এক 

মানুষের চিন্তার বিবর্তন হয়। বিবর্তন হয় বলেই সে মানুষ। মানুষ আজকে যা ভাবে, কালকে তা একই ভাবে হয়তো ভাবেন না, মনে করেন না, আর মানুষের চিন্তা শাখা প্রশাখা মেলে, বহু বিচিত্র ভাবে, পল্লবিত হয়ে ওঠে মানুষের চিন্তা, ভাবনার জগত। মানুষ আজকে যেভাবে ভাবেন কাল সেভাবে নাও ভাবতে পারেন।এই বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানুষ তার শুভ চিন্তাগুলোর পরম্পরা বহন করে চলেন। যাদের চিন্তার বিবর্তন হয়না, শাখা প্রশাখা মেলেনা, পত্র পুষ্পে পল্লবিত হয়ে ওঠেনা, তারা বুঝতেই পারেন না যে তারা আসলে জড় পাথরে পরিণত হয়েছেন নয়তো অবিকশিত প্রানীতে পরিণত হয়েছেন।মানুষের সকলের চিন্তার বিকাশ একই সময়ে একই ভাবে ঘটেনা এটা সত্য।আমার চাইতে অগ্রসর মানুষদের কাছ থেকে আমি শিখি একই ভাবে আমার পাশের মানুষকেও আমি আমার সাথে হাঁটার জন্যে আহবান জানাই, এটা খুবই স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রত্যাশা ও চর্চা। 

চিন্তার সক্ষমতার প্রসঙ্গে আমাদের দেশে কিছু আগ্রহউদ্দীপক স্টেরিওটাইপ আছে, কথিত আধুনিক ও প্রগতিশীল মানুষের হাতে তৈরি এই সকল স্টেরিওটাইপ। এই যে শব্দটা “স্টেরিওটাইপ” ব্যবহার করলাম, আমি সত্যিই খানিকটা ধন্দে ছিলাম, শব্দটা কি আমি ঠিক অর্থে ব্যবহার করছি, তাই আরেকবার চেক করে নিলাম। দেখুন স্টেরিওটাইপ শব্দটার অর্থ হচ্ছে – 

“a stereotype is an over-generalized belief about a particular category of people. It is an expectation that people might have about every person of a particular group.” 

