Image result for islamic fiqh

গোড়ার কথা

আমাদের ইসলাম সংক্রান্ত আলোচনার প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে ইসলামের নবী মুহাম্মদের “জ্বিহাদ”, যুদ্ধবাদীতা ও তার যৌনজীবন। মুহাম্মদের বহুবিবাহ, তার স্ত্রীদের সংখ্যা, স্ত্রীদের সাথে মুহাম্মদের ব্যক্তিগত যৌনাচার ও এই সংক্রান্ত রসালো আলোচনা-কৌতুক, মুহাম্মদের পরকিয়া ইত্যাদি হচ্ছে আমাদের ইসলাম বিষয়ক আলোচনার প্রধান রসদ। এটা আমাদের বাংলা অনলাইনের সাম্প্রতিক সময়ের নয়া-নাস্তিক্যবাদী বা “নিও-এথিস্ট” ধারার বুদ্ধিবৃত্তির ধরণ। যদিও বাস্তব পৃথিবীতে এই প্রসঙ্গ গুলো বহু বছর আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে। ইসলামী দুনিয়া বলতে যদি আরব দেশগুলোকে বোঝানো হয়ে থাকে তাঁরা এখন জ্বিহাদ করাতো দূরের কথা পশ্চিমা যুদ্ধবাজ শক্তির আক্রমন থেকে নিজের শহর – বন্দর নগর রক্ষা করতেই ব্যস্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের কবলে পড়ে একের পর এক ঐতিহাসিক শহর বন্দর ধ্বংস হয়েছে এবং হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। আরব দেশগুলোর কাছে এখন তাই জ্বিহাদ ইসলামের প্রসার আর পরদেশ দখল নয় বরং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আত্মরক্ষার সমার্থক। আর মুহাম্মদের যৌনজীবন এখন কেবল ইসলামী দুনিয়ার বিলিয়নিয়ার আরবদের পক্ষেই সম্ভব। অর্থাৎ চৌদ্দটি স্ত্রী আর দাসী সম্ভোগ এখন ধনী আরব শেখ ও রাজ পরিবারের বিষয়। এ বিষয়ে ধনী আরবদের সাথে আধুনিক পশ্চিমা টাইকুনদের মাঝে খুব বিস্তর ফারাক নেই। কিন্তু তারপরেও, আমাদের নাস্তিক্যবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে মুহাম্মদের “জ্বিহাদ” ও তার যৌনজীবন।পৃথিবীর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সমূহ যেমন বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তানে বহুবিবাহ, দাসী সম্ভোগ কিম্বা পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করার মতো এই সকল ঘটনা শুধু বিরলই নয়, হাস্যকর রকমের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। কিন্তু তবুও আমাদের নাস্তিক্যবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এখনও মূলধারার আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে এই সকল অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গগুলো। কিন্তু কেনো?  এর কারণ কি?

 

এর একটা প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গুলো দারুনভাবে পশ্চিমা বিশেষত অ্যাংলো-আমেরিকান বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি দাসত্ব প্রবণ। তাই অ্যাংলো-আমেরিকান বয়ানের বাইরে যাওয়ার সৃজনশীলতা আমাদের গড়ে ওঠেনি কখনই। আমেরিকায় ৯/১১ এর সেই ভয়ংকর আক্রমনের পর থেকে আমেরিকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি যে প্রকাশ্য বিদ্বেষ, সরকারী ভাবে এবং দক্ষিনপন্থীদের উদ্যোগে তা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বে, সেই বয়ানেরই বাংলা অনুবাদের উৎসব হচ্ছে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম আছেন, কিন্তু মূলধারাটি নিরেট পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়া আর পশ্চিমের চরম ডানপন্থী সংগঠনগুলোর মুখপাত্রদের প্রচারিত বয়ানের বাংলা অনুবাদ করে চলেছেন। কিন্তু মূল প্রয়োজনীয় কাজটি হচ্ছে ইসলামের মূল টেক্সটকে পাঠ করা, তার অসারতা প্রমান করা এবং কেনো ইসলামের এই সকল অনুশাসন মানবতার জন্যে, আধুনিক সমাজের জন্যে যেকোনো প্রগতিশীল – সৃজনশীল সমাজের জন্যে প্রতিবন্ধক তার ব্যাখ্যা করা। অভিজিৎ রায় বা অনন্ত বিজয়ের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে আমাদের নাস্তিক্যবাদী বুদ্ধিবৃত্তির যে স্থায়ী ক্ষতিটা হয়েছে তা এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ব্লগে ও অন্যান্য লেখালেখিতে। ধর্মের বিরুদ্ধে যে দারুন বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম আমরা দেখেছি অবিশ্বাসের দর্শনে, এখন তা প্রায় বিরল। এই লেখাটির মধ্যে দিয়ে ইসলামী বয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের বয়ান পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো এবং কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের কাছেই প্রশ্ন রাখবো বিবেচনা করার জন্যে, এই সকল বয়ান আজকের দুনিয়ার জন্যে, একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলার জন্যে কতটা উপযোগী সেই সিদ্ধান্ত নেবার জন্যে।

