আসানসোলের দাঙ্গায় নিজের সন্তান হারানো পিতা মাওলানা ইমদাদুল্লাহ রশিদী

পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে এক দুর্ভাগ্যজনক দাঙ্গা আবার নতুন করে আমাদেরকে চিনে নেবার সুযোগ করে দিয়ে গেলো। ঘটনাটি ইতিমধ্যেই সবাই জানেন। ভারতের হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং তার মাতৃ সংগঠন আর এস এস এর উদ্যোগে সারা ভারত জুড়ে “রাম নবমী” বা হিন্দুদের দেবতা রামের জন্মবার্ষিকী পালনের উৎসব আয়োজিত হয়। একটি সেকুলার দেশের রাষ্ট্রীয় সমর্থনে এই ভাবে রামনবমী পালনের বিষয়টি আপাতত পাশে সরিয়ে রেখে বরং আসানসোলের ঘটনাটিকেই উল্লেখ করি। সারা ভারত জুড়ে এই রামনবমী র‍্যালী বা শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী সমর্থকদের মাঝে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয় এবং কোনও কোনও মুসলিম প্রধান স্থানে শোভাযাত্রার অংশগ্রহনকারীদের সাথে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে উত্তেজনা তৈরী হয়েছে এবং কোনও কোনও স্থানে উত্তেজনা সংঘর্ষে পরিনত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে মোট চারজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।এদেরই একজন হচ্ছে আসানসোল রানিগঞ্জ নূরানী মসজিদের ঈমাম মাওলানা রাশিদী’র ছোট ছেলে সিবগাতুল্লাহ।

এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো ১৬ বছর বয়সী সিবগাতুল্লাহ।  দাঙ্গা শুরু হবার পর থেকে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলোনা। প্রায় তিন দিন পরে ২৮ শে মার্চ, তার লাশ পাওয়া যায়। অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাবে শারীরিক আঘাত দিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো সিবগাতুল্লাহ কে।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে আমরা দেখেছি এই ধরনের দাঙ্গার পরিনতি কি হতে পারে।কিন্তু সৌভাগ্যজনক ভাবে আসানসোলের এই পরিস্থিতি ভারতের পুরনো ইতিহাসকে অনুসরণ করেনি। মানুষের মনুষ্যত্ব জেগে উঠেছিলো সঠিক সময়ে, তাই কোনও ভয়ংকর দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েনি, সারা পশ্চিম বাংলা কিম্বা সারা ভারত জুড়ে। উইকিপেডিয়ার ইতিহাস বলছে, ভারতে হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠী পরস্পরের সাথে দাঙ্গায় জড়িয়েছে উনিশবার। অতি তুচ্ছ ঘটনার প্রেক্ষিতে হিন্দু-মুসলিম এই দুই জনগোষ্ঠী দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছে ইতিহাসে। আসানসোলের এই ঘটনাতেও এমনটা ঘটার সম্ভাবনা ছিলো যা এড়ানো গেছে। কোনও সন্দেহ নেই এই দাঙ্গা এড়ানোর ঘটনায় হিন্দু-মুসলিম দুই জনগোষ্ঠীরই ভূমিকা রয়েছে। এই ভয়াবহ বীভৎসতা এড়ানোর জন্যে ধর্ম নির্বিশেষে সকল আসানসোলবাসীকে সাধুবাদ জানাতে হবে।

আসানসোলে ধর্মীয় এই দুই গোষ্ঠীর মাঝে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানোর জন্যে একজন ব্যক্তি হিসাবে ঈমাম ঈমদাদুল্লাহ রাশিদীর ভুমিকার প্রশংসা করেছে সকল মহল। বিভিন্ন মিডিয়ায় তার ভুমিকার ভুয়সী প্রশংসা করে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। টেলিভিশনগুলো তাঁকে খুঁজে বের করেছে এবং তার বক্তব্য প্রচার করেছে। ভারতের প্রবল হিন্দুত্ববাদের উত্থানের সময়কালে একজন মুসলিম ঈমামকে নিয়ে মিডিয়ার এই ধরণের প্রচারনা অবাক করার মতো। ভারতের রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ তাঁকে রাষ্ট্রীয় পদক দেবারো দাবী জানিয়েছেন। তাই এটা আগ্রহ উদ্দীপক যে কি করেছিলেন এই মুসলিম ঈমাম তার সন্তানের হত্যাকান্ডের জবাবে, যার কারণে তাঁকে নিয়ে এমন হুলুস্থুল প্রচার হলো।

