১.

প্রখ্যাত নারীবাদী লেখক সিমোন দ্যা বুভোয়া তার পুস্তক “দ্বিতীয় লিঙ্গ” এর ভুমিকায় লিখেছিলেন – “আমি দীর্ঘকাল দারুন এক দ্বিধায় কাটিয়েছি, নারী বিষয়ক একটি বই লেখার জন্যে। বিষয়টি অস্বস্তিকর, যন্ত্রনাদায়ক বিশেষত নারীর জন্যে এবং এখন এটা আর নতুন কিছু নয়। নারীবাদ নিয়ে তর্কবিতর্কে প্রচুর কালি খরচ হয়েছে, আমরা হয়তো এখন বলতে পারি যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। কিন্তু এখনও কথা উঠছে, বিতর্ক হচ্ছে। কিন্তু গত শতকে এই বিষয়ের উপরে এতো বিপুল পরিমান আজেবাজে কথা আর আলোচনা হবার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, মূল সমস্যাটির উপরে কি আলোকপাত করা হয়েছে? নারীর কি আদৌ কোনও সমস্যা আছে? যদি থেকে থাকে তাহলে সেটা কি?”

 

“কিন্তু গত শতকে এই বিষয়ের উপরে এতো বিপুল পরিমান আজেবাজে কথা আর আলোচনা হবার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, মূল সমস্যাটির উপরে কি আলোকপাত করা হয়েছে? নারীর কি আদৌ কোনও সমস্যা আছে? যদি থেকে থাকে তাহলে সেটা কি?”

 

প্রায় সত্তুর বছর আগে প্রকাশিত এই পুস্তকটিতে সিমোন দ্যা বুভোয়া প্রশ্ন তুলেছিলেন, এতো বিপুল পরিমানে লেখালেখির পরেও কি সত্যিকার অর্থেই নারীর আসল সমস্যাটির প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে? নারীর আসলে কি আদৌ কোনও সমস্যা আছে? এই প্রশ্ন করে তিনি উল্লেখ করেছিলেন – চরম নারীত্বকে ধারন করে এমন মানুষেরা তখনও কানে কানে বলতেন “এমন কি রাশিয়াতেও নারীরা এখনও নারীই”। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক সমাজ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো নারীমুক্তির তার অর্জনে ব্যর্থতার কথাই স্মরণ করিয়ে দিতো সেই সকল নারীত্বের ধ্বজাধারীরা। যদিও একটি ব্যর্থতা ভিন্ন কোনও দৃষ্টিভঙ্গির সাফল্য প্রমান করে কিনা সেটা নিশ্চিত নয়।  সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া এখন বিলুপ্ত। পৃথিবী ব্যাপী মার্কসবাদী ও বামপন্থী রাজনীতির সেই ক্যারিশম্যাটিক যুগ আর নেই। তাই নারীবাদের বিতর্কগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমি এখনও ভাবছি, বাংলাদেশের নারীবাদী চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে সত্যি কি আমাদের নারীবাদী লেখকেরা বাংলাদেশের নারীদের প্রধান সমস্যাগুলোর প্রতি আলোকপাত করতে পেরেছেন? বাংলাদেশের নারীর আসলে প্রধান সমস্যা কি? কেউ কি এই নিয়ে কোনও কথা বলেছেন? আলোচনা করেছেন?

এই প্রশ্নগুলোই এই পুস্তকটি লেখার প্রেরণা। একই প্রশ্ন আমি করতে চেয়েছি, বাংলা ভাষায় এখন পর্যন্ত নারীবাদ বিষয়ে যে সকল আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে, সেসব লেখালেখিতে, চিন্তার প্রকাশে কি বাংলাদেশের নারীর মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পেরেছে? মূল সমস্যার সমাধান বিষয়ে যথাযথ আলোচনা উত্থাপন করতে পেরেছে? সেই জন্যেই এই লেখার অবতারনা।

২.