 

যেকোনো ধর্মকেই বিচার করা দরকার তার সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতি দিয়ে। অর্থাৎ ধর্ম টিকে থাকে সেই সমাজে অস্তিত্বমান কিছু বস্তুগত শর্তের উপর ভিত্তি করে। সেই সকল বস্তুগত শর্তগুলো নিয়ে আমাদের মাঝে আলোচনা প্রায় বিরল। রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি কিভাবে ধর্মকে টিকিয়ে রাখার শর্তগুলো তৈরী করে এবং কিভাবে সেই সকল শর্তগুলোকে এক একটা দানবীয় শক্তিতে পরিনত করে সেই প্রসঙ্গ গুলো নিয়ে আমাদের সাম্প্রতিক বুদ্ধিবৃত্তিতে কোনও আলোচনার অবসর নেই।মূলত ধর্ম হচ্ছে সেই সমাজের প্রতিচ্ছবি বা ছায়া। জ্ঞান – বিজ্ঞানের চরম শিখরে অবস্থান করা আমেরিকার টাকার গায়ে কেনো লেখা থাকে “এক ঈশ্বরে আমরা বিশ্বাস করি”? কিম্বা কেনো আজও আমেরিকার মতো একটি দেশে একজন নিরীশ্বরবাদী বা নাস্তিক মানুষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে পারেননা? কেনো বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগে, আমেরিকায় ভূত-পেত্নীর চলচ্চিত্রের এতো কদর? এর উত্তর পাওয়া যাবে আমেরিকার সমাজ কাঠামোর মাঝেই। অর্থাৎ আমেরিকার সমাজ কাঠামো এই ধরণের বদ্ধ বিশ্বাসগুলোকে এখনও ধরে রেখেছে, এই সকল আদিম বিশ্বাস গুলো বহাল থাকার বাস্তব শর্ত এখনও বহাল রয়েছে সেই সমাজে। ইউরোপে বা আরো সুনির্দিষ্ট ভাবে স্ক্যান্ডিনেভিয়াতে এই বিশ্বাসগুলো এখন অপ্রাসঙ্গিক। কেনো? জ্ঞান বিজ্ঞানে ফিনল্যান্ড তো আমেরিকার তুলনায় একটা চিনে বাদামের কোয়ার মতনও নয়। তাহলে কেনো ফিনল্যান্ড আমেরিকার চাইতে অধিক ধর্ম নিরপেক্ষ? সত্যিকারের প্রগতিশীল সমাজ গড়ার সংগ্রামে এই আলোচনা গুলো জরুরী আর তার জন্যে দরকার প্রধান ধর্মগুলোর টেক্সট এর নিবিড় পাঠ এবং তার অসারতা তুলে ধরে ধর্ম ও ধার্মিক গোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করা। মানুষের বিবেচনাবোধের কাছে ধর্মের এই সকল স্থুল অমানবিক ও অর্থহীন টেক্সটকে তুলে ধরা। এই লেখাটি তার একটা ছোট্ট প্রয়াস।