একথাতো বলার অপেক্ষা রাখেনা যে পৃথিবীতে সবচাইতে ভারী কোনও বোঝা থাকলে তা হচ্ছে পিতার কাঁধে সন্তানের লাশের কফিন। শোকের ভয়াবহতা বোঝানোর জন্যে এই উপমা দেয়া হয়ে থাকে তা আমরা সকলেই জানি। মাওলানারা রশিদী’র দুই ছেলে, বড় ছেলে পড়াশুনা করছেন ভারতের দেওবন্দে আর ছোট ছেলে সিবগাতুল্লাহ থাকতেন বাবা-মায়ের কাছে। বাবা-মায়ের হেফাজত থেকে ছেলেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে খুন করা হয়েছিলো। এই শোকের ভার আরো কতটা ভয়াবহ এটা সংবেদনশীল মানুষ মাত্রই বোঝেন। কিন্তু সেই শোকের ভার তাঁকে তার সামাজিক দায়িত্বের কথা ভুলিয়ে দেয়নি। তাইতো, সিবগাতুল্লাহ’র জানাজায় শামিল হওয়া বিশাল জনসমাবেশের ক্রোধকে সামনে রেখে তিনি বলছেন –

 

“আমার পুত্রকে আল্লাহ্‌ যতদিন হায়াত দিয়েছেন, ততদিন সে বেঁচেছে। আল্লাহ’র ইচ্ছায় তার মৃত্যু হয়েছে। তাঁকে যারা হত্যা করেছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তাদের বিচার করবেন। কিন্তু আমার সন্তানের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার অধিকার আপনাদের কারো নেই”।

 

মাওলানা রশিদী কি বুঝতে পেরেছিলেন এই ধরণের পরিস্থিতি থেকেই ভারতের অতীতে আরো উনিশবার দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছিলো পাশাপাশি বসবাস করা এই দুই ধর্মীয় জনগোষ্ঠী?তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় দাঙ্গায় কেবল নিরীহ মানুষেরই প্রাণ যায় আর লাভবান হয় রাজনীতি, ধর্মের রাজনীতি, লাশের রাজনীতি? হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কিম্বা হয়তোবা নয়, আমরা তা জানিনা। বুঝে কিম্বা না বুঝেই হোক, আমরা দেখেছি তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায়, দারুন দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করছেন –

 

 

“আমি সন্তানের বাবা, আমি আপনাদেরকে বলছি, আমার সন্তানের মৃত্যুর জন্যে একজনকেও আক্রমন করা চলবেনা। ইসলাম আমাদের কোনও নিরীহ মানুষের উপর আক্রমনের নির্দেশনা দেয়নি”।

 

 

পুত্রের জানাজায় হাজির হওয়া সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন –

 

“আমি তিরিশ বছর ধরে আপনাদের খেদমত করেছি, আপনারা আমাকে যদি ভালোবাসেন, তবে আসেন আসানসোলের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করি। আমরা প্রমান করে দেই আসানসোল অন্য শহরগুলোর থেকে আলাদা”।

 

শুধু পুত্রের জানাজায় নয়, তিনি মিডিয়ার কাছেও একই রকমের বক্তব্য দিয়েছেন। তার সাক্ষাৎকার প্রার্থী অনেককেই তিনি বলেছেন –

 

“আমি একজন পিতা, দাঙ্গায় আমি আমার সন্তান কে হারিয়েছি, আর কোনও পিতা যেনো তার পুত্রকে না হারায়”।

 

 

ভারতের নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষেরা ও বেশীরভাগ মিডিয়া মাওলানা ঈমদাদুল্লাহ’র এই ভুমিকার নিসংকোচ প্রশংসা করেছেন।তার বক্তৃতার মধ্য দিয়ে স্থানীয় মুসলিমদের প্রতিশোধস্পৃহা প্রশমিত হয়ে যায়। সকলেই শান্ত ভাবে জানাজার নামাজ শেষে আপন আপন ঘরে ফিরে যায়।

একজন পুত্রহারা পিতা তার বক্তৃতার মাধ্যমে সেদিন নিজ উদ্যোগে একটি শহরকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হাত  থেকে রক্ষা করেন। একটি বক্তৃতার মাধ্যমে একটি বিস্ফোরণের দাবানলের মুখ সেদিন তিনি একাই বন্ধ করে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু আসানসোল শহরকেই রক্ষা করেননি, আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে আমাদের চলমান অস্থির সময়ের গতিকে পরিবর্তন করে দেওয়ার। একই সাথে যেসকল সুযোগসন্ধানী দাঙ্গার মাধ্যমে নিজেদের সুবিধা আদায়ের প্রয়াস চালিয়েছিলো, এক বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি তাদের সকল প্রয়াসে জল ঢেলে দিয়েছেন।

একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ঈমাম ইমদাদুল্লাহ রশিদী’র সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন। তারা তাঁর মহানুভবতার প্রশংসা করেছেন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, ভারতবাসীকে ও আসানসোলবাসীকে একটা সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়ার জন্যে। কিন্তু সংহতি প্রকাশকারী মানুষের সংখ্যা যেমন উল্লেখযোগ্য তেমনি উল্লেখযোগ্য ছিলো ঈমাম রাশিদী’র এই অবস্থানের প্রতি সন্দেহ ও কুৎসামূলক প্রচারনা ছড়িয়ে দেয়ার মতো মানুষের সংখ্যাও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিচিত্র সব প্রচারনা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তার কয়েকটি নমুনা এখানে তুলে ধরছি –

প্রথম স্তরের প্রচারনা

প্রথম স্তরের প্রচারনায় হিন্দুত্ববাদী – আধা হিন্দুত্ববাদীদের একটা শক্ত পরিকল্পনা দেখা দেয় পুরো ঘটোনাটিকেই মিথ্যা বা সাজানো ও মিডিয়ার বাড়াবাড়ি বলে চালানোর। বেশ কয়েকজন মিলে একটি প্রচারনা তৈরী করেন, ঈমাম ইমদাদুল্লাহ রাশিদী’র নামের বানান নিয়ে। একেক পত্রিকায় একেক ধরণের নাম লেখা হয়েছে। এই অমিল কে পুঁজি করে অনেকেই বলতে থাকেন, আসল লোকটির নাম কি? শহুরে হিন্দুত্ববাদীদের একটা সংঘবদ্ধ দল, ভারতের নির্বাচনী ড্যাটাবেইস বা ভোটারলিস্ট থেকে গবেষণা করে দেখাতে চান যে এই নামে আসানসোল বা পশ্চিমবঙ্গ তো দূরের কথা সমগ্র ভারতেই কোনও ভোটার নেই। এদের কেউ কেউ আরেক কাঠি সরেস, তারা ঈমাম রাশিদী’র নামের বিভিন্ন অংশ দিয়েও খোঁজ করে দেখেছেন এবং উল্লেখ করেছেন “ইমাদুল্লাহ”, “ইমদাদুল্লাহ” কিম্বা “রাশিদী” এই ধরণের নামের অংশযুক্ত কোনও মানুষ ভারতের ভোটার তালিকায় নেই। সুতরাং এই যুক্তিতে তারা ঘোরতর সন্দেহ ছড়িয়ে দেন যে পুরো ঘটোনাটিই হতে পারে একটি বানোয়াট প্রচারনা। আর এর সাথে যুক্ত করেন বামপন্থী বা উদারনীতিবাদীদের মিডিয়া গুলোকে। হিন্দুত্ববাদীরা প্রচার করতে থাকে যে এই সকলি বামপন্থীদের “ন্যাকামী” আর “ইসলাম তোষণের” নজির। কিন্তু আমরা জানি পরের ইতিহাস এই সকল হিন্দুত্ববাদীদেরকে মিথ্যা প্রমান করেছে। এটা সত্যি যে হিন্দুত্ববাদীরা শুধু এই ধরণের প্রচারনাতেই থেমে থাকে না, তাঁদের রয়েছে প্রচারনার আরো নানান কৌশল। তাই এদেরই কেউ কেউ আরো ভিন্ন ধরণের প্রচারনায় মেতে ওঠেন।

দ্বিতীয় স্তরের প্রচারনা

দ্বিতীয় স্তরের প্রচারনা আসে ঘটনাটির প্রমান দাবী করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, একদল মানুষ বলতে থাকেন, আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগ, এখন ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল ফোন সকলের হাতে হাতে। এমন কি কেউ ছিলোনা সেই জানাজা নামাজে যিনি একটি ছবি তুলেছেন? কিম্বা যিনি সেই ঈমামের বক্তৃতার ভিডিও করেছেন? কেনো সংবাদপত্র গুলোও ঈমাম বা তার পরিবারের কারো কোনও ছবি ছাপছেন না? কেনো শুধু তার বক্তব্যই প্রচার করছে মিডিয়াগুলো? কি প্রমান আছে যে সেই ঈমাম সত্যিই এই ধরণের কথা বলেছেন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় এই সকল পোশাকী হিন্দুত্ববাদীরা প্রচার করার চেষ্টা করছিলেন যে, যেহেতু জানাজা নামাজের সময় বলা এই সকল কথাবার্তার কোনও ছবি নেই, ভিডিও নেই, সুতরাং এই সকল প্রচারনা কেবল মিডিয়ার মিথ্যা প্রচারনা হতে পারে। এসব কেবল মমতা ব্যানারজির মুসলিম তোষণ কিম্বা বামপন্থীদের “বামইস্লামিক” ভূমিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আমরা জানি, ইতিহাস এদেরকে মিথ্যা প্রমান করেছে। আমরা জানি, ঈমাম রাশিদী বাস্তবতই সেই সাহসী কাজটি করেছিলেন তার পুত্রের জানাজা নামাজে দাঁড়িয়ে, জানাজায় সমবেত হওয়া ক্রুদ্ধ মানুষ গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়রা এতেও দমে যাবার পাত্র নন। তারা বহাল শক্তি নিয়ে তাঁদের প্রচারনা জারি রেখেছিলেন, একের পর এক।

