ভুমিকা

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে নানান ধরনের প্রচারনার বেশ ঢল নেমেছে। বহু বিচিত্র নামের – দলের – রঙের মানুশ প্রাসঙ্গিক – অপ্রাসঙ্গিক ভাবে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন। কখনও নাস্তিকতা কে বাজার চলতি ফ্যাশন বলা হচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে নাস্তিকতা হচ্ছে ইউরোপে বা উত্তর আমেরিকায় নিরাপদ নাগরিকত্ব পাবার নিশ্চিত পথ। কখনও বা বলা হচ্ছে নাস্তিকতা হচ্ছে বিক্ষ্যাত হবার ধান্দা। কিন্তু এই সকল মতামত প্রচারকেরা কেউই একটা সহজ সরল বিশয় উল্লেখ করেন না যে, সাম্প্রতিক সময়ের উচ্চকন্ঠ এই বিপুল সংখ্যক নাস্তিক মানুষেরা আসলে প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস ও ঈশ্বর বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসা মানুষ এবং তাঁরা ধর্ম ও ঈশ্বর বিষয়ক ফাঁপা ও ফাঁকা বিশ্বাস গুলোর বিরুদ্ধে দাড়িয়েছেন। এঁদের একটা বিরাট অংশ বয়সে তরুন, মেধাবী ও প্রগতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত। ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পেছনে এঁদের কোনও উচ্চাভিলাষ নেই, আছে জগতকে মুক্ত দেখার – জগতকে মুক্ত করার এক দারুন বাসনা। কেউ কেউ নাস্তিকদের বিরুদ্ধে এই প্রচারনাকে আবার বেশ ভাবগম্বীর বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্র দেবার চেস্টা করছেন। দর্শন – রাজনিতির কঠিন কঠিন প্রায় উচ্চারণ অযোগ্য শব্দাবলী ব্যবহার করে এক ধরনের একাডেমিক (?) আলোচনার কৃত্রিম আবহ তৈরির চেস্টা করছেন। আর সেই মেকি বুদ্ধিবৃত্তিক ধরনে বলার চেস্টা করছেন সেই বহুকালের পুরানো কথা, যা মৌলবাদী ও পেটি-বুর্জোয়া সুবিধাবাদীরা বলে এসেছে – “আপনি নাস্তিক হোন, সেটা আপনার ব্যক্তিগত বিশয়, কিন্তু সেসব প্রচার করার দরকার কি?” কিম্বা “আপনি বিশ্বাস করেন না, ভালো কথা, কিন্তু অন্যের বিশ্বাসে আঘাত করার দরকার কি?” কিম্বা “মার্কসবাদ – কমিউনিজমের সাথে ধর্মের কোনও বিরোধ নেই, এই সবই উগ্র নাস্তিকদের প্রচারনা” … ইত্যাদি! অর্থাৎঃ

১ – নাস্তিক হোন কিন্তু প্রচার করবেন না। সেটা খুব ভালো কোনও কাজ নয়।

২ – আপনি নাস্তিক হোন, কিন্তু অন্যের বিশ্বাস প্রশ্নবিদ্ধ হয় এমন কোনও কাজ করবেন না।

৩ – আপনি যদি বিপ্লবী – মার্ক্সবাদী হন, তাহলে জেনে রাখুন, মার্কসবাদ কিন্তু ধর্ম কে খুব শ্রদ্ধার সাথে দেখত, মার্ক্স কখনই ধর্ম কে চ্যালেঞ্জ করেন নাই, তিনি ধর্ম কে খুব শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতেন।

এই একই চর্বিত চর্বণ বলবার জন্যে এইসকল পোশাকি একাডেমিক লেখকেরা কখনও ধার করছেন বিদ্যাসাগর – রাজা রামমোহন রায় কে, কখনও এম এন রায় কে বা কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে আবার কখনও বা খোদ মার্ক্স – এঙ্গেলস – লেনিনকে ! নরক থেকে নামিয়ে আনছেন বিদ্যাসাগর – রাম মোহন – মার্ক্স – এঙ্গেলস – লেনিন কে, এই সারটিফিকেট দেবার জন্যে যে, বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে নাস্তিকেরা আসলে যা করছে, তা আসলে ঠিক করছে না, ভালো করছে না।

ব্যক্তিগত আমি এই প্রবণতাকে পজিটিভ মনে করি। দুইটি বিশেষ কারনে আমি এই প্রবণতা কে পজিটিভ মনে করি।