স্টেরিওটাইপ হচ্ছে কিছু বর্গের বা গোত্রের মানুষ সম্পর্কে এক ধরনের অতি সাধারণীকৃত ধারনা। এই সকল স্টেরিওটাইপ নানান রকমের হতে পারে। অন্যান্য সকল সমাজের মতই আমাদের বাঙ্গালীদের মাঝে রয়েছে এইরকমের হাজার হাজার স্টেরিওটাইপ। বিভিন্ন মানুষ সম্পর্কে আমরা আমাদের এক ধরনের বোঝাপড়াকে সাধারণীকরণ করি তারপরে সেটাকেই জগতের নিয়ম বলে ভেবে আরাম বোধ করি।   আমাদের লাইফটাইমের একটা স্টেরিওটাইপ হচ্ছে প্রগতিশীলতা আর মুক্তচিন্তা। আমাদের দেশে একটু গান বাজনা আবৃত্তি করতে পারা মানুষদের আমরা মনে করতাম “প্রগতিশীল”, আমাদের কাছে কবি মানেই ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রগতিশীল, আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনীতির ধারক মানেই ছিল প্রগতিশীল। কিন্তু আশির দশক থেকে এই ধারনা ভাঙতে শুরু করলো কেননা এই সময় থেকে জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে সারা দেশে ইসলামী সঙ্গীতের দল গড়ে উঠতে লাগলো ব্যাঙের ছাতার মতন। আমরা যারা নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলতাম গান বাজনা করার সুবাদে, তারা কিন্তু জামাতে ইসলামীর সঙ্গীতের দলের সদস্যদের প্রগতিশীল বলতে নারাজ। ওরা প্রগতিশীল নয়, আমরা প্রগতিশীল এটা হচ্ছে এই স্টেরিওটাইপ। এই সময় আমরা দেখলাম গানের শিল্পীরা, সংস্কৃতিমনা মানুষেরা শাসকের আনুকূল্য পাবার জন্যে কেউ কেউ জয় বাংলা সাংস্কৃতিক জোটের দিকে গেলেন, কেউবা গেলেন জাসাস ধরনের সংগঠনের দিকে। আমরা দেখলাম কবিরা পুরস্কারের লোভে কিভাবে শাসকের দরবারে কাঙ্গালের মতন ধর্না দিতে পারেন। আমরা দেখলাম মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দাবীদার মানুষেরা কি করে একেকজন ফ্যাসিবাদী দানব হয়ে উঠলেন।  এখন নিশ্চয়ই আমরা কেবল গান – বাজনা – আবৃত্তি করা মানুষদের হরেদরে প্রগতিশীল বলিনা। কবি মানেই আমাদের কাছে এখন আর কেউ আবশ্যিক ভাবেই স্বাপ্নিক মানুষ নন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বলে দাবীদার বহু মানুষ এখন রীতিমত দাগী আসামীর চাইতে ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন। আমাদের কাছে প্রগতিশীলতার স্বরূপ বদলে গেছে, প্রগতিশীলতার সংজ্ঞা বদলে গেছে, প্রগতিশীল মানুষগুলো বদলে গেছেন। আমি আগে প্রগতিশীল বলে যে মানুষদের ভাবতাম এখন সেভাবে ভাবিনা। 

