(প্রথম পর্বটি পড়তে পারেন এখানে)

ভুমিকা 

আজকের ইউরোপ সকল অর্থেই বিগত পাঁচশো বছরের চলমান প্রগতির সংগ্রামের ফসল। বিশেষত ষোলশো শতক থেকে আঠারোশ শতক পর্যন্ত যে “এনলাইটেনমেন্ট” বা জ্যোতির্ময়তার কাল পেরিয়েছে ইউরোপ, তারই ফলাফল হচ্ছে আজকের ইউরোপের সেকুলার, উদারনীতিবাদী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এর সাথে শিল্প বিপ্লবের বদৌলতে ইউরোপ জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়েছে অভাবনীয় গতিতে। এই সকল কিছুই সম্ভব হয়েছিলো ইউরোপের জ্যোতির্ময়তার কালে শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন ও বিজ্ঞানের অভাবনীয় বিকাশের কারণে। ফলে জ্যোতির্ময়তার কালের অর্জন হিসাবে ইউরোপ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভাবে হয়ে উঠেছিলো সেকুলার, উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমাজ। আর এসবই সম্ভব হয়েছিলো ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রবল একাধিপত্য খর্ব করার মধ্য দিয়ে। সভ্যতাকে পেছনের দিকে টেনে রাখার সবচাইতে বড় কয়েকটি  প্রতিষ্ঠানের একটি হচ্ছে ধর্ম আর সেই ভয়াবহ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ছিলো ইউরোপের গোঁড়া খ্রিষ্টতন্ত্র বা অন্য কথায় ক্যাথলিক চার্চ।  সেই বিশাল বপু খ্রিস্টতন্ত্রকে পরাজিত করেই ইউরোপ কে অর্জন করতে হয়েছিলো এই উদারনীতিবাদী, সেকুলার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কে। বলাই বাহূল্য, ইউরোপে এখনও খ্রিষ্টতন্ত্রের কংকাল আছে।

জার্মানির একটি শহরে যীশুর ক্যারিকেচার করে আঁকা কার্টুন।

ইউরোপের সকল মানুষ নাস্তিক নন, এমন কি বেশীর ভাগ মানুষই সক্রিয় বা প্রকাশ্য নাস্তিক নন। আস্তিকতা বা নাস্তিকতা এখানে গুরুত্বহীন এবং ব্যক্তিগত বিষয়। এখনও বহু পরিবারের শিশুদের নিয়ম করে ব্যাপ্টাইজ করা হয়। এখনও এখানে চার্চ আছে, ইস্টার আছে, ক্রিসমাস আছে শুধু নেই জনগনের জীবনের উপরে চার্চ ও তার নানান ধরণের খবরদারি। নেই রাষ্ট্রের কর্তব্য বিষয়ে চার্চের খবরদারি, নেই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের মাঝে, নাগরিক অধিকারকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে চার্চের খবরদারি। খৃস্টান পাদ্রী আর মোল্লাদের ক্ষমতা এখানে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, এরা এখন কেবল জনগণের বেতনভুক কর্মচারী। রাষ্ট্রের সাথে তার নাগরিকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে চার্চ এর ভূমিকা এখন শুন্য। মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায়, চিন্তার স্বাধীনতায় ধর্মের বা চার্চের ভূমিকা এখানে আক্ষরিক অর্থেই শুন্য। চার্চ এখন সস্তায় বিবাহের ও মৃতের সৎকারের সার্ভিস দিয়ে থাকে। তাই জার্মানিতে একটি মেট্রো স্টেশনের দেয়ালে যখন বিশাল আকৃতির যীশুর কৌতুকপ্রবণ কার্টুন আঁকা হয়, তখন এখানকার খৃস্টান মানুষেরা সেই শিল্পীর গর্দান চেয়ে মিছিল করেন না। হয়তো ব্যক্তিগত ভাবে কোনও কোনও ধর্ম প্রবণ খৃস্টান এতে বিরক্ত হতে পারেন, কিন্তু তার সেই ব্যক্তিগত বিরক্তির সাথে রাষ্ট্রের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই, থাকেনা। রাষ্ট্র এখানে ধর্মীয় অনুভুতির পাহারাদার নয়। ধর্ম বিষয়ে ব্যক্তির অতি ভালোবাসা বা অতি বিরক্তির কোনটাকেই রাষ্ট্র পাত্তা দেয়না।কেননা ধর্ম এখানে একেবারেই ব্যক্তিগত, নিজের বেডরুমের বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ারে রাখা বাইবেল এর মতো। তাই ইউরোপের সমাজে খ্রিষ্টতন্ত্র এখন যত্নের সাথে ঝুলিয়ে রাখা একটি কংকালের ছায়ার মতোন। এই যে কংকালটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সেটাও কেবল পুঁজির সেবাদাস হিসাবে। এখানে ক্রিসমাস আছে কারণ সারা ইউরোপ জুড়ে ক্রিসমাস বা কারনিভালকে কেন্দ্র করে কয়েক শো বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা বানিজ্য আছে। তাই এখানে এখন খ্রিষ্টতন্ত্র হচ্ছে টাকার চাকর।