প্রথমত – নাস্তিকদের বিরুদ্ধে এই সকল লেখালেখি প্রমান করে যে, নাস্তিকেরা সমাজের গড় বা এভারেজ মস্তিস্ক গুলোতে খানিকটা ঝাকুনি দিতে পারছে। প্রথাগত মনে এক ধরনের আঘাত করতে পারছে। প্রথার বেদীতে আঘাত করতে পারা সকল অর্থেই পজিটিভ ঘটনা। প্রথাকে আঘাত না করে সমাজ কে এগিয়ে নেবার কোনও সুযোগই নেই। নাস্তিকেরা এটা করতে পারছেন বলেই প্রথাগত মানুষেরা জাত গেলো জাত গেলো তুমুল হই হই রব করছেন। এটা ভালো ঘটনা, ভালো লক্ষণ।

দ্বিতীয়ত – এই সকল প্রচারনার মধ্যে দিয়ে অনেক মানুষের স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে প্রগতিশীলতার পোশাক পরা কত মানুশ আসলে মৌলবাদী ও দক্ষিনপন্থীদের দক্ষিনার লোভে কিভাবে নাস্তিক – মুক্তমনা – সেকুলার মানবতাবাদীদের বিরুদ্ধে একাট্টা হতে পারেন। গোপন মানুষেরা প্রকাশ্য হচ্ছেন। মৌলবাদ শুধু আলখাল্লার নিচেই থাকেনা, সুট – টাই এর ভিতরেও থাকে। এই সকল মুখোশ উন্মোচনও নিসন্দেহে একটি ভালো ঘটনা।

নাস্তিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী এই লেখালেখির একাধিক সমস্যা রয়েছে। তার প্রধান কয়েকটি এই রকমেরঃ

১ – ভয়ঙ্কর রকমের সরলীকরন

২ – অন্যের লেখা কে উল্লেখ করবার সময় যথাযথ ভাবে রেফারেন্স এর ব্যবহারের ঘাটতি

৩ – অন্যের লেখা নিজের মতের সুবিধার জন্যে কখনও কোট করা আবার কখনও নিজের বয়ানে উল্লেখ করা

৩ – “চেরী পিকিং” বা প্রেক্ষিত উল্লেখ না করে, শুধুমাত্র নিজের মতামত কে সমর্থন করে এমন সব উদ্ধৃতির সুবিধাবাদী ব্যবহার, কখনও বিকৃত ভাবে, কখনও আংশিক ও অসম্পূর্ণ ভাবে

৪ – কখনও কখনও অনুবাদের ক্ষেত্রে অসততাও লক্ষনীয়, যা প্রায়শই উস্কানিমুলক এবং মুল লেখা থেকে অনেকটাই সরে যাওয়া।

আমাদের লেখক – পাঠকদের মাঝে একটি বড় অংশের যেহেতু তথ্যের অসমতা বা ”Information assymetry” রয়েছে, তাই এই সকল লেখকগন পাঠকের “তথ্যের অসমতা”র সুযোগ টির পুরোপুরি ব্যবহার করেন। এরা জানেন খুব কম সংখ্যক পাঠকই এদের দেয়া তথ্যগুলো পুনঃ পরীক্ষা করে দেখবেন। তাই নাস্তিকতা বিরোধি এই সকল লেখাগুলোতে দেখা যায় খোদ মার্ক্স – লেনিন – গ্রামসির নামে মিথ্যাচারের উৎসব। আমরা এই ধরনের দুই একটি উদাহরন দেবো এই লেখার শেষের দিকে।

প্রসঙ্গে প্রবেশ

মুল প্রসঙ্গ টি খুব সহজ সরল। কয়েকটি খুব সহজ সরল প্রশ্ন, যা নিয়ে এদেশের প্রগতিশীল – বামপন্থী কর্মীদের মাঝে খুব বেশী সংশয় নেই, তবুও এই প্রশ্নগুলো কে নতুন করে শংশয়াচ্ছন্ন করা হচ্ছে, এক ধরনের ধুম্রজাল তৈরী করা হচ্ছে। ধনী, সুবিধাবাদি মধ্যবিত্ত আর দক্ষিনপন্থী মৌলবাদীরা সব সময়েই এই ধরনের ধুম্রজাল তৈরির চেস্টা করেছেন ইতিহাসে। এটা নতুন কিছু নয়, তবে এখন যেহেতু অনলাইনের যুগ, তথ্য সন্ত্রাসের যুগ, তাই এই সকল অপচেষ্টার ইম্প্যাক্ট বা প্রভাব সমাজের জন্যে মাঝে মাঝেই খুব বিপদজনক হয়ে ওঠে। আসুন মুল প্রশ্নগুলো দেখে নেই।

১ – ধর্ম ও ঈশ্বর প্রসঙ্গে মারক্সবাদী – লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বা অবস্থান আসলে কি? নিরপেক্ষ? আস্তিক্যবাদী? অজ্ঞেয়বাদী? নাকি নাস্তিক্যবাদী? অর্থাৎ মারক্সবাদ-লেনিনবাদ কি ঈশ্বরের ধারনা বা অবস্থান কে স্বীকার করে? মার্কসবাদ কি ঈশ্বর বিষয়ক কোনও বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাকে ধারন করে? ধর্মের উৎপত্তি ও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েইবা মারক্সবাদ-লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কি?