 

ইসলাম মানে এখন আর শুধু কুরআন আর হাদিস নয়। বিশ্বব্যাপী ইসলামের যে “ইনডক্ট্রিনেশন”  তা কুরআন আর হাদিসের চাইতেও বহুগুন শক্তিশালী, জটিল এবং ভয়াবহ। কুরআন আদতে একটি অর্থহীন পুস্তক, অর্থহীন এই অর্থে যে এর কোনও অর্থগত পরম্পরা নেই। যেকোনো সুরা কিম্বা যেকোনো আয়াতই পড়ুন না কেনো, তা কেবলই কিছু কথিত “ইঙ্গিত” দেয়, এটা না দেয় কোনও সুস্পষ্ট দর্শন না কোনও গ্রহনযোগ্য যুক্তি। যে সকল যুক্তি দিয়ে থাকে তার বেশীরভাগই স্থুল ও শিশুতোষ। শুধু বিজ্ঞানের নিরীখে নয়, ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানের নিরীখেও সেই সকল যুক্তি দারুন শিশুতোষ। বিশ্বাসেরও এক ধরণের অর্থগত পরম্পরা দরকার হয়। মধ্যযুগের ইসলামী দার্শনিক ও পন্ডিতেরা এই সকল অর্থগত পরম্পরা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ইবনে সিনা ও আল-ফারাবী স্কুলের দারশনিকেরা প্রশ্ন তুলেছিলেন কেনো মানুষকে কেবল বেহেশতের লোভে কিম্বা দোজখের ভয়েই আধ্যাত্মিকতার চর্চা করতে হবে? কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী মানুষের সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বস্ত হয়ে ওঠার তার প্রতি আধ্যাত্মিক প্রেমে মগ্ন হয়ে ওঠার দুইটি কারণ – এক) বেহেশতের অপার সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য লাভ, যা সে এই দুনিয়ায় লাভ করতে পারেনা আর দুই)অবাধ্যতার ফল হিসাবে কবর থেকে শুরু হওয়া চরম শাস্তি বা দুর্ভোগের ভয়। ইসলামের বিশ্বাস কাঠামোর মধ্যেই অনেক দার্শনিক এই বিশয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং সেই একই বিশ্বাস কাঠামোর মাঝেই তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এই সকল প্রশ্ন ও তার উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা গুলোর মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য বা ট্র্যাডিশন যা কুরআন বা হাদিসের চাইতে পাঠ্য হিসাবে অনেক অগ্রসর এবং জটিল। কুরআনের অর্থহীনতা এখানেই। ধর্ম হিসাবে, দর্শন হিসাবে কিম্বা মানুষের জীবন বিধান হিসাবে কুরআনের টেক্সট এতোই অপ্রতুল যে আজকের আধুনিক ও জটিল মানব ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার জন্যে এটা কেবল ব্যর্থই নয়, খুবই হাস্যকর রকমের শিশুতোষ। আর সেজন্যেই কুরআনের এই সকল অর্থহীন বয়ানকে অর্থ দেবার জন্যে, এর টেক্সট কে ব্যাখ্যার ছুতোয় লক্ষ লক্ষ পাতার বিধান ও বয়ান লেখা হয়েছে। যার অধিকাংশই অচল, জড়, অপ্রাসঙ্গিক ও মানব সভ্যতার জন্যে শুধু বিপদজনকই নয়, সমাজ বিকাশের পথে বিরাট বাধাও বটে। এই বয়ানগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে ইসলামী আইন বা “ফেকাহ শাস্ত্র”। ইসলামী আইন বা ফেকাহ শাস্ত্র মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলে বোঝা  যায় ইসলামী দৃষ্টিতে সভ্যতা হচ্ছে “মুসলমানদের সভ্যতা”। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে মানব সমাজ মানে হচ্ছে “মুসলমান সমাজ”। ফেকাহ শাস্ত্রের হাজার হাজার পাতার বয়ান রচিত হয়েছে একটি কল্পিত সমাজের কথা ভেবে যেখানে মুসলমান ব্যতীত আর কেউ নেই। আরো সরাসরি করে বললে, মুসলিম এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বয়ান হচ্ছে ইসলামী ফেকাহ শাস্ত্র। সেখানে নেই ভিন্ন ধর্মের মানুষ, সেখানে নেই নারী, সেখানে নেই সমকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা।