পক্ষান্তরে ধর্ম হিসাবে ইসলাম হচ্ছে অনেকগুলো অপরিবর্তনীয়, জড় – জঙ্গম বিশ্বাসের সমষ্টি। ইসলামের গ্রন্থ কুরআনের কোনও পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধনের সুযোগ নেই। এ এক আদি অনড় জড় পুস্তক। দুনিয়া উল্টে গেছে তবুও এই গ্রন্থটি সেই পনেরোশ বছর আগের কথাই প্রচার করছে। মুসলিম জনগণের মাঝে বহু উদার সৃজনশীল, বৈচিত্রময় মানুষ থাকলেও ইসলামের এই পুস্তকটি এখনও অসংখ্য ঘৃণাবাদী ধারণা কে প্রচার করে চলেছে, এখনও কাফের, অবিশ্বাসী মানুষের প্রতি ঘৃণা ও হুমকী কে প্রচার করে চলেছে। এখনও অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বানী প্রচার করে চলেছে। ইসলাম প্রসঙ্গে, প্রায় দেড়শো বছর আগে কার্ল মার্কস নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন পত্রিকায় একটি ছোট আরটিকেল লিখেছিলেন। সেখানে মার্কস খুব সংক্ষেপে ধর্ম হিসাবে ইসলামের প্রধান সমস্যাটিকে উল্লেখ করেছিলেন। ইসলামের প্রধান সমস্যা হচ্ছে, এর নবী মুহাম্মদ সারা দুনিয়াকে মোটামুটি এক দাগে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন। মুসলিম আর কাফের (যদিও কাফের কে আজকাল নানান নামে ডাকা হচ্ছে)। মার্কস উল্লেখ করেছিলেন যে ইসলাম মনে করে, কেবল মাত্র ইসলামের মৌলনীতিতে অবিশ্বাসী হবার কারণেই অবিশ্বাসী মানুষদের তাড়া করে ফেরা যায়, হত্যা করা যায়, তাদের বিরুদ্ধে আজীবন যুদ্ধ জারি রাখা যায়। দেড়শো বছর আগে, মার্কস লিখেছিলেন – ইসলামের সাথে বোঝাপড়ার সবচাইতে বড় সমস্যা হচ্ছে, ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি বা অবিশ্বাসী মানুষদের প্রতি ইসলামের এই তীব্র ঘৃণা ও ইনটলারেন্স।

 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চর্চা এবং মূল্যবোধের পাথক্য রয়েছে। দেশে দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে উদারনৈতিকতা, আধুনিকতা ও সহিষ্ণুতার পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু ধর্ম ও ধর্মীয় বয়ান বিবেচনা করলে, ইসলাম সম্পর্কে কার্ল মার্কসের সেই বিশ্লেষণ আজও বহাল রয়েছে। যার প্রমান আমরা ইসলামীক ও মুসলিম প্রধান দেশগুলোর জনজীবন থেকে দেখতে পাই। ইসলামে ধ্রুপদী বয়ানে উদারনীতিক চিন্তার সুযোগ সীমিত, আল্লাহর একত্ববাদ, মুহাম্মদের নবুয়ত প্রাপ্তি ও আসমানী কিতাব কুরআন বিষয়ে কোনও প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। অন্তত এই তিনটি বিষয় সহ আরো হাজারো বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পরিনতি হচ্ছে মৃত্যুকে ডেকে আনা। ইসলামী মূল্যবোধে গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ নেই, নেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে ইসলামের এই মুখোমুখি অবস্থানের কথা শুধু কুরআন ও হাদিস থেকেই নয় এমনকি ইসলামী স্কলারদের দেয়া বিভিন্ন ব্যাখ্যা বা তাফসীর থেকেও জানা যায়।

 

পশ্চিমের দেশগুলোতে, বিশেষত ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বেলাতেও একথা সত্যি, ইসলামী মূল্যবোধ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর ব্যবহারিক সাংস্কৃতিক চর্চার মাঝে প্রায়শই বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিমের সাথে আত্মীকরন প্রক্রিয়ার সাথে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহন করে থাকেন। বিশেষত, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজম্মের মুসলিম অভিবাসীদের অনেকেই মূল্যবোধের দিক থেকে সাংস্কৃতিক দিক থেকে উদারনীতিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে অন্তত মুখোমুখি অবস্থান নেন না। কিন্তু এই অংশের বাইরে, মুসলিম জনগোষ্ঠীর আরেকটি অংশ যারা সরাসরি এর মুখোমুখী দাঁড়ান। বিশেষত যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠী আনুপাতিক হারে বেশী। ইংল্যান্ডে তাই আমরা দেখেছি, মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ২৫ বছরের মধ্যে ইংল্যান্ডে শরীয়া আইন প্রতিষ্ঠার উদ্ধত ঘোষণা দিতে। সুতরাং যদি আমরা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তুলনা করি, দুইটি পরস্পরবিরোধী স্বরূপ আমরা দেখতে পাই, একদলের মুসলিম উদারনীতিবাদী গণতান্ত্রিক চর্চায় অংশ নিচ্ছেন আর অন্যদিকে আরেক দল কট্টর ইসলামী মূল্যবোধের দাবীতে পশ্চিমের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে থাকেন। যদিও এই বিশ্লেষণটি খানিকটা উপরভাসা। হয়তো দেখা যাবে, মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে এই ভিন্নতাকে ব্যাখ্যা করার জন্যে অনেক আর্থসামাজিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু এই লেখার বেলায় আমরা সেই বিস্তৃত আলোচনায় যাবোনা। কিন্তু মোটের উপরে, ইউরোপের মূল ধারার সামাজিক মূল্যবোধের বিপরীতে এই হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অবস্থান।

লন্ডনের সড়কে শরীয়া আইনের দাবীতে ইসলামপন্থীদের সমাবেশ।

স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ইউরোপের উদারনীতিক ও সেকুলার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে অনেক ব্যক্তি মুসলমানের সংহতি থাকলেও ধর্মীয় মূল্যবোধ হিসাবে মূলধারার ইসলামী মূল্যবোধ সরাসরি ইউরোপের সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সাঙ্ঘরষিক। ইউরোপীয়রা একটু নরম করে এটাকে বলে থাকেন অসঙ্গতিপূর্ণ বা incompatible । কিন্তু বাস্তবত বিষয়টি হয়তো শুধু অসঙ্গতিপূর্ণই নয়, ইসলামী মূল্যবোধ ইউরোপের মূলধারার সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সাথে সরাসরি সাঙ্ঘরষিক এবং এক দুরতিক্রম্য সংকটের জন্ম দিয়েছে। যদিও দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম নাগরিক ইউরোপের মূলধারার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন অথবা নেয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কয়েকটি দেশে, বিশেষত, জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড এ মূলধারার সামাজিক মূল্যবোধের সাথে ইসলামী মূল্যবোধের সংকট এখনও দুরতিক্রম্য। পশ্চিমের বেশ কয়েকজন একাডেমিক গবেষক ইসলামের সাথে ইউরোপ বা আমেরিকান সমাজের সাঙ্ঘরশিক অবস্থান কে “পূর্ব ও পশ্চিমের” সম্পর্কের ঐতিহাসিক টানাপোড়েন এর একটা বর্ধিত অংশ হিসাবে বর্ণনা করেছেন, কেউ কেউ এটাকে সভ্যতার সংঘাত বলেও ব্যাখ্যা করেছে। কোনও কোনও লেখক এই অসঙ্গতিকে “ওরিয়েন্টালিজম” ও “মডারনিজম” এই তত্ত্বের আলোকেও ব্যাখ্যা করেছেন যেখানে মার্কিন সম্প্রসারনবাদীতাকে জায়েজ করার করার জন্যে তথাকথিত উঁচু ও নীচু সভ্যতার যুক্তি দিয়ে বিষয়টিকে আলোচনা করা হয়েছে। আমি এই আলোচনাটিকে সেই দিকে নিয়ে যাবোনা, সেই আলোচনাটি আলাদাভাবে করাই ভালো। দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক, শুধু যদি বিষয়টিকে সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষিতে দেখি, একথা সত্যি যে ইউরোপ ও পশ্চিমের যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, তার সাথে মূলধারার ইসলামী মূল্যবোধ সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