আমাদের লাইফটাইমের আরেকটা স্টেরিওটাইপ হচ্ছে “মুক্তচিন্তা” ও “মুক্তচিন্তক”। এটা গত এক বা দেড় দশকের উন্নয়ন। আমরা জেনেছি মুক্তচিন্তা হচ্ছে নাস্তিকতা এবং মুক্তচিন্তক হচ্ছেন যিনি নাস্তিক। অথবা উল্টো করে বলা যায় যিনি নাস্তিক নন, তিনি মুক্তচিন্তা করতে পারেন না, যিনি নাস্তিক নন তিনি মুক্তচিন্তক নন। এই স্টেরিওটাইপ এখনও বেশ শক্তিশালী ও বহাল। অথচ এই সংজ্ঞাতে যারা নিজেদেরকে “মুক্তচিন্তক” দাবী করেন তাদের দিকে যখন আমরা দেখি, যেকোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ বুঝতে পারবেন এই “মুক্তচিন্তা” ও “মুক্তচিন্তক” এর সংজ্ঞাটি কি ভয়ংকর রকমের ভুল ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়েছে। এটাকে অতি সাধারণীকরণ করা হয়েছে। অধ্যাপক আহমদ শরীফ নাস্তিক এবং বিপুল পাঠ করা মানুষ, আরজ মাতুব্বর বহু টাকা খরচ করে, শারীরিক পরিশ্রম কে মেনে নিয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসতেন কেবলমাত্র প্রিন্সিপাল সাইদুর রহমান বা তাঁর মত মানুষের কথা শোনার জন্যে, তাদের কাছ থেকে শেখার জন্যে, জমিজমা বিক্রি করে আরজ মাতুব্বর খরিদ করতেন বই। কিন্তু অধ্যাপক আহমদ শরীফ বা আরজ মাতুব্বর  এর নাস্তিকতাকে কি তাদের জ্ঞান তৃষ্ণার প্রসঙ্গে সাধারণীকরণ করতে পারি? পারিনা। অধ্যাপক শরিফ বা আরজ মাতুব্বর নাস্তিক বলেই জ্ঞানী ছিলেন তা নয়, বরং তাদের  তৃষ্ণা জ্ঞানের অন্বেষণ তাদেরকে প্রকৃতিবাদী করে তুলেছিল, নিরীশ্বরবাদী করে তুলেছিল। সেজন্যেই প্রবল নাস্তিক হয়েও অধ্যাপক আহমদ শরীফের হাত দিয়েই রচিত হয়েছে আমাদের এই উপমহাদেশের মুসলিম সাহিত্যের পাঠ, ইতিহাস। তার নাস্তিকতা ইসলামী ঐতিহ্য তাঁর গবেষণার পথে বাঁধা হয়ে দাড়ায়নি। নিয়ে  সুতরাং নাস্তিকতা ও জ্ঞান সবসময় হাতে হাত ধরে চলে এমনটা দাবী করা ভুল।  অন্তত আমরা যখন আজকের নয়া-নাস্তিক্যবাদী কথিত “মুক্তচিন্তক”দের চিন্তার কথা শুনি, যখন তাদের লেখা পড়ি, তাদের আলোচনা শুনি, তাদের বিতর্কের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি, তখন “মুক্তচিন্তা” আর “মুক্তচিন্তক” এই দুটি বিষয় নিয়ে ধন্দে পড়ে যাই। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে অভিজিৎ রায়ের মাধ্যমে যে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনটির সূচনা হয়েছিলো, তার দখল চলে গেছে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া “নয়া-নাস্তিক্যবাদী”দের হাতে। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াটা কোনও দোষের কিছু নয়, কেননা মানুষ উচ্চতর পাঠের দিকে যাওয়ার জন্যে কোনও কোনও সময় তো পঞ্চম শ্রেণীতে পড়তেই হবে। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণীতে কতবছর পড়তে হয়? মানুষের অতি সরলীকৃত বোঝাপড়া থেকে তো তার উত্তরণ ঘটে, যদি মানুষের চিন্তা পদ্ধতির, বোধের উত্তরণ না ঘটে তাকে আমি বলছি পঞ্চম শ্রেণীতে চৌদ্দ বছর ধরে পড়া। 