বলা হয়ে থাকে ইসলামের অনুশাসন  কুরআন ও সুন্নাহ’র ভিত্তিতে গড়ে ওঠা। প্রথমত বলে নেয়া ভালো ইসলামী অনুশাসন বলতে আমরা যা বুঝি তা আসলে ইসলামের ইতিহাসের লক্ষ লক্ষ আলেম এর নিজস্ব মতামত বা অনুধাবন। কুরআন ও হাদিস পাঠের ব্যক্তিগত অনুধাবন তাঁরা লিখে গেছেন এবং এই সকল বিষয়ে ঐক্যমত্য হচ্ছে এক ধরণের বিরল বিষয়। ফেকাহ শাস্ত্র’র কোনও সমন্বিত সংকলন নেই, প্রায় প্রতিটি পুস্তকেই একটি বিধানকে ব্যাখ্যা করার জন্যে নানান মতামত (ইসলামী পরিভাষায় – “দলিল”) উপস্থাপন করা হয়ে থাকে এবং পরিশেষে কোন ব্যাখ্যাটি গ্রহনযোগ্য হবে তা নির্ভর করে ইসলামের সেই উপদলের ধর্মীয় নেতার উপরে। তাই এক অর্থে ফেকাহ শাস্ত্রের যেকোনো বিধানকে চ্যালেনজ করা যেতে পারে ইসলামী পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা দিয়েই। এযেনো বারোহাত কাঁকুড়ের তেরোহাত বিচির মতো, অর্থাৎ একটি বিধান কে তেরো রকমের করে ব্যাখ্যা দেয়ার মতো।

 

এই লেখাটিতে আমি ফেকাহ শাস্ত্রের ইতিহাস থেকে শুরু করে সমাজ জীবন এর উপযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবো, অবশ্যই ফেকাহ শাস্ত্রের পুস্তকগুলো থেকে অনেক অনেক বাস্তব উদাহরণ দিয়ে।

 

ফেকাহ শাস্ত্র’র ভূমিকা

“ফেকাহ” কিম্বা “ফিকহ” শব্দের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে জানা বা জ্ঞানলাভ করা। ইসলামের প্রথমদিকের চার প্রধান ঈমামের একজন ঈমাম শাফীঈ’র মতে শরিয়তের বিধিবিধান বিভিন্ন প্রামাণ্য উৎস থেকে পদ্ধতিগত ভাবে জানাই হচ্ছে “ফিকহ” (আশরাফুল হিদায়া, খন্ড – ০১, পৃষ্ঠাঃ ০৮)।

 

অর্থাৎ পার্থিব জীবন সম্পর্কের ইসলামের যে সকল বিধি বিধান তার সংকলন হচ্ছে এই ফেকাহ শাস্ত্র। ইসলামের একজন অন্যতম ঈমাম, শাফিঈ (রা.) ফিকহের সংজ্ঞায় উল্লেখ করেছেন – “শরীয়তের বিস্তারিত প্রমানাদি থেকে আমলী শরিয়তের বিধি বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়াকে বলা হয়ে থাকে ফিকহ”। ইসলামের অপর অন্যতম ঈমাম জনাব আবু হানিফা এ প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন, তিনি বলেন – “নফস ও আত্মার জন্যে যে সব বিষয় কল্যাণকর এবং যে সব বিষয় কল্যাণকর নয়, তা সহ নফস সম্পর্কে যথাযথ অবহিত হওয়াকে ফিকহ বলা হয়”। পরবর্তীতেতে “যখন গানের প্রতিটি শাখা আলাদা করে গড়ে ওঠে, তখন ইসলামের আকাইদ সম্পর্কিত গানের নাম হয় “ইলমূল কালাম”, আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে গানের নাম হয় “ইলমূল তাসাউফ” আর আমলী জীবনের সাথে সম্পর্কিত বিধি বিধানের নাম হয় “ইলমূল ফিকহ” (আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুল্লাহ – খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫ – ১৬)।

 

কুরআন হাদিসের সাথে “ফিকহ”র সম্পর্ক কি?