 

ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণেই হোক আর পরবর্তীতে অব্যাহত অভিবাসনের কারণেই হোক ইউরোপের অভিবাসীদের সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন মুসলিম জনগোষ্ঠী। আর সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে যুদ্ধপিড়ীত মানুষের ভীড়। সব মিলিয়ে ইউরোপে এখন প্রায় ৫ – ৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী হচ্ছে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। এর মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ইংল্যান্ডে রয়েছে সবচাইতে বড় মুসলিম অভিবাসী জনগোষ্ঠী। আর তাই, পশ্চিমা ও ইসলামী মূল্যবোধের সংকটের সবচাইতে ভয়াবহ পরিনতি ভোগ করতে হয়েছে, মূল্য শোধ করতে হয়েছে এই দেশগুলোকেই। এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাংশ ইউরোপেরই আদি বাসিন্দা, অন্তত বহু পুরুষ ধরে আর বাকীরা হচ্ছেন অভিবাসী। ভাষা ও নৃতাত্ত্বিক কারণে যেহেতু ইরান, তুরস্ক, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া কে আরব বলা হয়না, সেই বিভাজনে ইউরোপের একটা বড় অংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী অ-আরব। এই অভিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী না পারছে ইউরোপের মূল্যবোধ কে নিজের করে ভাবতে আবার না পারছে ইউরোপের সামাজিক কল্যাণের সুবিধাসমুহ ছেড়ে নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে। এ এক দারুন দোটানা অবস্থা ইউরোপের মুসলমানদের।

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামী মূল্যবোধের সাথে ইউরোপীয় মূল্যবোধের এই সংকট কে ইউরোপ কিভাবে মোকাবিলা করবে? যেমন ধরা যাক – চরম ডানপন্থী প্রচারক মাইলো ইয়ানোপুওলাস এর মতে পশ্চিম থেকে সকল মুসলিম কে বস্তায় ভরে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে দিলে এই সকল সমস্যা দূর হয়ে যাবে। (এখানে দেখুন )। এই প্রচারনা শুধু মাইলো’র মতো ডানপন্থীরাই করেন না, অনেক মধ্যপন্থী এমনকি অনেক উদারনীতিবাদী মানুষও মনে করেন মুসলিমদের ইউরোপের বাইরে বা আমেরিকার বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হলেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। ব্রিটেনের চরম ডানপন্থী দলগুলো মনে করে ইসলাম হচ্ছে “অ-খ্রিস্টান”, “অ-পশ্চিমি” (নন-ক্রিসচিয়ান, নন-ওয়েস্টারন ইত্যাদি), সুতরাং মুসলমানেরা পশ্চিমা থাকার যোগ্যতা রাখেনা।

 

অনেকেই মনে করেন, যারা আছে তারা থাকতে পারেন তবে ভবিষ্যতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর পশ্চিমে ইমিগ্রেশনের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে (যার প্রমান আমরা দেখেছি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর সাম্প্রতিক ঘোষণার মধ্যে দিয়ে)। এই সমাধান টি হচ্ছে “আমরা” ও “তারা” বা “উই এন্ড দে” এই বোধের উপরে ভিত্তি করে যা পশ্চিমেরই অনেক মানবতাবাদীরা বিরোধিতা করেন।

 

সৌভাগ্যবশত ইউরোপে বা আমেরিকায় মাইলো’র মতো মানুষেরা সংখ্যালঘু। ট্রাম্পের মতো অসংবেদনশীল বর্ণবাদী রাষ্ট্রপতি আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে বিরল। তাই ইউরোপের মূল ধারার মানুষ এই উগ্র ডানপন্থীর মতো করে বা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো করে ভাবেন না। সেকারনেই ডানপন্থী – সাদা আভিজাত্যবাদী মাইলো বা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর সমাধান ইউরোপের বা আমেরিকার গড়পরতা মানবিকবোধের কাছে এখনও গৃহীত হয়নি ।  তাহলে ইউরোপ কি তার নিজের সেকুলার উদার গণতান্ত্রিক উপায়ে এই সংকটকে মোকাবিলা করবে? নাকি আমেরিকান প্রশাসনের মতো বর্ণবাদী কায়দায় এই সমস্যা মোকাবিলা করবে? নাকি পিছিয়ে থাকা আরব্য মূল্যবোধের স্তরে নিজেকে পরিবর্তিত করবে ও সেভাবে ইসলাম কে মোকাবিলা করবে?