তৃতীয় স্তরের প্রচারনা

যখন ঈমাম রাশিদী’র ছবি প্রকাশিত হলো মূলধারার অডিও-ভিসুয়াল মিডিয়াতে, যখন তার সেই ভিডিও প্রকাশিত হলো তখনও হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারনায় যথেষ্ট জ্বালানী রয়ে গেছে। তখন তাঁরা এই ঈমামের নাগরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললো। প্রচার করা হলো, এই ঈমাম আসলে ভারতীয় নন, তিনি বাংলাদেশী কিম্বা রোহিঙ্গা। এখানে এসে পলাতক জীবন যাপন করছেন। তিনি যে ভারতীয় নন তার প্রমান হিসাবে হিন্দুত্ববাদীরা দাখিল করলেন ঈমাম রাশিদীর বক্তৃতাটি ছিলো উর্দুতে। অথচ এই সকল আধুনিক মানুষের জানাই নেই, বাংলাদেশের মুসলমানেরা উর্দুতে কথা বলেন না, কওমি আলেমরা উর্দুতে বয়ান করতে পারেন বটে কিন্তু তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা। আর রোহিঙ্গা মুসলিমদের মাতৃভাষা আরাকানী, সেটা আরো জটিল ও দুর্বোধ্য। বরং ভারতেরই মুসলমান জনগোষ্ঠীর একটা উলেখযোগ্য অংশ হিন্দি ও উর্দু উভয় ভাষাতেই কথা বলতে পারেন। ভারতের বহু হিন্দুও উর্দু ভাষাতে কথা বলতে পারেন। সুতরাং কেবল কোনও একজন মানুষ উর্দুতে কথা বলছেন বলেই তিনি অ-ভারতীয় হয়ে যান না, এই সাধারণ যুক্তিটিও এদের মাথায় আসেনি। কেননা, সাধারণ ভাবে যেহেতু “উর্দু” পাকিস্তানের ভাষা তাই খুব সহজেই হিন্দুত্ববাদীরা সেই জাতীয়তাবাদী ঘৃণাটিকে কাজে লাগিয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সবচাইতে কার্যকর “জুজু” হচ্ছে পাকিস্তান। যেকোনো বিষয়ে যদি প্রমান করা যায় কোনও মানুষের সাথে পাকিস্তানের যোগসাজস রয়েছে, তাহলে আর কোনও কিছুরই দরকার নেই। দলবেঁধে জনগনকে কাছে পাওয়া যায় সেই মানুষটির বিরুদ্ধে। তাই হিন্দুত্ববাদীদের চেষ্টা ছিলো “উর্দু” কে কেন্দ্র করে কোনওভাবে যদি “পাকিস্তানী” সন্দেহের আঙুলটি ঈমাম সাহেবের দিকে ইঙ্গিত করা যায়। কিন্তু না, তাঁদের এই প্রয়াসটিও ব্যর্থ হয় যখন ঈমাম রাশিদী তার সাক্ষাতকারে ব্যাখ্যা করেন যে তার জন্ম হয়েছে আসানসোলে, তার বাবাও ছিলেন আসানসোলের ঈমাম এবং তাঁরা প্রায় ১০০ বছর ধরে আসানসোলে বসবাস করছেন।