 

দুই 

আমি আমার ঈশ্বর বিশ্বাস হারিয়েছিলাম আমার হাই স্কুলে পড়ার সময়ে। তারপর থেকে আমার যে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে, তাতে ঈশ্বর বিশ্বাস থাকা বা না থাকাকে কখনওই জীবনের জন্যে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করিনি। করার কোনও কারণ দেখিনি।কিন্তু আমার এই অবস্থানে প্রথম ছেদ পড়ে ২০১৩ সালে।  আমার জন্যে সবচাইতে বড় শক ছিল রাজীব হায়দারের হত্যাকাণ্ড।যেভাবে এবং যে কারণে রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়েছিলো, আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের দেশে একটা বিরাট ও ভয়ংকর পরিবর্তন হয়ে গেছে যা আমরা অনেকেই টের পাইনি। আমি সেদিন থেকে প্রকাশ্যে আমার নাস্তিকতার কথা বলতে শুরু করেছি। খুব খোলামেলা ভাবে, খুব নগ্ন ভাবে ধর্ম নিয়ে আমি আলাপ করতে শুরু করি। তারপরে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের যে স্বরূপ আমি দেখতে শুরু করি সেটা আরও ভয়াবহ, ভয়ংকর কুৎসিত একটা প্রজন্ম গড়ে উঠেছে আমাদের দেশে, আমাদের চারপাশে যারা নিজেকে দাবী করেন ধার্মিক হিসাবে কিন্তু কথায়-বার্তায় – চাল – চলনে- সংস্কৃতিতে ভয়ংকর আদিমতায় আক্রান্ত। এদের বিরুদ্ধে কিভাবে ফাইট করা যায়? কিভাবে ফাইট করা উচিত? ঠিক এই চরম ঘৃণাবাদী ধার্মিকদের মতো করেই? নাকি ভিন্ন কোনও পথ খুঁজে বের করতে হবে আমাদের? রাজ্জাক বিন ইউসুফ যে ভাষায় কথা বলেন, আমারো কি সেই একই ভাষা ও পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত? রাজ্জাক বিন ইউসুফ যেভাবে দুনিয়াকে মুমিন আর কাফের এই দুই দলে ভাগ করেন আমারো কি সেভাবেই দুনিয়াকে নাস্তিক আর মুমিন এইভাবে ভাগ করা উচিত?  আমার কখনও মনে হয়েছে ঘৃণার বিপরীতে ঘৃনাই সবচাইতে উপযুক্ত অস্ত্র হতে পারে আবার পরক্ষনেই মনে হয়েছে…  না, ওটা ধর্মবাদীদের পথ হতে পারে, আমার নয়।ইসলামে নারীর অবস্থান নিয়ে আল গাজালী আর ইবনে রুশদ এর তুলনামূলক টেক্সট যখন পড়ি তখন আমি ধন্দে পড়ে যাই। আমি আমার সেই ধন্দকে লুকাতে পারিনা, এই ধন্দ আমাকে কেবলই বলে ইসলাম কিংবা পৃথিবীর কোনও ধর্মই আজ আর কেবল কোনও একজন নবী বা ধর্মগুরুর বানী হিসাবে নেই, সমাজের জটিলতার সাথে সাথে ধর্মও জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। এক কুরআনের উপরে ভিত্তি করে রচিত হয়েছে হাজার হাজার তাফসীর বা ব্যাখ্যা – বয়ান, সেই সকল বয়ান যতটা না মূল ধর্মগ্রন্থ দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে তার চাইতেও অনেক বেশী প্রভাবিত হয়েছে ব্যক্তিগত অনুধাবন, বিস্তারিত কার্যকারণবোধ বা ডিটেইল রিনোনিং বা ইসলামী আইনি পরিভাষায় যাকে বলে “ইজতিহাদ” দিয়ে। সেজন্যেই ইসলামে নারীর অবস্থান গাজ্জালীর চোখে যেভাবে ধরা পড়ে ইবনে রুশদ এর চোখে সেভাবে ধরা পড়েনা। সেজন্যে ইসলামে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও ভূমিকা আল-ফারাবী যেভাবে ব্যাখ্যা করেন আল-গাজ্জালী সেভাবে ব্যাখ্যা করেন না। ধর্ম এখন যে সৌধ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে সেটা যতনা ধর্মগ্রন্থ ভিত্তিক তার চাইতেও অনেক বেশী গত হাজার বছরের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির জটিলতার উপরে।  ধর্মকে তাই দেখতে হবে সমাজের জটিলতার সাথে সাথে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নয়।সমাজ কে সাথে নিয়ে ধর্মকে বোঝা ও ধর্মের সাথে বোঝাপড়ার সংগ্রাম কে সমাজের আরও অন্যান্য সংগ্রামের সাথে যুক্ত করার জন্যে যে চিন্তাগত প্রস্তুতির দরকার তার কতটুকু আমাদের আছে? 

 

