর্শন করেই চৈতন্য প্রকাশনী থেকে পাঠকের অতিরিক্ত ছাড় লাভ করতে পারেন )

Spread the love