 

সমগ্র “ইসলামোফোবিয়া” বিষয়ক বিতর্কটির শুরুর বিন্দু হতে পারে এই প্রশ্নটিই। কেননা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষক,লেখক, রাজনীতি ভাষ্যকারের মতে সাম্প্রতিক সময়ের “ইসলামোফোবিয়া”র একটি প্রধান উৎসবিন্দু হচ্ছে পশ্চিমের এই “আমরা” ও “তারা” মনোভাব, যে মনোভাব তৈরীর বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। তবে  এই প্রশ্নটিই “ইসলামোফোবিয়া” প্রসঙ্গে একমাত্র আলোচনা নয়। আলোচনা – সমালোচনাটি আরো বিস্তৃতি হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। এই পর্বে, আমি “ইসলামোফোবিয়া” নিয়ে আন্তর্জাতিক, বিশেষত আমেরিকান ও ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে যে সকল বিতর্ক গুলো চলছে, তার একটা সংক্ষিপ্ত রুপ উপস্থাপনের চেষ্টা করবো। আন্তর্জাতিক ও ইউরোপীয় অঙ্গনে চলমান বিতর্কগুলো তুলে ধরছি এই জন্যে যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশ “ইসলামোফোবিয়া”র শিকার হয়েছেন এই দেশগুলোতেই।

 

“ইসলামোফোবিয়া”র সমালোচনাঃ শব্দের অর্থ নাকি বাস্তবতা কোনটি মূখ্য? 

“ইসলোফোবিয়া” ধারণাটির আলোচনা – সমালোচনা কম হয়নি। হাজার হাজার পাতা লেখা হয়েছে এই ধারণাটির উপযুক্ততা নিয়ে, সঠিকতা নিয়ে, বাস্তবতা কিম্বা বাস্তব ভয়াবহতা নিয়ে। প্রধানত দুই ধরণের সমালোচনা আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন মিডিয়া, ব্যক্তিগত ও সংগঠন কেন্দ্রিক প্রকাশনা গুলোতে। এক ধরণের সমালোচনা হচ্ছে গোছানো ও সংঘবদ্ধ সমালোচনা – যেখানে সমস্যার গভীর বিশ্লেষণ থাকে, বিভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে সমস্যাটিকে বিশ্লেষণের প্রচেস্টা থাকে। আর আরেক ধরণের সমালোচনা হচ্ছে অন্ধ সমর্থনজনিত কিম্বা চরম শত্রুভাবাপন্ন আগোছালো সমালোচনা। বাংলা ভাষার সমালোচনাগুলোর প্রায় সবটুকুই এই দ্বিতীয় গোত্রের সমালোচনা।

প্রথম দলে রয়েছে – বিভিন্ন একাডেমিক গবেষক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, লেখক ও থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান গুলোর পক্ষ থেকে গঠনমূলক সমালোচনা, যা সুনির্দিষ্ট ভাবেই তাত্ত্বিক ও বাস্তব তথ্য-উপাত্তভিত্তিক। আর

দ্বিতীয় দলে রয়েছে –খৃস্টান ডানপন্থী, সাদা আভিজাত্যবাদী ও নিও-লিবারাল নব-নাস্তিকতাবাদী এক্টিভিস্টদের অগোছালো সমালোচনা, যার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্যাটিকে নিয়ে ডিনায়াল বা প্রত্যাখ্যানসূচক মতামত। অথবা মুসলিম জাতিয়তাবাদী, মুসলিম ব্রাদারহুড ধরণের সংগঠনগুলোর অন্ধ-একপেশে সমর্থনজনিত আলোচনা। দ্বিতীয় দলের এই আলোচনা-সমালোচনা গুলো বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতা, কর্মী বা রাজনৈতিক মুখপাত্রদের মাধ্যমে হওয়া। যার মূখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে পরতিপক্ষকে প্রত্যাখ্যান করা বা ঘায়েল করা, মূল সমস্যাটির বাস্তব চরিত্র নিয়ে আলোচনা নয়।

এই লেখাটিতে আমি “ইসলামোফোবিয়া” ধারনাটির প্রসঙ্গে যে সকল গঠনমূলক সমালোচনা, তথ্য-উপাত্তভিত্তিক সমালোচনা রয়েছে প্রকাশিত মাধ্যমে তার একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে চাই। খৃস্টান ডানপন্থী, সাদা আভিজাত্যবাদী ও নিও-লিবারাল নব-নাস্তিকতাবাদীদের যে সমালোচনা রয়েছে তা প্রকাশ্যভাবেই প্রত্যাখ্যান ও গালিগালাজে ভরপুর বিধায়, সেসব নিয়ে সময় ব্যয় করাটা অপচয় বোধ করি। অন্যদিকে ইমিগ্র্যান্ট মুসলিম সংগঠনগুলোর অতিরঞ্জিত আলোচনা গুলোও এখানে খুব একটা আনবোনা। বিবেচনাবোধ সম্পন্ন মানুষ তাদের নিজ নিজ বিবেচনাবোধ কাজে লাগিয়ে এই সকল সমালোচনার মাঝে বস্তুনিষ্ঠ অংশগুলোকে তফাৎ করে নিতে পারবেন আশা করি।

এবার আসুন, “ইসলামোফোবিয়া” ধারণাটি নিয়ে পশ্চিমের মূলধারার বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কগুলোর সারসংক্ষেপ দেখে নেয়া যাক। আলোচনার সীমা কে ছোট রাখার জন্যে, তাত্ত্বিক অংশটুকুকে কেবল ইউরোপীয় অঞ্চল (পশ্চিম ইউরোপ) ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে সীমিত রাখবো।

পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ইসলামোফোবিয়া শব্দটির ব্যবহার নিয়ে একটি গবেষণার ফলাফল দেখে নেয়া যাক। যদিও “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটির ব্যবহার আমরা দেখেছি প্রায় গত শতকের গোড়ার দিকে, তবুও বলাই বাহূল্য, গবেষণা ও লেখালেখির জগতে শব্দটির ব্যবহার আকাশচুম্বী হয়েছে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর এ ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনাটির পর থেকে। Steve Garner and Saher Selod নামের দুজন গবেষক এ প্রসঙ্গে একটা পদ্ধতিগত গবেষণা করে দেখিয়েছেন প্রকাশিত গবেষনাপত্র ও মিডিয়াতে কিভাবে এই শব্দটির ব্যবহার হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষিতে। এঁদের অনুসন্ধানের উপাত্ত থেকে একথা সুস্পষ্ট করে বলা যায়, “ইসলামোফোবিয়া” ধারণাটির একটি স্পষ্ট বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায় ২০০১ সালের পর থেকে। সুতরাং যারা “ইসলামোফোবিয়া” উপস্থিতি নিয়ে সন্দিহান, তাদের জন্যে এই গবেষনাটি অন্তত পক্ষে একটি অপ্রত্যক্ষ প্রমান হিসাবে কাজে দিতে পারে।