লেখালেখি এখন আর প্রচলিত খবরের কাগজের কলাম বা বছর শেষে বইমেলা কেন্দ্রিক পুস্তক  প্রকাশনার মাঝে সীমিত নেই। বরং মূলধারার লেখকদের বাইরে একটা বিরাট সংখ্যক তরুন তরুনী এবং বিভিন্ন বয়সী মানুষ লিখছেন অন্তরজালিক সমাজে, যার প্রচলিত নাম “ব্লগ”। ইন্টারনেট এর কল্যানে এখন আমাদের রয়েছে অসংখ্য ব্লগ এবং পোরটাল। আমাদের এখন বেশ ক’টি নারী বিষয়ক পোর্টালও হয়েছে। উওমেন চ্যাপ্টার, জাগরনিয়া, নারী ইত্যাদি। কিছু কিছু নিউজ পোর্টাল বা অনলাইন সংবাদপত্রে নারীদের জন্যে নারীবাদী লেখালেখির জন্যে আলাদা পাতাও খোলা হয়েছে। হয়তো আরো বেশ কয়েকটি পোর্টাল চলছে যা আমার নিয়মিত পাঠ করা হয়না। নারী প্রশ্নে আমার যাবতীয় পাঠ ও চর্চা এখনও কাগজের বইয়ের উপর ভিত্তি করে। ইদানিং অ্যামাজন এর কল্যাণে কিন্ডল ফরম্যাটের বই কাগজের বইয়ের উপরে চাপ কমিয়েছে। কিন্তু কোনও সন্দেহ নেই, বাংলা ভাষায় আমরা সাম্প্রতিক সময়ে যে সকল লেখালেখিকে “নারীবাদী” লেখালেখি বা “নারীবাদী” চিন্তা বলে জানছি, তাঁর একটা বড় অংশই জেনেছি, পড়েছি এই অনলাইন পোর্টালগুলো থেকে। এর সাথে রয়েছে বাংলাদেশের ফেসবুক চত্বর। ফেসবুকে প্রখ্যাত হয়েছেন বা প্রচলিত অর্থে “ফেসবুক সেলেব্রিটি”তে পরিনত হয়েছেন, তাঁদের লেখালেখি তাঁদের ফেসবুকের দেয়াল থেকেও সরাসরি পড়েছি। এঁদের চিন্তার এক ধরনের প্রভাবও তৈরী হয়েছে, অন্যদের উপরে। ফলে নারী প্রশ্নে এখন সবাই মুখ খুলছেন, লিখছেন। নারীরা এখন তাঁদের পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে লিখছেন, ক্যারিয়ার নিয়ে লিখছেন, যৌনতা নিয়ে লিখছেন, বিয়ে – ডিভোর্স নিয়ে লিখছেন, অর্গাজম নিয়ে লিখছেন, মাসিক ঋতুচক্র নিয়ে লিখছেন, পরকিয়া নিয়ে লিখছেন, শ্বশুরবাড়ীর যন্ত্রনা নিয়ে লিখছেন, বছর বছর সন্তান জন্ম দেয়া নিয়ে লিখছেন, ইত্যাদি হাজার রকমের বিষয় নিয়ে লিখছেন। এটা সকল অর্থেই একটি সদর্থক বা পজিটিভ বিষয়। ধর্মের বিরুদ্ধে নীরবতা প্রসঙ্গে যেমন আমরা প্রায়শই বলি – আমাদের নীরবতাই ধর্ম নামের এই দানবকে এতো বিশাল আকৃতি দিয়েছে, আমার মুখ খোলা, আমাদের কথা বলা, আমাদের চ্যালেঞ্জ করাই এই দানবকে পরিনত করতে পারে ভীত – কম্পমান মূষিকে। যদিও নারীর সংগ্রামটি ঈশ্বর ও ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চাইতেও বহুগুন বড়, শক্ত, চ্যালেঞ্জিং, তবুও তার প্রথম ধাপ, উল্লেখযোগ্য ধাপ হচ্ছে “মুখ খোলা”। আমাদের নারীরা মুখ খুলছেন, কথা বলছেন, লিখছেন, খোলামেলা ভাবে, যার যার ব্যক্তিগত পছন্দ মাফিক, ব্যক্তিগত স্টাইলে লিখছেন, এটা সকল অর্থেই পজিটিভ ট্রেন্ড বা সদর্থক প্রবনতা। পিতৃতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রথম ধাপ হচ্ছে নিজের কথাগুলোকে দ্বিধাহীন ভাবে প্রকাশ করা।

২.