রাজীব হায়দার মারা গেছেন ২০১৩ সালে। গত সাত বছরে আমার চিন্তায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে, নানান বিষয় আমি নানান ভাবে ভেবেছি, ভাবতে শিখেছি। ধর্ম, রাজনীতি কিংবা সমাজের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানান বিষয়ে আমি আর আগের মত করে প্রতিক্রিয়া জানাইনা। এর মানে এটা নয় যে আমি খুব ”ভদ্রস্থ” হয়ে গেছি। এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশের ইসলামী ওয়াজগুলো শুনে আমার ক্রোধ তৈরি হয়না, অবশ্যই হয়। এই ক্রোধ আমাকে সাত বছর আগে যেভাবে আক্রান্ত করতো এখনও সেভাবেই করে, কিন্তু বদল ঘটেছে আমার প্রতিক্রিয়ায়, বদল ঘটেছে আমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।ইসলাম যেরকমের ফ্যাসিবাদী চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে, হাজির হচ্ছে আমাদের দেশে প্রতিদিন সেটা আমাকে প্রতিদিনই প্রতিক্রিয়াবিদ্ধ করে, ক্রোধান্বিত করে। আমি প্রতিক্রিয়া দেখাই, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমার সেই ক্রোধের প্রকাশের ধরনে পরিবর্তন এসেছে।  আমি ক্রোধের প্রতিক্রিয়া দেখানোর সাথে সাথে আরও কিছু বিষয় ভাবতে চাই, আমি ভাবতে চাই ধর্মের সাথে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে, রাষ্ট্র কিভাবে এর মাঝে খেলা করে সেই বিষয় নিয়ে।আমি ভাবতে চাই, ঠিক কেনো মুফতি ইব্রাহীমের মতো মানুষেরা দিনের পর দিন ইসলামের নামে গাঁজাখুরি গল্পগুলো শোনাতে পারেন তার সামনে বসে থাকা সাধারণ মানুষদের আর আমাদের দেশের একাডেমিক ধর্মতাত্ত্বিক বন্ধুদের সমালোচনায় তিনি আসেন না। আমি বুঝতে চাই, কিভাবে অজস্র ওয়াজকারী আলেম দিনের পর দিন ক্রমাগত প্রবল ঘৃণাবাদী বক্তব্য দেয়ার পরেও রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেনা। বহু বহু কথিত “আলেম” যা বলেন তা কেবল কৌতুকময়ই নয়, বিপদজনক ও অন্য নাগরিকের অধিকার খর্ব করার মত। আমি এই সকল ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হই, প্রতিক্রিয়াবিদ্ধ হই। আমার টলারেন্স এর মাত্রা মাঝেমাঝেই আক্রান্ত হয়। কিন্তু এটা সত্য যে আমি আমার টলারেন্স এবং প্রকাশভঙ্গীকে নানান ভাবে প্রভাবিত হতে দেখেছি গত দশ বছরে। আমার এই পরিবর্তন কে আমি কেবলই পরিবর্তন হিসাবেই দেখি, আমি একে ভালো-মন্দ-উঁচু – নিচু – মহান – খল এই রকমের কোনও কিছুই ভাবিনা, আমি কেবল ভাবি, এবং স্বীকার করি আমার এই পরিবর্তনের কথা।

 

তিন 

কিন্তু আমি যখন আমার দেখা দ্বিতীয় স্টেরিওটাইপ নিয়ে আবারো ভাবতে চাই, তখন একটু নড়েচড়ে বসি। আমাদের “মুক্তচিন্তক”  নয়া-নাস্তিক্যবাদী তারকা বন্ধুরা আজো সেই একই যায়গায় রয়ে গেছেন। সাত বছর আগেও ধর্ম প্রসঙ্গে ওনাদের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল মুহাম্মদের যৌনতা আর দাসীর সাথে সেক্স করা, আজো তাদের প্রসঙ্গ সেই একই রকমের। ধর্মবাদীদের একাংশের কৌশল যেমন হিংসা, ঘৃণা আর বিদ্বেষ ঠিক তেমনি আমাদের এই বন্ধুদেরও পথ হচ্ছে হিংসা, ঘৃণা আর বিদ্বেষের। তাঁরা দশ বছর আগে যেভাবে নাস্তিকতা করতেন, আজো সেই একি রকমের পথে নাস্তিকতা করে চলেছেন। চট্টগ্রামের সেই উম্মাদ কওমি হুজুর যেভাবে প্রকাশ্য ওয়াজে ঘোষণা দেন তাঁর শরীরে এক ফোটা রক্ত থাকতে তিনি কাফেরদের হত্যার জিহাদ চালিয়ে যাবেন, এযুগে নাস্তিকেরাও ঘোষণা দেন তাঁর কল্লা কেটে ফেললে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়েই যাবেন। চট্টগ্রামের ওই উম্মাদ হুজুর যেমন বদলাননি তাঁর ইহজন্মে, আমার এই তারকা নাস্তিক বন্ধুরাও বদলাননি নিজেদের এই সময়ের মধ্যে। দুজনের অবস্থান বৃত্তের দুই প্রান্তে বটে কিন্তু কেনা জানেন বৃত্তের দুই চরম প্রান্ত আসলে একি বিন্দু …!

