অরুন্ধতী রায় কে নিয়ে বাংলাদেশের জাতিয়তাবাদী, নারীবাদী, নয়ানাস্তিক্যবাদী ও নানান ঘরানার প্রগতিশীল মহলে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। ব্রিটেনের ওয়েস্ট মিনিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১ সালে দেয়া একটি বক্তৃতার সূত্র ধরে এই সমালোচনার সূত্রপাত।

যে সকল মহল এই সকল সমালোচনার ঝড় তুলছেন, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে অরুন্ধতী রায়ের সক্রিয়তাবাদীতা এঁদের ভালো লাগার কোনো কারণ নেই। কেননা এই বিভিন্ন গোত্রের বাঙ্গালীর  রাজনৈতিক বোঝাপড়াটা নয়া জমানার পুঁজিবাদী রাজনীতি- অর্থনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত, সেটা এমন আহামরি দোষের কিছু নয়,  কিন্তু অরুন্ধতী রায়ের প্রধান সংগ্রাম হচ্ছে এই নিও লিবারাল অর্থনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে।, সমস্যা টা সেখানেই।  অবশ্যই যেকোনো মানুষের অধিকার রয়েছে অরুন্ধতী রায় কিংবা যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সক্রিয়তাবাদীর মতামতের বিরোধিতা করার। এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। সেই অর্থে বাংলাদেশের জাতিয়তাবাদী, নয়া-নাস্তিক্যবাদী, জাতিয়তাবাদী নারীবাদী কিংবা যেকেউ অরুন্ধতী রায়ের বিরোধিতা করার অধিকার রাখেন এবং এই অধিকারটিকে আমাদের সবারই সংরক্ষন করা দরকার। কিন্তু কিভাবে, কেনো এবং কাদের সাথে মিলে এই বিরোধিতা করছেন সেটা খুব লক্ষণীয় একটি বিষয়। সেই বিশেষ দিকটি তুলে ধরার জন্যেই আজকের এই ব্লগের অবতারণা।  

 

মূল ঘটনা ও তার বাংলাদেশী ভার্শন 

মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রকাশিত “গালফ নিউজ” পত্রিকার অনলাইন সংস্করনে অরুন্ধতী রায়ের বক্তৃতা থেকে একটি বাক্য উদ্ধৃত  করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এভাবে – 

‘Pakistan army was never used against its own people’

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২৬ আগস্ট ২০১৯, সান্ধ্যকালিন সময়ে।  আগ্রহী পাঠকেরা উপরের লিংক এ ক্লিক করে আলোচিত প্রতিবেদনটি পড়ে দেখতে পারেন। এই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশ, ভারত সহ অন্যান্য দেশে ব্যাপক সমালোচনা – আলোচনার ঝড় ওঠে। আমার আলোচনাটি কেবল বাংলাদেশের আত্মদাবীকৃত প্রগতিশীলদের প্রতিক্রিয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখবো। তবে তার আগে, মূল ঘটনাটি উল্লেখ করছি।

ক্যানাডা প্রবাসী বিশিষ্ট মুসলিম বুদ্ধিজীবী তারেক ফাতাহ একটি টুইট করেন তার নিজের টুইটার একাউন্ট থেকে, সেখানে তিনি অরুন্ধতী রায়ের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি তার টুইট বার্তায় লিখেছেন –

“অরুন্ধতী রায় দাবী করেছেন যে পাকিস্তান তার  সামরিক বাহিনীকে কখনই তার নিজের জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেনি। সে কি অন্ধ ও বোবা ছিলো যখন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে তিরিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলো ১৯৭১ সালে? সে কি বালোচিস্তান সম্পর্কে অজ্ঞ? সে আক্ষরিক অর্থেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর প্রেসনোট পড়ে শোনাচ্ছে”।

মূলত তারেক ফাতাহ’র এই টুইট থেকেই সারা ভারত সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিষয়টিকে আরও রসিয়ে ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রচার করতে থাকে। যার এক পর্যায়ে বাংলাদেশের “জাতিয়তাবাদী”, “দেশপ্রেমিক প্রগতিশীল”, “জাতিয়তাবাদী নারীবাদী” আর “নয়া-নাস্তিক্যবাদী” সক্রিয়তাবাদীরা অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকেন।  আমি এই ব্লগে এই তারেক ফাতাহ বিষয়ে আলোচনা করবোনা, তার বিজেপি সংশ্লিষ্টতা পুরোনো এবং তাঁর বিষয়ে আমি আগ্রহীও নই। আমি আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া গুলোর উপরে। 

বাংলাদেশে অরুন্ধতী রায়কে নিয়ে প্রোপাগান্ডার শুরুটা হয়েছিলো কয়েকমাস আগে যখন বরেণ্য চিত্রগ্রাহক ও শিক্ষক শহিদুল আলমের আমন্ত্রনে অরুন্ধতী রায় এসেছিলেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার শহিদুল আলমকে যখন সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো, তখন আরও অনেক বরেণ্য আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবির সাথে অরুন্ধতী রায়ও শহিদুল আলমের মুক্তির দাবীতে বিবৃতি দিয়েছিলেন ও আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সাহায্য করেছিলেন। এই ঘটনায় অরুন্ধতী রায় বাংলাদেশ সরকার ও ক্ষমতাসিন দল আওয়ামীলীগের চক্ষুশূলে পরিনত হন। তারপর থেকেই আওয়ামীলীগের স্পনসরড একটি অনলাইন বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠী অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে প্রোপ্যাগান্ডা শুরু করে।     এই প্রচেস্টার অংশ হিসাবে, হাসান মুরশেদ নামের একজন আওয়ামীপন্থী লেখক ও মুজিব সৈনিক অরুন্ধতী রায়কে অভিযুক্ত করেছিলেন “জেনোসাইড অস্বীকারকারী” হিসাবে, অর্থাৎ অরুন্ধতী রায় নাকি বাংলাদেশের জনগনের উপরে করা পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর জেনোসাইডকে “অস্বীকার” বা “ডিনাই” করেন। এই আওয়ামী লেখক ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা অনলাইনে উঠে পড়ে লেগেছিলেন অরুন্ধতী রায়কে এই অভিযোগে অভিযুক্ত করতে যে অরুন্ধতী

আওয়ামী লেখক ও জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ হাসান মুরশেদ এর অরুন্ধতী রায় বিষয়ক প্রতিক্রিয়া (যা তিনি লিখেছেন অরুন্ধতী রায়ের বাংলাদেশ সফরের সময়ে)

রায় বাংলাদেশে পাকিস্তানী বাহিনীর করা জেনোসাইড কে “অস্বীকার” করেন। যদিও জেনোসাইড কে অস্বীকার করার খুব সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে, অন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত মানদন্ড আছে কখন কি কি কারণে কাউকে “জেনোসাইড অস্বীকারকারী” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, সেসব প্রশ্নে সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক মতামত রয়েছে । অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত হাসান মুরশেদ কিংবা তার মতো প্রোপানগান্ডাবিদেরা কখনই ঝেড়ে কাশতে পারেন নি। তারা দেখাতে পারেননি যে জেনোসাইড অস্বীকার করার কোন কোন শর্ত অরুন্ধতী রায় দেখিয়েছেন। তারা অরুন্ধতী রায়ের লেখা থেকে একটি লাইনও দেখাতে পারেননি কিভাবে তিনি বাংলাদেশের জেনোসাইডকে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সদলবলে কেবল প্রোপাগান্ডা চালিয়ে গেছেন।  আমরা এই বিষয়টি নিয়ে আরও বিশ্লেষণ করবো।  হাসান মুরশেদ সাম্প্রতিক সময়ের এই বিজেপি স্পনসরড প্রোপ্যাগান্ডাতেও শামিল হয়েছিলেন। 

ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের কাছে দারুন জনপ্রিয় আরেকজন নয়া-নাস্তিক্যবাদী যিনি সুষুপ্ত পাঠক ছদ্মনামে লেখালেখি করে থাকেন। তিনি হচ্ছেন স্থুলতার চুড়ান্ত, তিনি অরুন্ধতী রায় কে কখনও বেঈমান হিন্দু, কখনও মানসিক ভাবে মুসলমান, কখনও কমিউনিস্ট, কখনও আইএসআই এর পেইড এজেন্ট ইত্যাদি নানান তকমায় ভূষিত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “স্ট্যাটাস” এর বন্যা বইয়ে দিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “জনপ্রিয়” একজন নারীবাদী মুনমুন শারমিন শামস অরুন্ধতী রায় কে ইংরাজীতে অভিযুক্ত করেছেন এভাবে প্রশ্ন করে  “ is she blind or Insane?” অর্থাৎ তিনিও তারেক ফাতাহ’র মতোই অরুন্ধতীকে অন্ধ ও উন্মাদ বলে উল্লেখ করছেন।

আওয়ামী ব্লগার ও সরকারপন্থী নারীবাদী লেখক শাশ্বতী বিপ্লব লিখেছেন –

” প্রেম অন্ধ, আর পাকিপ্রেম জন্মান্ধ, বাংলাদেশের কথা বাদই দিলাম। অরুন্ধতী রায় কি বেলুচিস্তানের নাম জানে? পাকিপ্রেম একটা জিনিস মাইরী! গবেষণা কইরা এই প্রেমের জিনেটিক প্যাটার্ণ বাইর করা দরকার।”  

আওয়ামী লেখক ও সরকারী নারীবাদী লীনা পারভিনের প্রতিক্রিয়া

আরেকজন আওয়ামী লেখক ও সরকারী নারীবাদী হিসাবে পরিচিত লীনা পারভিন লিখেছেন – “অরুন্ধতী রায় শহীদুলের ভন্ধু না? তো সে পাকি কে সাদা বলবে না তো কাকে বলবে?”