২ – কমিউনিস্ট কে? মারক্সবাদী কে? মারক্সবাদী ও কমিউনিস্টরা কি ঈশ্বরবাদী? নাকি নিরীশ্বরবাদী?

৩ – কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচীতে অংশগ্রহণকারী সকলেই কি কমিউনিস্ট? এমন কি কমিউনিস্ট পার্টির সকল সভ্যই কি কমিউনিস্ট?

৪ – কমিউনিস্ট কি কোনও পদ – পদবী? নাকি প্রশিক্ষন ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে হয়ে ওঠার বিষয়?

৫ – কমিউনিস্ট পার্টি কেন নিরীশ্বরবাদ প্রচার করেনা? প্রশ্নটি কি নীতিগত? নাকি কৌশলের?

৬ – কমিউনিস্ট পার্টি কখন নিরীশ্বরবাদ প্রচার করেনা, এবং কখন করে?

৭ – কমিউনিস্ট নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ কি পরস্পরের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? এদের সম্পরক টি কি সমন্বয়ের? নাকি সঙ্ঘাতের?

এই সাতটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে এই লেখাটিতে। প্রাসঙ্গিক ভাবে হাল আমলের নাস্তিকতা বিরোধী যে সমস্ত কুলীন ব্লগার মার্ক্স – লেনিন কে ব্যবহার করে লেখালেখির মাধ্যমে ধর্ম কে একটি নির্জীব সুশীতল মহান প্রপঞ্চ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করছেন বা করার চেস্টা করছেন, তাদের লেখা থেকে কিছু কিছু বিষয় আলোচনা করা হবে।

লেখাটির হাউস কিপিংঃ

এই লেখাটিতে কয়েকটি হাউস কিপিং রুল বা নিয়ম মেনে চলার চেস্টা করা হবে।

১ – কোনও ব্যক্তিগত আক্রমন করা হবেনা। যদি কোথাও এমনটা ঘটে, পাঠক ধরিয়ে দিলে সংশোধন করে নেয়া হবে।

২ – মার্ক্স – এঙ্গেলস – লেনিন কে উদ্ধৃত করতে হলে, প্রথমত তাদের রচনাবলীর অনুমোদিত বাংলা অনুবাদ (যেমন – প্রগতি প্রকাশনীর অনুবাদ) ব্যবহার করা হবে। যদি কোনও কারনে ইতিমধ্যে প্রকাশিত বাংলা অনুবাদ না থেকে থাকে তাহলে অনুমোদিত ইংরাজি ভারশন থেকে এই লেখক নিজে বাংলায় অনুবাদ করে উল্লেখ করবেন (অনুবাদ বিষয়ে যেকোনো পরামর্শ কে স্বাগতম)

৩ – অভিধান হিসাবে সনাতন প্রতিষ্ঠিত অভিধান গুলোর পরামর্শ নেয়া হবে, কোনও মতেই গুগোল অভিধানের পরামর্শ নেয়া হবে না।

৪ – যথাসম্ভব চেস্টা করা হবে, অপ্রাসঙ্গিক জটিল উচ্চারণ অযোগ্য শব্দমালার ব্যবহার পরিহার করে মুল কথাটি সহজ করে বলার।

৫ – লেখাটিতে যথা সম্ভব ব্যক্তিগত আবেগ, জাতীয়তাবাদী বা বামপন্থী আবেগ কে দূরে সরিয়ে রাখা হবে।

৬ – এই লেখাটির ভাষা দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় ভাষা হবেনা, এখানে বড়শী কে বড়শী বলা হবে, বাঁকানো লোহা হলা হবেনা।

৭ – লেখাটিতে “ধান ভানতে শীবের গীত” গাওয়া হবেনা। ঢাকার মিরপুরের পানি সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সিন্ধু সভ্যতার পানি সরবরাহ নিয়ে আলোচনা শুরু করা হবেনা, অর্থাৎ আলোচনাটিকে তাঁর প্রাসঙ্গিক সীমার মধ্যেই রাখা হবে।

(চলবে)

Spread the love