ইউরোপে “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটি ও ধারণাটির ব্যবহারিক সমস্যার আলোচনার ক্ষেত্রে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হচ্ছে অধ্যাপক ক্রিস অ্যালেন, অধ্যাপক ইয়ুরগেন নিলসেন, অধ্যাপক সিন্দ্রে বাগস্টান্দ, ড. কেনান মালিক, ড. অরুন কুন্দনানী এঁদের মতো লেখক গবেষকেরা। অধ্যাপক ক্রিস অ্যালেন হচ্ছেন বারমিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ইয়ুরগেন নিলসেন ড্যানিশ কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ এর অধ্যাপক। এরা দুজন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডাকে প্রথম ইউরোপে “ইসলামোফোবিয়া” নিয়ে একটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যাপী সার্ভে করেন এবং তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করেন। কেনান মালিক, প্রশিক্ষিত নিউরোসাইকোলজিস্ট পেশায় নিউরো সাইকোলজির শিক্ষক, লেখক, বেতার ও টেলিভিশন ভাষ্যকার । কেনান মালিক একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মানবতাবাদী যার জন্ম ভারতে আর বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডের শিল্পনগরী ম্যানচেস্টার এ। ইসলামের ধর্মের একজন প্রকাশ্য সমালোচক এবং ব্রিটিশ মুসলিম সংগঠনগুলোর নানান দাবী-দাওয়ার একজন কট্টর সমালোচক হিসাবে প্রসিদ্ধ হয়েছেন সাম্প্রতিক সময়ে। ইংল্যান্ডের প্রায় প্রতিটি বেতারে তাঁর সাক্ষাৎকার ও অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে ইসলাম ও ইসলামোফোবিয়া ধারণার সমালোচনা বিষয় নিয়ে। তিনি তার সাম্প্রতিক পুস্তক “From Fatwa to Zihad” গ্রন্থের জন্যে জর্জ ওরওয়েল পুরস্কারের জন্যে ফাইনালিস্ট মনোনীত হয়েছিলেন। এই কয়েকটি ভুমিকা দেয়ার কারণ হচ্ছে, ইউরোপীয় অভিজ্ঞতায় এরা সকলেই পেশাদার বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ এবং এরা গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভাবে “ইসলামোফোবিয়া” ধারণাটির সমালোচনা করেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্যাটি থেকে কিভাবে উত্তোরন লাভ করা যায়। ক্রিস অ্যালেন, ইয়ুরগেন নিলসেন, সিন্দ্রে বাগস্ট্যান্ড কিম্বা অরুন কুন্দনানি এরা সবাই পারিবারিক ধর্মের দিক থেকে অমুসলিম। কেনান মালিক মুসলিম পরিবারের নাস্তিক এবং মার্কসবাদী, বামপন্থী তাত্ত্বিক (যাকে আমাদের নব-নাস্তিকেরা বলেন “বামাতি”, “ভাম” ইত্যাদি, সেই ধরণের একজন বুদ্ধিজীবি। এই তকমাটি কাজে লাগবে যখন আমরা কেনান মালিকের মতামত উল্লেখ করবো তখন।)। এরা সবাই পেশাগত ভাবে সিরিয়াস গবেষক হিসাবে স্বীকৃত ।

 

আমেরিকায় “ইসলামোফোবিয়া” ধারণাটির সমালোচনায় দুই ধারার লেখকেরাই সমান সক্রিয়।  একাডেমিক ও পদ্ধতিগত গবেষকদের লেখালেখির ক্ষেত্রে রয়েছেন অধ্যাপক মাত্তি বানজল, অধ্যাপক এরিক ব্লেইখ, ড. দিপা কুমার, ড. নাথান লীন এর মতো লেখকেরা যারা দেখিয়েছেন আমেরিকায় “ইসলামোফোবিয়া”র ভয়াবহ বিস্তার আবার অন্যদিকে রবার্ট স্পেনসার বা পামেলা গেলার এর মতো স্বঘোষিত “ইসলামোফোব” এর লেখালেখিও আছে যারা “ইসলামোফোবিয়া”র বিষয়টাকে পুরোটাই বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের চক্রান্ত বলে মনে করেন (এঁদের বয়ানের সাথে দারুন মিল পাওয়া যাবে আমাদের বঙ্গীয় নব-নাস্তিকদের, আমরা এই লেখার পরের অংশে দেখবো তা) । বলাই বাহুল্য, রবার্ট স্পেন্সার কে “ইসলামোফোব” বলাটা আমার মন্তব্য নয়, বরং তিনি নিজেই বিশয়টিকে গৌরবের সাথে জানান দিয়ে থাকেন।

 

আমি খুব সংক্ষেপে এই লেখকদের মূল ভাবনাগুলোর একটা পর্যালোচনা হাজির করার চেষ্টা করবো এই সিরিজটিতে। তবে এই পর্বের আলোচনায় উল্লেখ করবো “ইসলামোফোবিয়া”র শব্দ ও ধারণাটিকে কেন্দ্র করে আলোচনা – সমালোচনার মূল কথা গুলো।

 

“ইসলামোফোবিয়া” শব্দের ও ধারনার সীমাবদ্ধতা 

অধ্যাপক ক্রিস অ্যালেন ২০০৬ সালে তাঁর পিএইচডি থিসিস জমা দেন Islamophobia: Contested Concept in the Public Space শিরোনামে। পরবর্তীতে তাঁর মোট দশ বছরের গবেষণার উপরে ভিত্তি করে একটি পুস্তক লিখেছেন যার শিরোনাম “ইসলামোফোবিয়া”। এটাই সম্ভবত “ইসলামোফোবিয়া” নিয়ে প্রথম বস্তুগত সমালোচনা বা “Objective and critical” পুস্তক। ক্রিস অ্যালেন তাঁর পুস্তকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে লিখছেন এভাবে –

 

“This book seeks to be both timely and relevant: to contribute to the better understanding of this  ongoing and rapidly developing phenomenon as well as raise numerous other questions that will require further consideration and investigation. This latter point is both essential and necessary”.