অর্থাৎ তিনি শুধু অরুন্ধতী রায়কেই পাকিস্তানপন্থী হিসাবে উল্লেখ করছেন না, তার কারণ হিসাবে হাজির করছেন বাংলাদেশের বরেণ্য চিত্রগ্রাহক ও সাংবাদিক শহীদুল আলমের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের বিষয়টিকেও।

আসিফ মহিউদ্দিন নামের জার্মানী প্রবাসী বাংলা ভাষায় লেখালেখি করা একজন নয়ানাস্তিক্যবাদী উপরে উল্লেখিত সবার চাইতে আরেক কাঠি সরেস, তিনি গালফ নিউজের শিরোনামকে উদ্ধৃত করে অরুন্ধতী রায়কে অনেকগুলো সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন, তিনি ভারত সরকারের কাছে অরুন্ধতী রায়ের বিচার দাবী করেছেন এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবী করেছেন অরুন্ধতী রায় যেনো আর বাংলাদেশে ভ্রমন করতে না পারেন সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে। এই মুক্তচিন্তার সেনাপতি লিখেছেন এভাবে –

“বর্তমানে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের খুশি করতে উনার পাকিস্তানের গণহত্যার সাফাই গাওয়া আমার কাছে রীতিমত অপরাধ বলেই মনে হয়েছে। আমি বুঝলাম না, ভারতের সেনাবাহিনীর কাজের নিন্দা করার জন্য পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রশংসার প্রয়োজন কী! ইউরোপে বসে গণহত্যার পক্ষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ এরকম সাফাই গাইলে উনার এই অপরাধে জেল হয়ে যেতো। উনাকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হতো। উনি বলেছেন,

‘Pakistan army was never used against its own people’

বাঙলাদেশ থেকে বেলুচিস্তান, এরকম অসংখ্য জায়গায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যা ও নিপীড়ন ঐতিহাসিকভাবে সত্য। নারী ধর্ষণ এবং নিরীহ বেসামরিক জনগণকে হত্যার ক্ষেত্রে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মত দক্ষ এবং অভিজ্ঞ পৃথিবীতে সম্ভবত নাৎসী বাহিনী ছাড়া আর কেউ ছিল না৷ এরকম গণহত্যার ইতিহাস গোপন করার চেষ্টা নিঃসন্দেহে গণহত্যার সমর্থন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। আমি কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতার পক্ষে, সেখানে ভারতীয় আগ্রাসন এবং সেনাবাহিনীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে। তারপরেও, অরুন্ধতী রায়ের মত অসৎ এবং নির্লজ্জ হতে পারছি না। উনার বক্তব্য আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে। এরকম কথা পাকি জেনারেল ইয়াহিয়া খানও সম্ভবত বলতে লজ্জা পেয়ে যেতো৷

অরুন্ধতী রায়ের অত্যন্ত অশালীন এবং বিকৃত মন্তব্যের জন্য অবিলম্বে ক্ষমা প্রার্থণা করা উচিত। অন্যথায় ভারত সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি, অবিলম্বে বাঙলাদেশে গণহত্যা এবং বেলুচিস্তানে নির্মম নিধনযজ্ঞ চালানো পাকি সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাওয়া, ইতিহাস বিকৃত করা, পাকিস্তানী গণহত্যা নিয়ে মিথ্যা বলা, গোপন করার চেষ্টা, পরোক্ষভাবে সমর্থন দেয়ার অপরাধে তাকে বিচারের আওতায় নেয়া হোক। একইসাথে, বাঙলাদেশ সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি, অরুন্ধতী রায়ের এই ধরণের মন্তব্যের জন্য উনাকে বাঙলাদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হোক। উনার নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থণা করতে হবে, সেইসব নিহত মানুষের স্মৃতির প্রতি, যারা পাকি গণহত্যার শিকার হয়েছে। উনার ক্ষমা প্রার্থণা করতে হবে সেই সব নারীর কাছে, যারা দিনের পর দিন ধর্ষিত হয়েছে, এমনকি গলায় ফাঁস দেয়ার জন্য একটুকরো কাপড়ও যাদের দেয়া হয় নি। সেই সব সন্তানের কাছে, যারা পিতা মাতা হারিয়েছে। স্বজনদের হারিয়েছে। যাদের সবার লাশের ওপর অরুন্ধতী রায় হেঁটে যেতে পারেন না৷ তাদের রক্ত নিয়ে তামাশা করতে পারেন না। উনার সেই অধিকার নেই। 

কারণ গণহত্যার মত ভয়াবহ অপরাধ যারা করে, যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করে, যারা গোপন করে, এইসবই মানবতা বিরোধী এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত অপরাধ। আমি অবিলম্বে উনার কাছে কৈফিয়ত অথবা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থণা আশা করছি”।

আর সবশেষে বাংলাদেশের প্রখ্যাত নারীবাদী লেখক, বর্তমানে ভারতে বসবাস করা তসলিমা নাসরিন, অরুন্ধতী রায়ের কথিত “ক্ষমা” চাওয়া নিয়ে দারুন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভরা একটা স্ট্যাটাস পোস্ট করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অন্যান্যদের মতো তসলিমা নাসরিনও উল্লেখ করছেন যে অরুন্ধতী রায় পাকিস্তান আর্মির স্বপক্ষে “গীত” গাইছেন অর্থাৎ পাকিস্তানী আর্মির প্রশংসা করছেন ইত্যাদি অভিযোগ। তবে তসলিমা নাসরিনের প্রতিক্রিয়ার ভাষাটি ছিলো সবচাইতে কদর্য ও মানবিক মর্যাদার চরম লঙ্ঘন।   এই ব্লগটিতে তসলিমা নাসরিনের মন্তব্যটিতেও চোখ বোলানো যেতে পারে। 

অরুন্ধতী রায়ের বিবৃতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রখ্যাত নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের প্রতিক্রিয়া (তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতা থেকে নেয়া)

অরুন্ধতী রায় ভারতীয় নাগরিক এবং তাঁর সমগ্র কাজের, এক্টিভিজমের মূল বিষয় হচ্ছে ভারতের রাস্ট্র-হিন্দুত্ববাদ-কর্পোরেটতন্ত্র ও সামরিকায়ন বিষয়ে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অরুন্ধতীর কোনো বড় কাজ নেই, সেটা থাকার কোনো যৌক্তিক কারণও নেই, কেননা তাঁর মূল আগ্রহের বিষয় ভারত। কিন্তু তারপরেও বাংলাদেশের অনলাইন কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তি তাঁর বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছিলো কেনো? এই প্রশ্নের একটা পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ তুলে ধরছি এখানে।

 