চতুর্থ স্তরের প্রচারনা

একের পর এক প্রচারনা কৌশল যখন ভেস্তে যাচ্ছিলো, তখন এপার বাংলা – ওপার বাংলা মিলে এক ধরণের প্রচারনা তৈরী করা হয়। এটা আবার হিন্দুত্তবাদী প্রচারনা নয়, এটা হচ্ছে নাস্তিক্যবাদী প্রচারনা। এটা অভিনব প্রচারনা। এরা মাওলানা রাশিদিকে প্রশংসা করে নেন প্রথমেই, তারপরেই প্রশ্ন করেন, আরো তো তিনজন হিন্দু মানুষ মারা গেলেন, তাঁদের নিয়ে কেনো কোনও মিডিয়া হইচই নেই? কেনো সেই সকল নিহত মানুষের পরিবারের সদস্যদের এই রকমের ভূমিকা রাখতে হয়না? পরোক্ষ ভাবে এরা বোঝাতে চান, হিন্দু ধর্ম খুব শান্তিময় ধর্ম, এটা ইসলামের মতো এতো হিংস্র নয়, তাই তিনজন হিন্দু নাগরিক মারা গেলেও তা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে কোনও প্রতিহিংসার জমায়েত হয়নি, সুতরাং, মাওলানা রাশিদী খুব ভালো কাজ করলেও, তার কাজের মধ্যে দিয়ে এটা প্রমান হয়না যে তার ধর্ম একটি বিধ্বংসী ধর্ম নয়, কেননা তার ধর্ম ইসলামে “খুনের বদলা খুন” এটাই নিয়ম।  কিন্তু এই সকল নাস্তিকেরা জানেন না, ভারতবর্ষে গুজরাত এর ইতিহাস এখনও দগদগে হয়ে আছে। এরা জানেন না এই ভারতেই শিখদের কতটা নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে। এরা জানেন না, বাবরী মসজিদ উদ্ধারের নামে কি ভয়াবহ হিন্দুত্তবাদী তান্ডব চলেছিলো একদা। সুতরাং মাওলানা রাশিদীর ভূমিকাকে তার ধর্মের বর্বরতা দিয়ে ম্লান করার এই চেষ্টাও সফল হয়নি। কেননা বিবেকবান মানুষেরা তাঁদের ইতিহাস জানেন।

শেষ কথা

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারনা করি। আব্রাহামিক ধর্মগুলোর একে অপরের প্রতি তীব্র ঘৃণা ঐতিহাসিক। খৃস্টানদের তীব্র ইহুদী ঘৃণার নজির আজও সারা ইউরোপকে কালিমালিপ্ত করে রেখেছে “হলোকাস্ট” নামের দুঃসহ স্মৃতি দিয়ে। ইসলামের গ্রন্থ কুরআনের প্রথম সুরা হচ্ছে সুরা ফাতিহা, যেখানে স্পষ্টতই ঘোষণা করা হয়েছে মুমিন মুসলমান ব্যতীত অন্যরা হচ্ছে পথভ্রষ্ট, অভিশপ্ত। আর আধুনিক কালের বিশ্বব্যাপী মুসলিম ঘৃণার বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইহুদী-খ্রিস্টিয় ঐক্যের কথাতো এখন আর গোপন কিছু নয়।

ইসলামে সারা দুনিয়ার অমুসলিম ও পৌত্তলিক মানুষদের প্রতি রয়েছে তীব্র ঘৃণার চর্চা। কুরআন ও হাদিস নামের বয়ানে, মুসলিম নন এমন মানুষমাত্রই অভিশপ্ত, পাপিষ্ঠ, পথভ্রষ্ট। কুরআনে ও হাদিসে কাফের ও মুনাফেকদের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। কেউ কেউ দাবী করেছেন ইসলামে খুনের বদলে খুন করাটাই হচ্ছে জায়েজ। কিন্তু জনাব রাশিদী কেনো তাহলে নিজের পুত্রের হত্যার বদলে আরো হত্যাকে উস্কে না দিয়ে বরং একেবারেই উল্টো বয়ান প্রচার করলেন? তাহলে কি মাওলানা রাশিদী’র ধর্ম ইসলাম নয়? কিম্বা তার ধর্মের বিধান হচ্ছে খুনের বদলে খুন, তিনি সেই ধর্মের বিধান কে অস্বীকার করেছেন। তিনি কি এখনও ইসলামে বিশ্বাসী? তিনি কি এখনও মুসলমান?

আসানসোলের মুসলমানেরা কি এখনও তাঁকে ঈমাম মানছেন? তাঁরা কি এখনও তার পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন?

ধরা যাক, ঈমাম রাশিদী তার ধর্মের বিধান মানেন নি, তিনি ধর্মচ্যুত হয়েছেন, কিন্তু তাহলে সেই হাজার দশেক মানুষের কি হবে? যারা ঈমামের কথায় নিজেরাও ধর্মের বিধান কে অস্বীকার করলেন?

এরা কেনো এমন টা করলেন?

এই প্রশ্নগুলো কোনও উত্তর আছে ? আমাদের দুই পারের মানুষদের কাছে? অপেক্ষায় থাকবো কেউ যদি কখনও এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার আয়োজন করেন।

 

Spread the love