 

(অনুবাদঃ এই বইটি অনেকটা প্রাসঙ্গিক ও সময়ানুগ ভাবেই আরো ভালো করে চলমান এই সকল ধারণা বা প্রপঞ্চ সমূহকে বুঝতে চায় এবং একইসাথে অপরাপর প্রশ্নগুলোও তুলতে চায় যা বিবেচনা ও অনুসন্ধানের দাবী রাখে। বিশেষত এই পরের প্রসঙ্গটি অর্থাৎ বিবেচনা ও অনুসন্ধানের বিষয়টি জরুরীও বটে)

 

 

অন্তত বইটি লেখার উদ্দেশ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই পুস্তকটি ইসলামিস্টদের সন্তুষ্ট করার জন্যে বা ব্রিটিশ সরকারকে সন্তুষ্ট করার জন্যে লেখা হয়নি। আমরা ক্রিস অ্যালেন এর পুস্তক থেকে “ইসলামোফোবিয়া” বিষয়ে তাঁর গবেষণা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আরো বিস্তারিত উল্লেখ করবো।

 

অধ্যাপক অ্যালেন তাঁর পুস্তকের প্রথম অংশটুকু ব্যয় করেছেন “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটির ইতিহাস সন্ধানে। অন্যান্যদের মতোই তিনিও শব্দটির সিম্যান্টিকস বা অর্থতত্ত্ব নিয়ে খানিকটা সময় ব্যয় করেছেন কিন্তু সেখানেই আটকে থাকেননি, তিনি এই শব্দ ও ধারণাটিকে কেন্দ্র করে যে সকল বাস্তবতা তার বিশ্লেষণ কে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

 

তিনি উল্লেখ করেছেন, শব্দটির প্রথম প্রবর্তন অনেক পুরোনো হলেও, প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রবর্তন ঘটেছিলো আমেরিকার জার্নাল “ইনসাইট” পত্রিকায় ১৯৯১ সালে এবং কাকতালীয় ভাবে ঠিক একই সময় ব্রিটেনের গবেষক তারিক মদুদ এই শব্দটি ব্যবহার করেন। যদিও তারিক মদুদ এর গবেষনাটি ছিলো ইংল্যান্ডের খ্রিস্টান-মুসলিম সম্প্রীতি সংগঠনের উদ্যোগে করা। এই দুইটি সূত্রের ইসলামোফোবিয়া শব্দটির ব্যবহারের কারণেই, ক্রিস অ্যালেন মনে করেন “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটি সাম্প্রতিক, যদিও উনিশ শতকের গোড়ার দিকে হয়তো এর প্রচলন হয়েছিলো, কিন্তু বর্তমানে যে অর্থে এটি ব্যবহার হচ্ছে তার প্রচলন সাম্প্রতিক। তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রায় একই সময়ে আমেরিকাতে এবং ইংল্যান্ডে শব্দটির ব্যবহার শুরু হলেও, ইংল্যান্ডই প্রথম দেশ যারা বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃত দেয় ও পরিচিত করে তোলে। অন্যান্যদের মতো তিনিও স্বীকার করেন, রানিমেইড ট্রাষ্টই এই শব্দটির প্রকৃত পুনর্জন্মদাতা। তাই তাঁর মূল আলোচনা আবর্তিত হয়েছে রানিমেইড ট্রাষ্ট এর দেয়া “ইসলামোফোবিয়া”র সংজ্ঞা ও ধারণার উপরেই।

 

তিনি রানিমেইড ট্রাষ্ট এর রিপোর্টটির সমালোচনা করেছেন পদ্ধতিগত ভাবে। ইসলামোফোবিয়া আছে কি নেই, কিম্বা থাকলে কতটুকু আছে এটা নিয়ে তাঁর বিতর্ক নয়। বরং তিনি সমালোচনা করেছেন দুটি বিষয়ে, রানিমেইড ট্রাষ্ট এর গবেষণা পদ্ধতির ত্রুটি নিয়ে আর “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটির ব্যবহারিক সমস্যা প্রসঙ্গে । ইসলামোফোবিয়া কে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে রানিমেইড ট্রাস্ট এর গবেষণা ও পদ্ধতির তিনটি প্রধান সমালোচনা করেছেন তিনি।

 

প্রথমত – রানিমেইড ট্রাষ্ট এর গবেষণার পদ্ধতির কিছু মৌলিক সমস্যা উল্লেখ করেছেন যা না থাকলে এই গবেষণাটির ফলাফল আরো বেশী গ্রহনযোগ্য করতে পারতো, ত্রুটিমুক্ত হতে পারতো। রানিমেইড ট্রাষ্ট এর গবেষকদলের মূল দলটিতে সকল ধর্মের মানুষ রাখাকে নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, এই ক্ষেত্রে গবেষকদের নিজস্ব দক্ষতার বদলে তাদের ধর্মপরিচয় প্রধান হয়ে উঠেছে কিনা তা ভাবার বিষয়, যা গবেষণার পদ্ধতিগত সঠিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে। সকল ধর্মের মানুষ থাকলেই একটা গবেষণা নিরপেক্ষ হয়ে উঠবে, তা নাও হতে পারে। এটা বিশুদ্ধ গবেষণার বদলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেই বেশী দেখা যায়।

 