পর্যালোচনা – এক

এই সকল উচ্চ শিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষগুলোর অরুন্ধতী সংক্রান্ত সমালোচনার একটা নিশ্চিত মিলের দিক হচ্ছে এরা কেউই অরুন্ধতির লেখালেখির সাথে খুব গভীর ভাবে পরিচিত নন, এরা কেউই অরুন্ধতী রায়ের ওয়েস্ট মিনিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া আলোচিত সেই বক্তৃতাটি শুনে দেখেন নি।  এরা কেউই খতিয়ে দেখেননি আসলেই অরুন্ধতী রায় কি বলেছিলেন সেই বক্তৃতাটিতে, কোন প্রেক্ষিতে এবং ঠিক কি যুক্তিতে বলেছিলেন। যেহেতু এরা কেউই অরুন্ধতী রায়ের বক্তৃতাটি শোনেননি এবং তাঁর লেখালেখির সাথে পরিচিত নন, তাই এরা জানেন না যে শুধু বাংলাদেশের উপরে হওয়া জেনোসাইড নয়, অরুন্ধতী রায় পৃথিবীর আরও নানান দেশে হওয়া জেনোসাইডের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন তাঁর বিভিন্ন লেখালেখিতে। এমন কি যে ভিডিওটিকে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করে এরা অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে জেনোসাইড অস্বীকারের অভিযোগ এনেছেন, সেই ভিডিওটিতেও অরুন্ধতী রায় বাংলাদেশের উপরে পাকিস্তানের করা “জেনোসাইড” এর কথা বলেছেন। কিন্তু তারেক ফাতাহ, তসলিমা নাসরিন, আওয়ামী লেখক বা তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গোরা যেহেতু বিজেপির সরবরাহ করা ভিডিও ক্লিপটি ব্যতীত আর কিছু দেখেন নি, পড়েন নি, তাই তারা তারস্বরে বিষোদগার করছেন অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে।  আমি একে একে সেসব হাজির করছি তবে শুরুতেই একটা সাধারণ বিষয় উল্লেখ করি –    

মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘গালফ নিউজ’ অরুন্ধতী রায়ের নামে যে বাক্যকে শিরোনাম করেছে সেটার সত্যনিষ্ঠা খুঁজে দেখি। লক্ষ্য করে দেখুন, এই বাক্যটিতে কোট আনকোট বা উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। লেখালেখির কিংবা সাংবাদিকতার সাধারণ নীতি যারা জানেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন কাউকে উদ্ধৃত করতে হলে তিনি যা বলেছেন বা লিখেছেন সেটাকে হুবুহু বা Exactly উল্লেখ করতে হয়, সম্ভব হলে প্রেক্ষিত সহ, দাড়ি – কমা – সেমিকোলন সহ উল্লেখ করতে হয়। গালফ নিউজ যেভাবে অরুন্ধতী রায়কে উদ্ধৃত করেছে সেটা এই রকমের –

‘Pakistan army was never used against its own people’

আমাদের বাংলাদেশের উল্লেখিত প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষেরাও এই বাক্যটিই হুবুহু ব্যবহার করেছেন তাঁদের সমালোচনায়। কিন্তু মূল বক্তৃতাটিতে অরুন্ধতী রায়ের কথার আগে পরের প্রেক্ষিত যদি বাদ দিয়েও বলি, গালফ নিউজের মতো করেই যদি উল্লেখ করি, তাহলে অরুন্ধতী রায় বলেছিলেন এভাবে –

 

the state of Pakistan has not deployed its own army against its own people in the way India, the democratic India has.” …

 

ইংরাজি ভাষায় সামান্য দখল আছে এমন যেকোনো মানুষই বুঝতে পারবেন অরুন্ধতী আসলে যা বলেছিলেন সেটা হচ্ছে “রাষ্ট্র পাকিস্তানও তাঁর নিজের জনগনের বিরুদ্ধে তার সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করেনি যেভাবে ভারত, গণতান্ত্রিক ভারত করেছে”

অরুন্ধতীর বাক্যটির শেষাংশকে সুকৌশলে বাদ দিয়ে, তার বাক্যের অংশকে উদ্ধৃত করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো তাঁর মূল কথাকে পাকিস্তানপন্থী একটা বিবৃতি হিসাবে হাজির করা, অথচ অরুন্ধতী বলেছেন যে ভারত “যেভাবে” তার সেনাবাহিনীকে তার নিজের জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, পাকিস্তান “সেভাবে” করেনি। এবং সমগ্র বক্তৃতাটিতে অরুন্ধতী রায় ব্যাখ্যা করেছেন ভারত “কিভাবে” তার সেনাবাহিনীকে তার নিজের জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু গালফ নিউজের রিপোর্টটিতে এসবের কিছুই উল্লেখিত হয়নি, কেননা রিপোর্টটির উদ্দেশ্য ছিলো অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী মব কে উসকে দেয়া, অরুন্ধতীর বয়ান কে চ্যালেঞ্জ করা নয়। আর আমাদের দেশের কথিত বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষেরা গালফ নিউজের এই “ফেইক” রিপোর্টটির উপরে ভর করে চিলের পেছনে ছুটেছেন হারানো কান উদ্ধারের জন্যে।

বাংলাদেশের পত্রিকা ঢাকা ট্রিবিউন আরেক কাঠি সরেস, এরা তাদের করা প্রতিবেদনটির শিরোনামও বদলে দেয়। প্রথম শিরোনামটি ছিলো “Arundhati: Pakistan never used its army against its people” কিছু সময় পরে তারা প্রতিবেদনটির শিরোনাম পালটে দিয়ে করে “Pakistan did not use army against its people, like India did” – বিস্ময়কর হলেও দেখা যাচ্ছে দুটি শিরোনামই অরুন্ধতীর মূল কথাকে সরাসরি উদ্ধৃত করা হয়নি, টুইস্টেড বা বিকৃত করে উদ্ধৃত করা হয়েছে। কেনো? এটা কি সাংবাদিকতার নৈতিকাকে অনুসরন করে? ঢাকা ট্রিবিউন কেনই বা বিকৃত শিরোনাম দিলো আর কেনইবা আবার সেটাকে পরিবর্তন করলো?

বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত পত্রিকা Dhaka Tribune পালটে দেয়া শিরোনামের সংবাদটি।

গালফ নিউজ বা ঢাকা ট্রিবিউন সহ প্রায় প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম অরুন্ধতীর বক্তব্যকে বিকৃত করে প্রকাশ করেছে, বিকৃতির মাত্রাটি এতোটাই কৌশলী যে তা দিয়ে তাঁর কথার অর্থ তো বদলে দেয়াই যায়, উপরন্ত এই কথার বিনিময়ে একটা রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি করা যায়। ঢাকা ট্রিবিউন কি তাহলে বাংলাদেশে বিজেপি’র এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে? উদ্দেশ্যটি কি ছিলো?

এর কারণ হচ্ছে এদের কারোরই সময় হয়নি অরুন্ধতী রায়ের মূল বক্তৃতাটি শোনার। এঁদের কারোরই সময় হয়নি, আগ্রহ হয়নি, অনুসন্ধিৎসা জাগেনি অরুন্ধতী রায়ের মূল বক্তৃতাটি খোঁজ করে দেখার, শুনে দেখার। কেননা, এটা প্রায় নিশ্চিত, অরুন্ধতী রায়ের মূল বক্তৃতাটির খানিকটা অংশ শুনে থাকলেও যেকোনো সৎ মানবতাবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ ভারতের হিন্দুত্তবাদীদের এই বৈশ্বিক প্রোপাগান্ডায় শামিল হতেন না। এখানেই প্রোপাগান্ডার যাদুকরী সাফল্য। কেননা, মানুষ প্রোপাগান্ডার বিপরীতে কখনই সুস্থ চিন্তাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেন না। মানুষ প্রোপাগান্ডার সাথে গা ভাসাতে ভালোবাসেন। নইলে এক ঘন্টা সাতচল্লিশ মিনিটের একটি আলোচনা থেকে দেড় মিনিটের যে ক্লিপটি ভারতীয় জনতা পার্টির মিডিয়া সেল সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে দিয়েছে, সেটার সাথে গা ভাসানোর আগে অন্তত মিনিট দশেক শোনা যেতে পারতো অরুন্ধতী রায়ের আলোচনা টি। তারেক ফাতাহ কিংবা উপরে উল্লেখিত বাংলাদেশী কথিত “প্রগতিশীল” মানুষের কেউই অরুন্ধতী রায়ের মূল বক্তৃতাটি শোনেন নি। তাই এঁদের বিচারের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে বিজেপি’র সরবরাহ করা ভিডিও ক্লিপ, যা তৈরী করা হয়েছে অরুন্ধতী রায়কে গনরোষের মাঝে নিক্ষেপ করে গ্রেফতার করার এক সহজ পরিস্থিতি তৈরী করার জন্যে। তারেক ফাতাহ এবং বাংলাদেশী এই ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ এখানে বিজেপি’র সহযাত্রী মাত্র। হয়তো সচেতন ভাবেই, কিংবা অসচেতন ভাবে এরা বিজেপি’র সাথে একই নৌকার যাত্রী হয়েছেন, যেখানে অরুন্ধতী রায়ের মতো একজন যুগ পরীক্ষিত মানবতাবাদী মানুষ কেবল এঁদের শিকারে পরিনত হয়েছেন। বিস্তারিত বিশ্লেষণে যাওয়ার আগেই আসুন অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো দেখে নেই –