আমাদের সমবয়সীদের অনেকেই, যারা মার্কসবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিলাম আমাদের যৌবনে, আমরা আরজ আলী মাতব্বর এর লেখা পড়ার আগেই আমাদের ঈশ্বর চেতনা বা ধর্ম বিষয়ক বোধ হারিয়েছিলাম। নাস্তিক হয়েছিলাম আমাদের ব্যক্তিগত অবিশ্বাস, কার্যকারণবোধ ও মার্কসবাদী লেখালেখি পাঠের মধ্যে দিয়ে। পরে আমি, আমরা অনেকেই একাধিকবার পড়েছি আরজ আলী মাতব্বর এর লেখা। বলাই বাহুল্য, মুগ্ধ হয়েছি। ঈশ্বর অবিশ্বাসী হবার জন্যে আমার মতো অনেকেরই বিবর্তনবাদ পড়তে হয়নি, রিচারড ডকিন্স, স্যাম হ্যারিস কিম্বা স্টিফেন হকিং পড়তে হয়নি। আমরা বস্তুবাদের অ-আ-ক-খ পড়ে শুধু ভেবেছি, নিজের মধ্যেই, নিজের মতো করেই ভেবেছি আর কার্যকারণ-সূত্র মেলানোর চেষ্টা করেছি। ব্যর্থ হয়েছি, এবং পরে সমাজ বিজ্ঞানের ইতিহাস পড়ে জেনেছি, বুঝেছি কিভাবে চিরকাল শাসকদের হাতে তৈরী ও গড়ে উঠেছে মানুষের ধর্ম বিশ্বাস। কিভাবে প্রকৃতির কাছে পরাজিত মানুষ নিজেই তৈরী করে নিয়েছে “পরম শক্তিমান” আল্লাহ্‌ আর ঈশ্বরের ধারণা।

কিন্তু নারীবাদ প্রসঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতাটি ভিন্ন। আমার মতো যারা বামপন্থী রাজনীতির সাথে ছাত্র জীবনের সময়টুকু ব্যয় করেছেন, আমরা মনে করতাম, সমাজের গুনগত বা বিপ্লবী রুপান্তরই  নারীর প্রতি সকল বঞ্চনার অবসান ঘটাতে পারে। আমরা জানতাম সমাজের সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী উত্তরণ নারী-পুরুষের বিভেদ, বৈষম্যকে দূর করতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে নারীবাদী লেখালেখি থেকে আমরা জেনেছি, নারীর সংগ্রামটি আরো অনেক বেশী কঠিন। শুধুমাত্র সমাজের বৈপলবিক রুপান্তর নারীর উপরে চেপে বসে থাকা “পিতৃতন্ত্র” নামের জগদ্দল পাথরটি সরিয়ে দিতে পারেনা। নারীর এই দুর্বহ সংগ্রামের ইতিহাস, যুগ যুগ ধরে নারীর বঞ্চনার কাহিনী আমরা জানতে পারি আন্তর্জাতিক নারীবাদী সাহিত্যগুলোর কিছু ছিটেফোঁটা পাঠের মধ্য দিয়ে। অন্তত আমাদের সমসাময়িক বন্ধু – রাজনৈতিক সঙ্গীরা মিলে নারীবাদ সম্পর্কে হঠাত করেই খুব বিশদ জানতে পারি, বাংলার অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের লেখা গ্রন্থ “নারী”র প্রকাশনার মধ্যে দিয়ে। সম্ভবত সেটাই বাংলা ভাষায় “নারীবাদ” বা ফেমিনিজম এর তত্ত্ব বা ধারণাগুলো জানার শুরু। আমার ধারণা, বাংলাদেশে আমরা প্রায় সকলেই নারীবাদ শিখেছি দুজন মানুষের কাছ থেকে। হুমায়ূন আজাদ এবং তসলিমা নাসরিন হচ্ছেন এই দুজন মানুষ। কোনও সন্দেহ নেই, আমাদের ভুখন্ডে আগামী বহু বছর নারীবাদের যেকোনো আলোচনায় এই দুজন মানুষকে উল্লেখ করতে হবে। প্রথমজন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক আর দ্বিতীয়জন প্রশিক্ষণের দিক থেকে চিকিৎসক, পরবর্তীতে পেশাদার লেখক এবং কবি। নারীবাদ প্রশ্নে কেনো তসলিমা নাসরিন আর হুমায়ূন আজাদের নাম আসবে সবচাইতে উল্লেখযোগ্যভাবে, তাঁর হয়তো নানান ব্যাখ্যা হতে পারে। অবশ্যই “নারীবাদ” কে পরিচিত করার কাজে এঁদের নিজদের লেখালেখি ও ভূমিকা একটা প্রধান কারণ।

৩.