দ্বিতীয়ত – রানিমেইড ট্রাষ্ট এর গবেষণা “নৃতাত্ত্বিক – সাংস্কৃতিক” বিষয়টিকে ধর্মের সাথে খানিকটা গুলিয়ে ফেলেছে। অন্তত সেটা আলাদা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যার প্রভাব গবেষণার ফলাফলে পড়তে পারে। ইসলাম একটা ধর্ম যার কিছু সুনির্দিষ্ট চিন্তা ও নৈতিক অবস্থান আছে আর মুসলিম বলতে সেই ধর্মের প্রতি বিশ্বাসী কিন্তু সাংস্কৃতিক ভাবে দারুন ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্য, ভাবনা, চর্চার  মানুষদের বোঝানো হয়ে থাকে। সেজন্যেই আরবের মুসলমানের সাথে এশিয়ার মুসলমান নাগরিকদের মাঝে রয়েছে সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মোটের উপরে এঁদের সবাইকে “এক” বলাটার বিপদ আছে। এমন কি ইংল্যান্ডে এবং পশ্চিমের অনেক দেশে শুধুমাত্র মুসলিম নাগরিকেরাই যে ধর্ম জনিত বর্ণবাদী ঘৃণার শিকার হয়েছেন তা নয়, অনেক অমুসলিম মানুষও এই ধরণের ঘৃণার শিকার হয়েছেন যা রানিমেইড ট্রাষ্ট এর সংজ্ঞায় স্বীকার করা হয়না। শুধুমাত্র “মুসলিমদের মতো” দেখতে বলে অনেক শিখ ও এশিয়ান মানুষ একই ধরণের নিগ্রহের স্বীকার হয়ে থাকেন, রানিমেইড ট্রাষ্ট এর “ইসলামোফোবিয়া” এই ধরণের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে পারেনা।

 

তৃতীয়ত – রানিমেইড ট্রাষ্ট এর পুরো গবেষনাটি করা হয়েছে, ইসলাম সম্পর্কে “খোলা মতামত” অথবা “বদ্ধ মতামত” এই দুই ক্যাটেগরির ভিত্তিতে, অর্থাৎ মানুষকে এক রকমের বাইনারী অপশনের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে, হয় আপনি “ইসলামোফোব” অথবা আপনি “ইসলামোফাইল”। অর্থাৎ ইসলাম বিষয়ে আপনার কোনও প্রীতিবোধ না থাকাকেই ইসলাম সম্পর্কে আপনার অপ্রীতিবোধ বলে ধরে নেয়া্র সুযোগ তৈরী হয়েছে। কিন্তু বাস্তব এমনটা নাও হতে পারে। বাস্তবে এর মাঝামাঝি অবস্থানের অনেক মানুষ থাকতে পারেন, যারা ইসলামের প্রতি প্রীতিও বোধ করেন না আবার ঘৃণাও বোধ করেন না, এই ধরণের মানুষের অবস্থান এই গবেষণায় সঠিক ভাবে চিত্রিত হয়নি।

 

যারা রানিমেইড ট্রাষ্ট এর মূল রিপোর্টটি পড়ে দেখবেন, তারা হয়তো ক্রিস অ্যালেন এর এই সমালোচনা গুলোর সাথে একমত হবেন। রানিমেইড ট্রাষ্ট এর দেয়া “ইসলামোফোবিয়া”র সংজ্ঞা টি অতিমাত্রায় ধর্মকেন্দ্রিক তাই তা এই সমস্যার সাংস্কৃতিক মাত্রাটিকে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।   ক্রিস অ্যালেন এর মূল সমালোচনা হচ্ছে রানিমেইড ট্রাষ্ট এর গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে, তাঁর ত্রুটির দিক নিয়ে যা “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটি কে খুব স্পষ্ট হতে দেয়নি জনগনের কাছে। তিনি মনে করেন, “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটি হয়তো ব্যবহার করা যেতে পারে কিন্তু এর ব্যাখ্যার যায়গায় সমস্যা রয়েছে, যা মানুষের বোঝাপড়াকে আরো জটিল করেছে।

 

আমাদের দেশের মুক্তমনা, মুক্তচিন্তক দাবীদার অনেকেই শব্দটির শাব্দিক অর্থ, “ফোবিয়া” আর ভীতি ইত্যাদির মাঝেই হাবুডুবু খেলেও, ক্রিস অ্যালেন তাঁর পুস্তকে এবং পরের একটি লেখায় ব্যাখ্যা করেছেন যে ইসলামোফোবিয়াকে সংজ্ঞায়িত করাটা কঠিন, ঠিক যেভাবে কঠিন যেকোনো বৈষম্যমূলক ধারণার নাম কে সংজ্ঞায়িত করা।

 

“Much has been made about the fact that Islamophobia is difficult to define. This isn’t exclusive to Islamophobia. In fact the same is true of all discriminatory phenomena including racism, homophobia and sexism among others”.

 

(অনুবাদঃ অনেক চেস্টার পরও বাস্তবতা হচ্ছে “ইসলামোফোবিয়া” কে সংজ্ঞায়িত করাটা কঠিন। এটা কেবল “ইসলামোফোবিয়া”র ক্ষেত্রে সত্যি তা নয়, সকল ধরণের বৈষম্যমূলক প্রপঞ্চকে বোঝানোর ক্ষেত্রেই এই সমস্যাটি আছে, যেমন রেসিজম, হোমোফোবিয়া কিম্বা সেক্সিজম এই শব্দগুলোর বেলাতেও এই সমস্যা রয়েছে।)

 

 

যারা “ইসলামোফোবিয়া”র আলোচনা কে কেবল “ফোবিয়া” আর “ফিয়ার” বা ভীতি – আতংক  এই সকল শব্দের কুজ্ঝটিকায় আটকে রাখতে চান, ক্রিস অ্যালেন তাদের জন্যে সাম্প্রতিক আরেকটি প্রবন্ধে লিখছেন এভাবে –

 

 

“the term Islamophobia merely needs to name: it does not need to literally describe or define. A precedent exists for this, illustrated by how the terms Antisemitism and homophobia name rather than literally describe what they are used to refer to. So for example, while Antisemitism is widely accepted and used to name rather than describe the discrimination, bigotry, hate and violence expressed and manifested towards Jews, Jewish communities and importantly, the religion of Judaism it cannot be used to accurately describe – literally at least – someone perpetrating such acts as an ‘anti-Semite’. Islamophobia as a descriptor functions in exactly the same way and so should be able to be used to name in exactly the same way also: to name rather than literally describe. Arguments that seek to dismiss on the basis of literal interpretations and understandings must therefore be dismissed as mere smokescreens behind which critics and detractors seek to obscure the debates about the realities of Islamophobia and more importantly, the need to tackle it”.