 

  • অরুন্ধতী রায় পাকিস্তান আর্মির প্রশংসা করেছেন ও ভারতীয় আর্মির সমালোচনা করেছেন।
  • অরুন্ধতী রায় পাকিস্তান আর্মিকে সারটিফিকেইট দিচ্ছেন
  • অরুন্ধতী রায় বাংলাদেশের উপরে করা জেনোসাইডকে অস্বীকার করেছেন
  • অরুন্ধতী রায় “জেনোসাইড ডিনায়াল” এর মতো অপরাধ করেছেন
  • অরুন্ধতী রায় অশালীন, নির্লজ্জ ভাবে সত্যকে গোপন করেছেন (বাংলাদেশের ১৯৭১ এর জেনোসাইড বিষয়ে)

 

আসুন এবারে প্রথমেই অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে করা এই সকল অভিযোগগুলো একটু খতিয়ে দেখা যাক।

 

পর্যালোচনা – ২

পুরো আলোচনার ঘটনাটি আট বছরের পুরোনো।  ওয়েস্ট মিনিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১ সালের জুলাই মাসে একটা আলোচনা-সভায় অরুন্ধতি অংশ নিয়েছিলেন। অধ্যাপক দিব্যেশ আনন্দের সঞ্চালনায় হওয়া সেই আলোচনার আলোচনার শিরোনাম ছিলো ” গণতন্ত্র ও ভিন্নমতের চর্চা: চীন ও ভারত”। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওয়েস্ট মিনিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক দিব্যেশ আনন্দ নিজেও একজন ভারতীয়। আলোচনার একেবারেই গোড়াতে, ভুমিকা অংশে দিব্যেশ আনন্দর মুখে প্রথম যে বাক্যটা শোনা যায় তা হল ” এই আলোচনাটা খুবই ইনফর্মাল হবে।” একটা বিশুদ্ধ বিদ্যায়তনিক পরিবেশে যেভাবে ইনফরমাল আলোচনা  হয়ে থাকে, সেভাবেই আলোচনাটি হয়েছে। ইনফরমাল কিন্তু গভীর, ইনফরমাল কিন্তু মানবতার প্রশ্নে দারুন সংবেদনশীলতা ছিলো সেই আলোচনায়।

সমগ্র আলোচনার মূল বিষয় ছিলো গনতন্ত্র, ভারত ও চীনের প্রেক্ষিত। সেখানে খুব স্বাভাবিক ভাবেই আলোচনার একটা বড় অংশ আবর্তিত হয়েছে ভারতকে কেন্দ্র করে এবং একেবারে গোড়াতেই অরুন্ধতী ভারত ও চীন কে সংজ্ঞায়িত করেছেন “গণতান্ত্রিক ভারত” ও “একনায়কতান্ত্রিক চীন” হিসাবে। তিনি উল্লেখ করেছেন চীন, কমিউনিস্ট শাসিত দেশ যেখানে গনতন্ত্রের চর্চা নেই, বাক স্বাধীনতা নেই, কিন্তু গণতান্ত্রিক ভারত, কেমন গণতান্ত্রিক সেই প্রশ্নটাই তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তার পরে। এই যে তথাকথিত “গণতান্ত্রিক ভারত” সেটা যে কি ভয়ংকর একটা মিথ্যা ও মীথ সেটাই নানান তথ্য উপাত্ত দিয়ে অরুন্ধতী ব্যাখ্যা করেছেন সমগ্র আলোচনাটিতে।  যে অংশটুকু নিয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রোপাগান্ডার শুরু সেখানে আসলে অরুন্ধতী রায় কি বলেছিলেন? ওনার বক্তৃতা থেকে সরাসরি ইংরাজি অনুলিখন তুলে দিচ্ছি এখানে –

প্রথমেই অরুন্ধতী তার প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করতে শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে, ঠিক ৯ঃ৫৫ মিনিট থেকে তিনি ইনফরমাল আলোচনা শুরু করেন। আসুন দেখি তিনি কি বলেছিলেন এবং কি প্রসঙ্গে বলেছিলেন (যেহেতু আলোচনা টি ইনফরমাল ছিলো, প্রথাগত ব্যকরন ও যতি চিহ্নের ব্যবহার ছিলো মুক্ত ধরণের, তাই ইংরেজীটিকে পড়তে হবে ইনফরমাল ভাবেই) –

 

So when I am speaking of a place like India, where we will come to the fact that, I mean the war that was fought  in Kashmir and Manipur and Nagaland and Mizoram, in fact the Indian state from the moment it became sovereign nation, from the moment it shook off the shackles  of colonialism, it became a colonial state and it has waged war, since 1947 in Kashmir, Manipur, Nagaland, Mizoram, Telengana, Punjab, Kashmir, Goa, Hydrabad, if you look at it, its like a state that has been perpetually at war and a military war and deploying the army against its own people, the state of Pakistan has not deployed its own army against its own people in the way India, the democratic India has. And if you look at who are these people that Indian state had chose to fight, in all the north eastern states they were tribal people, in Kashmir it was Muslims, in Telengana it was the tribal people, in Hy derabad its Muslims, in Goa it’s the Christian and in Punjab it’s the Shikhs, so you see this sort of upper cast Hindu state perpetually at war  ……

 

পাঠকের সুবিধার্থে সহজ করে অনুবাদ করে দিচ্ছি এইখানেঃ

 

“আমি যখন ভারত প্রসঙ্গে কথা বলি, এখানে যে বাস্তবতায় আমাদেরকে যেতে হবে, অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি যে যুদ্ধগুলো হয়েছে কাশ্মীরে, মনিপুরে, নাগাল্যান্ডে, মিজোরামে, বাস্তবত ভারত রাষ্ট্র যেদিন থেকে স্বাধীন জাতিতে পরিনত হয়েছিলো, যে মুহূর্ত থেকে সে তার নিজের হাত থেকে ঔপনিবেশিকতার শিকল ছিড়ে ফেলে দিয়েছিলো, (সে মুহূর্ত থেকে) সে নিজেই একটি উপনিবেশিক রাষ্ট্র হিসাবে দাঁড়িয়ে যায়, এবং সে যুদ্ধ শুরু করে সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই, কাশ্মিরে, মনিপুরে, নাগাল্যান্ডে, মিজোরাম, তেলেঙ্গানা, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, গোয়া, হায়দরাবাদ এবং আপনি যদি খেয়াল করে দেখেন মনে হবে রাষ্ট্র যেনো অনন্তকাল ধরে যুদ্ধ জারি রেখেছে, হ্যাঁ রীতিমত সামরিক যুদ্ধ জারি রেখেছে, সেনা মোতায়েন করেছে তার নিজের জনগনের বিরুদ্ধে, এমন কি রাষ্ট্র পাকিস্তান এভাবে তার সামরিক বাহিনীকে তার জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেনি যেভাবে ভারত, গণতান্ত্রিক ভারত ব্যবহার করেছে।  এবং আপনি যদি দেখেন কারা এই সেই মানুষেরা যাঁদের বিরুদ্ধে ভারত রাষ্ট্র এই যুদ্ধ জারি রেখেছে, সমস্ত উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে এই যুদ্ধ আদিবাসী মানুষদের বিরুদ্ধে, কাশ্মীরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে, তেলেঙ্গানায় আদিবাসীদের বিরুদ্ধে, হায়দরাবাদে মুসলিমদের বিরুদ্ধে, গোয়াতে খ্রিস্টান সম্প্রদায় আর পাঞ্জাবে শিখদের বিরুদ্ধে, আপনি দেখতে পাচ্ছেন, এই অভিজাত হিন্দু রাষ্ট্র অনন্তকাল ধরে যুদ্ধ জারি রেখেছে এভাবে … “

 

 

উপরের এই ইংরাজি ও তার তরজমা অংশটুকু পাঠ করে বলুন তো –

১ –  ঠিক কোন বাক্যে অরুন্ধতী রায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর “প্রশংসা” করেছেন?

২ – কোন বাক্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বদনাম করা হয়েছে? 

৩ – এই প্যারাগ্রাফের ঠিক কোথায় বলা হয়েছে যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের নিজ জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়না?

৪ – এখানে কোথায় বলা হয়েছে যে পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশের উপরে ১৯৭১ সালে গনহত্যা চালায়নি?

৫ – এখানে কোথায় বলা হয়েছে যে পাকিস্তানী সেনবাহিনী বালুচিস্তানে নিপীড়ন – হত্যাকান্ড চালায়নি?  