ফিকহ শাস্ত্র কি কুরআন হাদিসের বয়ান? নাকি কতিপয় মুসলিম পন্ডিতের ব্যক্তিগত বোঝাপড়া ও তাঁর বয়ান? এই বয়ান গুলোকে কি কুরআন ও হাদিসের প্রতিনিধিত্বশীল চিন্তা হিসাবে গ্রহন করা যাবে? এ প্রসঙ্গে আল হিদায়া’র প্রথম খন্ডে লেখা হয়েছে এভাবে –

“একথা সন্দেহাতীত ভাবে সত্য যে, ফিকহ কুরআন ও হাদিস থেকে ভিন্ন কিছু নয়; বরং কুরআন ও হাদিসের বিস্তারিত প্রমানাদি থেকে উদ্ভাবিত আমলী শরীয়তের বিধি-বিধানের নামই হচ্ছে ফিকহ। মাতা-পিতার সাথে সন্তানের যে সম্পর্ক, কুরআন – হাদিসের সাথেও ফিকহের সেই একই সম্পর্ক। কুরআন হাদিস হলো শরীয়তের মূল। আর ফিকহ হলো এর শাখা – প্রশাখা মাত্র। ইলাহী হিদায়াত ও নব্বী শরীয়তের বাস্তব রুপ হলো এই ফিকহ। ফিকহ হলো কুরআন ও হাদিসেরই বাস্তব ভিত্তিক ব্যাখ্যা। ফিকহ ব্যতীত কুরআন ও হাদিসের মর্ম উপলব্ধি করা এবং তা বাস্তবায়িত করা কোনও ভাবেই সম্ভব নয়”।

(আশরাফুল হিদায়া, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ০৮, অনুবাদ ও সম্পাদনায় মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ঢাকা – ১১০০)

ফেকাহ শাস্ত্র সম্পর্কিত পুস্তক গুলোতে অসংখ্য হাদিস ও উদাহরণ সহযোগে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কেনো ফেকাহ শাস্ত্র হচ্ছে ইসলামী জীবন যাপনের মূল পথ। কেনো ফেকাহ শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন হচ্ছে ইসলামী জীবনের প্রধান দায়িত্ব। যদিও ফেকাহ বিষয়ক পুস্তক গুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই বিষয়ে জ্ঞান অর্জন ব্যতীত মুমিন মুসলমানের পক্ষে পার্থিব জীবন চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু সৌভাগ্য কিম্বা দুর্ভাগ্য বশতই হোকনা কেনো বাংলাদেশের গ্রামে ও শহরের মুসলিম নাগরিকদের মাঝে ফেকাহ শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান খুবই সামান্য। বাংলাদেশে ব্যাপক ইসলামীকরণ ঘটলেও ইসলামের এই সকল শাস্ত্রীয় জ্ঞান সম্পর্কে মুসলিম নাগরিকেরা এখনও প্রায় অন্ধকারে। এই বিষয়ে চর্চা এখনও সীমিত রয়েছে ইসলামী আলেম ও কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের মাঝে।

 

এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে ইসলামের নবী মুহাম্মদের আমলে ফিকহ ছিলো এবং এর চর্চাও ছিলো কিন্তু সেই সময় ফিকহ শাস্ত্রের সংকলন আজকের মতো এই অবস্থায় ছিলোনা। মূলত সেই সময় যেহেতু ধর্মের সকল ব্যবহারিক প্রশ্নগুলো সরাসরি মুহাম্মদকে জিজ্ঞাসা করে নিয়ে পালন করা যেতো, তাই আজকের মতো এতো সুসঙ্ঘবদ্ধ অবস্থায় ছিলো না ফিকহ শাস্ত্র। ফিকাহ শাস্ত্রের সংকলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় মূলত ইসলামের নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর পর থেকে। ইসলামের নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর পর থেকে যখন ইসলাম ব্যাপক বিস্তার লাভ করতে শুরু করে তখন ইসলামের পক্ষে পার্থিব জীবনের নানান বিষয়ের সমাধান দেয়া সম্ভব হচ্ছিলোনা ইসলামের পক্ষে। ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে ইসলামের এই সকল বিধি বিধান সংকলন করা দরকার হয়ে পড়লো।