 

(অনুবাদঃ “ইসলামোফোবিয়া” বিষয়টির কেবল একটা নাম দরকার। এর দরকার নেই বিষয়টিকে আক্ষরিক অর্থে বর্ণনা করার বা সংজ্ঞায়িত করার। যেভাবে অতীতে “এন্টি-সেমেটিসিজম” বা “হোমোফোবিয়া” শব্দ গুলো ব্যবহৃত হয়েছিলো, শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থ বোঝানোর চাইতেও আসল ঘটনা বা প্রপঞ্চগুলোকে বোঝানোর জন্যে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় – অ্যান্টি-সেমেটিসিজম শব্দবন্ধটি বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে একটি বৈষম্যের নাম দেয়ার জন্যে, ইহুদী মানুষ বা ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য, অন্ধ আক্রমন, ঘৃণা কিম্বা আক্রমন কে বিশদ বর্ণনা করার জন্যে নয়। এমন কি এই শব্দটি ধর্ম হিসাবে ইহুদী ধর্ম বা ইহুদীবাদকেও সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনা, সুতরাং উপরোক্ত কাজগুলো করেন এমন কাউকে হয়তো সঠিক অর্থে “এন্টি-সেমাইট” বলাটা সঠিক নাও হতে পারে। “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটিকে ঠিক একই ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, একই ভাবে শুধু সমস্যাটির নাম হিসাবে, সমস্যাটির বিশদ বর্ণনা করার জন্যে নয়। শাব্দিক অর্থের জটিলতার ধোয়া তুলে যারা সমস্যাটিকে নাকচ করে দিতে চান, তাদেরকেও একই ভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী হিসাবে ছুঁড়ে ফেলা দরকার, এঁদের সমালোচনা ও বিতর্কের উদ্দেশ্য বাস্তব সমস্যাটিকে বোঝা বা অনুধাবন নয়, এবং বাস্তব সমস্যাটির সমাধানের জন্যে নয়”।)

 

 

ক্রিস অ্যালেন রানিমেইড ট্রাষ্ট এর দেয়া “ইসলামোফোবিয়া”র সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, এই সংজ্ঞাটির সীমাবদ্ধতাকে ব্যাখ্যা করেছে বিস্তারিত ভাবে এবং তিনি নিজে একটি গবেষণার নেতৃত্ব দেন “ইসলামোফোবিয়া” বিষয়টিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার। শুধু তাইই নয়, তিনি এই নতুন সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এর সর্বদলীয় কমিটির কাছে উপস্থাপন করেন, ভবিষ্যত নীতি নির্ধারণ কাজে ব্যবহারের জন্য। এই লেখার প্রথম পর্বে আমরা ইসলামোফোবিয়ার সংজ্ঞা হিসাবে রানিমেইড ট্রাস্ট এর মতামত কে বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করেছি। আগ্রহী পাঠকেরা রানিমেইড ট্রাস্ট এর দেয়া সংজ্ঞার সাথে অধ্যাপক ক্রিস অ্যালেন এর সংজ্ঞাকে তুলনা করে দেখতে পারেন।   আসুন দেখা যাক সেই ইসলামোফোবিয়ার সংজ্ঞাটি কেমন।

 

“Islamophobia is a certain perception of Muslims, which may be expressed as hatred toward Muslims. Rhetorical and physical manifestations of Islamophobia are directed toward Muslim or non-Muslim individuals and/or their property, toward Muslim community institutions and religious facilities”

(অনুবাদঃ ইসলামোফোবিয়া হচ্ছে মুসলিমদের সম্পর্কে এক বিশেষ ধারণা যা হয়তো মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা হিসাবে প্রকাশিত হয়। ভাবে ও ভাষাগত কিম্বা প্রকাশ্য ভাবে “ইসলামোফোবিয়া”র মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে মুসলিম অথবা অমুসলিম মানুষেরা, তাঁদের সম্পত্তি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান কিম্বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ”।

 

 

বলাই বাহূল্য, এই সংজ্ঞাটি রানিমেইড ট্রাষ্ট এর দেয়া সংজ্ঞাটি থেকে সহজ সরল এবং এই সংজ্ঞাটি শুধু মুসলিম জনগোষ্ঠীর সদস্যকেই ইঙ্গিত করেনা, বরং “মুসলিম সদৃশ” নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের মানুষ যারা ই ধরণের ঘৃণার শিকার তাঁদেরকেও উল্লেখ করে। সেই অর্থে এই সংজ্ঞাটিতে রানিমেইড ট্রাষ্ট এর অন্তত একটি সীমাবদ্ধতার উত্তোরন ঘটেছে। কিন্তু একথা সত্যি যে মূলগত ভাবে এই সংজ্ঞাটির মৌলিক ধারণাটি একই, তা হচ্ছে, শুধুমাত্র ধর্ম পরিচয়ের কারণে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণার প্রকাশ।

 

এই সংজ্ঞাটি ইউরোপের “এন্টি-সেমেটিজম” এর সংজ্ঞার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং রানিমেইড ট্রাষ্ট এর সংজ্ঞার তুলনায় অনেক সরল এবং সোজা-সাপ্টা। যারা “ইসলামোফোবিয়া” শব্দটির “ফোবিয়া” নিয়ে আতংকগ্রস্থ এবং একে কেবলই মুসলিম ও বামাতিদের ষড়যন্ত্র দেখেন, তারা ক্রিস অ্যালেন এর গবেষনাপত্র গুলো পড়ে দেখতে পারেন।

এর পরের পর্বগুলোতে আমরা শব্দ ও ধারণা হিসাবে ইসলামোফোবিয়া সম্পর্কে অন্যান্য প্রধান গবেষক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষদের মতামত তুলে ধরবো।

(চলবে)

 

তথ্যসূত্র

Steve Garner and Saher Selod, “The Racialization of Muslims: Empirical Studies of Islamophobia,” Critical Sociology 40, No. 4 (2014): 2.

Islamophobia, Christopher Allen, ASHGATE publishers, p.4

 

Spread the love