কিংবা আরও মৌলিক প্রশ্ন করা যায় এই অংশের বোঝাপড়া নিয়ে,  এখানে কি আদৌ দুই দেশের সেনাবাহিনীর তুলনা করা হয়েছে? নাকি দুটি রাষ্ট্র তাদের সেনাবাহিনীকে কিভাবে ব্যবহার করেছে সেই তুলনা করা হয়েছে? এখানে “কিভাবে” এই শব্দটির গুরুত্ব কেমন? ভারত যেভাবে তাদের সেনাবাহিনীকে নিজ জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে পাকিস্তান সেভাবে ব্যবহার করেনি। এই বাক্যটিতে “যেভাবে”“সেভাবে” এই শব্দ দুটির গুরুত্ব বা ভুমিকা কি? এই বাক্যটিতে কি প্রমানিত হয় যে পাকিস্তান রাষ্ট্র বাংলাদেশের উপরে কোনো জেনোসাইড করেনি?  বরং এই বাক্যটিতে এটাই বোঝানো হয়েছে যে দুটি রাষ্ট্রই তার সেনাবাহিনীকে নিজ জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, কিন্তু ভারত যেভাবে ব্যবহার করেছে পাকিস্তান সেভাবে ব্যবহার করেনি।

তাহলে প্রশ্ন হতে পারে ভারত কিভাবে তার সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছে তার নিজের জনগনের বিরুদ্ধে যা পাকিস্তান করেনি? অরুন্ধতী রায় তাঁর উল্লেখিত বক্তৃতায় তো বটেই, তাঁর অনেক লেখালেখিতে খুব বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে ভারত রাষ্ট্র দেশী-বিদেশী করপোরেইট স্বার্থকে রক্ষা করার জন্যে, নিশ্চিত করার জন্যে ভারতের সেনাবাহিনীকে তার নিজের জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। অরুন্ধতী উল্লেখ করেছেন ভারত রাষ্ট্র কিভাবে উচ্চ বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য সকল জনগোষ্ঠীর উপরে দমন নিপীড়ন চালিয়েছে সেই স্বাধীনতার পর থেকেই। এই সকল দমন নিপীড়নে ভারত রাষ্ট্রের প্রধান হাতিয়ার ছিলো ভারতের সেনাবাহিনী। কিন্তু অরুন্ধতীর বক্তৃতার মূল পয়েন্টটি ছিলো নব্বুই দশকের গোড়া থেকে ভারতের রাজনীতিতে দুটি নতুন প্রপঞ্চ হাজির হওয়া ও তার ফলাফল বিষয়ে, আসুন দেখি সেই দুটি বিষয়  –

১ – ভারত বিশ্ব পুঁজিবাদী বাজারে নিজেদের দুয়ার খুলে দেয়, যা বিশাল ভারতকে বিশ্ব পুঁজিবাদের জন্যে এক আকর্ষণীয়  বাজারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির করে  

২ – ভারত বাবরি মসজিদের শত বছরের পুরোনো দরোজা খুলে দেয় যা ভারতকে তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়, যা মূলত গণতান্ত্রিক ও সেকুলার ভারতকে ক্রমশই একটি হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথ করে দেয়

মূলত এই দুটি প্রপঞ্চকে অরুন্ধতী রায় উল্লেখ করেছেন কেননা, এই দুটি প্রপঞ্চের উপরে ভর করেই ভারত রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাচ্ছে এখনো এবং এই কাজে তার প্রথম বিশ্বস্ত পার্টনার হচ্ছে ভারতের সেনাবাহিনী।

অরুন্ধতী রায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে ভারত সারা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত আদিবাসী – পাহাড়ী অঞ্চলের খনিজ সম্পদকে দেশী ও বিদেশী করপোরেশনগুলোর হাতে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। যেহেতু খনিজ সম্পদের সঞ্চয়ের একটা বিরাট অংশ রয়েছে পাহাড়ে, যেখানে আদিবাসী জনগনের বসবাস, তাই সেই ভুমির দখল নেয়ার জন্যে আদিবাসীদের সেখান থেকে উচ্ছেদের কোনো বিকল্প নেই। করপোরেশনগুলোর পক্ষে খনিজ সম্পদের দখল নেয়ার ক্ষেত্রে এই সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সেনাবাহিনীকে। কখনও সেনাবাহিনী সরাসরি নিজেরাই এই দায়িত্ব পালন করেছে, কখনও বা সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা হয়েছে স্থানীয় মিলিশিয়া বা প্যারামিলিশিয়া বাহিনী, যাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আদিবাসী জনগনকে তাঁদের বহু বছরের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা। মাইলের পর মাইল পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে করপোরেশনগুলোকে বক্সাইটের দখল বুঝিয়ে দেয়ার জন্যে। ভারতের সকল আদিবাসী জনপদে একটা স্থায়ী আতংকের জীবন তৈরী করে সেখান থেকে মানুষ উচ্ছেদের এই রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের প্রধান বাস্তবায়নকারী হচ্ছে ভারতের সেনাবাহিনী ও তাঁদের প্রশিক্ষিত স্থানীয় মিলিশিয়া দল। এই তথ্যগুলো তো সকলেরই জানা এবং অরুন্ধতী রায় এসব বলে যাচ্ছেন বহুদিন ধরে। আমাদের প্রগতিশীল বন্ধুরা কি পারবেন এই তথ্যগুলোকে মিথ্যা প্রমান করতে? পাকিস্তান কি তার করপোরেশনের স্বার্থে তার নিজের জনগন কে তাঁদের পিতৃভুমি থেকে উচ্ছেদ করেছে? কিংবা এই কাজে কি পাকিস্তান তার নিজের সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছে? পাকিস্তান নিশ্চিত ভাবেই বাংলাদেশ ও বালোচিস্তনের জনগনের বিরুদ্ধে তার সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছে এই দুই জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার দাবীকে দমন করার জন্যে, কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর পাকিস্তান কি দেশী-বিদেশী করপোরেশন কে খনিজ সম্পদের দখল পাইয়ে দেবার জন্যে, বনভুমির দখল পাইয়ে দেবার জন্যে কিংবা নিদেন পক্ষে পাকিস্তানকে বিশ্ব পুঁজিবাজারের কাছে তুলে দেবার জন্যে,  তার নিজের জনগন কে উচ্ছেদ করার জন্যে তার নিজের সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছে? যদি করে থাকে, তাহলে কেনো কেউ সেই প্রমান – ব্যাখ্যা হাজির করছেন না?

বাবরী মসজিদের দরোজা খোলার সাথে সাথে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের সম্পর্ক নিয়ে যেকোনো চিন্তাশীল মানুষের কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এটা এখন ইতিহাসের অংশ, কিভাবে ভারতের মতো একটি সেকুলার দেশে বাবরি মসজিদের উপরে রামমন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠতে পারে ভোটের রাজনীতির প্রধান নির্ধারক, তা আমরা দেখেছি গত দুই দশকে। হিন্দুত্ববাদের এই প্রবল উত্থান, বিজেপির এই বিশাল বিজয়, ভারতের মূলধারার মিডিয়াতে বিজেপির প্রভাব ভারতের প্রধান সংখ্যালঘু মুসলিম ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সমগ্র ভারতীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। সারা ভারতে মিডিয়া ও বিজেপির প্রোপ্যাগান্ডা সেল এর সফল প্রচারনা ভারতের অ-হিন্দু জনগন কে করে তুলেছে “অ-ভারতীয়”র সমার্থক। সেজন্যে বরেণ্য চলচ্চিত্র অভিনেতা নাসিরউদ্দিন শাহ কিংবা শাবানা আজমীকে প্রকাশ্যে শুনতে হয়ে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেবার হুমকী, সমগ্র ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আতংকগ্রস্থ করে তোলা হয়েছে, মুসলিম জনগোষ্ঠীকে হয় সন্ত্রাসবাদী নয়তো পাকিস্তানের এজেন্ট এই দুই তকমায় ভুষিত করা হচ্ছে।

নাসিরুদ্দিন শাহ’র মতো অনেক বরেণ্য প্রগতিশীল মানুষকে প্রতিনয়ত হিন্দুত্ববাদী হুমকীর মুখে জীবন কাটাতে হচ্ছে বর্তমান ভারতে।