 

আমার কাছে,  মুহাম্মদ এক রাতে কতজন নারীর সাথে সেক্স করতেন তারচাইতেও অনেক সমকালীন প্রশ্ন হচ্ছে ইরানের যে নারীরা হিজাব পরা বা পরার স্বাধীনতা নিয়ে লড়াই করছে সেই প্রসঙ্গ। শ্রী কৃষ্ণের নারী প্রীতি নিয়ে হাসি ঠাট্টা তরল কৌতুক করার চাইতেও অনেক জরুরী প্রসঙ্গ হচ্ছে ভারতে কেবল নারী হয়ে জন্মানোর জন্যে প্রায় কয়েক কোটি নারী শিশুকে হত্যা করা হয়েছে হয় প্রসবের আগেই নয়তো প্রসবের পরপরই। তিনবেলা ভাত খেতে  না পাওয়া দরিদ্র মানুষেরাও ব্যবহার করছেন অত্যাধুনিক আল্ট্রাসাউন্ড টেকনোলজি শুধুমাত্র অনাগত সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় জানার জন্যে ও তাঁকে হত্যা করার জন্যে। পুকুরে, নদিতে, ট্র্যাশ বিনে পাওয়া যাচ্ছে সুগঠিত, আধা সুগঠিত নারী শিশুর মৃতদেহ আর আমরা শ্রীকৃষ্ণের নারীপ্রীতি নিয়ে তরল কৌতুক করাকে বলছি “মুক্তচিন্তা”। যে মাদ্রাসা তার শিক্ষকদের বেতন দিতে পারেনা, সেই মাদ্রাসার আয়োজনে প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিলে খরচ হয় পাঁচ কোটি টাকা, কোথা থেকে আসে এই টাকা? কারা দেয় এই টাকা? এখানে ধর্মের সাথে বাংলাদেশের কালো টাকার মালিকদের মৈত্রীর ভিত্তি কি? ধর্মের সাথে জড়িয়ে থাকা এই রকমের হাজার খানেক সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ তাই আমার কাছে জরুরী হয়ে ওঠে। ধর্মকে বিশ্লেষণের বেলায় এই সকল ভাবনাগত পরিবর্তন আমার মাঝে হয়েছে, অন্য সকলের মাঝে একই ভাবে পরিবর্তন হতে হবে তা নয়। আমার মাঝে এই পরিবর্তন হয়েছে, আমি তা গোপন করিনা। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই স্বীকার করি। 

 