যারা হুমায়ূন আজাদ ও তসলিমা নাসরিনের প্রধান লেখাগুলোর সাথে পরিচিত তাঁরা জানেন, লেখালেখির দিক থেকে এই দুজন নারীবাদী লেখক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ও ধারার। তাঁরা তাঁদের লেখার ধরণ, গভীরতা, বিস্তৃতি, ভাষারীতি সবকিছুতে ভিন্ন। এর প্রধান কারণ, হুমায়ূন আজাদ নিরেট একাডেমিক অবস্থান থেকে নারীবাদকে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। আর তসলিমা নাসরিন বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর নিজের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নারীর সংগ্রাম কে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

Image result for humayun azad

নারীবাদী লেখক – হুমায়ূন আজাদ

হুমায়ূন আজাদ, বিশ্বের, বিশেষত পশ্চিমা নারীবাদের ধ্রুপদী চিন্তাগুলোকে কখনও অনুবাদের মাধ্যমে আবার কখনও বা সেই সকল চিন্তার এক ধরনের সংশ্লেষ আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন। আর তসলিমা নাসরিন নারীর সংগ্রামকে তুলে এনেছেন তারই চারপাশের জীবন থেকে। কখনও ময়মনসিংহের কোনও সাধারণ বাঙালী নারীর “পিতৃতন্ত্রের” যাঁতাকলে পিষ্ট হবার ইতিহাস আবার কখনও বা পদস্থ নারীর সংগ্রামের কথা তিনি লিখে চলেছেন, নিরন্তর ভাবে। হুমায়ূন আজাদ ও তসলিমা নাসরিন দুজনই চ্যালেঞ্জ করেছেন “পিতৃতন্ত্র”র অন্যতম প্রতিষ্ঠান ধর্মকে, বিশেষত বাংলাদেশের জন্যে ইসলামী মোল্লাতন্ত্রকে তাঁরা চ্যালেঞ্জ করেছেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে। এই চ্যালেঞ্জ করবার কঠিনতম মূল্য দিতে হয়েছে তাঁদের দুজনকেই। হুমায়ূন আজাদ আজ নেই, তসলিমা নাসরিন আজও তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। আমাদের দেশের সাম্প্রতিক সময়ের নারীবাদী লেখকদের লেখালেখির প্রধান প্রেরণা হয় হুমায়ূন আজাদ নয়তো তসলিমা নাসরিন। বিশেষত নারী লেখকদের মাঝে তসলিমা নাসরিনের প্রভাবই মূখ্য। হুমায়ূন আজাদ ও তসলিমা নাসরিনের লেখালেখির দ্বারা প্রভাবিত, তাঁদের  ঘরানার এই সকল লেখালেখিকে আমি বলছি “চেনা নারীবাদ”। অর্থাৎ আমাদের এই সকল চেনা নারীবাদীরা যা লিখছেন তাকেই বলছি “চেনা নারীবাদ”। এঁরা নানান বিষয় নিয়ে লিখছেন, একেকজনের ভাষারীতি, বিশ্লেষণ ভিন্ন।সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের এই সকল চেনা নারীবাদীরা এমন অনেক বিষয় নিয়ে লিখছেন যা নিয়ে কথা বলে বা লেখা, আমাদের সমাজাএর মতো পিতৃতান্ত্রিক মুসলিম সমাজ কাঠামোতে বহু কাল ধরে এক রকমের “হারাম” বলে বিবেচিত হয়েছে।  কখনও কখনও এঁরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে লিখছেন যা বহুবছর ধরেই পশ্চিমা নারীবাদী অঙ্গনে আলোচিত। আবার একথাও সত্যি যে পশ্চিমা নারীবাদীদের মাঝে যে বিপুল সৃজনশীল ভাবনার নজির, প্রকাশ আমরা দেখেছি, সমাজ – রাজনীতি নিয়ে, মানুষের ইতিহাস নিয়ে, পিতৃতান্ত্রিকতার ইতিহাস, কাঠামো, পোশাক নিয়ে,  এই সকল লেখালেখি, বিতর্ক, আলোচনার উল্লেখ কিম্বা অনুবাদ খুব বেশী একটা দেখা যায়না আমাদের “চেনা নারীবাদ” চত্তরের লেখালেখিতে। হয়তো প্রাসঙ্গিকতার অভাব একটা মূল কারণ। পশ্চিমা নারীবাদের ধ্রুপদী ও সমসাময়িক কালের এই সকল অনুল্লেখিত নারীবাদী ও তাঁদের লেখালেখিকে আমি নাম দিয়েছি “অচেনা নারীবাদ”। এই চেনা নারীবাদ বিষয়ক লেখালেখির বিষয়গুলোকে কিভাবে পশ্চিমা নারীবাদী লেখকেরা লিখেছেন, প্রকাশ করেছেন তাঁর একটা আপাত তুলনামূলক বিশ্লেষণ আমি এই লেখায় উপস্থাপন করতে চাই। তাই এই লেখার শিরোনাম চেনা “নারীবাদ – অচেনা নারীবাদ”। আমি আমাদের চেনা নারীবাদী চত্বরের লেখালেখিগুলোকে উল্লেখ করতে চাই এবং পাশাপাশি উপস্থাপন করতে চাই সেই একই বিষয়ে বা অন্তত একই রকমের – কাছাকাছি বিষয়ে পশ্চিমা নারীবাদের ভাবনা – চিন্তা গুলো কেমন। অথবা উল্টো করে পশ্চিমা নারীবাদী ভাবনা-চিন্তাগুলোকে উল্লেখ করে খোঁজ করে দেখতে চাই বাংলা ভাষায় সেই প্রসঙ্গ গুলোতে কোনও নারীবাদী লেখালেখি আছে কিনা, থাকলে সেসবের প্রকাশ, চরিত্র, মূল আলোচ্য বিষয়গুলো কি কি, কিম্বা না থাকলে সেটাও উল্লেখ করা।