অরুন্ধতী রায় ব্যাখ্যা করেছেন, নব্বুই এর দশক থেকে কিভাবে ভারত রাষ্ট্র তার নিজের জনগোষ্ঠীর দুটি অংশকে “সন্ত্রাসবাদী” হিসাবে চিহ্নিত করে চলেছে, এক – পাহাড়ী জনগনকে বানানো হচ্ছে “মাওবাদী সন্ত্রাসবাদী” আর মুসলিম জনগন কে বানানো হচ্ছে “ইস্লামিস্ট জঙ্গীবাদী”। আর এই দুটি প্রয়াসেই ভারত রাষ্ট্রের বিশ্বস্ত পার্টনার হচ্ছে ভারতের সেনাবাহিনী। এবং এটা বিস্ময়কর নয় যে এই দুটি প্রকল্পই কিভাবে পশ্চিমের শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান কেই বাস্তবায়ন করছে। মাওবাদীদের দমনের নামে করপোরেশনগুলোর হাতে পাহাড়ের দখল তুলে দেয়া আর মুসলিম জনগন কে “ইসলামী জঙ্গীবাদী” বানানোর মাধ্যমে আমেরিকা ও তার মিত্রদের জারি করা তথাকথিত “ওয়ার অন টেরর” এর এশিয়ান পার্টনার হয়ে থাকা। নব্বুইয়ের দশকের পর থেকে  ভারতকে বিশ্ব পুজিবাজারের একটি নিরাপদ অংশ হিসাবে গড়ে তোলার জন্যে ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল হচ্ছে ভারতীয় সমাজের ব্যাপক সামরিকায়ন করা আর এই প্রকল্পের প্রধান অংশীদার বা স্টেইকহোল্ডার হচ্ছে ভারতের সেনাবাহিনী। পাকিস্তান রাষ্ট্র কি তার সেনাবাহিনীকে এভাবে ব্যবহার করেছে? কেউ ইতিহাস থেকে প্রমান করে দিতে পারবেন?

 

পর্যালোচনা – ৩

আওয়ামীপন্থী লেখক হাসান মুরশেদ অরুন্ধতী রায়কে “জেনোসাইড ডিনায়াল” এর অপরাধে অভিযুক্ত করেছেন। কিন্তু তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি কোন সংজ্ঞায় অরুন্ধতী জেনোসাইড ডিনায়াল করেছেন। তিনি লিখেছেন এভাবে –

“১। Listening to Grasshoppers- Genocide, Denial, And Celebration:- ২০০৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। ১৫ শতক থেকে শুরু করে ১৯১৫ এর আর্মেনিয়ান জেনোসাইড হয়ে কম্বোডীয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া ধরে ভারত রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন জেনোসাইড সমুহ নিয়ে আলোচনা। সারা বিশ্বের প্রায় সকল জেনোসাইডের উল্লেখ আছে- শুধু ১৯৭১ বাংলাদেশ জেনোসাইড নেই, একটা শব্দ ও নেই।

২। “They say Pakistan is a military dictatorship, but I don’t think the Pakistani army has been actively deployed against its ‘own’ people the way the Indian army has been” – 1st September 2011

https://newint.org/…/2011/09/01/interview-with-arundhati-roy

৩। “Pakistan did not deploy army against its own people as India does” October 2017

http://theindianvoice.com/arundathi-roy-attacks-india-exo…/…

অরুন্ধতী রায়, ভারত রাষ্ট্র ও তার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যা খুশী বলুন- আমাদের কিছু যায় আসেনা। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র ও এর সেনাবাহিনীকে যদি সার্টিফিকেট বিলাতে থাকেন তাহলে আমাদের যায় আসে। অনেক কিছুই যায় আসে।

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম নৃশংস জেনোসাইডকে যদি কেউ উপেক্ষা করেন- সেটা একটা অপরাধ। অপরাধের নাম ‘জেনোসাইড ডিনায়েল’”।

(সূত্রঃ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লেখা থেকে, হাসান মুরশেদ মার্চ ০৬, ২০১৯)

অর্থাৎ হাসান মুরশেদের ভাষ্যমতে কোনো একটি বিশেষ প্রবন্ধে যদি কোনো একটি জেনোসাইড এর কথা উল্লেখ না থাকে তাহলে সেটা “ডিনায়াল” হিসাবে গন্য হবে।  জেনোসাইড ডিনায়াল এর এই সংজ্ঞা তিনি কোথায় পেলেন? কোনো রেফারেন্স আছে এর স্বপক্ষে? আন্তর্জাতিক ভাবে যে দুই তিনটি সবচাইতে গ্রহনযোগ্য ঐক্যমত আছে “জেনোসাইড ডিনায়াল” বিষয়ে সেখান থেকে কি তিনি দেখাতে পারবেন কিভাবে অরুন্ধতী রায় কে “জেনোসাইড ডিনায়াল” এর অপরাধে অভিযুক্ত করা যায়? তিনি তা পারবেন না, আর ২০০৮ এর যে প্রবন্ধটির প্রসঙ্গ তিনি উল্লেখ করেছেন উপরে, সেই প্রবন্ধটি যেকেউ পড়ে দেখলে বুঝতে পারবেন সেখানে প্রধান প্রসঙ্গ তুরস্ক এবং ভারত। পৃথিবীর অন্যান্য কয়েকটি জেনোসাইড এর নাম এসেছে কেবলই পার্শ্বীয় প্রসঙ্গ হিসাবে। আর সবচাইতে আগ্রহউদ্দীপক হচ্ছে যে প্রবন্ধটির উল্লেখ করেছেন হাসান মুরশেদ সেই নামে অরুন্ধতীর একটি পুস্তক প্রকাশিত হয় পরবর্তীতে, ২০১০ সালে প্রকাশিত সেই বইয়ের “আজাদী” নামের একটি প্রবন্ধে বাংলাদেশের উপরে পাকিস্তানের করা জেনোসাইডের উল্লেখ রয়েছে, জি “জেনোসাইড” শব্দটিই উল্লেখ করেছেন অরুন্ধতী। এর মানে কি এই যে, জীবনের যত প্রবন্ধ একজন লেখক লিখবেন তার সকল প্রবন্ধে যদি দুনিয়ার সকল জেনোসাইডের উল্লেখ এক সারিতে না করেন, তাহলেই তিনি “জেনোসাইড ডিনায়াল” এর অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন?

বঙ্গীয় নয়া-নাস্তিককূলের একজন আসিফ মহিউদ্দিন, তিনি জার্মানি থেকে লিখছেন এভাবে –

“অরুন্ধতী রায়ের অত্যন্ত অশালীন এবং বিকৃত মন্তব্যের জন্য অবিলম্বে ক্ষমা প্রার্থণা করা উচিত। অন্যথায় ভারত সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি, অবিলম্বে বাঙলাদেশে গণহত্যা এবং বেলুচিস্তানে নির্মম নিধনযজ্ঞ চালানো পাকি সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাওয়া, ইতিহাস বিকৃত করা, পাকিস্তানী গণহত্যা নিয়ে মিথ্যা বলা, গোপন করার চেষ্টা, পরোক্ষভাবে সমর্থন দেয়ার অপরাধে তাকে বিচারের আওতায় নেয়া হোক। একইসাথে, বাঙলাদেশ সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি, অরুন্ধতী রায়ের এই ধরণের মন্তব্যের জন্য উনাকে বাঙলাদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হোক।

আচ্ছা বলুন তো এই গোটা ভিডিওতে এমন কি বিজেপি সাপ্লাইড যে দেড় মিনিটের ক্লিপটি সেখানেও কোথায়  অরুন্ধতী “বাংলাদেশের গনহত্যার জন্যে ও বেলুচিস্তানে নির্মম নিধনযোগ্য চালানো পাকি সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই” গেয়েছেন? ঠিক কোন যায়গাটিতে? কত মিনিটের সময়? আসিফ মহিউদ্দিন কি আমাদেরকে উল্লেখ করে দিতে পারেন? অরুন্ধতী কোন ইতিহাস বিকৃত করেছেন এই ভিডিও তে? পাকিস্তানী গণহত্যা নিয়ে কি মিথ্যা কথা বলেছেন? ভিডিওটি কোন অংশে দেখিয়ে দিতে পারবেন জনাব আসিফ মহিউদ্দিন? তিনি পারবেন না, কেননা তিনি ভিডিওটি দেখেন নি, শোনেন নি, আর যদি তিনি দাবী করে থাকেন যে তিনি দেখেছেন তাহলে হয়তো ইংরাজি ভাষায় বক্তৃতার কারণে তিনি বোঝেন নি, কেননা তিনি যেসব দাবী করছেন, তার কিছুই ভিডিওটিতে নেই। আগ্রহী বন্ধুরা ভিডিওটি আবার দেখে নিতে পারেন।  

এই গোটা ভিডিওটিতে অরুন্ধতী রায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ে একটি কথাও বলেন নি। ঠিক কিভাবে তিনি এই আলোচনায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর “সাফাই গাইলেন”? এমন কি এই একই ভিডিও তে তিনি বাংলাদেশের উপরে পাকিস্তানের করা জেনোসাইডের কথা উল্লেখ করেছেন।  তিনি সুস্পষ্ট ভাবেই উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে হওয়া “জেনোসাইড” এর কথা, জি “জেনোসাইড” শব্দটাই উচ্চারন করেছেন। তাহলে ঠিক কিভাবে তিনি বাংলাদেশের গনহত্যাকে গোপন করার চেষ্টা করলেন? 