চার 

আমি বদলেছি, আমরা অনেকেই বদলেছি। আমার বা আমাদের অনেকের এই বদলে যাওয়াকে আমাদের “মুক্তচিন্তক” বন্ধুরা কিভাবে দেখছেন?   এরা আমার কিংবা আমার মতো অনেকের দশ বছর আগের ফেসবুকে পোস্ট এর স্ক্রিনশট নিয়ে মানুষ কে দেখান, দেখেছো উনিও একসময় এই রকমেরই ছিলেন … অথচ আমাদের এই নাস্তিক বন্ধুরা এটা বলেন না যা উনি এক সময় এই রকমের ছিলেন কিন্তু বদলেছেন এবং সেই বদলটা কি হয়েছে সেটা বলেন না। সেই পরিবর্তনটা কেমন হয়েছে সেটা বলেন না। আমি যদি দশ বছর আগে একজন সেকুলার মানুষ থাকি তাহলে এখন কি আমি সেকুলার মানুষ থেকে গোড়া ধর্মবাদীতে পরিণত হয়েছি? নাকি আমার সেকুলার ভাবনা এখন মানুষকে বিভক্ত করার বদলে ঐক্যবদ্ধ করার স্বপ্ন দেখে?  আমি যদি দশ বছর আগে বর্ণবাদী বক্তব্য দিয়ে থাকি এবং এখন যদি আমি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকি সেটা কি মানুষ হিসাবে আমাকে উন্নত করেছে নাকি আরও নীচে নামিয়ে নিয়ে গেছে?  আমি যদি দশ বছর আগে কোনও অপরাধীর ফাঁসী চেয়ে থাকি আর এখন যদি আমি শাস্তি হিসাবে ফাঁসীর বিরোধিতা করি সেটাকি আমার মনুষ্য বোধের উন্নয়ন নাকি অবনমন?  আমি যদি দশ বছর আগে মুমিন আর মাদ্রাসা ছাত্র মানেই ”ছাগল” ভেবে থাকি  আর এখন যদি তা মনে না করি, সেটা কি আমার সদর্থক পরিবর্তন?  

 

পাঁচ 

পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, প্রতিদিন। শুধু যে টেকনোলজি বদলে যাচ্ছে তা নয়, মানুষ বদলে যাচ্ছে, প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে জলবায়ু। এই পরিবর্তন কে ধরতে প্যারাটা জরুরী। এই পরিবর্তনের মাঝে রয়েছে নানান জটিলতা ও বৈচিত্র্যময়টা। জটিলতা ও বৈচিত্রময়তাকে বোঝার জন্যে আমাদের প্রথাগত চিন্তাপদ্ধতি দিয়ে হবেনা, একেবারেই হবেনা। তা সে আপনি ধর্মবাদী হোন আর মারকুটে নাস্তিক হোন। 

পরিবর্তন বা বদলে যাওয়া বেশীরভাগ সময়ই সদর্থক … কিন্তু আমাদের বন্ধুদের অনেকেরই পরিবর্তন হয়নি, এই পরিবর্তন না হওয়াকে অনেকেই পরম গৌরবের বলে আলিঙ্গন করছেন। বন্ধু, আপনি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ছেন চৌদ্দ বছর ধরে, এটা কোনও গৌরবের কিছু নয়। পঞ্চম শ্রেণীর পরে ষষ্ঠ শ্রেণী আসে, তারপরে সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম … আরও পরে মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায় … আপনি যদি পঞ্চম শ্রেণীতেই চৌদ্দ বছর ধরে পড়ে থাকেন, আপনার জন্যে কষ্ট ছাড়া কি হবার আছে আমাদের? দশ বছরে যার চিন্তার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়না, যার ভাবনার প্রসঙ্গ বদলে যায়না, তিনি জানেন না যে তিনি পাথরে পরিণত হয়েছেন। আমাদের নয়া-নাস্তিক্যবাদী বন্ধুদের অনেকেই পাথরে পরিণত হয়েছে, এরা সেটা জানেন না। আপনাদের চারপাশের মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, তাঁরা যেন আপনাদেরকে গায়ে চিমটি কেটে মনে করিয়ে দিতে পারেন যে আপনি একদা মানুষ ছিলেন এখন জড় পদার্থে পরিণত হয়েছে। 

অন্ধ বিশ্বাস আর অন্ধ অবিশ্বাস আসলে প্রায় একই বিন্দু। বিশ্বাসের অন্ধত্ব যেমন বিপদজনক অবিশ্বাসের অন্ধত্বও প্রায় একই রকমের বিপদজনক। দুটিই আমাদেরকে ঘৃণার মাঝে ডুবিয়ে দেয়। অন্ধত্ব ঘুচে যাক আমাদের সবার। 

Spread the love