Image result for taslima nasrin

নারীবাদী লেখক – তসলিমা নাসরিন

তবে যে সকল লেখালেখি এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছি তার ক্ষেত্রে একটা সীমা বা নিয়ম মেনেছি । আমি প্রধানত প্রকাশিত পুস্তক, ব্লগ বা সংবাদপত্রের মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখাসমুহ আমার এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছি। আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম “ফেসবুক” এর নারীবাদী লেখালেখি গুলোকে এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করিনি। কারণ দুটো – প্রথমত  ফেসবুকের লেখালেখি সমূহের গুনগত মান প্রায়শই খুব গ্রহনযোগ্য মানের হয়ে ওঠেনা এবং প্রায়শই সেই লেখাগুলো লেখা না হয়ে বরং সংক্ষিপ্ত মতামত বা মন্তব্য হয়ে থাকে। কোনও সুনির্দিষ্ট মতামত বিশ্লেষণের অভাব থাকে এই লেখাগুলোতে, কখনও কখনও থাকে চরম গালাগাল আর খিস্তি-খেউড়। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সকল আত্মদাবীকৃত নারীবাদী লেখকদের অনেকেই দারুন জনপ্রিয়, কিন্তু এই সকল লেখকের নারীবাদী লেখায় কতটা “নারীবাদ” থাকে সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। তবে এটা ঠিক এই সকল নারীবাদীদের লেখালেখিকেও আমরা বলছি “নারীবাদ”, এটাও আমাদের কাছে পরিচিত নারীবাদ যাকে আমি বলছি “চেনা নারীবাদ”।  এই সকল নারীবাদী লেখাতেও আমরা দেখতে পারি, বুঝতে পারি নারীবাদ বিষয়ে আমাদের মোটা দাগের বোঝাপড়াটা কেমন, কোথায় এবং কি অবস্থায় রয়েছে।

শুরুতেই বলেছি, নারীবাদী লেখকেরা এখন দারুন সরব “ব্লগ” বা নানান ধরণের সংবাদ পোর্টালগুলোতে। এখানে তাঁরা কলাম বা প্রবন্ধ লিখছেন, কখনও কখনও জাতীয় ইস্যুগুলোকে প্রসঙ্গ ধরে নারীর অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে লিখছেন আবার কখনও বা প্রতিবাদ করছেন লেখার মধ্যে দিয়ে। অন্তরজালের এই এসকল লেখালেখি নিয়ে তাঁরা পুস্তকও  প্রকাশ করছেন। সেই সকল পুস্তক চিন্তার দিক থেকে কতটুকু সুসংলগ্ন হচ্ছে তা হয়তো খুব একটা আলোচনা হয়না, তবুও এই লেখায় সেই লেখাগুলোকে অন্তরভুক অরার প্রধান কারণ একই, এই লেখাগুলোই আমাদের “চেনা নারীবাদ” কে প্রতিনিধিত্ব করে। আমি এই “চেনা নারীবা” এর সমান্তরালে উপস্থাপন করবো আন্তর্জাতিক নারীবাদী লেখালেখির একই ধরণের প্রসঙ্গ গুলোকে। হয়তো এই লেখার মধ্যে দিয়ে দেখা যাবে, নারীর সমস্যার একটা সাধারণ প্রকৃতি আছে সারা বিশ্বব্যাপী। দেশ – কালের ব্যবধানেও নারীর সমস্যার এই সাধারণ দিকটি হয়তো আমাআদের কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে, অনুসন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করবে আবারো পশ্চিমের নারীবাদের ইতিহাস খুঁড়ে দেখার জন্যে। সাথে থাকু, আশা করি এই লেখাটি কিছু সুস্থ আলোচনাকে উসকে দেবে আমাদের মাঝে।

(চলবে)

Spread the love