সমগ্র আলোচনায় বেলুচিস্তান প্রসঙ্গে কোনো কথাই হয়নি, কেননা আলোচনাটি ছিলো গনতন্ত্র, ভারত ও চীনের প্রেক্ষিত নিয়ে, সেখানে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ আসার কোনো কারণ ছিলোনা। কোনো আলোচনায় যদি কোনো বিশেষ প্রসঙ্গ না উল্লেখিত হয়, তাহলে কি সেই ঘটনাটিকে সমর্থন করা হয়? কিংবা সেই ঘটনাটিকে অস্বীকার করা হয়?  যেমন ধরা যাক, এই আলোচনায় ইউরোপের ইহুদী নিধনের কোনো প্রসঙ্গ আসেনি, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনের কোনো প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়নি, আসামের বাঙালী বিতাড়নের কোনো প্রসঙ্গ আসেনি। তাহলে কি অরুন্ধতী কে ইহুদী নিধনের, রোহিঙ্গা নিধনের ও আসামের বাঙালী নিধনের “পরোক্ষ সমর্থক” হিসাবে সাব্যস্ত করা যায়? কোনো যৌক্তিক মানুষ এটা মানবেন?  

এবার আসি, অরুন্ধতীর বাংলাদেশের জেনোসাইড প্রসঙ্গে। যেহেতু এই সকল প্রগতিশীলদের সময় নেই অরুন্ধতীর লেখালেখি পড়ে দেখার, তাই এরা জানেন না, অরুন্ধতী রায় অন্তত ভিন্ন ভিন্ন তিনটি লেখার অংশে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের উপরে পাকিস্তানী বাহিনীর করা গনহত্যার কথা উল্লেখ করেছেন (জি, তিনি ইংরাজিতে Genocide শব্দটিই ব্যবহার করেছেন)। ভারত ও পাকিস্তানের গনতন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ পাকিস্তানকে উল্লেখ করেছেন সামরিক শাসনতাড়িত একটি দেশ হিসাবে, যারা তাদেরই একাংশ যা এখন বাংলাদেশ, তার উপরে গনহত্যা (জেনোসাইড) চালিয়েছিলো। অরুন্ধতী লিখছেন এভাবে –

 

“It’s easy to scoff at the idea of a “freedom struggle” that wishes to distance itself from a country that is supposed to be a democracy and align itself with another that has, for the most part been ruled by military dictators. A country whose army has committed genocide in what is now Bangladesh. A country that is even now being torn apart by its own ethnic war”.

(Listening to the grasshopper, Arundhati Roy, 2009)

 

উপরের এই উদ্ধৃতিটিতে কি বাংলাদেশের জেনোসাইডের কথা উল্লেখ আছে? এখানে কি বাংলাদেশের জেনোসাইডের কথা অস্বীকার করা হয়েছে নাকি স্বীকার করা হয়েছে? এবারে এই উদ্ধৃতিটি পড়ে দেখুন, এটি পাওয়া যাবে ২০১১ সালে প্রকাশিত পুস্তক Walking with the comrades এর ১২০ তম পাতায়।

 

“When Charu Mazumdar famously said, ‘China’s chairman is our chairman and China’s path is our path,’ he was prepared to extend it to the point where the Naxalites remained silent while General Yahya Khan committed genocide in East Pakistan (Bangladesh)”.

(Walking with the Comrades, Arundhati Roy, 2011 পৃষ্ঠা ১২০)

 

উপরের এই উদ্ধৃতিটিতে কি বাংলাদেশের উপরে পাকিস্তানী বাহিনীর জেনোসাইডের কথা উল্লেখ আছে? এখানে কি জেনোসাইড কে অস্বীকার করা হয়েছে? পাকিস্তানী বাহিনীর সাফাই গাওয়া হয়েছে?

অরুন্ধতী রায়ের সর্ব শেষ উপন্যাস (বিশ বছর পরে লেখা অরুন্ধতীর দ্বিতীয় উপন্যাস) দি মিনিস্ট্রি অফ  আটমোস্ট হ্যাপিনেস বইয়ে অরুন্ধতী রায় তার গড়া চরিত্রের মাধ্যমে বলছেন –

 

“It’s true we did—we do— some terrible things in Kashmir, but… I mean what the Pakistan Army did in East Pakistan—now that was a clear case of genocide. Open and shut. When the Indian Army liberated Bangladesh, the good old Kashmiris called it—still call it—the ‘Fall of Dhaka.’ They aren’t very good at other peoples’ pain. But then, who is? The Baloch, who are being buggered by Pakistan, don’t care about Kashmiris. The Bangladeshis who we liberated are hunting down Hindus. The good old communists call Stalin’s Gulag a ‘necessary part of revolution’. The Americans are currently lecturing the Vietnamese about human rights. What we have on our hands is a species problem. None of us is exempt.”

(The ministry of utmost happiness, Arundhati Roy, 2017)

 

এখন ভেবে দেখুন তো অরুন্ধতী রায় কি বাংলাদেশের উপরে হয়ে যাওয়া পাকিস্তানী গনহত্যার কথা অস্বীকার করেছেন? কিংবা বেলুচিস্তানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর করা নিপীড়ন বিষয়ে তিনি কি অন্ধ বা বধির? না, তিনি এই বিষয়গুলোতে অন্ধ বা বধির কোনোটাই নয়, তিনি কেবল এই সকল জাতিয়তাবাদী মুক্তচিন্তকদের মতো প্রোপাগান্ডায় উচ্চকন্ঠ নন, তিনি উচ্চকন্ঠ একটি বিষয়ে সেটা হচ্ছে ভারতের গনতন্ত্র ও ভারতীয় সমাজকে ক্রমাগত গ্রাস করতে থাকা সামরিক – বেসামরিক করপোরেট তন্ত্র, হিন্দুত্ববাদ, গনতন্ত্রহীনতা ইত্যাদি নিয়ে । তিনি যতটা উচ্চকন্ঠ ভারতের গনতন্ত্র নিয়ে, ততটা উচ্চকন্ঠ নন, দুনিয়ার বাকী অংশ নিয়ে। এটা কি অপরাধ? হিন্দুত্ববাদী প্রোপাগান্ডা এটাকে অপরাধ প্রমানের জন্যে তাদের সর্বস্বপন করে নেমেছে, আর হিন্দুত্ববাদী এই প্রচারনায় যোগ দিয়েছেন লক্ষ লক্ষ জাতিয়তাবাদ তাড়িত “আধুনিক মানুষ” যার মাঝে আমাদের উপরে উল্লেখিত ধরণের মানুষগুলো প্রধান। তসলিমা নাসরিন,  হাসান মুরশেদ, আসিফ মহিউদ্দিন, সুষুপ্ত পাঠক আর নানান রঙের নারীবাদিরা,  এরা কেবলই বিজেপি’র এজেন্ডা বাস্তবায়নের বাংলাদেশী মাঠ কর্মী মাত্র।

 

পর্যালোচনা – ৫

এবারে আসি অরুন্ধতী রায়ের “মাফ” চাওয়া প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিন এই বিষয়ে তার ফেইসবুকের দেয়ালে একটি পোস্ট দেন, পোস্ট টি ছিলো এই রকমের  –

 

“অরুন্ধতী তো মাপ চাইলো। ২০১১ সালে পাকিস্তানী আর্মির গীত গাইছিলো। ওরা নাকি দেশের কাউরে আক্রমন করেনা, ভারতের আর্মি করে। পূর্ব পাকিস্তানের ৩০ লাখ বাঙ্গালিরে তো ১৯৭১ সালে পাক আর্মি ভালোবাইসা চুমা দিছিল আর কী ! এহন কী কারণে গীত গাওয়ার লাইগা মাপ চাইতাছে, উদ্দেশ্য কী বুঝা যাইতাছে না। ৯ বছর কেন টনক নড়লো। এহনকার কীর্তি কলাপের লাইগা কত বছর নিবে মাপ চাইতে কেডা জানে”।

 