ইসলামের ইতিহাসে ও জীবনরীতিতে, ফিকহ বা ফেকাহ শাস্ত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কেমন? ফিকাহ শাস্ত্রের একাধিক পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী জীবনরীতিতে ফিকহ বা ফেকাহ শাস্ত্রের গুরুত্ব কুরআন ও সুন্নাহ’র পরেই। ফিকহ ছাড়া কোনও মুমিন মুসলমানের জীবন চলতে পারেনা, কেননা জীবনের কোন উপাদান বা কর্মটি হারাম আর কোনটি হালাল সেটাই হচ্ছে ফিকহ বা ফেকাহ শাস্ত্রের কেন্দ্রীয় বিষয়। অর্থাৎ মুমিন মুসলমানদের জীবন যাপনের ক্ষেত্রে “সহী” বা সঠিক পথ অবলম্বনের ক্ষেত্রে একটি প্রধান দিক নির্দেশক হচ্ছে ফিকহ।

আশরাফুল হিদায়া গ্রন্থের প্রথম খন্ডে বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে মুমিন মুসলমানদের জীবন ফিকহ এর গুরুত্বের কথা। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কুরআন এবং হাদিসের বিস্তারিত সংকলনের পরেও কেনো আলাদা করে মুমিনের জন্যে আরেকটি জীবন পদ্ধতির সংকলন দরকার হয়ে উঠলো? মোটের উপরে যে কারণ ব্যাখ্যাগুলো হাজির করা হয় সেসব এই রকমের –

 

১) কুরআন ও হাদিসে মূলনীতি বিবৃত হয়েছে কিন্তু প্রতিটি বিষয়ের বিধি-বিধান এতে নেই।

২) কুরআনের কোনও কোনো ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী আয়াতের নজির আছে এবং এই পরস্পরবিরোধী আয়াতগুলোর কোনও সমাধান করা সম্ভব হয়নি, অথচ এটা জরুরী।

৩) কখনও কখনও কুরআন ও হাদিস স্ববিরোধী অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়, সেই সকল পরিস্থিতির সমাধান করা।

৪) কখনও কখনও হাদিসের একাধিক বয়ানের মাঝে স্ববিরোধিতা দেখা দেয়, যার সুরাহা করার জন্যে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা দরকার হয়, ফিকহ সেই সকল পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারে।

 

মোটের উপরে একটা বিষয় বেশ স্পষ্ট তা হচ্ছে, সময় যত অগ্রসর হয়েছে, মানুষের জীবন তত জটিল হয়েছে, হাজারো নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে মানুষের মনে, হাজারো নতুন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে ধর্মকে ও ধর্মীয় নেতাদের। এই সকল প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যে কুরআন কিম্বা হাদিস যখন আর যথেষ্ট ছিলোনা বা কুরআন ও হাদিস যখন জীবন এই সকল জটিলতার উত্তর দিতে পারছিলোনা, তখনই ইসলামী পণ্ডিতদের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠে “ফিকহ” নামের এই শাস্ত্র। বলা যেতে পারে, এটা জীবনের পার্থিব চ্যালেঞ্জ কে মোকাবেলা করার জন্যে ইসলামী চিন্তকদের এক ধরণের চিন্তার সংকলন, যারা এরা দাবী করেন কুরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে সংকলিত বলে।

(চলবে)

 

রেফারেন্স

১. আশরাফুল হিদায়া, প্রথম খন্ড, অনুবাদ ও সম্পাদনায় মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ঢাকা – ১১০০০

 

 

Spread the love