প্রথমত বলে নেয়া ভালো, তসলিমা নাসরিনের এই ধরণের হিংসা প্রসূত নোংরা বক্তব্যের জবাব দেননি অরুন্ধতী রায়। সম্ভবত তসলিমা নাসরিনের কোনো লেখা প্রসঙ্গে কথা বলার সময় অরুন্ধতী রায়ের নেই। তসলিমার লেখালেখি অরুন্ধতী রায়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তসলিমা নাসরিন যখন ভারতে মুসলিম মৌলবাদীদের দ্বারা হেনস্থা হয়েছিলেন, রাষ্ট্র যখন তাঁর পাশে দাঁড়ায় নি, তখন আরও অনেকের সাথে অরুন্ধতী রায় দাঁড়িয়েছিলেন তসলিমার লেখার অধিকারের দাবীতে, তাঁর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের নিশ্চয়তার দাবীতে। তসলিমা নাসরিনের মতো “খ্যাতি উম্মাদ” লেখকের কাছ থেকে এই ধরণের একটি বিবৃতি খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তসলিমা কি অরুন্ধতীর বিবৃতিটি পড়ে দেখেছেন? তসলিমার ইংরাজি খুব দুর্বল। এটা কেতকী কূশারী ডাইসন উল্লেখ করেছিলেন তাঁর এক প্রবন্ধে। তাই আমার ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে তসলিমা আদৌ অরুন্ধতীর বিবৃতিটি পড়েছেন কিনা, কিংবা পড়ে বুঝেছেন কিনা। অথবা হয়তো তসলিমার কোনো টিন এজ সমর্থকের লিখে দেয়া এই কুৎসিত পোস্টটি তিনি কেবল তাঁর নিজের ফেইসবুক একাউন্ট থেকে প্রকাশ করেছেন। কেননা তিনি যা লিখেছেন তা কেবল প্রমান করছে যে তিনি না শুনেছেন অরুন্ধতীর বক্তৃতা, না পড়েছেন অরুন্ধতীর বিবৃতি।  অরুন্ধতী লিখেছেন –  

 

This tiny clip of video in no way represents what I believe, or indeed what I have written over the years. I am a writer, and what I commit to words is far more important than what I might say extempore in the course of a freewheeling talk. Still, it is a matter of enormous consequence and I apologize for any momentary confusion the clip may have caused.”

সূত্রঃ অরুন্ধতী রায়ের বিবৃতি 

 

আগ্রহী পাঠক লক্ষ্য করে দেখুন, অরুন্ধতী বলছেন “এই ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ” এর কথা। অর্থাৎ যে দেড় মিনিটের ভিডিও ক্লিপটি বিজেপির প্রচারনা সেল তৈরী করেছে ও প্রচার করেছে সারা বিশ্বব্যাপী। এবং তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন যদি “এই ভিডিও ক্লিপ” টি কোনো ধরণের বিভ্রান্তি তৈরী করে থাকে সেজন্যে। অরুন্ধতী রায় কি তাঁর মতামত, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যে “মাপ” চাইছেন? তসলিমা নাসরিন কোথায় পেলেন এই “মাপ” চাওয়ার গল্প? পাকিস্তানী আর্মির “গীত” গাওয়ার গল্প? এসবই তসলিমা নাসরিনের ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার ফসল। কিন্তু তসলিমা নাসরিন একজন লেখক, তিনি কেনো আরেকজন লেখকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন? কেনো তিনি একজন লেখকের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না ঠিক যেভাবে অরুন্ধতী রায় তাঁর পক্ষে অন্তত তিন বার পথে নেমেছিলেন? ঠিক যেভাবে অরুন্ধতী রায় তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তার জন্যে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর কাছে চিঠি লিখেছিলেন? তসলিমা নাসরিনের সাম্প্রতিক দুয়েকটি টুইটার বানী আমাদের এ বিষয়ে উত্তর দিতে পারে। দেখুন – 

তসলিমা নাসরিন প্রকাশ্যে টুইটার বিবৃতি দিয়ে জানাচ্ছেন যে তিনি রেসিডেন্স অনুমতির জন্যে আবেদন করেছেন। এই বিবৃতিতে তিনি যুক্ত করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রবল হিন্দুত্ববাদী নেতা অমিত শাহ কে। তিনি আশা প্রকাশ করছেন যে অমিত শাহ তাঁকে তাঁর আবাসিক অনুমতিপত্র অনুমোদন করবেন। খুব বিস্ময়কর হচ্ছে তসলিমা নাসরিন ঠিক এর একদিন পরে আরেকটি

টুইটার বানীতে বিজেপির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে  ধন্যবাদ জানাচ্ছেন তাঁর রেসিডেন্স পারমিট অনুমোদন করার জন্যে এবং একই ভাবে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করছেন কেনো তিনি মাত্র তিন মাসের জন্যে এই অনুমতি পেয়েছেন, কেনো পঞ্চাশ বছরের জন্যে পাননি। বিজেপির নেতাদের প্রতি তসলিমা নাসরিনের যে ভাষা, তার সাথে আমরা তুলনা করে দেখতে পারি উপরে দেয়া তসলিমা নাসরিনের আরেকটি প্রতিক্রিয়া যা অরুন্ধতী রায়ের সম্পর্কে তিনি করেছেন। এই দুই প্রতিক্রিয়ার ভাষা কি এক রকমের? না, এক রকমের নয়, বিজেপির নেতাদের সাথে তসলিমা নাসরিনের ভাষা যতটা প্রেমময় ঠিক ততটাই ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ তাঁর ভাষা অরুন্ধতী রায়ের প্রতি। কিন্তু কেনো? শুধুমাত্র রেসিডেন্স পারমিটের অনুমোদন কি একজন লেখক কে আরেকজন সংগ্রামী লেখকের বিরুদ্ধে এতোটা ঘৃণাবাদী করে তুলতে পারে? হয়তো পারে, তসলিমা নাসরিন তার উদাহরণ। 

শেষ কথা

শক্তিমানের সঙ্গী হওয়াটা সহজ, তাতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তির দেখা মেলে, সরাসরি দেখা মিললেও এক ধরণের আত্মশ্লাঘা অনুভব করা যায়, আজকাল শক্তিমানের সাথে থাকাটা এক ধরণের “বুদ্ধিমত্তা”ও বটে, ঠিক যেভাবে লেখক তসলিমা নাসরিন বিজেপির সাথে রয়েছেন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে । সেজন্যেই তারেক ফাতাহ বা তসলিমা নাসরিনের মতো উপরের এই চরিত্রগুলো প্রকারন্তরে বিজেপি’র সঙ্গী হয়ে নিজেদেরকে ধীমান ভেবে আনন্দিত হয়েছেন। কিন্তু মানব ইতিহাস আমাদের জানান দেন, ইতিহাসে নরেন্দ্র মোদী’র বুদ্ধিবৃত্তিক সহচরেরা থাকবেন এক অধ্যায়ে আর অরুন্ধতী রায়েরা থাকেন আরেক অধ্যায়ে। অরুন্ধতী রায়দের গ্রেফতার করা যায়, জেলখানায় পচিয়ে মারা যায়, কিন্তু ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়না।   

তারেক ফাতাহ, তসলিমা নাসরিনের মতো ঘৃণাবাদীর আক্রমনের মুখে কিংবা লক্ষ লক্ষ হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণাত্মক  উম্মাদনার মুখেও ধীর স্থীর প্রত্যয়দীপ্ত অরুন্ধতী রায় বলছেন – 

 

“I do not believe that the States of India, Pakistan or Bangladesh are in any way morally superior to one another. In India right now, the architecture of pure fascism is being put into place. Anybody who resists it risks being smeared, trolled, jailed, or beaten down. But it will be resisted.”

সূত্রঃ অরুন্ধতী রায়ের বিবৃতি 

 

“আমি বিশ্বাস করিনা যে রাষ্ট্র ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ কেউই নৈতিক ভাবে একে অপরের চাইতে ভালো। বর্তমান ভারতে নিরেট ফ্যাসিবাদী কাঠামো উপস্থিত। যে কেউ এই ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করবেন, তারাই চরিত্র হননের শিকার হবেন, তাঁদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হবে, জেলখানায় ভরা হবে কিংবা মেরে স্তব্ধ করে দেয়া হবে। কিন্তু এই জমানাকে প্রতিরোধ করা হবেই”।

আমি ও আমরা অনেকেই একারনেই অরুন্ধতী রায়ের পক্ষে, কেননা আমরা জানি, ফ্যাসিবাদী জমানাকে জনগন প্রতিরোধ করবেই একদিন। সেখানে নরেন্দ্র মোদী, তারেক ফাতাহ কিংবা তসলিমা নাসরিন যে বা যারাই ফ্যাসিবাদের পক্ষে থাকুন না কেনো। 

Spread the love